দিগ্বিজয়ী বাবর(দ্বিতীয় খণ্ড)
দিগ্বিজয়ী বাবর(দ্বিতীয় খণ্ড)
আন্দিজান এসেই তনয়াল আন্দিজানের বেগদের ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে নিজের পক্ষে এনে বাবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলো এবং ফাতিমা সুলতানার সাথে পরামর্শ করে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নিলো।
এই বিদ্রোহের সময় বাবর জ্বরে ভুগছিলেন। জ্বরে ভুগে ভুগে তিনি কাহিল হয়ে পড়েছিলেন। সেজন্য উত্তেজিত হলে অসুখ বেশি হওয়ার আশংকা করে আন্দিজান থেকে আসা খবর হেকিম বাবরকে জানাতে দিচ্ছিলেন না।
কাশিম বেগ আন্দিজানের খবর নিয়মিতভাবে পাচ্ছিলেন যদিও বাবরের অসুখের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তিনি বেগদের সাথে পরামর্শ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য চিন্তা-ভাবনা করার সমান্তরালভাবে বাবর আরোগ্য হয়ে উঠার জন্য উৎকণ্ঠিতভাবে অপেক্ষা করছিলেন।
সেদিন শরীরটা একটু সতেজ অনুভব করার জন্য বাবর বোস্তান-ই-শরাইর শয়নকক্ষে বসে ছিলেন।
ঠিক তখনই আন্দিজান থেকে আসা পত্রবাহক প্রাসাদের নিচের মহলার দরজার নিকট উপস্থিত হলো।
পত্রবাহক গোল করে মুড়ানো মোহরযুক্ত একটি পত্র বাবরের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত দেহরক্ষীকে দেখিয়ে বললো-পত্রটি মালিকা সাহেবা স্বয়ং জাহাপনার হাতে দেওয়ার জন্য বলে পাঠিয়েছেন।
কয়েকদিন ধরে বাবর আন্দিজানের খবরের জন্য ব্যাকুলভাবে প্রতীক্ষা করছিলেন। আন্দিজান থেকে কোনো খবর এসেছি কি, না আসেনি প্রতিদিন তিনি তার খোঁজ-খবর নিচ্ছিলেন। বাবরের উৎকণ্ঠা দেখে দেহরক্ষীরাও উৎকণ্ঠিত হয়ে আছিলো। সেজন্য পত্রবাহকের হাতে পত্র দেখে দেহরক্ষীটি পত্রবাহককে বারান্দায় অপেক্ষা করতে বলে সে তৎক্ষণাৎ বাবরের শয়ন কক্ষের পহরায় নিয়োজিত দেহরক্ষীর নিকটে এসে বাবরের সাথে পত্রবাহকের সাক্ষাতের অনুমতি খুঁজলো।
দেহরক্ষীটি বাধা দিয়ে বললো- না না, এরকম সরাসরি জাহাপনাকে পত্র দেওয়া যাবে না। পত্রটি প্রথমে উজির-এ-আজম পড়বেন। সংবাদ ভালো হলে তখন জাহাপনাকে পড়তে দেওয়া হবে।
তখন পত্রবাহক সেখানে এসে বললো- কিন্তু মালিকা সাহেবাই পত্রটি স্বয়ং জাহাপনার হাতে দেওয়ার জন্য বলে পাঠিয়েছেন।
ঠিক তখনই হেকিম সাহেব সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি পত্রবাহক এবং দেহরক্ষীর বাক-বিতণ্ডা শুনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনি বাক-বিতণ্ডার কারণ জানতে চাইলেন- কী হলো? কী নিয়ে বাক-বিতণ্ডা চলছে?
দেহরক্ষীটি বললো- আন্দিজান থেকে পত্রবাহক এসে পৌঁছেছে। সে স্বয়ং জাহাপনার হাতে পত্রটি দেওয়ার জন্য জোর করতেছে। আমি নিষেধ করাতে আমার সাথে তর্ক করতেছে।
হেকিম সাহেব দরজার পাহারায় নিয়োজিত সৈনিককে সমর্থন করে বললেন- জাহাপনার অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। খারাপ সংবাদে অবস্থা অধিক জটিল করতে পারে! কিছু সময় আগে অবস্থা কিছু উন্নত হয়েছে যদিও মানসিক আঘাত পেলে আবার অবস্থা খারাপ হতে পারে! চিন্তা-ভাবনা উৎকণ্ঠাই রোগ বৃদ্ধি করে। অসুখেও রোগীর উপরে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পায়। যেহেতু অবস্থা কিছু উন্নত হয়েছে, সেজন্য এই সময়ে পত্র না দেওয়াটাই নিরাপদ হবে।
আন্দিজান বর্তমান শত্রুর কবলে। পত্রবাহক যুক্তিতর্ক শুরু করে দিলো- যদি এখনই জাহাপনাকে পত্রটি দেওয়া না হয়, তাহলে দেরি হয়ে যাবে এবং তখন আন্দিজান শত্রুর পদানত হওয়াটাও অসম্ভব নয়!
হেকিম সাহেব জোর গলায বললেন- না না, তবুও আমি অনুমতি দিতে পারব না। আমায় ক্ষমা করবেন। এ বিষয়ে আপনি আগে কাশিম বেগের সাথে আলোচনা করুনগে'। একজন চিকিৎসক হিসাবে আমার কাছে রোগীর নিরাপত্তা সবার আগে।
কিন্তু হেকিম সাহেব..। মাথা চুলকিয়ে চুলকিয়ে পত্রবাবহক হতাশ ও বিষণ্ন সুরে বললো।
না না অসম্ভব... হেকিমের ভ্রূযুগল কুঞ্চিত হয়ে উঠলো।
বাক-বিতণ্ডা বাবরের শয়ন কক্ষের দরজার সন্মুখে হচ্ছিল। সেজন্য বাক-বিতণ্ডা বাবরের কাণে পৌঁছোল। তিনি কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠে উচ্চস্বরে ডেকে বললেন- যদি পত্রবাহক এসেছে আমার কাছে আসতে দিন। এটা আমার আদেশ।
বাবরের উৎকন্ঠিত গুরু-গম্ভীর কন্ঠের প্রভাবে বাক-বিতণ্ডা বন্ধ হয়ে গেলো। পরাজয়ের গ্লানিতে হেকিমের মুখমন্ডল উদ্ভট এবং হাস্যকর হয়ে উঠলো। তিনি অসহায় ভাবে রক্ষীর দিকে তাকালেন কিছু আশ্বাস পাওয়ার আশায়। কিন্তু রক্ষী কোনো রকমের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না করে অনিচ্ছাসত্ত্বেও পত্রবাহককে শয়ন কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি দিলো- যান, জাহাপনাই স্বয়ং হুকুম করেছে যখন আমার তরফ থেকে কিছু বলার নেই।
পত্রবাহক কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করে আঁঠু গেড়ে বসে সে ধীরে ধীরে বাবরের নিকটে এসে দুই হাত দিয়ে পত্রটা ধরে সসন্মানে বাবরের দিকে বাড়িয়ে ধরলেন। বাবর পত্রটি হাতে নিয়ে বালিশের উপরে ভর দিয়ে অর্ধশায়িত হয়ে মোহর ছাড়িয়ে খামের মুখ খুলে পত্রটি বের করলেন। পত্রের সাথে এক টুকরো কাগজও বের হলো। কাগজ টুকরোয় খাজা আবদুল্ল্যার এবং পত্রটিতে মাতৃ কুতলুগ নিগার বেগমের হস্তাক্ষর দেখে বাবর ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। তিনি অতি আগ্রহে পত্র দু'টি পড়ে উদভ্রান্ত ও ক্লিষ্ট দুষ্টিতে পত্রবাহকের দিকে তাকালেন। উত্তেজনায় তাঁর সর্বশরীর ম্যালেরিয়া রোগীর মতো থর থর করে কাঁপতে লাগলো।
পত্র দু’টির বিষয়বস্তু একই ছিলো। শত্রু আন্দিজান অবরোধ করে রয়েছে এবং তনয়াল সেনাদলের নেতৃত্ব দিচ্ছে। পরিস্থিতি খুবই সংকটজনক। যেকোনো মুহূর্তে আন্দিজান শত্রুর পদানত হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠেছে। আন্দিজান শত্রুর পদানত হলে রক্ষা করাটা খুবই কঠিন হবে। বাবরের হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকে আন্দিজান রক্ষা করা সম্ভব নয়। এভাবে লেখার পরে উভয় পত্রেই বাবরের হস্তক্ষেপের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে।
আহম্মদ তনয়াল যে লোভী এবং খামখেয়ালি স্বভাবের এ কথা বাবরের অবিদিত নয়। কিন্তু সে যে এতদূর এগোবে এ কথা ছিলো বাবরের কল্পনারো অগোচর। সেজন্য তিনি নিরুদ্ধ আক্রোশে পত্র দু’টি মুঠ করে ধরে উত্তেজিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন-বিশ্বাসঘাতক তনয়াল! সে আন্দিজান অবরোধ করে রেখেছে? বিশ্বাসঘাতক বেগদের সাথে ষড়যন্ত্র করে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ষড়যন্ত্র করছে? এর উদ্দেশ্য আমার কাছ থেকে গৃহরাজ্য কেড়ে নেওয়া হবে? আহম্মদ তনয়াল নাবালক বাদশাহর হয়ে আন্দিজান শাসন করার স্বপ্ন দেখছে? না না, তনয়ালের এই স্বপ্ন আমি পূরণ হতে দেব না। আমার ঘোড়া সাজাও— আমার তরবারি আন। আমি এখনই এই মুহূর্তে আন্দিজান যাত্রা করব। তনয়ালের স্বপ্ন আমি চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দিব। তলয়ালকে আমি এমন শিক্ষা....
বাবর বাক্যটি সম্পূর্ণ করতে পারলেন না। তাঁর মাথা ঘুরতে লাগলো। সাথে সাথে তাঁর শরীরে প্রচন্ড জ্বর উঠলো। উত্তেজনায় তাঁর মাথার সিরা উপসিরা স্ফীত হয়ে উঠলো এবং তাঁর অজ্ঞাতসারেই মাথাটা বালিশ থেকে পড়ে গেলো।
মাথাটা বালিশ থেকে পড়ে যাওয়ার পরে বাবর আচ্ছন্নের মতো ভাবতে লাগলেন, আন্দিজানে যদি আহম্মদ তনয়াল এবং জাহাঙ্গীরের জয় হয়, তখন বেশিভাগ লোক তাঁদের পক্ষে যোগদান করবে। হয়তো তিনি বিছানায় পড়ে থাকা সময়টুকুতেই অনেকে পালিয়ে গিয়ে তাঁদের সাথে যোগদান করেছে। বাবরের অত্মরাত্মা ভয়ে কেঁপে উঠলো। দেহের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে তিনি বিছানায় উঠে বসলেন।
হেকিম, পত্রবাহক এবং দরজার পহরায় নিযোজিত রক্ষী নির্বোধ অসহায় চোখে বাবরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় তাঁরা শংকিত, উৎকণ্ঠিত এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন। বাবর বিছনায় উঠে বসাতে তাঁরা খানিকটা প্রকৃতিস্থ হলেন। পরিস্থিতির বিষয়ে অবগত করার জন্য রক্ষীটি দৌড়ে কাশিম বেগকে ডেকে আনতে গেলো।
হেকিম দ্রুত বাবরের পাশে এসে তাঁর শরীরে ধরে শোয়ানোর চেষ্টা করে বললেন- জাহাপনা, উত্তেজিত হবেন না। আপনি শোয়ে পড়ুন।
বাবর যন্ত্রণাকাতর কন্ঠে আর্তনাদ করে উঠলেন- কাশিম বেগ কোথায়?
এক্ষুনি এসে পৌঁছোবেন। হেকিম বাবরকে উৎসাহিত করার জন্য কোমল কন্ঠে অনুরোধের সুরে বললেন- রক্ষী তাঁকে ডাকতে গেছে। এক্ষুনি এসে পড়বে। আপনি শোয়ে পড়ুন। বর্তমান আপনার বিশ্রামের প্রয়োজন।
বাবর হেকিমের অনুরোধ রক্ষা করে অলসভাবে বিছনায় গা এলিয়ে শোয়ে পড়লেন। তিনি চোখ বুজে আন্দিজানের বর্তমান পরস্থিতির সম্ভাব্য চিত্র কল্পনা করার সাথে সাথে তাঁর মানসপটে ভেসে উঠলো আহম্মদ তনয়ালের হিংস্র, বীভৎস মূর্তি। তনয়াল যেন তনয়ালের চোখেমুখে পৈচাসিক উল্লাস। হিংস্র রক্তবর্ণ চোখে লোলুপ দৃষ্টি। তনয়াল হাতে নিয়ে থাকা তরবারিটিও বাবর চিনতে পারলেন। স্বয়ংবাবর তাকে তরবারিটি উপহার দিয়েছিলেন।
তনয়াল সেই তরবারিটিতে চুমা খেয়ে চিরদিনের জন্য বাবরের অনুগত হয়ে থাকার জন্য শপত খেয়েছিলো। তনয়াল তরবারিটিতে চুমা খেয়ে পৈচাসিক উল্লাসে বাবরের মাথার উপরে ঘুরাতে লাগালো। তনয়ালের পদতলে অসংখ্য রক্তরঞ্জিত ছিন্নমুণ্ড ভূ-লুণ্ঠিত হয়ে থাকা বাবরের চোখে পড়লো। সেই ছিন্ন মস্তকগুলির একটি....ইয়া আল্লাহ, এটা দেখছি তাঁর মাতৃর ছিন্ন মস্তক....।
সেই ভয়াবহ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে বাবরের সর্বশরীরে হিমপ্রবাহের মতো তীক্ষ্ণ বাতাসের স্রোত বয়ে গেলো। তিনি উদভ্রান্তের মতো হয়ে উঠলেন। সর্পদৃষ্ট মানুষের মতো তিনি চমকে জাঁপ মেরে বিছানা থেকে নেমে পড়লেন। পা-র তলে তিনি নরম কোমল দলিচার স্পর্শ অনুভব করলেন। দেহের সমগ্র শক্তি প্রয়োগ করে তিনি দাঁড়িয়ে আক্রোশ ভরা কন্ঠে চিৎকার করে উঠলেন- আমার তরবারি কোথায়? অতিসত্বর আমার তরবারি দিন।
হেকিম বাবরকে জড়িয়ে ধরে বললেন- জাহাপনা, আপনি অসুস্থ। আপনি শোয়ে থাকা জরুরি। আপনার বিশ্রামের প্রয়োজন।
বাবরের অনুমান হলো, হেকিম যেন তাঁকে বলপূর্বকভাবে তরবারির তলে ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি বলপূর্বকভাবে হেকিমের হাত থেকে মুক্ত হয়ে ঢুলতে ঢুলতে দরজার দিকে এগিয়ে এলেন।
দরজার কাছে এসেই বাবর পাগলের মতো চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে ডেকে বললেন- আমার ঘোড়া কোথায়? আমার ঘোড়া আনুন। আমি আন্দিজান যাব। আমার তরবারি কোথায়? বেগদের অতিসত্বর প্রস্তুত হতে বলুন।
হেকিম বাবরের আচকান এবং জোতা নিয়ে বাবরের কাছে দৌড়ে এলেন। তিনি বাবরের কাঁধে আচকান এবং পা-র কাছে জোতা রাখলেন।
বাবর এক পা-য় জোতা পরলেন যদিও অন্য পায় পরতে পারলেন না। তাঁর মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। তিনি কোনোমতে উচ্চারণ করলেন- বিদ্রোহী...খুনী.……..
এভাবে বলে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই তিনি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন এবং অচেতন হয়ে পড়লেন।
মধ্যরাতে বাবরের চেতনা ফিরলো। তিনি চোখ মেলে দেখলেন, হেকিম শিয়রের দিকে দাঁড়িয়ে তাঁর মুখে ফোটা ফোটা জল দিতেছেন এবং তাঁর দীর্ঘ বিশ্রী ছায়া দেয়ালের উপরে পড়ে আন্দোলিত হইতেছে।
বাবরের অনুমান হলো যেন, তাঁর জিভা ফুলে উঠেছে। জিভা এতো ভারি হয়ে উঠেছে যে বাবরের জন্য সেই ওজন সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়লো। শরীরটা যেন কোনো ভারি জিনিষ দিয়ে চেপে ধরে রাখা হয়েছে। হাত-পাগুলি অসার হয়ে পড়েছে। তাঁর পইথানের দিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন কাশিম বেগ। কাশিম বেগের দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে তিনি চোখ মুদলেন।
কাশিম বেগ দ্রুত বাবরের শিতানের দিকে এসে বললেন- আল্লাহ মেহেরবান জাহাপনা। আপনি তো আমাদের ভয়ই খাইয়েছিলেন।
উত্তরে বাবর কিছু বলতে যাচ্ছিলেন যদিও তিনি জিভা নাড়াতে পারলেন না। তিনি চোখ মেলে অসহায়ভাবে স্থির দৃষ্টিতে কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখের জলে চোখ দু'টি ছলছল করতে লাগলো। ব্যথা ও উত্তেজনার অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো মুখমণ্ডলে।
কাশিম বেগ আত্মীয়তার সুরে বললেন- এখন আপনার অবস্থা কেমন, জাহাপনা? বাবর আগের মতোই নিশ্চল হয়ে পড়ে রইলেন। তিনি সব দেখছিলেন ও বুজছিলেন, তবে মুখ দিয়ে কোনো শব্দ প্রকাশ করার শক্তি ছিল না। তিনি নিঃসহায়ভাবে কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন।
বাবরের অবস্থা প্রত্যক্ষ করে কশিম বেগের অন্তর হাহাকার করে উঠলো এবং তাঁর চোখ জলে ভরে উঠলো। ষোল বছরের অসুস্থ কিশোর একজন সুস্থ সবল উজির-এ-আজমের চোখে জল দেখে যাতে বিচলিত হয়ে না উঠে তার জন্য তিনি মুখ ঘুরিয়ে চোখের জল মুছতে লাগলেন।
কয়েক মুহূর্ত পরে কাশিম বেগ বাবরের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে আন্দিজানের পরিস্থিতি সম্পর্কে অধিক তথ্য জনার জন্য তাহিরজানকে আন্দিজান পাঠিয়ে দিলেন।
*
* *
বাবর রোগশয্যায় পড়ে থাকা অবস্থায় আহম্মদ তনয়াল আন্দিাজন দখল করে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করলো।
সেদিন ছিলো দারুণ অন্ধকার রাত। সমগ্র আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে ছিলো। আন্দিজানের দূর্গটি সেই অন্ধকারের মাঝে ডুবে ছিলো। আসন্ন বিপদের আশংকায় আন্দিজানের প্রতিটি অলিগলিতে বিরাজ করছিলো থমথমে নিস্তব্ধতা।
সর্বোপরি সমরকন্দ থেকে আসা সংবাদবাহকের মুখে বাবরের ভয়ঙ্কর অসুখের খবর পেয়ে দূর্গের দায়িত্বে থাকা এক অংশ সেনা আহম্মদ তনয়ালের পক্ষে যোগদান করাতে দূর্গের পহরায় পর্যাপ্ত পরিমাণের সেনাও ছিলো না। সেজন্য প্রায় অরক্ষিত অবস্থাতে পড়ে ছিলো দূর্গের কোনো কোনো দরজা।
ঠিক এমনই একটি রাতের জন্য আহম্মদ তনয়াল অপেক্ষারত ছিলো। প্রত্যাশিত রাতটা আসার সাথে সাথে তনয়াল আন্দিজান দূর্গ আক্রমণ করলো এবং প্রত্যাশিতভাবেই সে দূর্গ দখল করতে সক্ষম হলো।
দূর্গের পহরায় নিয়োজিত বাবর সেনা সেই অতর্কিত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলো না। তারা প্রতিরোধ গঢ়ে তোলার আগেই তনয়ালের সেনা তাদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ফলে বাবরের বিধ্বস্ত বেগবর্গের কেউ কেউ খণ্ড যুদ্ধে নিহত হলো এবং অনেকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গিয়ে প্রাণের ভয়ে তনয়ালের বশ্যতা স্বীকার করে তার পক্ষে যোগদান করলো। সেজন্য অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আন্দিজান দূর্গ তনয়ালের হস্তগত হয়ে পড়লো।
দূর্গ দখলের পরে তনয়াল বাবর পক্ষের সেনাদের নির্বিচারে হত্যা করার পরে মির্জা জাহাঙ্গীরকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে নিজে স্বয়ং উজির-এ-আজম পদে অধিষ্ঠিত হয়ে পুরাতন আক্রোশ চরিতার্থ করার জন্য উঠেপড়ে লাগলো। আক্রোশবশতঃ সে কুতলুগ নিগার বেগম ও খানজাদা বেগমকে বন্দি করার নির্দেশ দিলো। তবে, মির্জা জাহাঙ্গীর তাঁর সৎমা এবং সৎ বোনকে বন্দি করার পরিবর্তে নজর বন্দি করে রাখার জন্য পরামর্শ দিলেন।
খানজাদা বেগম যে ফজিলুদ্দিনের প্রতি দুর্বল ছিলেন এই কথা তনয়ালের অবিদিত ছিলো না। সেজন্য তনয়াল আক্রোশমূলকভাবে ফজিলুদ্দিনকে বন্দি করে ‘কাল কুঠুরি’তে আটক করে রাখলো।
কিন্তু খাজা আবদুল্ল্যার সহযোগে ফজিলুদ্দিনের ভাগ্নে তাহিরজান ফজিলুদ্দিনকে কাল কুঠুরি থেকে মুক্ত করে হিরাত পাঠিয়ে দিলো।
জিলুদ্দিনকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তনয়াল খাজা আবদুল্ল্যাকে ফাঁসি কাঠে ঝুলিয়ে হত্যা করলো।
এসব সময়ের খবর সময়ে সমরকন্দে আসছিলো যদিও বাবরের অসুস্থতার জন্য কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গঢ়ে তোলা সম্ভব হচ্ছিল না। বাবরের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে অপ্রত্যাশিত ফল লাভ করে তনয়াল ধীরে ধীরে সমগ্র আন্দিজান হাতের মুঠে নিলো।
দীর্ঘদিন রোগ ভূগের পর কিছু সুস্থ হয়ে উঠায় মাতৃ এবং ভগ্নীকে শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করার জন্য বাবর সসৈন্যে আন্দিাজন অভিমুখে রওয়ানা হলেন।
শরীর দুর্বল থাকার দরুণ বাবর ঘোড়ায় না উঠে তিনটি ঘোড়ায় টানা একটি বগিতে চড়ে রওয়ানা হলেন। বগিতে নরম গদি এবং তোশক পেড়ে দেওয়া হচ্ছিল। ছৈর সন্মুখে টানিয়ে দেওয়া হচ্ছিল রঙীন পর্দা। রঙীন পর্দাটিতে সূর্যের রশ্মি পড়ে বগির ঝাঁকানিতে অগ্নি শিখার মতো লকলক করতে ছিলো।
বাবর এবং তাঁর সেনাদল থেকে দুই তিন মাইল পেছনে পেছনে আসছিলো একটি অতি সুন্দর বাগি। সেই বাগিটার আরোহী ছিলেন বাবরের মাসি মেহের নিগার খানম এবং তাঁর বাগদত্তা আয়েশা বেগম।
সমরকন্দে আসার প্রস্তুতি অনেকদিন যাবত চলছিল যদিও বাবরের অসুখের জন্য দেরি হচ্ছিল। সেজন্য বাবর সমরকন্দ ছেড়ে আসার কথাটা এ কান সে কান করে সমগ্র সমরকন্দে রাষ্ট্র হয়ে পড়েছিলো। এমনকি সমরকন্দের বাইরেও অন্য শাসকদের কানেও পড়েছিলো কথাটা।
বুখারার সুলতান সুলতান আলীর কাণেও পৌঁছেছিলো কথাটা। সমরকন্দ দখলের জন্য সুলতান আলী অনেকদিন থেকে প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। সেজন্য বাবর সমরকন্দ ছেড়ে চলে আসার জন্য প্রস্তুতি চালানোর কথা শুনে তিনি উৎসাহিত হয়ে সৈন্য সমাবেশ করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। বাবর সমরকন্দ ছেড়ে আসার সাথে সাথে যাতে সমরকন্দ আক্রমণ করে নিজের দখলে নিতে পারে এটাই ছিলো তাঁর সৈন্য সমাবেশের উদ্দেশ্য।
বাবর সুলতান আলীর এই মনোভাবের কথা আগে থেকেই অবগত হয়ে ছিলেন যদিও তাঁর জন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা গঢ়ে তোলা সম্ভব হয়নি। কারণ তাঁর অসুখের সময় অনেক সৈন্য পালিয়ে গিয়ে বিদ্রোহী তনয়ালের দলে যোগদান করেছিলো। ফলে তাঁর সৈন্য সংখ্যা খুবই কমে গিয়েছিলো। সেজন্য তিনি সমরকন্দে সৈন্য ছেড়ে আসা সম্ভব হয়নি। ফলে সমরকন্দ ছেড়ে আসার পরে কী হতে পারে এ বিষয়ে তিনি পূর্ব থেকেই পূর্বাভাস পেয়েছিলেন।
সুলতান আলী ছিলো একজন নিষ্ঠুর শসক। তাঁর কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা সম্ভব ছিলো না। মেহের নিগার বেগমও সুলতান আলীর এই নিষ্ঠুর স্বভাবের বিষয়ে অবগত ছিলেন। সেজন্য সুলতান আলী সীমান্তে সৈন্য সমাবেশের কথা শুনে বাবর সমরকন্দ ছেড়ে আসার জন্য উত্রাবল হয়ে পড়েছিলেন। বাবর আয়েসা বেগমকে সমরকন্দে ছেড়ে আসতে ভরসা পাননি। সেজন্য সমরকন্দ ছেড়ে আসার সময় মেহের নিগার বেগম ও আয়েশা বেগমকে সাথে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন।
এই দুর্দিনের সময়ে মেহের নিগার বেগম এবং আয়েশা বেগমের জন্য একমাত্র নিরাপদ স্থান হলো তাসকন্দ। তাসকন্দে বর্তমান সুলতান আহম্মদ রাজত্ব করতেছেন। তিনি মেহের নিগার বেগমের ভ্রাতৃ এবং আয়েশা বেগমের বড় বোন রেজিয়া সুলতানার স্বামী। রেজিয়া সুলতানা বর্তমান সুলতান আহম্মদের সাথেই আছেন। সেই হিসাবে আত্মীয়তার দিক থেকেও মেহের নিগার বেগম এবং আয়েশা বেগমের জন্য তাসকন্দ সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। বাবর মেহের নিগার বেগম এবং আয়েশা বেগমকে তাসকন্দে রেখে আন্দিজান আক্রমণ করার কথা ভেবে সমরকন্দ থেকে চলে এসেছেন।
তাসকন্দ এবং আন্দিজান যাওয়া রাস্তা জিজ্জখ পর্যন্ত একটাই। জিজ্জখ পাওয়ার পরে মেহের নিগার বেগম এবং আয়েশা বেগমকে তাসকন্দ পাঠিয়ে বাবর সৈন্যসহ আন্দিজান অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যাবে। এখন দু'টি দলই এক সাথে যাইতেছে।
ইসলাম ধর্মীয় বিধান অনুসারে বিয়ের আগে বর-কনে একে অপরের মুখ দর্শন করা নিষিদ্ধ। সেই বিধান অনুসারে যাত্রা পথ একটা হলেও উভয় দল দু’টি ভাগে বিভক্ত হয়ে বর-কনের মাঝে দুই তিন মাইলের ব্যবধান রেখে চলেছেন।
উভয় দল বুলুণ্ড গাঁও এবং খালেসিয়া দূর্গের পাশ দিয়ে এসে সংগঝার নদীর পাড়ে উপস্থিত হলো। সন্ধ্যা হওয়াতে রাত্রি যাপনের জন্য নদীর পাড়ে তাঁবু খাড়া করা হলো। তাঁবু খাড়া করার সময়েও দুই তিন মাইলের ব্যবধান রাখা হলো।
তাঁবু খাড়া করার পর বাবর জায়গাটা ঘুরে দেখার জন্য বেরিয়ে পড়লেন।
নির্মল নীল আকাশ। ঝরঝরে পরিস্কার আবহাওয়া। দেহমন পুলকিত করা মৃদুমন্দ মলয় সমীর বইছিলো। নীল আকাশের তলে এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো সবুজ শ্যামল ছোট ছোট অনেক টিলা। টিলাগুলোর পাদদেশে ফুটে আছিলো নানা জাতের মরসুমি ফুল।
জায়গাখণ্ডের সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করে বাবর অভিভূত হয়ে পড়লেন। তিনি নরম কোমল ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াতে লাগলেন। পা-র তলে নরম ঘাসের স্পর্শ এবং বিকেলের সোনালী রোদের আমেজ লাগাতে বাবর পুলকিত হয়ে উঠলেন। তিনি নিজেকে স্বচ্ছন্দও মুক্ত অনুভব করতে লাগলেন। ফলে সমরকন্দে থাকাকালীন মনের মাঝে যে দুঃশ্চিন্তার কালো মেঘ জমেছিলো তা ধীরে ধীরে দূর হতে লাগলো।
কিন্তু এমন কিছু কথা আছে যা মন থেকে দূর করা কঠিন এবং ভুলাও সম্ভব নয়। সেরকম কিছু স্মৃতি বাবরের মনে লুকোচুরি খেলতে লাগলো।
কত কষ্ট এবং ত্যাগের বিনিময়ে তিনি সমরকন্দ দখল করেছিলেন। নানান দুর্গতি বিপত্তি, ভয়-শংকা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া অতিক্রম করে পুরা সাত মাস যাবত সমরকন্দ অবরোধ করে থাকতে হয়েছিলো। একমাত্র দৃঢ় মনোবলের জন্যই তিনি অসাধ্য সাধন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু দৈব-দুর্বিপাকে পড়ে তিনি স্বপ্নের সহর সমরকন্দ স্বইচ্ছায় শত্রুর হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছেন। সমরকন্দ ছেড়ে আসার সময় গভীর বেদনায় তাঁর দেহমন ভর গিয়েছিলো। দুঃসহ বেদনায় হৃদপিন্ড মোচড় দিয়ে উঠেছিলো। তাঁর অনুভব হচ্ছিলেন, সব প্রচেষ্টা, সব শ্রম বিফল হয়ে গেলো। অদৃষ্টের দুর্বিপাকে পড়ে হাহাকার করে উঠছিলো তাঁর হৃদয়। এখানে বেড়াতে আসার আগমুহূর্তেও বিষাদের অনুভতি তাঁর দেহমন আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো।
শ্যামল প্রান্তরের খোলা ঘাসে হেঁটে, খোলা বাতাস সেবন করে বাবরের মন চাঙ্গা হয়ে উঠলো। তিনি নিজের দুঃখ-বেদনার কথা ভুলে মাতৃ-বোন এবং খাজা আবদুল্ল্যাহর কথা ভাবতে লাগলেন। তাঁর চোখের সন্মুখে ভেসে উঠলো তাঁদের বেদনাচ্ছন্ন মুখের প্রতিচ্ছবি। সাথে সাথে তাঁর সমগ্র চিন্তা, সমগ্র ভাবনা মাতৃ-ভগ্নী এবং খাজা আবদুল্ল্যাহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে লাগলো। যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে তিনি তাঁদের নিষ্ঠুর তনয়ালের হাতের মুঠো থেকে উদ্ধার করবেন, তা না হলে তাঁর মনে শান্তি নেই—স্বস্তি নেই। এরকম একপ্রকার ভাবনাই তাঁর সমগ্র সত্বাকে আলোড়িত করে তুললো।
হঠাৎ বাবরের চোখ প্রসারিত হলো, সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা দূরস্থিত তাঁবুগুলোর দিকে। তাঁবুগুলোর দিকে দৃষ্টি প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে তাঁর হঠাৎ আয়েশা বেগমের কথা মনে পড়ে গেলো।
ওই তাঁবুগুলোর কোনটায় আয়েশা বেগম থাকতে পারে? ওই যে বিশেষভাবে দু'টি তাঁবু খাড়া করা হয়েছে, তার কোনো একটিতে আয়েশা বেগম নিশ্চয় তাঁর মাসির সাথে রয়েছে! আয়েসা বেগম এখন দেখতে কেমন হয়েছে? লোকে বলা মতে, গোলাপের পাপড়ির মতো বোলে তাঁর রূপের জ্যোতি প্রস্ফুটিত হয়েছে। আয়েশা বেগম তাঁর এতো কাছে থেকেও অনেক দূরে অবস্থান করছেন। এতো আপন, অথচ আয়েশা বেগম এতো পর! তিনি ভেবেছিলেন, এই বছরই তিনি মাতৃর অনুমতি নিয়ে মৌলবী ডেকে আয়েশাকে নিজের সাথে রাখার ব্যবস্থা করবেন। মানুষ গড়ে, বিধাতা ভাঙে। তার সেই আশা পূরণ হলো না।। কোথা থেকে ঝাঁপটা বাতাস এসে সব তছনছ করে দিয়ে গেলো। সেই বাতাসের তাণ্ডবে তিনি ঝরা পাতার মতো এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বাবর সজাগ হয়ে উঠলেন।উত্তেজিত হয়ে উঠলো তাঁর সিরা উপসিরা। না না, যেভাবেই হোক তিনি এই তাণ্ডবের বিপক্ষে বিজয় সাব্যস্ত করতেই হবে! নিজের হৃত গৌরব আবার উদ্ধার করতে হবে। কথাগুলো ভাবার সাথে সাথে তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো।
এভাবে নানান বিচ্ছিন্ন চিন্তার মাঝে তিনি খোলা প্রান্তরে ঘুরে ফিরে বেলা ডুবার আগে আগে ছাউনিতে ফিরে এলেন।
পরের দিন সকালে আবার যাত্রা শুরু হলো। আগের দিনের মতোই বাবর বাগিতে চড়ে আসতে লাগলেন। কিন্তু বাগির ভেতর বসে তিনি বিরক্তি অনুভব করতে লাগলেন। বগির ভেতরে বসে বসে এক সময় তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। এক প্রকার অস্বস্তির তীব্র সংঘাতে তাঁর দেহমন আলোড়িত করে তুললো।
তাঁরা একটি পাহাড়িয়া নির্জন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তৈমূর দরজা পার হয়ে বাবর বাগির পর্দা সরিয়ে সহিসকে উদ্দেশ্য করে খুঁনিয়ে খুঁনিয়ে বললেন- আমার মু-গ বর্ণ ঘো-ড়া আনতে বলুন।
দীর্ঘদিন রোগ ভোগের জন্য বাবরের কন্ঠ খোঁনা হয়ে ছিলো। ফলে তিনি খুঁনিয়ে খুঁনিয়ে কথা বলতেন।
কাশিম বেগ ঘোড়ার পিঠে বসে আসছিলেন। বাবরের কন্ঠস্বর শুনে তিনি দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে বাবরের কাছে এসে উৎকন্ঠিতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন- জাহাপনা, আপনি এখন ঘোড়া দিয়ে কী করবেন?
আবার খুঁনিয়ে খুঁনিয়ে কথা বলার ভয়ে বাবর মুখে কিছু না বলে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের অভিপ্রায়ের কথা জানিয়ে সহিসের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালেন। তাঁর চোখের ভাষায় স্পষ্ট হয়ে ছিলো, আমি যা বলছি, তাই কর।
বাবর যাতে আরও দুই তিন দিন ঘোড়ায় না চড়ে তারজন্য কাশিম বেগ এবং হেকিম অনুরোধ করতে লাগলেন। কিন্তু বাবর তাঁদের অনুরোধ উপেক্ষা করে বিরক্তি ভরা কণ্ঠে খুঁনিয়ে খুঁনিয়ে বললেন- আ-মি এ-ক-টু অ-শ্বা-রো-হ-ণ করব।
বাবরের দৃঢ় প্রত্যয় মিশ্রিত কন্ঠস্বর শুনে কাশিম বেগ এবং হেকিম তাঁদের মত পরিবর্তন করতে বাধ্য হলেন। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সহিসকে ঘোড়া আনতে নির্দেশ দিলেন।
নির্দেশ পেয়ে সহিস ঘোড়া নিয়ে এলো। ঘোড়া দেখে বাবর উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। বাগি থেকে নেমে তিনি ঘোড়ার কাছে এলেন। ঘোড়ার পাশে এসে তিনি কয়েকটা মুহূর্ত নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে থেকে কেউ বুঝতে পারার আগেই তিনি হঠাৎ ঝাঁপ মেরে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসলেন।
রোগ ভোগের পরে এটাই ছিলো তাঁর প্রথম অশ্বারোহণ। কারও সহায় ব্যতিরেকেই ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করা দেখে সহিস প্রশংসাসূচক হাসি হাসলো। কাশিম বেগ এবং হেকিম স্বস্তির নিশ্বাস ত্যাগ করলেন।
বাবর নিজেও উল্লসিত হয়ে উঠলেন ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে। তিনি স্বচ্ছন্দে ঘোড়া ছুটিয়ে যেতে লাগলেন। কোনো অসুবধিা হলে সহায় করার উদ্দেশ্যে কাশিম বেগ বাবরের পেছনে পেছনে যেতে লাগলেন। কিন্তু বাবরের কোনো রকমের সহায়ের প্রয়োজন হলো না। তিনি স্বচ্ছন্দে ঘোড়া ছুটিয়ে এগোতে লাগলেন।
বাবর ছোটবেলা থেকেই ঘোড়ায় উঠায় অভ্যস্ত ছিলেন। ছেলেবেলা তিনি ঘোড়ায় চড়ে নানান রকমের খেলা খেলতে ভালো বাসতেন। কখনও কখনও তেমন খেলা খেলতে গিয়ে তিনি বিপদেও পড়তেন।
একদিনের কথা। সেদিন বাবর যুদ্ধবিদ্যা অনুশীলনে ব্যস্ত ছিলেন। সেদিনের অনুশীলনের বিষয় ছিলো তীরন্দাজি। অন্যান্য সহযোগী তীরন্দাজবর্গ গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে বাবরের রণ কৌশল প্রত্যক্ষ করছিলেন।
বাবর ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে আসা অবস্থাতে হঠাৎ ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দিয়ে অপূর্ব দক্ষতায় তীর নিক্ষেপ করলেন এবং সেই তীর গিয়ে লক্ষ্যস্থানে আঘাতও করলো।
তীর নিক্ষেপ করেই বাবর সাবলীল ভঙ্গীতে ঘোড়া ছুটিয়ে ওস্তাদ মুস্কী বেগের নিকটে এলেন।
বাবরের অপূর্ব তীর নিক্ষেপ কৌশল প্রত্যক্ষ করে মুস্কী বেগ অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। বাবর তাঁর নিকটে আসার সাথে সাথে তিনি বাবরের পিঠ চাপরিয়ে প্রশংসা করে বললেন- বাঃ! অপূর্ব! আমি তোমার রণ কৌশলে অভিভূত। আচ্ছা, এখন তুমি বিশ্রাম নাওগে'।
এভাবে পরামর্শ দিয়েই মুস্কী বেগ অন্য কাজে চলে গেলেন।
মুস্কী বেগের প্রশংসায় বাবর উৎসাহিত হয়ে বিশ্রামের কথা ভুলে গেলেন। দুষ্টুমি বুদ্ধি জেগে উঠলো তাঁর মনে। তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে দুষ্টুমি করার কথা ভাবলেন। মুস্কী বেগ দৃষ্টিপথ থেকে অদৃশ্য হওয়ার সাথে সাথে তাঁর চোখেমুখে ফুটে উঠলো দুষ্টুমি বুদ্ধির চমক।
ভাবামতেই তিনি কপালে তারা চিহ্নযুক্ত অশ্বটি তাঁর কাছে নিয়ে আসার জন্য দেহরক্ষী অশ্বারোহীকে ইংগিতে নির্দেশ দিলেন।
দেহরক্ষীটি বাবরের নির্দেশ অনুসারে ঘোড়া নিয়ে এলেন। ঘোড়ার কাঠি ঠিক মতো বাঁধা আছে কিনা বাবর টেনে দেখে নিলেন। বাঁধা ঠিকই ছিলো। তিনি কিছুক্ষণ ভাবলেন এবং দেহরক্ষীকে পঞ্চাশ গজ দূরে এগিয়ে গিয়ে তাঁর দিকে ধীরে ধীরে ঘোড়া ছুটিয়ে আসতে বললেন। বাবরের নির্দেশ অনুসারে দেহরক্ষীটি ঘোড়ার পিঠে চড়ে পঞ্চাশ গজ এগিয়ে গিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ঘোড়ার লাগাম ধরে ধীরে ধীরে বাবরের দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো।
বাবরের সাথীদের মধ্যে নুয়ান কুশল দাস ছিলো অন্যতম। নুয়ান বাবরের থেকে বয়সে কিছু বড়। সে খানজাদা বেগমের সমবয়সী। খানজাদা বেগম এবং সে একসাথে তার মাতৃর দুগ্ধ পান করেছে। সেজন্য তার বাবরের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিলো।
দেহরক্ষীকে তেমনভাবে ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে আসতে দেখে নুয়ান উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলো। ববার যে ‘পাকচক্ৰ’( পাকচক্র অনুশীলনে সন্মুখের দিক থেকে নিজের দিকে এগিয়ে আসা ঘোড়ার দিকে দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে গিয়ে নিজের ঘোড়াটিকে দ্রুত ঘূরিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে জাঁপ মেরে গিয়ে সন্মুখের দিক থেকে মন্থর গতিতে এগিয়ে আসা ঘোড়ার পিঠে চড়তে হয়। এই অনুশীলনে ঘোড়ার পিঠে চড়তে বিফল হলে আঘাত পাওয়াটা প্রায় নিশ্চিত।) অনুশীলনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে এ কথা উপলব্ধি করতে নুয়ানের অসুবিধা হল না। সেজন্য বাবরের মনোভাব উপলব্ধি করে সে তৎক্ষণাৎ বাবরের কাছে এসে উৎকন্ঠিতভাবে অনুরোধের সুরে বললো- শাহজাদা, এইমাত্র আপনি একটি অনুশীলন করেছেন। পাকচক্র অনুশীলনটা আজ না করলে হয় না?
বাবর নুয়ানের কথায় বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে বললেন- আচ্ছা, তোমার কথায় পাকচক্র অনুশীলনটা আজকের জন্য বাদ দিলাম। আজ শুধু একটি লঘু অনুশীলন করব।
এভাবে বলেই বাবর রহস্যপূর্ণ হাসি হেসে ঘোড়ার পেটে পা-র গোড়ালি দিয়ে গুঁতো মেরে তাঁর দিকে মন্থর গতিতে এগিয়ে আসা ঘোড়ার দিকে সগৌরবে ঘোড়া ছুটিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে গেলেন।
ঝাঁপটা দৌড়ে দৌড়ে এসে বাবরের ঘোড়া দেহরক্ষীর ঘোড়ার কাছে পৌঁছোলেন। সাথে সাথে বাবর রেকাব থেকে পা বের করে চাবুক দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে দেহরক্ষীর ঘোড়া লক্ষ্য করে জাঁপ দিলেন। বাবরকে জাঁপ দেওয়া দেখে দেহরক্ষীর ঘোড়াটি ভয় পেয়ে একটু সরে গেলো।
বাবর একমুহূর্ত শূন্যে ভেসে রইলেন এবং পরে দেহরক্ষীর ঘোড়াটির জিনের কাঠি ধরতে সক্ষম হলেন। তবে তাঁর পা মাটিতে ঘেঁসরানি খেতে খেতে হিঁচড়ে যেতে লাগলো। তাঁর মাথার রেশমি পাগুরি মাথা থেকে খসে দূরে ছিটকে পড়লো।
দেহরক্ষী সৈন্যটি অশেষ কষ্ট করে ঘোড়াটা থামাতে সক্ষম হলো। বাবর ঘোড়ার কাঠি ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ালেন। তবে তিনি তখনও চাবুকটি দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে ছিলেন।
বাবরের এই দুর্গতির জন্য দেহরক্ষী সৈন্যটি নিজেকে দায়ী ভেবে ঠক্ঠক্ করে কাঁপতে লাগলো। প্রকৃতার্থে বাবরের এই দুর্ঘটনার জন্য দেহরক্ষী সৈন্যটি দায়ী ছিলো না, দায়ী ছিলো স্বয়ং বাবর।
সেজন্য দেহরক্ষীর ভয়ের কারণ উপলব্ধি করতে পেরে বাবর অভয় দিয়ে বললেন- তুমি কেন ভয় করছ? এখানে তোমার কোনো দোষ নেই। সেজন্য তোমার ভয় করারো প্রয়োজন নেই। যাও, তুমি ঘোড়া সামলাওগে'।
ছেলেবেলা থেকেই এরকম ছিলেন বাবরের মহত্ত্ব এবং অশ্ব চালনার প্রতি আকর্ষণ ও পারদর্শিতা।
সেজন্য বাবর ঘোড়ায় চড়ে স্বচ্ছন্দ অনুভব করতে লাগলেন। বাগিতে পা কুঁচিয়ে বসে থেকে তিনি রোগশয্যায় শোয়ে থাকার মতো অনুভব করছিলেন। ঘোড়ার কদম কদম দৌড়ের ছন্দে তিনি শরীরে নতুন শক্তি ও উদ্যম অনুভব করতে লাগলেন। দেহের জড়তার সাথে সাথে তাঁর মনের জড়তাও হ্রাস পেতে লাগলো ঘোড়ার কদম কদম পা ফেলার ছন্দে। ঘোড়ার পিঠে বসে যেন তাঁর স্বাস্থ্যও উত্তরোত্তর উন্নতি হতে লাগলো। তাঁর স্বাস্থ্য এবং মনের গতি লক্ষ্য করে সবাই উৎফুল্লিত হয়ে উঠলো।
সূর্যাস্তের সাথে সাথে তাঁরা এসে জিজ্জখ উপস্থিত হলেন। রাত্রি যাপনের জন্য তাঁবু খাড়া করা হলো। আগের মতোই দুই তিন মাইলের ব্যবধান রেখে বর-কন্যার তাঁবু পৃথকে পৃথকে খাড়া করা হলো।
অশ্বারোহণ করে বাবরের স্বাস্থ্য এবং মনের উন্নতি হওয়ার কথা মেহের নিগার বেগম এবং আয়েশা বেগমের কানেও পড়লো। তাঁরা খবর শুনে স্বাভাবিকভাবেই উৎফুল্লিত হয়ে উঠলেন এবং শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা হিসাবে বাবরকে কিছু উপহার প্রদানের কথা ভাবলেন। মেহের নিগার বেগম পরিচারক একজনের দ্বারা কাশিম বেগকে ডেকে পাঠালেন।
খবর পেয়ে কাশিম বেগ আসার পরে মেহের নিগার বেগম একটি আচকান, একটি কটিবন্ধ এবং একটি রুপোর মুঠোযুক্ত চাবুক বাবরের জন্য উপহার হিসাবে কাশিম বেগের হাতে পাঠিয়ে দিলেন।
তিনটা উপহারেরই রূপক অর্থ ছিলো। আচকান ছিলো বাবরের স্বাস্থ্য উন্নত হওয়ার জন্য আনন্দের প্রতীক, কটিবন্ধের অর্থ ছিলো, অতি শক্তিশালী ও প্রতাপী হওয়ার এবং রূপোর চাবুকের অর্থ ছিলো বাবর দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে আন্দিজান গিয়ে শত্রুর ওপরে বিজয় সাব্যস্ত করার প্রতীক।
মাগরিবের নামাজের পরে কাশিম বেগ উপহার কয়টি এনে বাবরের হাতে দিলেন। উপহার পেয়ে বাবর হর্ষোৎফুল্লিত হয়ে উঠলেন এবং তিনি প্রতি উপহার প্রদানের কথা ভাবলেন।
উপহারের বিষয়ে বাবর কাশিম বেগের কাছে পরামর্শ চাইলেন। কাশিম বেগ কিছুক্ষণ ভাবনা-চিন্তা করে মুদ্রা দিয়ে পরিপূর্ণ একটি রুপোর পাত্র প্রদানের পরামর্শ দিলেন।
পরামর্শ বাবরের মনোমত হলো। তিনি মুদ্রাপূর্ণ পাত্রের সাথে আরও একপদ বস্তু প্রদানের পরামর্শ দিলেন- আপনি মুদ্রাপূর্ণ পাত্রটি একটি খালি ঘোড়ার বগিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।
বগির কথা শুনে কাশিম বেগ চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- কিন্তু.......বর্তমান আমাদের মাত্র একটি খালি বগি আছে। উপহার ভেবে বাগিটা যদি তাঁরা ফেরত না দেয় এবং যদি আপনার প্রয়োজন হয়.........
বাবর দৃঢ় কণ্ঠে বললেন- আল্লাহর ওপরে ভরসা রাখুন, নিশ্চয় বগির প্রয়োজন হবে না। বগিতে মাসি-ই সফর করুন।
কথাটা বাবরের আদেশ ভেবে কাশিম বেগ কোনো রকমের প্রতিবাদ করলেন না। বাবরের ইচ্ছানুসারেই একটি মুদ্রাপূর্ণ পাত্র একটি খালি বগিতে পাঠিয়ে দিলেন।
পরের দিন সকালে আবার যাত্রা শুরু হলো। দু’টি জাকজমক রাজকীয় বগি, মালবাহী গাড়ী এবং উটের সারি উত্তর দিকে ঘুরে তাসকন্দের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলো। না বললেও হবে যে, সেই বগি দু’টির একটিতে ছিলেন মেহের নিগার বেগম এবং অন্যটিতে ছিলেন আয়েশা বেগম।
দেহরক্ষী সেনার ওপরেও বাবর নিজের একশ জন সুশিক্ষিত সেনা মেহের নিগার বেগম এবং আয়েশা বেগমের সাথে পাঠিয়ে দিলেন। এখান থেকে মেহের নিগার বেগম এবং আয়েশা বেগম যাবেন তাসকন্দ অভিমুখে এবং বাবর আন্দিজান অভিমুখে।
মাসি এবং বাগদত্তাকে বিদায় সম্ভাষণ জানানোর জন্য বাবর একটি টিলার ওপরে উঠে দাঁড়ালেন। বগি, মালবাহী গাড়ী এবং অপসৃত উটের সারি ধীরে ধীরে বাবরের দৃষ্টিপথ থেকে অদৃশ্য হয়ে পড়ল। তাঁর সাথে যাওয়া সেনারা টিলা থেকে নেমে এলেন যদিও তিনি টিলার ওপরেই দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে আয়েশা বেগম চড়ে যাওয়া বগিটি প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন। তিনি হয়তো সেভাবে দাঁড়িয়ে নিজের বাগদত্তাকে শুভকামনা জানানোর সমান্তরালভাবে নিজেও তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিলেন।
বাবর সমরকন্দে একশ দিন ছিলেন। এই একশ দিনের ভেতরে তিনি একদিনও আয়েশা বেগমের সামনাসামনি হোন নি। ধর্মীয় নীতি নিয়মের সাথে যুবকসুলভ লজ্জাশীলতাই তাঁকে আয়েশা বেগমের সাথে সামনাসামনি হওয়ায় বাধা দিচ্ছিলেন। টিলার ওপরে দাঁড়িয়ে তাঁর ‘বোস্তান সরায়’ প্রসাদে বসে রচনা করা শায়েরির কথা মনে পড়ে গেলো-
তোমার রূপের জ্যোতি সবার মুখে মুখে চন্দ্রমুখি
তোমার ও আমার কখন মিলন হবে চন্দ্রমুখি?
কিছুক্ষণ পরে বাবর অন্যমনস্কভাবে টিলা থেকে নেমে ছাউনিতে এলেন। ছাউনিতে এসেই তিনি দলবল নিয়ে আন্দিজান অভিমুখে রওয়ানা হয়ে এলেন।
সেদিন সারাটা দিন তিনি ঘোড়ার পিঠে বসে শায়েরির উপরোক্ত পংক্তি দু’টির সাথে অন্য দু'টি পংক্তি সংযোগ করলেন-
তোমার মাথার নাগাল না পেলেও, আঁঠু পর্যন্ত নিশ্চয় পাব
ভাগ্যই আমাকে যেদিকে নিবে, তোমার সাথে আমি সেখানেই যাব।
সেদিন রাত্রি যাপনের জন্য ‘কোতে গিরমান’-এ সন্ধ্যেবেলা তাঁবু খাঁড়া করলেন। তাঁবু খাড়া করার পরে তিনি কাগজ কলম নিয়ে তাঁবুতে বসে সারাদিন ভেবে আসা পংক্তি দু'টি লিখে ফেললেন।
* * *
বাবর জিজ্জখ থেকে সৈন্যসামন্ত নিয়ে রওয়ানা হয়ে নাবদরিয়া পার হয়ে আন্দিজানের সংবাদ জানার জন্য ছাউনি পেতে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কারণ সমরকন্দে থাকতেই আন্দিজানের সবিশেষ পরিস্থিতির বুঝ নেওয়ার জন্য কাশিম বেগ তাহিরজানকে আন্দিজান পাঠিয়ে দিয়ে ছিলেন এবং সমরকন্দ থেকে আন্দিজান অভিমুখে রওয়ানা হয়ে আসার দু'দিন আগে তাহিরজানের সাথে সাক্ষাত করে নাব দরিয়ার পাড়ে বাবরের সাথে সাক্ষাত করার জন্য অন্য একজন সংবাদবাহককে নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়ে ছিলেন।
কিন্তু বাবর নাব দরিয়া পার হওয়ার সময়ে তাহিরজান আন্দিজান থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে কোকন্দ পার হয়ে খোদ দরবেশ রেগিস্থান পৌঁছেছিলেন মাত্র। খোদ দরবেশ থেকে বাবর ছাউনি পাতা স্থানে ঘোড়া ছুটিয়ে এলে কমেও সাত আটদিনের রাস্তা। সেজন্য বাবর ছাউনি পেতে ছয়দিন অপেক্ষা করার পরেও আন্দিজানের কোনো সংবাদ না পেয়ে বা তাহিরজান আসার কোনো লক্ষণ না দেখে অধৈর্য হয়ে সাতদিনের দিন আন্দিজান অভিমুখে যাত্রা শুরু করলেন।
বাবর দলবল নিয়ে কিছুদূর আসার পরেই কস্তুরি রঙের ঘোড়ায় চড়ে ধূলি উড়িয়ে তাহিরজানকে আসতে দেখলেন।
বাবরের কাছে এসেই তাহিরজান ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ মেরে নেমে কাঁদতে লাগলো। সে কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলো- আপনি সমরকন্দ ছেড়ে এলেন কেন, জাহাপনা?........
তাহিরজান কেঁদে কেঁদে আন্দিজানের সমগ্র ঘটনা বলে গেলো-
তাহিরজানের মুখে আন্দিজানের পরাজয় এবং দূর্গ সুরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাদের বিশ্বাসঘাতকতার বিবরণ শুনে বাবরের অন্তরাত্মা আর্তনাদ করে উঠলো। তাঁর দেহমন প্রচণ্ড ব্যথার অনুভূতিয়ে আচ্ছন্ন করে ফেললো। তাঁর অনুমান হলো, পৃথিবীটা যেন প্রচণ্ড ঝঞ্জার তাণ্ডবে কাঁপতেছে। আকাশ বাতাস আন্দোলিত হইতেছে। প্রচন্ড ভূমিকম্পের তাণ্ডবে পৃথিবী তল ওপর হইতেছে। চির দরিয়ার পাড় ভেঙে ভূ-ভাগ প্লাবিত করতে মাতাল তরঙ্গ মুখব্যাদান করে এগিয়ে আসছে। সেই তরঙ্গের জলে যেন ধোয়ে মুছে নিবে সমগ্র পৃথিবী।
বাবরের চোখে মুখে করুণ ব্যথার অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো। চোখ বিস্ফারিত করে তিনি আন্দিজানের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। নাব দরিয়ার সেপাড়ে অবস্থিত খোজন্দের পাহাড়িয়া এলেকা ধোঁয়াশার মতো দৃষ্টিগোচর হলো। খোেজন্দ থেকে আন্দিজান কতদূর? বাবর নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলেন। তাঁর অনুমান হলো, দুর্ভাগ্য যেন তাঁকে আন্দিজান থেকে টেনে হিঁচড়িয়ে সমরকন্দ নিয়ে গিয়েছিলো এবং চরম দুর্ভাগ্যই যেন পুনরায় সমরকন্দ থেকে আন্দিজান ঠেলে পঠিয়েছে।
আন্দিজান থেকে বিশ্বাসঘাতক তনয়াল, সমরকন্দ থেকে সুলতান আলী এবং তুর্কিস্থান থেকে শৈবানি খাঁ তাঁর দিকে তাকিয়ে পৈচাশিক উল্লাসে অট্টহাসি হাসছে এবং সেই হাসির শব্দে যেন চতুর্দিক ঝঙ্কারিত হচ্ছে। আলীদোস্ত বেগের বিদ্রোহ, বাবরের প্রতি আনুগত্য ও নিষ্ঠা প্রদর্শনের জন্য খাজা আবদুল্ল্যাহকে খাকান দরজায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার কথা এবং বাবরের মাতৃ কুলতুগ নিগার বেগম ও ভগ্নী খানজাদা বেগমের দুর্দশার কথাও তাহিরজান অশ্রুসিক্ত নয়নে বর্ণনা করে গেলো।
খাজা আবদুল্ল্যাহকে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে হত্যা এবং মাতৃভগ্নীর দুর্দশার কথা শুনে বাবর প্রচন্ড ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। তাঁর ধৈর্যের বান্ধ ভেঙ্গে গেলো। উত্তেজনায় তাঁর চোখমুখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করলো। বিক্ষুব্ধ উত্তেজনায় তিনি থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। তাঁর দেহের সিরা উপসিরা স্ফীত হয়ে উঠলো।
বাবর লাফ মেরে ঘোড়ার পিঠে চড়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোড়া ছোটালেন। কোথায় যাবেন, তিনি নিজেও জানেন না। যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাক ভেবে তিনি ঘোড়াটিকে ইচ্ছামতো ছুটতে দিলেন।
সকাল থেকে জল না খাওয়ার জন্য পিপাসার্ত হয়ে ঘোড়া নদীর পাড়ে এলো। নদীর উঁচু খাড়া পাড় দেখে বাবরের হঠাৎ পিতৃর কথা মনে পড়ে গেলো। তাঁর উপলব্ধি হলো, যেন নদীর উঁচু খাড়া পাড় ধীরে ধীরে তলের দিকে ধসে পড়ছে। তিনি চমকে উঠে পিছিয়ে এলেন। ক্ষোভ, আক্রোশে তিনি উদ্ভ্রান্তের মতো হয়ে উঠলেন। এক সময় তিনি নিরুদ্ধ আক্রোশে ঘোড়ার গলা ঝাঁপটে ধরে মেয়ে মানুষের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
বাবর হঠাৎ উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোড়া ছুটিয়ে আসা দেখে কাশিম বেগ এবং হেকিম উৎকণ্ঠিত হয়ে বাবরের পেছনে পেছনে আসছিলেন। তাঁরা কিছুদূরে দাঁড়িয়ে বাববের কার্যকলাপ নিরীক্ষণ করছিলেন। বাবরকে কাঁদতে দেখে কাশিম বেগ বাবরের নিকটে এসে সমবেদনা প্রকাশ করে বললেন-এভাবে কাঁদবেন না জাহাপনা। আমরা এখন চরম বিপদের সম্মুখীন হয়েছি। বিপদে ধৈর্য ধারণ করা
উচিত, জাহাপনা।
তনয়াল আন্দিজানে কাশিম বেগরও যথেষ্ট ক্ষতি সাধন করেছিলো। সেজন্য তিনি তাঁর দুরবস্থার কথা বলে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন- বিদ্রোহীরা আমার সমস্ত সম্পত্তি লুটপাট করে নিয়ে গেছে। আমার ছেলেটিকেও খারাপ ধরণে মারধোর করেছে। এগুলিকে অদৃষ্টের পরিহাসের বাইরে আর কী বলবো, জাহাপনা?
কাশিম বেগের কথা শুনে বাবর উদ্বিগ্নভাবে মাথা তুলে তাকালেন। তাঁর চোখে তখনও জল টলবল করতেছিলো।
বাবরের চোখে জল দেখে হেকিম মাতৃসূলভ স্নেহে বাবরের পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন- জাহাপনা, আপনার অন্তর এতো ছোট করা উচিত নয়। আল্লাহর কৃপায় আপনার মাতৃ এবং ভগ্নী কুশলেই আছেন। আপনি বেঁচে থাকলে পুনরায় সব ফিরে পাবেন। আল্লাহর ওপরে ভরসা রাখুন। আপনি এভাবে হতাশায় ভেঙ্গে পড়লে আপনার অসুখ আবার বেশি হতে পারে! তখন সব আশা ভরসা বরবাদ হয়ে যাবে, জাহাপনা।
হেকিমের উপদেশ মিশ্রিত কথাগুলো বাবরের কর্ণগোচর হল না। কারণ তখন তাঁর চোখের সন্মুখে ভেসে বেড়াচ্ছিলো খাজা আবদুল্ল্যাহর প্রাণহীন দেহ। তিনি চেষ্টা করেও চোখের জল লুকোতে সক্ষম হচ্ছিলেন না। তাঁর চোখে যেন বর্ষার ঢল নামলো। যন্ত্রণা বিকৃত কণ্ঠে তিনি নিজেকে নিজে বলতে লাগলেন- হায় ! আমার ওস্তাদ, আপনি আমাকে কার কাছে রেখে এভাবে চলে গেলেন? সেই পাষণ্ডরা আপনার মতো মানুষকে কীভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করতে পারলো? এভাবে বলার পরেই যেন তিনি আত্মপ্রত্যয় ফিরে পেলেন। তাঁর ক্লান্ত শিথিল স্নায়ুগুলো যেন হঠাৎ সজীব হয়ে উঠলো। দু’চোখে দপ করে জ্বলে উঠলো প্রতিশোধের বহ্নি শিখা। বিষণ্ণ ক্লান্তির জায়গায় জেগে উঠলো উদ্যম উদ্দীপনা। হঠাৎ তাঁর কন্ঠস্বর বদলে গেলো। তিনি আক্রোশে জ্বলে উঠলেন- আমি, আমাদের ওস্তাদ হত্যার বদলা নেব। আমার দেহে প্রাণ থাকা পর্যন্ত আমি লড়াই করে যাব। এ আমার কসম!
হেকিম এবং কাশিম বেগ লক্ষ্য করলেন, বাবর খুঁনিয়ে খুঁনিয়ে কথা বলছেন না। প্রতিটা শব্দ সাবলীল এবং স্পষ্টভাবে উচ্চারণ কর ছেন। কথাগুলো বলার সময় প্রতিমুহূর্তে তার মুখমণ্ডলের রঙ বদলে যাচ্ছে। কখনও মলিন, কখনও আবার রাঙা হয়ে উঠছেন তাঁর মুখমন্ডল।
বাবর স্পষ্ট উচ্চারণে কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে আদেশের সুরে বললেন- আমি বদলা নেব, আমি যুদ্ধ করব। আপনি সৈন্যদের সঙ্গবদ্ধ করে আমার আদেশের কথা জানিয়ে দিন। আমি কসম খাচ্ছি, আমি বদলা নেব। সবাই আন্দিজান অভিমুখে যাত্রা করুন।
বাবর কথাগুলো বলে লাফ মেরে দাঁড়িয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে ছাউনির দিকে রওয়ানা হলেন।
*
* *
বাবর অতি সহজেই মার্গিলান এবং উশ দখল করলেন। আন্দিজানের কাছে সংঘটিত সমরে তনয়াল শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো। উপায়বিহীন হয়ে তনয়াল আন্দিজান দূর্গের ভেতরে আশ্রয় গ্রহণ করলো।
বিজয়ের আনন্দে বাবর সৈন্য দুঃসাহসী হয়ে উঠলো। একদিন বাবর সেনার কিছুসংখ্যক সৈন্য খাকান দরজার কাছে অবস্থিত পরিখার নিকটে তাঁবু খাড়া করলো। কিন্তু বিজয়ের আনন্দে সৈন্যরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে পহরার ব্যবস্থা না করেই রাতে শোয়ে পড়লো। সেদিন রাতেই তাঁরা এই অপরিণামদর্শিতার মাশুল দিতে হলো।
তনয়াল সৈন্য গোপনে পরিখার পাড়ে অবস্থিত তাঁবুর দিকে নজর রাখছিলো। তারা যখন দেখলো, তাঁবুগুলিতে কোনো পহরার ব্যবস্থা না করেই সেনারা নিশ্চিন্ত মনে শোয়ে পড়ছে, তখন তনয়াল সেনা উজ্জীবিত হয়ে উঠলো। তারা তনয়ালের সাথে পরামর্শ করে সুর্যোদয়ের পূর্বেই অতর্কিতে বাবর সেনার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
গভীর নিদ্রায় শায়িত বাবর সেনা গন্ডগোলের শব্দ পেয়ে জেগে উঠলো যদিও প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত হতে সক্ষম হলো না। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রতিরোধের আশা বাদ দিয়ে তারা প্রাণ নিয়ে পালাতে লাগলো। এই ঘটনার প্রভাব কিছু দূরে অবস্থানরত বাবর সেনার ওপরেও পড়লো।
বাবর সেনার পলাতক সেন্যদের প্রভাব বাবরের দেহরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাদের ওপরেও পড়লো। তারা বাবরের দেহরক্ষার কথা ভুলে প্রাণ নিয়ে এদিকে সেদিকে পালাতে লাগলো।
গণ্ডলোলের শব্দ পেয়ে বাবর জেগে উঠে দেখলেন তাঁর দেহরক্ষার জন্য শুধু দশজন সেনা অবশিষ্ট রয়েছে। বাকি সেনা সব পালিয়ে গেছে। ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে আসন্ন বিপদের মোকাবিলার জন্য তিনি তৎক্ষণাৎ সজ্জিত হয়ে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং ঘোড়ার পিঠে চড়ে কোলাহলের উৎস লক্ষ্য করে ঘোড়া ছুটালেন।
বাবর লক্ষ্য করলেন, আহম্মদ তনয়ালের সেনারা তাঁর পলায়নরত সেনার ওপরে নির্বিচারে তীর নিক্ষেপ করে চলেছে।
বাবর ভালোভাবে লক্ষ্য করে দেখলেন, তীরন্দাজ সেনার সংখ্যা
খুবই কম। সেজন্য তিনি দশজন সেনা নিয়েই তীরন্দাজ সেনাদের ওপরে
ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আকস্মিক আক্রমণে ভয় পেয়ে তীরন্দাজ সেনারা যথেচ্ছভাবে
পালাতে লাগলো। বাবর উৎসাহিত হয়ে তাদের পেছনে পেছনে ধাওয়া করলেন।
কিছুদূর আসার পর একদল অশ্বারোহী সেনা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে তাঁদের দিকে
এগিয়ে আসা বাবর লক্ষ্য করলেন। সেনাদের আগে আগে
আসছিল আহম্মদ তনয়াল। তনয়ালকে দেখে বাবর ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলেন। ফলে ঘোড়াটি দাঁড়িয়ে পড়লো।
ঘোড়াটি দাঁড়ানোর
পরে বাবর তাঁর নিজের সেনাদের বুঝ নেওয়ার জন্য চতুর্দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, তাহিরজানসহ তাঁর সাথে মাত্র তিনজন সেনা রয়েছে। বাকি সৈন্য আসন্ন বিপদ থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেছে। ইচ্ছা করলে এবং কিছু তৎপর হলে বাবরও পালিয়ে যেতে সক্ষম হতেন। তবে তাঁর প্রকৃতি তাঁকে শত্রু সেনার দিকে পিঠ প্রদর্শন করে পালিয়ে যেতে বাধা
প্রদান করলো। তাঁর মনে আত্মসন্মানবোধ জেগে উঠলো। কিছুক্ষণ আগে মৃত্যু ভয়ে তিনি কিছু বিচলিত হয়ে উঠেছিলেন যদিও আত্মসন্মানবোধ
জেগে উঠার সাথে সাথে সেই মৃত্যু ভয় দূরীভূত হলো এবং তিনি বীরের মতো শত্রুর মোকাবিলা
করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন।
ভাবামতেই বাবর তৎক্ষণাৎ তীরধনু নিয়ে প্রস্তুত হলেন এবং শত্রুসেনা লক্ষ্যের
ভেতরে প্রবেশ করার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। বাবরকে দেখে তাহিরজান এবং অন্য দু’জন সেনা তীরধনু নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য অবস্থান গ্রহণ
করলো।
আহম্মদ তনয়াল দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে বাবরের দিকে ধাবিত হচ্ছিলো। অল্প সৈন্যের মাঝে বাবরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে উল্লসিত হয়ে অশ্ব নিয়ন্ত্রণ
না করেই তরবারি কোষমুক্ত করে মাথার ওপরে ঘুরাতে ঘুরাতে পৈচাশিক উল্লাসে বাবরের দিকে
ধাবিত হলো।
তনয়াল লক্ষ্যস্থানের ভেতর প্রবেশ করার সাথে সাথে বাবর তনয়ালের নাক এবং চোখের
মাঝ বরাবর লক্ষ্য করে শর নিক্ষেপ করলেন। শনশন শব্দে তীর এগিয়ে এসে তনয়ালের শিরস্ত্রাণে আঘাত করলো। কিন্তু শিরস্ত্রাণ খুবই মজবুত ছিলো। সেজন্য কোনো ক্ষয়ক্ষতি
না করে শর ধাতব শব্দ করে জমিতে পড়ে গেলো। বাবর পুনরায় তনয়ালকে
লক্ষ্য করে শর নিক্ষেপ করলেন। তনায়ল ক্ষিপ্রহাতে
সেই শর প্রতিহত করলো। ঢালে আঘাত করে শর পুনরায় জমিতে পড়ে গেলো।
তনয়াল সেনারাও বাবরকে লক্ষ্য করে শর নিক্ষেপ করতে লাগালো। একটি শর বাবরের জোতা ভেদ করে পা-য় আঘাত করলো। বাবর পা থেকে শরটি খুলে নিজেকে সামলিয়ে নেওয়ার আগেই তনয়াল তাঁর কাছে পৌঁছে
গেলো।
তনয়ালের হাতে ছিলো বাবর নিজে উপহার দেওয়া সেই সোনার তরবারি এবং তার চোখেমুখে
বিরাজ করছিলো হিংস্র উল্লাস।
সন্মুখে মূর্তিমান যম সদৃশ তনয়ালের হাতে তরবারি প্রত্যক্ষ করেও বাবর নিজের
তরবারি কোষমুক্ত করলেন না। তরবারি কোষমুক্ত
না করার কারণ পা-র আঘাত, না সময়ের অভাব বুঝা গেল না।
তনয়াল কিন্তু ক্ষ্যান্ত হল না। বাবরের নির্লিপ্ততার পূর্ণ সুযোগ সে গ্রহণ করলো। ক্ষণকাল বিলম্ব না করে সে বাবরের মস্তক লক্ষ্য করে আঘাত করলো। শিরস্ত্রাণ ভেদ করে তরবারি মাথায় বসে গেল না যদিও শিরস্ত্রাণের আঘাত মাথা
ফেটে রক্ত ঝরতে লাগলো। আকস্মিক প্রচন্ড আঘাতের ফলে বাবরের মাথা চক্কর কাটতে
লাগলো। তাঁর দু’চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
আমার জোতাও কি রক্তে ভরে গেছে? মাথা ঘুরানোর ফলে বাবর
ঘোড়ার পিঠে শোয়ে পড়ার আগমুহূর্তে উদাসীনভাবে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলেন।
বাবরের সংকটাপন্ন অবস্থা প্রত্যক্ষ করে তনয়াল বিজয়ের উল্লাসে চিৎকার করে
উঠে পুনরায় আঘাত করার জন্য তরবারি উত্তোলন করলো।
তাহিরজান বাবরের সংকটাপন্ন অবস্থা দেখে সহায়ের জন্য এগিয়ে এসে ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত হলো। তাহিরজান
তনয়ালের আঘাত প্রতিহত করার অন্য কোনো উপায় না দেখে বাবরের ঘোড়ার লাগাম ধরে সজোরে তার দিকে আকর্ষণ করলো। টান পেয়ে ঘোড়া কিঞ্চিত এগিয়ে গেলো। ফলে তনয়ালের তরবারির আঘাত বাবরের শরীরে না লেগে বাবরের তূণে লাগলো। তূণ কেটে জমিতে খসে পড়লো।
তনয়াল পুনরায় তরবারি উত্তোলন করার আগেই তাহিরজান প্রচণ্ড চিৎকার করে বললো- জাহাপনা, ঘোড়া সামলান। এভাবে বলেই সে বাবরের ঘোড়ার পিঠে প্রচণ্ড চাবুকাঘাত করলো।
মুগ বর্ণের ঘোড়াটা বাবরের খুবই প্রিয় ছিলো। কখনও কখনও বিশেষ পরিস্থিতিতে এরকম নিষ্ঠার ব্যবহার করা হতো ঘোড়াটার সাথে। সেজন্য অনভ্যস্ত চাবুকাঘতে ভীতিগ্রস্ত হয়ে বাবরকে নিয়ে ঘোড়াটা তরিৎবেগে ধাবিত হলো।
তাহিরের উপস্থিত বুদ্ধি এবং তৎপরতার জন্য সেদিন বাবর কোনোমতে মৃত্যুমুখ থেকে রক্ষা পেলেন।
বাবরের পা এবং মাথার ক্ষত শুকোতে অনকেদিন লাগলো। ক্ষতের সাথে মাথার যন্ত্রণা বাবরকে পীড়া দিতে লাগলো। পা-র ক্ষত ধীরে ধীরে শুকালো যদিও অনেকদিন তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে বাধ্য হলেন এবং মাথার যন্ত্রণা অনেকদিন তাঁকে পীড়া দিতে লাগলো।
অবশেষে বাবর আন্দিজান জয়ের আশা সেখানে সমাপ্ত করে উশ-এ ফিরে এলেন।
দেহের ক্ষতের চেয়ে মনের ক্ষত বাবরকে অধিক যন্ত্রণা দিতে লাগলো। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় তিনি প্রচণ্ডভাবে মর্মাহত হয়ে পড়লেন।
ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! নিজে উপহার দেওয়া তরবারির আঘাত তিনি মাথা পেতে নিতে হলো! এর থেকে দুর্ভাগ্যের কথা আর কী হতে পারে? লোকে বলে, সজ্জনে সুবিচার পায় এবং বেইমানে শাস্তি মাথা পেতে নিতে হয়। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে উলটো হলো কেন? বেইমান, নিষ্ঠুর তনয়ালকে ভাগ্য শাস্তি দিলে না কেন? যুদ্ধক্ষেত্রে বেইমান, অত্যাচারি তনয়ালের হাত-ই কেন অধিক শক্তিশালী এবং সৌভাগ্যবান বলে পরিগণিত হলো?
বাবর উশ-এ আসার কয়েকদিন পরেই কুলতুগ নিগার বেগম এবং খানজাদা বেগমকে মির্জা জাহাঙ্গীর বাবরের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তখন থেকে তাঁরা বাবরের সাথেই রয়েছেন।
বাবর একদিন কুলতুগ নিগার বেগমকে এসব প্রশ্ন করাতে তিনি বাবরকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন- আল্লাহর মেহেরবাণীতে যে আপনি প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছেন, এটাই যথেষ্ট। আপনি বর্তমান মাত্র ষোল বছরের কিশোর। তনয়ালের মতো বয়স হলে আপনিও এর থেকে বড় বিজয় সাব্যস্ত করতে পারবেন। বর্তমান আপনাদের দুই ভ্রাতৃর মাঝে সংঘটিত যুদ্ধ-বিগ্রহে এই অঞ্চলের শান্তি এবং সমৃদ্ধির মূলে কুঠারাঘাত করেছে। আপনার মেসো সুলতান আহম্মদ জাহাঙ্গীর এবং আপনার মাঝে শান্তি চুক্তির কথা বলতেছেন। তিনি আখসি জাহাঙ্গীরকে এবং আন্দিজান আপনাকে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
মাতৃর কথা শুনে বাবর চিন্তিত কন্ঠে বললেন- কিন্তু ফারগানার মতো এই ছোট সাম্রাজ্য টুকরো টুকরো করাটা সমীচিন হবে কী? সমগ্র মাউরা উন্নহর একত্রিত করার পরিবর্তে টুকরো টুকরো করলে আমাদের শক্তি কমে যাবে না?
এখন এর বাইরে অন্য কোনো উপায় নেই। জাহাঙ্গীর তো আপনারই ভ্রাতৃ। দুই ভ্রাতৃর মাঝে বুঝাপড়া থাকলে বাহিরা শত্রু আপনাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এভাবে সান্ত্বনা দিয়েই কুলতুগ নিগার বেগম প্রসংগ পালটিয়ে বললেন- আপনি এখন শুধু সাম্রাজ্যের কথা ভাবলেই হবে না। তাসকন্দে আপনার বাগদত্তা আপনার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে রয়েছে। আমি কয়েকদিন আগে আপাজানের কাছ থেকে একটি পত্র পেয়েছি। আয়েশা বেগমকে আপাজান অতি শীঘ্র সেখান থেকে আনার জন্য লিখে পাঠিয়েছেন। সেজন্য আয়েশা বেগমকে যতদূর সম্ভব শীঘ্র এখানে আনাটা উচিত হবে।
বাবর মাতৃর কথার বিরোধিতা করতে গিয়েও করতে পারলেন না। কারণ তিনি নিজেও বাগদত্তার সাথে মিলনের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন।
বাবরের অনুমতি নিয়ে কুলতুগ নিগার বেগম কয়েকদিন পরেই তাসকন্দে লোক পাঠিয়ে আয়েশা বেগমকে উশ-এ আনালেন এবং অতি ধূমধাম করে উভয়ের শুভ পরিণয় সম্পন্ন করলেন।
বিয়ের কয়েকদিন পরে সুলতান আহম্মদের পরামর্শ অনুসারে বাবর এবং জাহাঙ্গীরের মাঝে শান্তি চুক্তি সম্পন্ন হলো। মির্জা জাহাঙ্গীরকে আখসি এবং বাবর নিজে আন্দিজানের শাসনভার গ্রহণ করলেন।
বাবরকে এতোদিন প্রচণ্ডভাবে পীড়া দিয়ে থাকা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন এই শান্তি চুক্তির মাধ্যমে দূর হলো।
সমগ্র চিন্তাভাবনা ত্যাগ করে বাবর পুনরায় শায়ের হওয়ার কল্পনায় বিভোর হয়ে পড়লেন। কিন্তু কিছুদিন পরে আবার সমরকন্দ আক্রমণ করার জন্য বাধ্য হয়ে পড়লেন। নিয়তি আবার তাঁকে যুদ্ধের পথে ঠেলে দিলো।
* * *
বাবর সমরকন্দ ছেড়ে আসার পরে বুখারার সুলতান সুলতান আলী সমরকন্দ দখল করেছিলেন।
সুলতান আলীর বয়স কম ছিলো। কিন্তু তবুও তিনি অত্যধিক নারীলোভী এবং স্বেচ্ছাচারি ও অকর্মণ্য শাসক হিসাবে পরিচিত ছিলেন। সেজন্য শাসক হিসাবে তাঁকে কেউ ভালবাসত না। সর্বোপরি তাঁর বয়স কম থাকার জন্য মাতৃ জহুরা বেগমই ছিলেন সর্বেসর্বা। জহুরা বেগম নিজেও ক্ষমতালোভী এবং স্বেচ্ছাচারি ছিলেন। সেজন্য জহুরা বেগমকে সমরকন্দের বেগ এবং বিশিষ্ট নাগরিকরা পসন্দ করতেন না। ফলে এক সময় বেগ এবং বিশিষ্ট নাগরিকবর্গ তলে তলে সুলতান আলীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠলেন।
এই বিদ্রোহের খবর তুর্কিস্থানের শাসক শৈবানি খাঁর কাণে পৌঁছায়। কিন্তু শৈবানি খাঁ যুদ্ধের পরিবর্তে এক বিশেষ কৌশল অবলম্বনকরে সমরকন্দ দখলের সিদ্ধান্ত নিলেন।
শৈবানি খাঁ জানছিলেন যে, সুলতান আলীর মাতৃ জহুরা বেগম বিধবা যদিও যুবতী হয়েই রয়েছেন। কামপীড়িতা বলেও তাঁর দুর্নাম ছিলো। শৈবানি খাঁ তাঁর এই দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করে সমরকন্দ দখল করার কথা ভাবলেন।
ভাবামতেই শৈবানি খাঁ প্রেম নিবেদন করে জহুরা বেগমের নিকট পত্র প্রেরণ করেন।
পত্র পেয়ে জহুরা বেগমের দেহে কামনার অনল জ্বলে উঠার সমান্তরালভাবে প্রতিহিংসার স্পৃহা দপ্ করে জ্বলে উঠে। কারণ বেগবৃন্দ তাঁকে ভালবাসত না। তলে তলে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করত। এ কথা জহুরা বেগম অবগত ছিলেন। তবে, তিনি এ বিষয়ে জেনেশুনেও পরিস্থিতির কথা ভেবে সব মুখ বুজে সহ্য করে আসছিলেন।
শৈবানি খাঁর প্রেমপত্র পেয়ে জহুরা বেগম উজ্জীবিত হয়ে উঠেন। শৈবানি খাঁর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হলে একসাথে তাঁর দু'টি উদ্দেশ্য সফল হবে। প্রথমত তিনি অতৃপ্ত যৌন বাসনা চরিতার্থ করতে পারবেন এবং দ্বিতীয়তঃ বিদ্রোহী বেগবৃন্দকে শিক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। সেজন্য তিনি বিশেষ চিন্তা ভাবনা না করে শৈবানি খাঁকে সমরকন্দে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন।
জহুরা বেগমের নিকট থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে শৈবানি খাঁ সমরকন্দ এসে সহর থেকে কিছুটা দূরে ছাউনি পাতলেন। ছাউনি পেতে শৈবানি খাঁ সুলতান আলী এবং জহুরা বেগমকে ছাউনিতে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। আমন্ত্রণ পেয়ে ছাউনিতে যাওয়ার পরে জহুরা বেগম এবং সুলতান আলীকে বন্দি করে শৈবানি খাঁ সমরকন্দের শাসনভার নিজে গ্রহণ করলেন। শাসনভার গ্রহণ করে তিনি জহুরা বেগমকে মনসুর বক্সী নামের একজন বেগের সাথে বিয়ে দিলেন এবং সুলতান আলীকে হত্যা করে সমরকন্দের সিংহাসন কণ্টক মুক্ত করলেন।
শৈবানি খাঁ একজন নিষ্ঠুর প্রকৃতির শাসক ছিলেন। তিনি কূটিল এবং ক্ষমতালোভী ছিলেন। ফলে প্রজাসাধারণকে শাসন ও শোষণ করে অল্পদিনের মধ্যেই তিনি সমরকন্দকে দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিলেন।
শৈবানি খাঁর এই প্রজা উৎপীড়নের কথা এক সময় বাবরের কর্ণগোচর হলো। সমরকন্দের প্রতি বাবরের এক বিশেষ আকর্ষণ ছিলো এবং প্রজাসাধারণও তাঁকে খুব ভালবাসতেন। সেজন্য সমরকন্দের দুর্গতির কথা শুনে তিনি স্থির থাকতে পাড়লেন না। সমরকন্দবাসীকে শৈবানি খাঁর শাসন শোষণ থেকে মুক্ত করার জন্য তিনি সসৈন্যে সমরকন্দ অভিমুখে যাত্রা করলেন।
সমগ্র গ্রীষ্মকাল নানান দুর্যোগের মধ্য দিয়ে এসে বাবর শরতের কোনো একটি দ্বিপ্রহরে সমরকন্দ থেকে বিশ মাইল দূরে অবস্থিত জাফরসন নদীর পাড়ে পৌঁছোলেন। শরত কালের জন্য নদীতে তেমন জল ছিল না। সেজন্য তাঁরা হেঁটেই নদী পার হতে সক্ষম হলেন।
নদী পার হয়ে বাবর সেনা অতি দ্রুত অথচ খুব সাবধানে কোনো রকমের হৈচৈ না করে সিয়াব নদীর দিকে অগ্রসর হলেন।
নদীর অববাহিকা অঞ্চল। উর্বর ভূমি। সেজন্য এখানে সেখানে গঢ়ে উঠেছিলো ঘন বসতিপূর্ণ অনেক গ্রাম। শৈবানি খাঁ যাতে তাঁদের অভিযানের কথা টের না পায় তারজন্য বাবর সেনা খুব সাবধানে অগ্রসর হলেন। তাঁরা যাতে মানুষের চোখে না পড়ে তারজন্য ঘন বসতিপূর্ণ গ্রামগুলো এড়িয়ে চলতে সচেষ্ট হলেন। কখনও কখনও ঘন বসতিপূর্ণ গ্রামের মাঝ দিয়ে যেতে হলে অতি সাবধানে কোনো রকমের উচ্ছৃংখলতা প্রদর্শন না করে মনে মনে গ্রামগুলো পেরিয়ে আসতে লাগলেন।
এ সব গ্রামের লোকেরা শৈবানি খাঁর ভয়ে আগে থেকেই সন্ত্রস্ত হয়ে ছিলেন। কারণ শৈবানি খাঁর সৈন্যরা আগেই এ সব গ্রাম লুটপাট করে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছিলো। সেজন্য আগুনে পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পাওয়ার মতো বাবর সেনাকে শৈবানি খাঁর সেনা ভেবে গ্রামের লোকগুলো সন্ত্রস্ত হয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে কিছু দূর থেকে বাবর সেনার গতিবিধি নিরীক্ষণ করতে লাগলো।
বাবর সেনার একরাতের একটি আচরণ থেকে গ্রামের লোকগুলো বুঝতে সক্ষম হলো যে, এরা শৈবানি খাঁর সেনা নয়, এরাও শৈবানি খাঁর সেনাকে ভয় করে।
সেদিন ছিলো অন্ধকার রাত্রি। রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে সিয়াব নদী পার হওয়ার সময়ে ঘটেছিলো ঘটনাটি--
নদীর তলভাগ কর্দমাক্ত ছিলো। ফলে নদী পার হওয়ার সময় কিছুসংখ্যক ঘোড়ার ঠ্যাং কাদায় ঢোকে গিয়েছিলো। সেনারা হাসি তামশার মাঝ দিয়ে ঘোড়ার ঠ্যাং কাদা থেকে তুলে আনার সময় নিজেদেরও পা কাদায় ঢোকে গেলো। ফলে হাত-পা-র সাথে তাঁদের মুখমণ্ডলেও কাদা লেগে কদাকার হয়ে পড়ল।
তাহিরজান নিজেও ছিলো সেই দলে। সে উচ্চকণ্ঠে গালাগাল দিতে লাগলো শালা, ঢোকে যাওয়ার সময় যেতে পারছ, এখন টেনে তোলার সময় উঠতে চাইছিস না কেন?
বাবর অল্পদূরেই ছিলেন। গালাগালের
শব্দ তাঁর কানে এসে পৌঁছোল। তিনি ধমকের সুরে বললেন-চিৎকার করছ কেন? সবাইকে বিপদে ফেলতে চাইছ নাকি?
তাহিরজান
মিনতিভরা কন্ঠে বললো- ক্ষমা করবেন, জাহাপনা। বদমাশ ঘোড়াটাকে কোনোমতেই কাদা থেকে তুলতে পারছি
না।
এমনিতে
অন্ধকার রাত, তাতে আবার
কুয়াশা পড়ে অন্ধকার অধিক নিবিড় করে তুলছিলো। কয়েক গজ দূরের লোককেও দেখতে অসুবিধা
হচ্ছিল। এদিকে দেরি করাও সম্ভব ছিল না। সেজন্য বাবর দৃঢ়কণ্ঠে বললেন- ঘোড়াটা
সেখানে রেখেই চল এস। সকালে গ্রামের কোনো লোক তুলে নিয়ে যাবে’খন।
কাশিম বেগ
বাবরের পাশেই ছিলেন। তিনি বাবরকে সমর্থন করে বললেন- জাহাপনা সময়োচিত সিদ্ধান্তই
নিয়েছে। ঘোড়াটা ছেড়ে চলে এস। আমার ঘোড়াটাই তোমাকে দিয়ে দিব।
রাস্তায় অনেক
ঘোড়া এবং উট মরল। তাহিরজান ব্যথিত কন্ঠে বললো- অথচ আমার এই ঘোড়াটা কত দুর্গম
রাস্তা নির্বিঘ্নে পাড়ি দিয়ে এসেছে। এখন একে এখানে মরতে ছেড়ে দিয়ে যাব নাকি?
এখন আমাদের
মাথার উপরেও মৃত্যু খড়্গ তুলে রয়েছে। বাবর তাহিরজানকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য
বললেন- রাতটা বেচে থাকলে সকালে কোনো গ্রামবাসী তুলে নিয়ে যেতে পারবে। চল, দুঃখ করো না।
বাবরের পরামর্শ
অনুসারে তাহিরজান নিজের ঘোড়ার সাথে আরও দু'টি ঘোড়া ছেড়ে চলে এলো।
এই ঘটনার পরে
গ্রামের লোকদের বাবর সেনার প্রতি থাকা ভয়ভাব চলে গেলো। এমনকী তারা প্রয়োজনে বাবর
সেনাদের সহায় করতেও কুন্ঠাবোধ করত না।
বাবর সেনা এসে
এসে সমরকন্দের কাছে পৌঁছোল। সমরকন্দের কাছে পৌঁছনোর সাথে সাথে তাঁরা আগের থেকেও
অধিক সতর্কতা অবলম্বন করতে লাগলেন। শৈবানি খাঁর সেনারা যাতে তাঁদের এই অভিযানের
কথা অগ্রিম টের না পায় তারজন্য তাঁরা অধিক সতর্ক হলো। শৈবানি খাঁর সেনা এই
অভিযানের কথা টের পেলে সব প্রচেষ্টা জলে পড়ার সম্ভাবনা ছিলো। কারণ শৈবানি খাঁর
সেনা বাবর সেনার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। শৈবানি খাঁর সমগ্র বাহিনী একত্রিত হয়ে
তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করলে তিষ্ঠে থাকা কঠিন হবে বলে বাবর নিশ্চিত ছিলো।
বাবর আন্দিজান
থেকে আসার সময়ে অবশ্যে এত কম সংখ্যক সেনা নিয়ে আসেনি। রাস্তায় আসতে আসতে সৈন্য
সংখ্যা ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়ে
বর্তমান কয়েক শত সৈন্য অবশিষ্ট রয়েছে। সমগ্র গ্রীষ্মকাল নানান প্রতিকূল অবস্থার
মাঝ দিয়ে নানান দুর্যোগ, দুঃখ-কষ্ট স্বীকার করে আসতে হয়েছে। তিনি আন্দিজান থেকে যাত্রা করে সহরসব্জ থেকে
হিসার, হিসার থেকে উদ্গম, উদগম থেকে ফানদরিয়া পার হয়ে আসতে হয়েছে। এই দীর্ঘ কষ্টকর যাত্রাপথে পথশ্রমে পরিশ্রান্ত হয়ে
অনেক সেনা হতউদ্যম হয়ে বাবরের সংগ ত্যাগ করে চলে গেছে। সমরকন্দ থেকে যেসকল সেনা তাঁর সাথে
গিয়েছিলো তাদের অনেকেই হিসারের বাদশাহ খশ্রুর কাছে চলে গেছে। আন্দিজান থেকে আসা অনেক সেনা যুদ্ধে সফলতার আশা
না দেখে বাবরের সংগ ত্যাগ করে ফারগানা বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দিয়েছে। যারজন্য সেনা সংখ্যা অনেক হ্রাস পেয়েছে
এবং সেনা সংখ্যা হ্রাস পাওয়াতে বাবর অধিক সতর্ক হতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাবর যতই
সতর্কতা অবলম্ব করুন না কেন শৈবানি খাঁ কিন্তু সময়রে খবর সময়েই পেয়ে যাচ্ছিলেন।
তিনি গুপ্তচরদের মুখ থেকে অবগত হয়েছিলেন যে, বাবর সেনা ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়ে বর্তমান মাত্র এক হাজার সেনার কোঠায়
ঠেকেছে এবং তারাও পাহাড়িয়া দুর্গম অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বাবরের এই পরিস্থিতির
কথা টের পেয়ে শৈবানি খাঁর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিলো যে, বাবরের মতো বিচক্ষণ একজন যোদ্ধা অল্পসংখ্যক সেনা নিয়ে তাঁর বিশাল বাহিনীর
বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনার মতো মূর্খামি কখনও করবে না। হয়তো বাবর আন্দিজান ফিরে যাবে, না হলে তাঁর চাচা আলাসা খাঁর সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করবে।
আলাসা খাঁ ইস্তানিক হ্রদের সেপাড়ে রাজত্ব করেন। বাবর চাচার সেখানে আশ্রয় নিয়ে সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করার পরে সমরকন্দ আক্রমণের কথা চিন্তা করবে। কারণ শৈবানি খাঁর সেনা বাবর সেনার চেয়ে দশ গুণ বেশি। সেজন্য এই পরিস্থিতিতে বাবর জলজ উদ্ভিদের মাঝে পোণা মেলে দিয়ে বিপদ ডেকে আনার মতো কাজ করবে না। শৈবানি খাঁর মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস জাগ্রত হওয়াতে তিনি মাত্র পাঁচশ সৈন্য সমরকন্দে রেখে বাকি সেনা নিয়ে সমরকন্দ থেকে পশ্চিম দিকে অবস্থিত খাজা দিদার নামক স্থানে ছাউনি পেতে বাবরের আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
কিন্তু শৈবানি খাঁর হিসাব ভুল প্রমাণিত হলো। শৈবানি খাঁ ভাবা ধরণে বাবরের মনোবল অত ঠুনকো ছিলো না। বাবরের মনোবল ছিলো, বজ্রের মতো কঠিন, ইস্পাতের মতো দৃঢ় এবং আকাশের মতো সুদূরপ্রসারি। তিনি মহৎ বিপদ সংকুল এবং অন্যে ভয় করা কার্য করে নিজেকে একজন অদ্বিতীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য লালায়িত ছিলেন। এই মনোভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েই তিনি জীবন পণ সংগ্রামের সিদ্ধান্ত নিলেন। শৈবানি খাঁর কাছ থেকে তিনি যেকানো মূল্যের বিনিময়ে সমরকন্দ কেড়ে নিবেই এটা ছিলো তাঁর দৃঢ় সংকল্প। এভাবে দৃঢ় এবং জীবন পণ সংকল্প নিয়ে তিনি অতি সন্তর্পণে যুদ্ধের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
সমরকন্দ আক্রমণের সমগ্র পরিকল্পনা এবং আয়োজন সম্পূর্ণ হয়ে উঠার পরেও শৈবানি খাঁর নির্লিপ্ততা দেখে বাবর সমগ্র আয়োজন সম্পূর্ণ করেও কিছুদিন নীরব হয়ে রইলেন। বাবরের মনে সন্দেহ ঘণীভূত হয়ে উঠলো যে, শৈবানি খাঁ হয়তো বাবরের এই অভিযানের বিষয়ে সব টের পেয়েও কিছু না জানার ভান করে তাঁকে বেকায়দায় ফেলার জন্য নির্লিপ্ত হয়ে রয়েছে। শৈবানি খাঁ একজন চতুর এবং বিচক্ষণ যোদ্ধা। তিনি হয়তো বাবরকে অল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে সহবের ভেতর প্রবেশ করতে দিয়ে পরে সমগ্র শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে বাবর সেনার উপরে। যদি বাবর ভাবা ধরণেই শৈবানি খাঁ পরিকল্পনা করেছে, তাহলে সহরের ভেতরে প্রবেশ করলে তাঁর একজন সেনাও প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে সক্ষম হবে না। সহরের ভেতরেও বাবর সেনার চেয়ে শৈবানি খাঁর সেনা সংখ্যা অনেক বেশি। সর্বোপরি সুলতান আলীর অনেক সেনা পরিস্থিতির প্যাঁচে পড়ে শৈবানি খাঁর বশ্যতা স্বীকার করে রয়েছে। এদিকে সমগ্র মাউরা উন্নহর থেকে তৈমূর প্রতিষ্ঠিত নতুন রাজবংশ উৎখাত করার জন্য শৈবানি খাঁ সংকল্পবদ্ধ হয়েছে। সেজন্য বাবর যদি কোনো প্রকারে শৈবানি খাঁর হাতে ধরা দিতে হয়, তাহলে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসাটা কখনও সম্ভব হবে না।
এসব কথা ভেবে বাবর কিছু বিচলিত হয়ে উঠলেন এবং সন্মুখ সমরের পরিকল্পনা ত্যাগ করে রাতের অন্ধকারে অতর্কিতে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি আরও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন যে, প্রয়োজন হলে তিনি প্রাণ বিসর্জন দিবেন, কিন্তু কোনো পরিসিস্থিতিতে শৈবানি খাঁর হাতে ধরা দিবেন না।
সিদ্ধান্ত মতেই একদিন অন্ধকার রাতে বাবর-সেনা নদী-নালা, সোঁতা, জলপূর্ণ খাল পার হয়ে সমরকন্দের দিকে অগ্রসর হলেন। সৌভাগ্যবশতঃ সেদিন রাতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পরাতে রাস্তা-ঘাট একেবারে জনশূন্য ছিলো। বাবর সেনা নির্বিঘ্নে এসে মগাক পুল পৌঁছোলেন। মগাক পুল থেকে সহর অল্প দূরেই অবস্থিত। দু’দিন আগে মগাক পুল নিরীক্ষণ করার জন্য বাবর দু’জন বিশ্বস্ত সেনা পাঠিয়েছিলেন এবং দূর্গ দেয়ালে চড়ার জন্য কয়েকটা মজবুত মৈ তৈয়ারি করে রাখার জন্য তাদের নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। সেনারা নির্দেশ অনুসারে তাদের দায়িত্ব যথাযথ পালন করে বাবরের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
বাবর অপেক্ষারত সেনাদের কাছ থেকে সব কথার বুঝ নিয়ে সেনা বাহিনী দু’টি দলে বিভক্ত করলেন। বাবরের নির্দেশে নুয়ান কুশল দাশের নেতৃত্বে আশীজনের একটি দল মৈ নিয়ে নিশ্চিত বিপদের দিকে এগোতে লাগলেন। অন্য দলটি সন্তর্পণে ফিরোজা দরজার দিকে এগোতে লাগলেন। এই দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন স্বয়ং বাবর। ফিরোজা দরজার কাছে এসে তাঁরা গাছ-গাছালির আড়াল নিয়ে মৈ নিয়ে যাওয়া দলটির সংকতের অপেক্ষায় অধীরভাবে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
নীরব নিস্তব্ধ। চারদিকে যেন বিরাজ করছে বিষণ্ণ ভয়াল কবরের নিস্তব্ধতা। ভয়ঙ্কর ভয়াল অন্ধকার যেন হিংস্র থাবা মেলে সমগ্র সহর গ্রাস করে ফেলছে। বাবরের নেতৃত্বে আসা দলটি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো, সেখানে গাছ-গাছড়ার ছায়া পড়ে জায়গাটি অধিক ভয়াল করে তুলেছিলো। এক জাক কালো মেঘ দেয়ালের উপরে ভেসে থাকার ফলে দেয়ালটা অস্পষ্টভাবে নজরে পড়তে ছিলো।
কোনো যুদ্ধাভিযানের সময় বাবর সব সময় কাশিম বেগের কাছে অবস্থান নিতেন। সেদিনও বাবর কাশিম বেগের কাছেই অবস্থান নিয়েছিলেন। কাশিম বেগ উত্তেজনায় ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছিলেন। বাবর নিজেও শ্বাসরোধী আতংক উত্তেজনায় নির্বাক নিস্পন্দভাবে অপেক্ষা করছিলেন।
চার মাস আগেও বাবর এ রকম একটি অভিযান চালিয়ে ছিলেন। সেদিনকার রাতের অন্ধকারও এ রকম নিবিড় ছিলো। সেদিন তাঁরা খাজা ইয়াহিয়া দরজার কাছে দূর্গদ্বার খুলে দেওয়ার অপেক্ষায় অপেক্ষা করতে ছিলেন; তবে শত্রু সেনা তাঁদের উপস্থিতির কথা টের পেয়ে অবিরাম তীর বর্ষণ শুরু করেছিলো।
সেদিন বাবরের অনেক সেনা শরাঘাতে আহত হয়েছিলো এবং তাদের যন্ত্রণা কাতর বিকট চিৎকারে রাতের অন্ধকার গুমরে উঠেছিলো। নিজের সৈন্যের যন্ত্রণা কাতর চিৎকার এবং শত্রুসেনার উত্তেজিত গালাগালের মাঝে বাবর সেদিন অভিযান স্থগিত রেখে নিরাশ হয়ে ছাউনিতে ফিরে এসেছিলেন। সেই স্মৃতি আজও সজীব হয়ে আছে বাবরের মনে।
ঠগ, প্রবঞ্চনা, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে চোরের মতো লুকিয়ে আক্রমণ, নিজের সেনা এবং শত্রুসেনার মৃত্যু, জয়- পরাজয়, রাজনীতি তথা সমগ্র মাউরা উন্নহর একসূত্রে গাঁথার চিন্তা-ভাবনা প্রভৃতি নিয়ে বাবরের সমগ্র জীবন পরিপূর্ণ ছিলো। উৎকণ্ঠা- বিপর্যয়. জয়-পরাজয় ছিলো তাঁর নিত্য সহচর।
সেজন্য আগের ব্যর্থতার তিক্ত অভিজ্ঞতাই এইবার বাবরকে অধিক সতর্ক হতে বাধ্য করেছে। সেবারের তুলনায় এইবার বাবরের সৈন্যসংখ্যা খুবই অল্প। এবার মাত্র দু'শ চল্লিশ জন সেনা নিয়ে তিনি এই দুঃসাহসী অভিযানের জন্য প্রস্তুত হয়েছেন। অথচ দেয়ালের সেপ্রান্তে অবস্থান করছে পাঁচশ শত্রুসেনা এবং কিছু দূরেই অবস্থান করছে পাঁচ হাজার সেনা; হয়তো এর থেকেও অধিক হতে পারে!
পূর্বের বারের মতো যাতে এইবারো নিজের সমর্থকবর্গ নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে না হয়, তারজন্য বাবর তাঁর সেনাদের কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন। বাবরের মনোভাব উপলব্ধি করে সেনারাও নির্বাক নিস্পন্দভাবে মাটির মূর্তির মতো সারি বেঁধে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। উত্তেজনা উৎকণ্ঠায় প্রতিজন সেনার সিরা-উপসিরা স্ফীত হয়ে উঠেছে। বর্শাফলকের মতো দৃঢ় ও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে মনোবল। ‘হয় মন্ত্রের সাধন, না হলে শরীর পতন।' এই মনোভাবের জন্য তাঁরা মৃত্যু ভয় জয় করতে সক্ষম হয়েছেন।
তবে জয় কার জন্য অপেক্ষা করছে, এই কথা অনুমান করা খুবই কঠিন। বাবর সেনার, না শৈবানি খাঁর সেনার?
সেনারা বাবরকে এই দুঃসাহসিক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত না নেওয়ার জন্য বারে বারে অনুরোধ করছিলো। সমরকন্দ জয়ের আশা ত্যাগ করে আন্দিজান ফিরে যাওয়ার জন্য অনেকেই তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলন।
কিন্তু বাবর জেনেছিলেন, যোজনা ত্যাগ করে আন্দিজান ফিরে যাওয়ার অর্থ তনয়ালের হাতের পুতুল হয়ে বেঁচে থাকার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার বাহিরে অন্য উপায় নেই। স্বাধীনচেতা বাবর তনয়ালের মতো একজন প্রবঞ্চকের হাতের পুতুল হওয়ার জন্য আত্মসমর্পণ করতে পারেনা। সর্বোপরি অত ঠান্ডার মধ্যে এতো দূর এসে বিনাযুদ্ধে ফিরে যাওয়াটাও সহজ নয়। বাবর অত কাপুরুষও নয়। জন্মিলে মৃত্যু অনিবার্য। এটাই নিয়তির বিধান। নতজানু হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরাও উত্তম। তিনি যুদ্ধ করে মরবেন, নতজানুহয়ে বেঁচে থাকবে না। বাঘের মতো শৈবানি খাঁর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তিনি বিজয় সুনিশ্চিত করবেন। এটাই বর্তমান তাঁর জীবনপণ দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।
বাবর বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে শৈবানি খার উপরে। বাঘ শিকারির জাল থেকে নিজেকে বাচিয়ে শিকারীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে জানে। বাবরও সেটাই করবে। শৈবানি খাঁর জাল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়বে শৈবানি খাঁর সেনার উপরে। এভাবে ভাবার পরে বাবরের মনোবল অনেক গুণে বেড়ে গেলো।
বাবর উৎকর্ণ হয়ে সংকেতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
রাত্রি। ভয়াল অন্ধকার। সীমাহীন নিস্তব্ধতা। প্রেতের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে সমরকন্দ সহর। একমাত্র ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দের বাইরে কোনো সাড়াশব্দ নেই। চতুর্দিকে বিরাজ করছে ভয়াল নিস্তব্ধতা।
বাবরের হৃদপিন্ড জোরে জোরে ঢপঢপ করতে লাগলো। তাঁর অনুমান হলো, বুকের ঢপঢপ শব্দ যেন তাঁর ভাগ্য নামক অশ্বের ক্ষুরার শব্দ।
*
* *
নুয়ান কুশল দশের নেতৃত্বে আসা আশী জনের দলটি পুরানা সফরদীজ কবরগাহ পেরিয়ে অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত একফালি জায়গার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলো। সময় পার হওয়ার সাথে সাথে তাদের মাথার বোজা ভারি হয়ে আসছিলো। ফলে বোজার ভারে তারা অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলো।
সন্তর্পণে বিড়ালের মতো নিঃশব্দে তারা এগোতে লাগলো। হঠাৎ তারা একটি নিচু খাল পার হয়ে যেতে হলো। খালের তলদেশ উঁচুনিচু ছিলো। সেজন্য তারা হাঁটতে অস্বস্তিবোধ করছিলো।
তাহিরজান হঠাৎ হোঁচট খেয়ে বড়বড় করতে লাগলো। তার এদিক দিয়ে আসার মোটেই ইচ্ছে ছিল না। সাথী কয়জেনর জন্য এদিক দিয়ে আসতে হয়েছে। তারা গন্তব্যস্থানে যাওয়ার জন্য একটি সূচল এবং সংক্ষিপ্ত রাস্তা ছিলো। তবে রাস্তায় একটি গুহা ছিলো। গুহাটায় পূর্বে রাজদ্রোহে অভিযুক্ত দোষীদের জীবন্তে কবর দেওয়া হত। সেই সব অতৃপ্ত আত্মা সেখানে বিচরণ করে বলে জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। রাতের বেলা সেখানে কেউ গেলে সেই আত্মারা তাদের জীবন্তে ফিরে আসতে দেয় না বলে অন্ধবিশ্বাসও প্রচলিত রয়েছে। সেজন্য সেখানে রাতের বেলা লোক যাওয়া তো দূরের কথা দিনের বেলাতেও লোক যেতে ভয় করে। সাথী কয়জন সেই অন্ধবিশ্বাসের শিকার হয়ে সেখান দিয়ে আসতে চায়নি। সেজন্যই এই উঁচুনিচু রাস্তা দিয়ে আসতে হয়েছে।
তারা এক সময়ে এসে গন্তব্যস্থানে পৌঁছাল। গন্তব্যস্থানে এসে তারা দূর্গের দেয়ালের দিকে তাকালেন। পরিখার তলদেশ থেকে দূর্গের দেয়াল প্রেতের মতো অনুমান হতে লাগলো তাদের মনে। তবুও তারা সাহস করে পরিখার ঢালু পাড় বেয়ে উপরের দিকে উঠে যেতে লাগলো। পরিখার ঢাল কাঁটাযুক্ত লতা-গুল্ম দিয়ে আবৃত ছিলো। তারা অশেষ কষ্টে ঢাল বেয়ে পরিখার উপরে উঠে এলো।
সৈন্যদের কাপড় ঘামে ভিজে চপচপে হয়ে উঠেছিলো। মৈ নিয়ে ঢাল বেয়ে উঠে আসার জন্য তারা পরিশ্রান্তও অনুভব করছিলো। পরিশ্রমের ক্লান্তির সাথে বিপদের আশংকায়ো তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি দ্রুততর হয়ে উঠছিলো। দূর্গের দেয়াল পরিখার পাড়েই অবস্থিত ছিলো। সেজন্য ঢাল বেয়ে উপরে উঠার পরে তারা মৈগুলো মাথা থেকে নামিয়ে দেয়ালের পাশে রাখলো। নুয়ান কুশল দাস সৈন্যদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলো। সে পথশ্রমে ক্লান্ত সৈন্যদের কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দিলো। বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগে সে দেয়ালের উচ্চতা নিরীক্ষণ করতে লাগলো।
পাথর এবং ইঁট দিয়ে নির্মিত দেয়ালের উচ্চতা প্রায় একটি উঁচু বৃক্ষের সমান। দেয়ালের উচ্চতা দেখে দূর্গের বিষয়ে জ্ঞান না থাকা কয়েকজন সেনা ভয়বিত হয়ে উঠলো। কিন্তু দূর্গের দেয়ালের বিষয়ে নুয়ান কুশল দাশ ভালভাবে অবগত ছিলো। সে সেনাদের আশ্বাস দিয়ে বললো- ভয়ের কোনো কারণ নেই। দেয়াল যত ভয়ঙ্কর দেখা যাচ্ছে, আসলে তত ভয়ঙ্কর নয়। দেয়ালের উপরের ভাগ খুবই প্রশস্ত। দু’জন লোক স্বচ্ছন্দে চলাচল করার উপযোগী।
আশীজন সেনা মুরগির বাচ্চার মতো জড়সড় হয়ে একজনের গা আরেকজনের সাথে লাগিয়ে নিঃশব্দে বসেছিলো। তাদের শ্বাস- প্রশ্বাসের শব্দের বাইরে অন্য কোনো রকমের শব্দ ছিল না জায়গাটিতে। নৈঃশব্দের পটভূমিতে কবরের নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিলো চারদিকে।
নুয়ান কুশল দাশ চতুর্দিকে সতর্ক দৃষ্টি প্রসারিত করে বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায় দেয়ালের পাশে এসে দেয়ালের গায় কান লাগিয়ে দেয়ালের সেপ্রান্তের বুজ নিতে সচেষ্ট হলো।
দেয়ালের সেপ্রান্তে বর্তমান কি হচ্ছে? শত্রুর আকস্মিক আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য কত সৈন্য নিয়োজিত হয়ে রয়েছে দেয়ালের সেপ্রান্তে? দেয়ালে কান লাগিয়ে সে এইসব কথার বুজ নেওয়ার জন্য চেষ্টা চালালো।
নুয়ানের অনুমান হলো, দেয়ালের সেপ্রান্ত নীরব নিস্তব্ধ। জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ নেই। রাতে পহরার দায়িত্বে নিযোজিত সৈন্যরা সম্ভবত প্রচণ্ড শীতের কবল থেকে রক্ষা পেতে নিজের নিজের আশ্রয়স্থলে আশ্রয় নিয়ে সুখ নিদ্রায় বিভোর হয়ে আছে। সে ভাবলো, সে অনুমান করার মতোই যদি সেপ্রান্তের অবস্থা হয়ে থাকে, তাহলে অভিযান শুরু করার এটাই সুবর্ণ সুযোগ।
নুয়ান সাথীদের উদ্দেশ্যে আদেশের সুরে বললো- মৈগুলো স্থাপন করে মৈ বেয়ে উপরে উঠে যাও। কারণ অভিযান শুরু করার এটাই উপযুক্ত সময়।
নুয়ানের আদেশ পেয়ে সেনাদের চোখেমুখে আতঙ্কের ভাব ফুটে উঠলো। তারা হতাশভাবে উপরের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলো। তাদের মনে মৃত্যুর মতোই ভয়ঙ্কর অনুমান হলো দেয়ালের উচ্চতা। দেয়ালের উচ্চতা ত্রিশ হাতের চেয়েও বেশি। কোনো কারণবশতঃ হঠাৎ পড়ে গেলে হাড়-মাংস একাকার হয়ে যাবে। পহরায় নিয়োজিত সেনারা টের পেয়ে মৈ ঠেলে দিলে তো কথাই নেই! সর্বোপরি প্রচণ্ড শীতের প্রকোপে হাত-পা-র সিরা উপসিরা অস্বাভাবিকভাবে টনটন করছিলো। সেই অবস্থায় মৈ বেয়ে উপরে উঠাও প্রায় অসাধ্য কাজ ছিলো। সেজন্য সেনারা হতাশার শিকার হয়ে নুয়ানের আদেশ শুনেও না শুনার ভান করে মাটির মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
সেনাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে নুয়ান নিজেই এগিয়ে মৈর কাছে এলো। সে দেয়ালে মৈ স্থাপন করে প্রথম ধাপে পা দিয়েই সেনাদের উদ্দেশ্য করে উপদেশের সুরে বললো- জন্মিলে মৃত্যু নিশ্চিত। একদিন তো মরতেই হবে, আজই মরে যাই না কেন? আমি আগে উঠছি, তোমরা আমার পেছনে পেছনে উঠে এস। এভাবে বলেই কুশল দাশ উপরে উঠতে লাগলো।
নুয়ানের আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে মৈ স্থাপন করে তাহিরজানও প্রায় নুয়ানের সমানে সমানে উপরে উঠতে লাগলো।
মৈগুলো কয়েকজন একসাথে উঠার মতো মজবুত ছিলো। নুয়ান এবং তাহিরজানকে উপরে উঠতে দেখে বাকি সেনারাও মৈ বেয়ে তাদের পেছনে পেছনে উপরে উঠতে লাগলো।
নুয়ান সবার আগে দেয়ালের উপরে উঠলো। সে সতর্ক দৃষ্টি প্রসারিত করে দূর্গের অভ্যন্তরে তাকাল। সন্দেহজনক কোনো দৃশ্য পড়ল না তার চোখে। জনপ্রাণীর চিহ্নমাত্র নেই রাস্তায়। দেয়ালের উপরেও কোনো জনপ্রাণী চোখে পড়ল না। দেয়ালের উপর ভাগ বেশ প্রশস্ত। একজন অশ্বারোহী অনায়াসে ঘোড়া ছুটিয়ে যাওয়ার মতো প্রশস্ত।
তাহিরজানও ইতিমধ্যে দেয়ালের উপর ভাগে পৌঁছেছিলো। সে তার পাশে অবস্থানরত সেনাটির কানের পাশে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো- কুড়োল কোথায়? তোমার কাছে আছে নাকি?
সেনাটি মুখে কিছু বলল না। সে কুড়োল কোমরে বেঁধে এনেছিলো। কোমর থেকে কুড়োল খুলে সে তাহিরজানের দিকে এগিয়ে দিলো।
সবাই দেয়ালের উপরে উঠে আসার পরে দূর্গ শিখর থেকে নিচে নামার জন্য মৈ খুঁজতে লাগলো। নিচে নামার জন্য দেয়ালের অভ্যন্তর ভাগে মৈ স্থাপন করাই ছিলো। সেজন্য তাদের মৈ খুঁজে পেতে অসুবধিা হলো না। কিছুদূর আসার পরেই তারা মৈ পেয়ে গেলো। নুয়ান এবং তাহিরজান সবার আগে নিচে নেমে গেলো। তাদের পেছন পেছন অন্য সেনারাও নেমে এলো।
দূর্গের অভ্যন্তরে নামার পরে সবাই সষ্টম হয়ে উঠলো। মৃত্যু ভয় পর্যন্ত ভুলে গেলো তারা। দ্রুত অথচ অতি সন্তর্পণে তারা ফিরোজা দরজার গিকে অগ্রসর হলো।
দূর্গের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট দূরত্বের ব্যবধানে পহরা চকী। তারা সেরকম একটি পহরা চকীর কাছে আসার সাথে সাথে শৈবানি খাঁর কোনো একজন সেনা ঘুম জড়িত কণ্ঠে বললো- এই এরিস্থায়, তুই কোথায় মরতে গিয়েছিস? তোর অপেক্ষায় বসে বসে বিরক্ত হয়ে আমরা লেগে পড়েছি। তারাতারি আয়।
নুয়ান উদ্বিগ্নভাবে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে সবার আগে আগে যাচ্ছিল। তাকে দাঁড়িয়ে পড়া দেখে বাকিরাও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। উত্তেজনায় সবার রক্তের গতি খরস্রোতা নদীর স্রোতের মতো উত্তাল হয়ে উঠলো। উত্তেজনায় সবার বুক দুরু দুরু কাঁপতে লাগলো। মুহূর্তের ভেতরে নুয়ান নিজেকে সামলে নিয়ে হাতের মুঠোয় ধরে থাকা কুড়োল শক্ত করে ধরে বললো- এখানেই আছি। আসতেছি, দাঁড়া।
কে তুমি? পহরা চকীর ভেতর থেকে সন্ধিগ্ধ কণ্ঠে প্রশ্ন করালো।
নুয়ান প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে হাতের মুঠোয় কুড়োল শক্ত করে ধরে স্বচ্ছন্দ অথচ দ্রুত গতিতে চকীর দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। দরজা ঠেলে সে ভেতরে প্রবেশ করে একজন সেনাকে অসংলগ্ন অবস্থায় বসে বসে ঘুমিয়ে থাকা প্রত্যক্ষ করলো। ক্ষণকাল বিলম্ব না করে সে সেনাটির মাথা লক্ষ্য করে কুড়োল চালালো। বিকট চিৎকার করে সেনাটি রক্তে রঞ্জিত হয়ে মেঝেতে ঢলে পড়লো। নুয়ানের কাপড়েও সেই উষ্ম রক্তের ছিটা লাগলো। সাথে সাথে নুয়ান ক্ষিপ্র গতিতে চকী থেকে বেরিয়ে এলো।
বাইরে এসেই নুয়ান উত্তেজিত কন্ঠে বললো- তাহিরজান, তুমি ফিরোজা দরজার দিকে যাও।
তাহিরকে এভাবে আদেশ দিয়েই দশজন সেনা নিয়ে নুয়ান অন্য একটি চকীর দিকে অগ্রসর হলো।
বাকি সেনাদের পেছনে পেছনে আসতে নির্দেশ দিয়ে তাহিরজান চোখের পলকে ফিরোজা দরজার কাছে এলো।
ফিরোজা দরজার পহরার দায়িত্বে ছিলো ফাজিল তর খাঁ নামের একজন বেগ। তার অধীনে ডেরশ সেনা ছিলো। প্রায়গুলো সেনা নিজের দায়িত্বের প্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে নিজের নিজের কোঠায় নিশ্চিত মনে শোয়ে ছিলো। মাত্র বিশজন সেনা পহরায় নিয়োজিত ছিলো। পহরার দায়িত্বে থাকা সেনা কয়জনও অলসভাবে বসে বসে ঘুমুচ্ছিলো। তাহিরজানকে দেখে তাদের মাত্র একজন সেনা তরবারি তুলে নিতে সক্ষম হলো। কিন্তু আঘাত করার আগেই তাহিরজান তাকে যমপুরী পাঠিয়ে দিলো।
তাহিরজান অস্বাভাবিক ক্ষিপ্রতায় নিজের দায়িত্ব পালন করে যেতে লাগলো। সেনাটিকে হত্যা করেই সে দূর্গের দরজার দিকে এগিয়ে এলো। দরজায় ঘোড়ার মাথার আকৃতির একটি প্রকাণ্ড তালা ঝুলতেছিলো। দুহাতে কুড়োল ধরে দেহের সমগ্র শক্তি প্রয়োগ করে সে তালার উপরে আঘাত করলো। কিন্তু প্রথম আঘাতে তালাটার কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলো না। শুধু তালা এবং কুড়োলের সংঘর্ষে সৃষ্টি ধাতব শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। পরের পর্যায়ে তাহিরজান পাগলের মতো তালার উপরে উপর্যুপরি আঘাত করতে লাগলো।
নিহত সেনাটির আর্তচিৎকার এবং তালার উপরে করা উপর্যুপরি আঘাতের ধাতব শব্দ শুনে দরজা থেকে কিছু দূরে পহরারত সেনাগুলো সচকিত হয়ে উঠলো।
ফাজিল তর খাঁ পহরারত সেনাদের সাথে আড্ডা মার ছিলো। ধাতব শব্দে অশুভ বার্তার ইংগিত পেয়ে সে মশাল এবং কয়েকজন সেনা নিয়ে দরজার দিকে দৌড়ে এলো। সবার আগে আগে আসা দু’জন সেনা তাহিরকে কুড়োল চালাতে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের দু'জনের একজন ক্ষিপ্রহাতে শরধনু বের করে তাহিরকে লক্ষ্য করে শর নিক্ষেপ করলো। অল্পের জন্য শর লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। শরটি তাহিরের মাথার উপর দিয়ে সনসন শব্দ করে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে লোহার শেকলে আঘাত করে ছিটকে এলো।
সেনা দু’জন পুনরায় শর নিক্ষেপ করার আগেই তাহিরজানের সাথে আসা সেনারা তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে তাদের যমালয় পাঠিয়ে দিলেন। এমন সময় তর খাঁর নেতৃত্বে আসা বাকি সেনা সেখানে এসে উপস্থিত হলো। ফলে উভয় দলের মাঝে দরজার কাছে খণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। খঞ্জর, বর্শা প্রভৃতি অবিরামভাবে চলতে লাগলো। মরন্মুখ সেনার আর্তনাদে জায়গাটা কোলাহল মুখর হয়ে উঠলো।
ইতিমধ্যে নুয়ানও এসে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলো। সে অসীম বিক্রমে যুঁজে তরবারির আঘাতে শত্রু সেনা ধারাসায়ী করতে লাগলো। শত্রুসেনার দলপতি তর খাঁও তার তরবারির আঘাতে নিহত হলো।
এদিকে তাহিরজান তালা ভাঙার জন্য উন্মত্তের মতো উপর্যুপরি কুড়োল চালিয়ে যাচ্ছিলো। তার কুড়োলের প্রহার কখনও তালায় এবং কখনও দরজার তক্তায়, কখনও আবার লোহার শেকলে লাগছিলো। কুড়োলের প্রহারে তালা খুলছিলো না যদিও প্রতিটা প্রহারে দরজার কিছু না কিছু ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছিল। ফলে কুড়োলের উপর্যুপরি প্রহার সহ্য করতে না পেরে এক সময় সম্পূর্ণ দরজাটা খুলে ধড়াস করে পরিখার উপরে পড়ে গেলো। বড় প্রশস্ত দরজাটা পরিখার উপরে পড়ে গিয়ে পুলের মতো সৃষ্টি করলো।
বাবর এবং কাশিম বেগ সসৈন্যে পরিখার সেপাড়ে অধীরভাবে অপেক্ষা করছিলেন। দরজা ভেঙে পড়ার সাথে সাথে তাঁরা ঝাঁপ মেরে ঘোড়ার পিঠে চড়ে তরবারি কোষমুক্ত করে দরজা সৃষ্ট পুল দিয়ে পরিখা পার হয়ে বিজুলি সঞ্চারে সসৈন্যে দূর্গের ভেতর প্রবেশ করলেন।
ইতিমধ্যে ফাজিল তর খাঁর দলের মুষ্ঠিমেয় কয়েকজন সেনা জীবিত ছিলো। বাকি সেনা হয়তো নিহত হয়েছিলো, নয়তো আহত হয়ে মৃত্যুর জন্য ক্ষণ গণছিলো। জীবিত থাকা সেনারা নুয়ানের দলে অল্প কয়েকজন সেনা দেখে উজ্জীবিত হয়ে তাদের দলের অন্য সেনাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠার জন্য সময় দিতে প্রাণপণে যুদ্ধ করছিলো। কিন্তু বাবরের নেতৃত্বে একশ ষাটজন অশ্বারোহী বন্যার জলের মতো একসাথে দূর্গের ভেতর প্রবেশ করা দেখে তারা ফরিঙের মতো ছিটকে পালাতে লাগলো। কাশিম বেগ কয়েকজন সেনা নিয়ে পলায়নরত সেনাদের পেছনে পেছনে ধাওয়া করলেন।
পরের ঘটনাগুলো অতি ক্ষিপ্রভাবে সংঘটিত হতে লাগলো।
দূর্গের দরজা চারটে। প্রত্যেকটা দরজা রাতের অন্ধকারে দখল করা প্রয়োজন বলে বাবর উপলব্ধি করলেন। কারণ অভিযানের
সংবাদ পেয়ে শৈবানি খাঁ যেকোনো মুহূর্তে সমরকন্দ আসতে পারে! শৈবানি খাঁ আসার আগেই প্রত্যেকটা দরজা নিজেদের দখলে আনতে না পারলে সাপ মেরে নেগুরে বিষ রাখার মতো কথা হবে। শৈবানি খার বিশাল সেনাবাহিনী যদি যেকোনো একটি দরজা দিয়ে সহরে প্রবেশ করার সুযোগ পায়, তাহলে জয়ের আশা সমুলঞ্চে নাশ হবে এবং তখন জীবন নিয়েও সংশয়ে দেখা দিবে। বাবর এসব কথা চিন্তা করে নিজের সেনাদল চারটে দলে বিভক্ত করে প্রত্যেক দলকে একটা করে দরজা দখলের দায়িত্ব দিলেন।
দায়িত্ব অনুসারে নুয়ান দলবল নিয়ে গিয়ে ‘চারবাহা’ দরজায় আক্রমণ চালালো। বাবর নিজে কয়েকজন সেনা নিয়ে ‘সুজন গরাণ’ দরজার পহরায় থাকা সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কাশিম বেগ গেলেন ‘শেখজাদা’ দরজার দিকে এবং তাহিরজান থাকলো ফিরোজা দরজার সুরক্ষার দায়িত্বে।
সেনাদের দৌড়াদৌড়ি এবং চিৎকারে সমগ্র সহর ঘুমের জড়তা ভেঙে জেগে উঠলো এবং সমগ্র সহরে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়লো। প্রকৃত ঘটনার খোঁজখবর না পেয়ে নৌকা ডুবা নাবিকের মতো আতংকগ্রস্ত হয়ে জনতা দিশেহারা হয়ে পড়লেন। সহরটায় নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচণ্ড কিছু একটা সংঘটিত হওয়ার কথা শুধু উপলব্ধি করতে সক্ষম হলো তারা।
শেখজাদা দরজা থেকে অল্প দূরেই খাজা ইয়াহিয়ার প্রাসাদ। শৈবানি খাঁ সহর দখল করার সময়ে সহর দারোগা জানবফাই খাজা ইয়াহিয়ার কাছ থেকে প্রাসাদটা কেড়ে নিয়েছিলো। প্রাসাদের জাঁকজমকপূর্ণ কক্ষ একটিতে সে গভীর নিদ্রায় মগ্ন ছিলো। দৌড়াদৌড়ি এবং চিৎকারের শব্দে সে ঘুম থেকে জেগে উঠলো। কিন্তু হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠার জন্য সে ঘটনার কোনো শুংসূত্র পেল না। ঘটনার বুঝ নিতে সে বিরক্ত ও উৎকণ্ঠিতভাবে দৌড়ে কক্ষের বাইরে বেরিয়ে এলো। বাইরে বেরিয়েই সে দেখতে পেল তাড়া খাওয়া শিয়ালের মতো দৌড়ে পালানো একদল সেনার পেছনে পেছনে শিকারি কুকুরের মতো একদল অশ্বারোহী ধাওয়া করে যাচ্ছে। কে মিত্র, কে শত্রু সেই কথা উপলব্ধি করাটা কঠিন হয়ে পড়লো। সবাই চিল্লাচিল্লি ও দৌড়াদৌড়ি করছে। প্রাণপণে দৌড়ে পলায়নরত সেনারা তাদের পেছনে পেছনে ধাওয়া করে আসা সেনাদের পার্যমাণে গালাগাল দিচ্ছে। ফলে চারদিকে এক আতংকময় বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বুঝ নিতে জানবফাই তৎক্ষণাৎ ঘোড়া ছুটিয়ে শেখজাদা দরজার দিকে এলো। শেখজাদা দরজার কাছে তখনও বাবর পৌঁছোতে পারেননি। তবে চারদিকে বিশৃংখল পরিবেশ লক্ষ্য করে জানবফার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠলো। সে ভাবলো, নিশ্চয় কোনো শত্রুসেনা সহর আক্রমণ করেছে এবং সেই আক্রমণকারী বাবরের বাইরে অন্য কেউ নয়! সহরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলেও তার উপলব্ধি হলো। সেজন্য ‘চ জীবতি, স্ব পালয়তি’ নীতি অনুসারে সে সহর ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘোড়া ছুটালো।
দরজার কাছে এসে ঘটনার আকস্মিকতায় কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে একশত জন সেনা দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যক্ষ করলো জানবফাই। সেনাদের সে তৎক্ষণাৎ দরজা খুলে দিতে নির্দেশ দিলো। নির্দেশ পেয়ে একজন সেনা দরজা খুলে দিলো। দরজা খোলার সাথে সাথে সে কয়জন সেনা সাথে নিয়ে শৈবানি খাঁর ছাউনি অভিমুখে ঘোড়া ছুটালো।
সহরের বাসিন্দারা গণ্ডগোলের অশুভ শব্দে আতংকিত হয়ে জেগে উঠেছিলো। তবে তারা ঘটনার বুঝ নিতে কেউ বাইরে বের হয়নি। সবাই ভয়ে কাছিমের মতো হাত-পা লুকিয়ে সূর্যোদয়ের জন্য অধীরভাবে অপেক্ষা করছিলো। ভয়ে তারা বাতি পর্যন্ত জ্বালায়নি। সহরে প্রকৃতার্থে কী ঘটছে সরারাত তারা সে বিষয়ে কোনো সংবাদ পায়নি। মানুষগুলো ভাগ্যের উপর নির্ভর করে উৎকণ্ঠা এবং হতাশায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত পঙ্গুর মতো রাত কাটিয়ে দিলো।
সকাল বেলা কিছু কিছু সাহসী লোক রাস্তায় বের হয়ে এলো। সাধারণ জনতা দরজা খুলে বাইরের দিকে ফুচকি পারতে লাগলো। তারা লক্ষ্য করলো, একদল সেনা ঢোল পিটিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘোষণা করতেছে- সাধারণ নাগরিকের কোনো ভয় নেই। বাবর শৈবানি খাঁর সেনাদের পরাজয় করে সহর দখল করেছেন। এখন থেকে সমরকন্দ বাবরের দখলে। জনতা নির্ভয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারবে।
সকাল হওয়ার সাথে সাথে বাবরের এই বিজয় বার্তা বনের আগুনের মতো সমগ্র সহরে ছড়িয়ে পড়লো। শৈবানি খাঁর পরাজয়ের ফলে সাধারণত জনতা উল্লসিত হয়ে উঠলো।
শৈবানি খাঁর নিষ্ঠুর আচরণের জন্য সহরের অধিক সংখ্যক লোক তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলো। নির্মম অত্যাচার এবং শাসন-শোষণের ফলে অতিষ্ঠ হয়ে জনতা তাঁর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিলো। শৈবানি খাঁর সেনারা অনেক শিল্পী, কারিগর এবং সভ্রান্ত লোকের ঘর- বাড়ি লুটপাট করে সর্বস্বান্ত করেছিলো। কৃষকের কষ্টোপার্জিত ক্ষেত-খোলাও বিজয়োমত্ত সেনারা রেহাই দেয়নি। বিজয়ী সেনাদের ঘোড়াগুলো ক্ষেতের শস্য খেয়ে ক্ষেত-খোলা পদপিষ্ট করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলো। খাজা ইয়াহিয়ার মতো সমরকন্দের একজন গণ্যমান্য লোককে তাঁর দু'টি পুত্রসহ পাহাড়ের উপরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে। এক কথায় বলতে গেলে, শৈবানি খাঁ সহরটায় এক শ্বাসরোধী আতংকজনক পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছিলো।
ফলে শৈবানি খাঁর শাসন সমাপ্ত হওয়ার আনন্দে সহর মুখর হয়ে উঠলো। বাবরের বিজয় ঘোষণা করে জনতা রাজপথে বেরিয়ে এলো।
সহরের গণ্যমান্য ব্যক্তি, ভূতপূর্ব শাসক সুলতান আলীর সমর্থক বেগবর্গ বাবরকে উষ্ম অভ্যর্থনা জানালেন। খাজা ইয়াহিয়ার সমর্থক, কৃষক, কারিগর, শিল্পীবর্গ কালো পতাকার নিচে সমবেত হয়ে সহরের প্রধান প্রধান রাস্তায় শোভাযাত্রা বের করলেন।
শৈবানি খাঁর সেনার অত্যাচার, উৎপীড়ন, শাসন-শোষণে জর্জরিত জনতার অন্তরে উল্লাসের সাথে প্রতিশোধের স্পৃহা জেগে উঠলো। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য জনতা উন্মত্ত হয়ে উঠলো। বাবরের দুশ চল্লিশ জন সেনার সাথে মিলে শত শত উন্মত্ত জনতা শৈবানি খাঁর সেনাদের অলিয়ে-গলিয়ে খোঁজে বেরাতে লাগলো।
সে ছিলো এক অত্যন্ত ভয়াবহ লোমহর্ষক দৃশ্য। শৈবানি খাঁর পলায়নরত সেনাদের পালানো স্থান থেকে বের করে টেনে হিঁচড়ে রাস্তায় এনে ভেড়া-ছাগলের মতো নির্বিচারে হত্যা করতে লাগলো। কয়েকজনকে পলায়নরত অবস্থায় ধরে ছুরি, দা, লাঠি এবং পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করলো। নির্মমভাবে সংঘটিত হতে লাগলো হত্যার পর হত্যা। রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠলো। মরন্মুখ সেনার আর্তনাদে আকাশ-বাতাস কম্পিত হয়ে উঠলো। এভাবে প্রায় দুপর পর্যন্ত চললো এই সেনা নিধন যজ্ঞ।
সেদিকে জানবফার কাছ থেকে বাবরের সমরকন্দ বিজয়ের সংবাদ পেয়ে শৈবানি খাঁ সমগ্র বাহিনী নিয়ে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে এসে সমরকন্দে উপস্থিত হলো। কিন্তু তাঁরা সরাসরি বাবর সেনাদের আক্রমণ না করে তাঁবু খাড়া করতে লাগলো।
শৈবানি খাঁর সেনা দেখে বাবর দূর্গ রক্ষার সুব্যবস্থা করলেন। পরিখার উপরে পুলের মতো পড়ে থাকা ফিরোজা দরজার ফটক তুলে এনে মেরামত করে পুনরায় মজবুতভাবে স্থাপন করলেন। বাকিগুলো দূর্গ ফটকও বন্ধ করে দিলেন। আসন্ন আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য কটকটে পহরার ব্যবস্থাও করলেন ফটকগুলোতে।
কিন্তু শৈবানি খাঁ চিল হয়ে উড়ে এসে কয়েকদিন ছাউনি পেতে থেকে আক্রমণ না করেই ফেঁচাটা হয়ে ফিরে গেলেন। শৈবানি খাঁ চলে যাওয়ার পরে বাবর সেনার সাথে সমরকন্দের জনতা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।
কয়েকদিনের ভেতরেই সমরকন্দে আবার স্বাভাবিক জীবন শুরু হলো। ভয়-শংকা-আতংকের পরিবর্তে জনতার অন্তরে আবার আনন্দময় জীবনের উল্লাস জেগে উঠলো।
* * *
সমরকন্দ বিজয়ের কয়েকদিন পরের কথা।
সেদিন সকালের প্রচণ্ড ঠাণ্ডার শেষে সোনালী রোদের মিঠে পরশ পেয়ে সমগ্র সমরকন্দ সহর ঝলমল করে উঠেছিলো।
দালানের ছাদ, মাটির কাঁচা বেড়া, গাছ-লতা এবং দালানের উঁচু উঁচু গম্বুজসমূহে বরফের আচ্ছাদন তখনও সাদা চাদরের মতো ঝলমল করছিলো যদিও কর্মের হাত ইশারায় সমগ্র সহর এক সময় কোলাহল মুখর হয়ে উঠলো।
বাবব অভিভূতের মতো বোস্তান-ই-সরাই(রাজপ্রাসাদ)র ছাদের উপরে উঠে এলেন। ছাদ থেকে তিনি বরফাবৃত সহরের সৌন্দর্যসম্ভার উপভোগ করতে লাগলেন। বরফের মাঝে মাঝে বেরিয়ে থাকা গাছ-বিরিখের শাখা-প্রশাখার দিকে তাকিয়ে তাঁর আরবি বর্ণমালার স্বরচিহ্নের কথা মনে পড়ে গেলো। আরবি বর্ণমালার কথা মনে পড়ার সাথে সাথে আলীশের নবাই তাঁকে লিখা একটি পত্রের কথা মনে পড়ে গেলো। আলীশের নবাইর প্রশংসাসূচক পত্র। সেটা ছিলো তাঁর জন্য এক বিরল প্রাপ্তি।
পত্রের কথা মনে পড়ার সাথে সাথে গর্ব এবং প্রসন্নতায় বাবরের বুক ফুলে উঠলো। বাবরের নিজেকে বিখ্যাত ও মহৎ ব্যক্তির মতো ধারণা হতে লাগলো। ফলে আলীশের নবাইর মতো একজন বিখ্যাত কবি হওয়ার উজ্জ্বল অনুভূতি জেগে উঠলো তাঁর হৃদয়ে।
বাবর দ্রুত নিচে নেমে এসে নিজের কক্ষে প্রবেশ করলেন। কাগজ-কলম হাতে নিয়ে তিনি ভাবে বিভোর হয়ে পড়লেন। ভাবনার তাঁরে দু’টি মাত্র কলি ঝংকারিত হতেই পরিচারক একজন প্রবেশ করে তাঁর ভাবনার ছন্দ পতন করলেন।
পরিচারকটি বুকে দু’হাত স্থাপন করে ক্ষমা খোঁজার ভঙ্গীতে বললো- জাহাপনা, ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন।
বাবর বিরক্তিতে ভ্রূযুগল কুঞ্চিত করে বললেন- কী হলো?
আপনার মাতৃ সাহেবান আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন, জাহাপনা।
সত্যি ! বাবর লাফ মেরে দাঁড়িয়ে বললেন- সত্যিই এসেছে নাকি?
হ্যাঁ জাহাপনা, আপনার ভগ্নী সাহেবানও এসেছেন।
মাতৃ এবং ভগ্নী আসার কথা শুনে বাবরের মুখমন্ডল আনন্দোজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তিনি উৎসাহিত কণ্ঠে বললেন- খুব ভালো হয়েছে। এভাবে বলেই তিনি কাগজ-কলম সরিয়ে রাখলেন।
প্রায় ছয় মাস যাবত বাবরের মাতৃ এবং ভগ্নীর সাথে দেখা সাক্ষাৎ নেই। সমরকন্দের শান্তি সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যস্ত থাকাতে অনেকদিন তিনি মাতৃ ও ভগ্নীর খোঁজ খবর নিতে পারেন নি। সমরকন্দে শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি হওয়ার পরে তাঁর সর্বদা মাতৃ ও ভগ্নীর কথা মনে পড়ছিলো। তাঁরা কয়েকদিন ধরে নেপাতোলায় আছেন। সেজন্য তিনি মাতৃ-ভগ্নীকে সমরকন্দে আনার জন্য কয়েকদিন আগে কয়েকজন বিশ্বস্ত সেনা নেপাতোলায় পাঠিয়ে ছিলেন। তারাই অল্প আগে মাতৃ-ভগ্নী, মাসি এবং আয়েশা বেগমকে নিয়ে সমরকন্দ ফিরে এসেছে।
বাবর বেঙের মতো লাফ মেরে মেরে সিঁড়ি ভেঙ্গে প্রথম মহলায় নেমে এলেন। প্রথম মহলা মহিলাদের জন্য নির্ধারিত ছিলো। কক্ষে প্রবেশ করেই তিনি মাতৃ-ভগ্নী, মাসি এবং আয়েশা বেগমকে দেখে উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন।
বাবর মাতৃ-ভগ্নী এবং মাসির সাথে ভাব বিনিময় করে অল্প দূরে অবস্থানরত আয়েশা বেগমের নিকটে এলেন। সমরকন্দে আসার সময়ে তিনি আয়েশা বেগমকে সাথে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আয়েশা বেগম তাঁর সাথে আসতে অমান্তি হওয়াতে তিনি তাঁকে ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে অনেকদিন পরে আয়েশা বেগমকে দেখে তিনি রোমাঞ্চিত হয়ে উঠলেন। উজ্জীবিত কণ্ঠে তিনি আয়েশা বেগমকে স্বাগতম জানালেন- উষ্ম সম্বর্ধনা বেগম।
আয়েশা বেগম তাঁর শীর্ণ হাত বাবরের কাঁধে স্থাপন করে বললেন- আমার বাদশাহ, বিজয়ের জন্য আপনাকেও শুভকামনা জানাচ্ছি।
আপনাকেও শুভকামনা বেগম। আপনার নিজের সহর সমরকন্দে ফিরে আসার জন্য আপনাকেও শুভকামনা জানাচ্ছি।
আয়েশা বেগম মাথা নুইয়ে বললেন- এর জন্য আপনাকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
খানজাদা বেগম মধ্য থেকে ঠাট্টার সুরে বললেন- বেচেরা আয়েশা রাস্তায় আসতে খুব কষ্ট করে এসেছে। এর জন্য বর্তমান ভ্রমণ করাটাও অসুবিধা। তবুও একমাত্র আপনার কথা ভেবে পথশ্রমের ক্লান্তি ভুলে এতো দূর রাস্তা কষ্ট করে এসেছে। এর জন্যও বেচারা আয়েশা ধন্যবাদ পাওয়া উচিত।
বাবর ভগ্নীর ঠাট্টার অর্থ উপলব্ধি করতে না পেরে নির্বোধের মতো ভগ্নীর দিকে তাকালেন। বাবরের কৌতূহল দেখে খানজাদা বেগমের চোখে-মুখে দুষ্টুমি ভরা কৌতুকের হাসি খেলে গেলো। ভগ্নীর কথার অর্থ উপলব্ধি করতে না পেরে বাবর অধিক অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন।
খানজাদা বেগম বাবরকে অপ্রস্তুত দেখে তিনি নিজেও অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। জিব্বার জল লুকানোর জন্য পাণ চাবানোর মতো তিনি নিজের অপ্রস্তুত অবস্থা লুকানোর জন্য বাবরের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মাতৃর দিকে তাকালেন। মাতৃ এবং মাসিও বাবরের অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে পরস্পরে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে চোখের ভাষায় কৌতুক করে থাকা খানজাদা বেগমের চোখে ধরা পড়ল।
আসলে বাবর পিতৃ হতে চলেছেন। আয়েশা বেগম ছয় মাসের সন্তান সম্ভবা। খানজাদা বেগম এই সুসংবাদটাই বাবরকে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মাতৃ এবং মাসির সন্মুখে কথাটা বলতে লজ্জা পেয়ে তিনি সংকুচিত হয়ে উঠলেন।
বাবর অসহায়ভাবে আয়েশা বেগমের দিকে তাকালেন। খানজাদা বেগমের ঠাট্টার কারণ উপলব্ধি করতে পেরে তিনি ইতিমধ্যেই লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠছিলেন। সেজন্য তিনিও মাথা নত করলেন।
বাবরের অনুভূতি সজাগ হয়ে উঠলো। তিনি মাতৃ, ভগ্নী, মাসি এবং আয়েশা বেগমের আচরণে রহস্যের গোন্ধ পেলেন। তির্যক সন্ধানী দৃষ্টি মেলে তিনি আয়েশা বেগমের দিকে তাকালেন। আয়েশা বেগম আগের থেকে শীর্ণ হয়েছে যদিও পেটটা যেন মোটা দেখা যাচ্ছে। তিনি লক্ষ্য করলেন, আয়েশা বেগমের পেটটা কুর্তা থেকে সন্মুখের দিকে বের হয়ে আছে। আয়েশা বেগমের মুখমন্ডলো যেন অস্বাভাবিক রকমে ম্লান পড়ে আছে। আয়েশার স্বাস্থ্য ও পেটের অস্বাভাবিক গঠনের প্রতি লক্ষ্য করে আয়েশা বেগম সন্তান সম্ভবা বলে তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন। রহস্যের সন্ধান বের করতে পেরে তিনি উৎফুল্লিত হয়ে উঠলেন। তবে আয়েশা বেগম গাড়ীর ঝাঁকুনিতে পাওয়া অসুবিধার কথা ভেবে তিনি কিছু পরিমাণে শংকিতও হলেন।
বাবর আয়েশা বেগমের দিকে তাকিয়ে সহানুভূতির সুরে বললেন- আপনার অসুবিধার কথা আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি, বেগম। বর্তমান আপনি সকল অসুবিধা থেকে মুক্ত। আপনার আরামের জন্য সব ব্যবস্থা করা হবে। বোস্তান-ই-সরাইর প্রতিটা প্রাণী আপনার পরিচর্যার জন্য সর্বদা প্রস্তুত হয়ে থাকবে।
খানজাদা বেগম প্রাণখোলা হাসি হেসে বললেন- আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনার প্রতিশ্রুতির কথা শুনে এবং অনেকদিনের মাথায় আপনাকে কুশলে দেখে আমার আনন্দের সীমা আকাশের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।
আপনার সেবক ভ্রাতৃও আপনার সাথে কথা বলার জন্য অনেকদিন থেকে ছটফট করছিলো। আপনাকে পেয়ে আমার আনন্দ সাগরে অবগাহন করার মতো লাগছে। আপাজান, আপনারা পথশ্রমে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। বর্তমান আপনাদের বিশ্রামের প্রয়োজন। যান, বিশ্রাম করুনগে’। পরে কথা হবো। আমি আপনাদের বিশ্রামের জন্য বিছানা পাততে হুকুম দিয়েছি। বাবর এভাবে বলেই ঠাট্টার সুরে বললেন- ওই যে, ঐ আকাশের উপরে। বাবর এভাবে বলে ছাদের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে ফেললেন। বাকিরাও তাঁর সাথে হাসিতে যোগ দিলেন।
মাতৃ, ভগ্নী, মাসি এবং আয়েশা বেগমকে বিশ্রামের জন্য এগিয়ে দিয়ে বাবর নিজের কক্ষে এসে ভাবে বিভোর হয়ে পড়লেন।
আজকে তাঁর জন্য খুবই আনন্দের দিন। আনন্দে তাঁর গা সাতখান আটখানের মতো করতে লাগলো। নিজের হৃদপিণ্ডের ঢিপ ঢিপ শব্দ যেন তাঁর দেহ-মনে মিঠা বাঁশির সুর ধ্বনিত করতে লাগলো। তাঁর হৃদয়ে সজীব হয়ে উঠলো পিতৃত্বের পুলক ভরা অনুভূতি। জীর্ণ-শীর্ণ আয়েশা বেগমও তাঁর অনুভূতিতে যৌবনের সুষমামণ্ডিত উজ্জ্বল দ্যুতিময়ী নারীরূপে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। আয়েশাকে যেন আগের থেকে অধিক আপন আপন লাগতে লাগলো তাঁর। আয়েশার সান্নিধ্য পেতে তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। সূর্যটাকে দু’হাত দিয়ে অস্তাচলের দিকে ঠেলে দিতে ইচ্ছে হলো তাঁর।
রাতে বাবর এবং আয়েশা বেগম একটি বিছানায় শোইলেন। বাতি নিভিয়ে শোয়ার পরে আয়েশা বেগম বুক পর্যন্ত লেপ ঠেলে দিয়ে পা মেলে শোয়ে নিশ্চল হয়ে উপরের দিকে চেয়ে রইলেন। তাঁর ধারণা হলো, তিনি সত্যই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। তিনি হঠাৎ আচ্ছন্নের মতো বলে ফেললেন- আপনার জন্য আমি গৌরাবান্বিত, আমার বাদশাহ।
অপ্রত্যাশিত সংযোগের জন্য বাবর চমকে উঠলেন। কারণ তিনি নিজেও এই কথা ভাবছিলেন। তিনি সমরকন্দে আসার আগমুহূর্তে আয়েশাক বলে এসেছিলেন- বেগম, আমরা আবার সমরকন্দে মিলিত হবো।
তিনি নিজে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পেরে গৌরববোধ করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আয়েশা বেগম কথাটা বলছিলেন।এই সংযোগের ফলে বাবর অধিক আনন্দোজ্জ্বল হয়ে উঠলেন।
আসন্ন পিতৃত্বের গৌরবে বাবর যেভাবে উৎফুল্লিত আয়েশা বেগমো যে বাবরের সন্তানের পিতৃ হতে পেরে সেভাবে গৌরবান্বিত, আয়েশা বেগমের আচরণে সেকথা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠাতে বাবর অধিক পুলকিত হয়ে উঠলেন।
শিশুর মতো চপলতা প্রকাশ করে বাবর জিজ্ঞাসা করলেন- বেগম, আমরা কখন সেই প্রত্যাশিত দিনটির আনন্দ উপভোগ করতে পারব?
তিন মাসের চেয়েও কম সময় রয়েছে, আমার বাদশাহ। সময় যত এগিয়ে চলছে আমার উৎকণ্ঠাও তত বেড়ে চলেছে।
কেমন উৎকন্ঠা? আপনি তো এইমাত্র বললেন যে আপনি গৌরব অনুভব করছেন?
অবশ্যেই গৌরব অনুভব করছি। তবে, সময় এগোনোর সাথে সাথে অন্য প্রকারের ভয়ের অনুভূতিও মনে সঞ্চার হচ্ছে। সেই ভয়ের ব্যাখ্যা আমি আপনকে দিতে পারব না। আচ্ছা, সেগুলো এখন বাদ দিন। আমি একটা কথা ভাবছি।
কি কথা, বেগম?
আল্লাহই যদি আমাদের পুত্র সন্তান দিন তো তার নাম ফখরুদ্দিন রাখার কথা ভাবছি। ভালো হবে না, আমার বাদশাহ?
বাবর ভাবলেন, পিতৃর নাম জহিরুদ্দিন এবং পুত্রের নাম ফখরুদ্দিন। কেমন বুদ্ধিমতী এই আয়েশা! পুত্রের নাম পিতৃর নামের সাথে মিলিয়ে রাখতে চাইছে....
বাবর আয়েশাকে প্রশংসা করে বললেন- ফখরুদ্দিন! কেমন সুন্দর নাম? কিন্তু যদি মেয়ে সন্তান হয়, তাঁর নাম রাখব ফখরুন্নিসা।
ঠিক হবে না বেগম?
আয়েশা বেগম আসলে পুত্রের মা হতে চায়। সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর মাতৃ।
সেজন্য আয়েশা বেগম বললেন- আপনার কথা মেনে নিচ্ছি, কিন্তু আমি আসলে পুত্র সন্তানের মা হতে চাই।
আল্লাহই আপনার মনোবঞ্ছা পূর্ণ করুন।
ফখরুদ্দিন.....ফখরুন্নিসা। কী সুন্দর নাম!
বাবর ভাবে বিভোর হয়ে পড়লেন।
*
* *
দিনের পরে রাত, রাতের পরে দিন...... এ মহাকালের অমোঘ বিধান।
সমরকন্দ বিজয়ের পরে বাবরের জীবনেও অন্ধকার রাতের অবসান হয়ে নতুন দিনের সূর্যোদয় হলো। সাথে উদয় হলো ভাগ্য রবি। তাঁর জীবনে একটার পরে একটা সফলতা আসতে লগালো। পূর্ব দিকের উর্গুল, পশ্চিম দিকের সোগন্ধ এবং বুসিয়া শৈবানি খাঁর হাত থেকে স্বতন্ত্র হয়ে বাবরের অধীনে এলো।
শৈবানি খাঁ আসন্ন যুদ্ধের জন্য অর্থ এবং সেনাবল বৃদ্ধির জন্য সমরকন্দ থেকে অবরোধ তুলে পিছিয়ে গিয়ে ছোট ছোট দল নিয়ে বাবর সেনাদের ব্যতিব্যস্ত করছিল যদিও শেষ মুহূর্তে সেইসকল স্থানের দখল বাবর নিজের হাতে আনতে সক্ষম হচ্ছিলেন।
কিন্তু কুর্শি এবং খুজার নামক সহর দু’টি অনেকদিন শৈবানি খাঁ নিজের দখলে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। শৈবানি খাঁ নিয়োগ করা দু’জন শাসক উক্ত সহর দু’টির শাসন নিয়ন্ত্রণ করছিলো। উৰ্গুল, সোগন্ধ, বুসিয়া বাবরের অধীনে আসার পরে বাবর সেনার মনোবল অধিক বৃদ্ধি পেয়েছিলো। সেজন্য বাবর উৎসাহিত হয়ে উক্ত সহর দু'টির দখল নিজের হাতে আনার জন্য একদল সেনা প্রেরণ করলেন। বাবর সেনা অতি সহজে উক্ত সহর দু'টি দখল করে শৈবানি খা নিয়োগ করা শাসক দু’জনকে বিতাড়িত করে নতুন শাসক নিযুক্ত করলেন। নব নিযুক্ত শাসক দু'জনে নানান উপহার সামগ্রীর সাথে শত শত সেনা বাবরের জন্য উপঢৌকন পাঠালেন। তার একদল সেনা সমরকন্দ এসে পৌঁছেছিলো এবং বাকি সেনা অতিশীঘ্ৰে এসে উপস্থিত হবে।
উক্ত সংবাদ পেয়ে বাবর উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। নতুন সেনা নিয়ে আসা বেগদের তিনি আড়ম্বরপূর্ণ জমকালো সাজসজ্জা, আরামদায়ক আবাসগৃহ এবং উচ্চহারে বেতন প্রদান করলেন।
এভাবে বাবর হৃত মর্যদা এবং প্রতিপত্তি ফিরিয়ে আনার জন্য মনোনিবেশ করলেন। ভাগ্যলক্ষ্মী প্রসন্ন হওয়ার জন্য তিনি প্রভূত সফলতাও লাভ করতে সক্ষম হলেন।
বিগত বছরগুলোতে সমরকন্দের শাসনভার একজন শাসক থেকে আরেকজন শাসকের হাতে হস্তান্তর হওয়াতে সমরকন্দের অবস্থা সবদিক দিয়েই দুর্বল হয়ে পড়েছিলো। বাবর সহরের অবস্থা উন্নত করার সাথে সাথে জনতার মনোবল ও মানসিক শান্তি ফিরিয়ে আনারজন্য মনোনিবেশ করলেন। ইতিমধ্যে বিখ্যাত শায়ের আলীশের নবাইর কাছ থেকে প্রশংসাসূচক পত্র পেয়ে বাবর উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিলেন। সেজন্য তিনি দ্বিগুণ উৎসাহে কাব্য চর্চায় মনোনিবেশ করলেন। পত্র আদান-প্রদানের মাধমে তিনি আলীশের নবাইর সাথ সুসম্পর্ক গঢ়ে তুলতে সচেষ্ট হলেন।
কয়েকদিন আগে বাবর আলীশের নবাইর কাছে পত্র লিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু তিনি পত্রটা সম্পূর্ণ করতে পারেন নি। সেজন্য তিনি সেদিন পত্র লিখা সম্পূর্ণ করার মানস নিয়ে লাইব্রেরীর দিকে যাচ্ছিলেন।
লাইব্রেরী যাওয়ার পথে ভগ্নী খানজাদা বেগম তাঁকে সাক্ষাত করে বললেন- ভাই, হিরাত থেকে পত্র আসার কথা সত্যি নাকি?
বাবর থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন- হ্যাঁ সত্যি। আলীশের নবাই আমার সফলতার জন্য প্রশংসা পত্র প্রেরণ করেছেন।
আলীশের নবাইর পত্র আসার কথা শুনে খানজাদা বেগম প্রসন্নতা প্রকাশ করে বললেন- আলীশের নবাইৰ মতো একজন মহান ব্যক্তি আপনাকে প্রশংসা পত্র প্রেরণ করার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
প্রশংসার নম্রতায় বাবর প্রসন্ন হয়ে উঠলেন। খানজাদা বেগমের কাছ থেকে আরও অধিক কিছু শুনার আশায় তিনি মৌন হয়ে রইলেন। কিন্তু খানজাদা বেগম কিছু বললেন না। উদাসভাবে বসে রইলেন। আসলে তিনি বাবরের কাছ থেকে বিশেষ মহত্ত্বপূর্ণ কিছু সমাচার শুনার আশায় মনে মনে ছিলেন। এই বিশেষ মহত্ত্বপূর্ণ সমাচারের আড়ালের ব্যক্তিটি ছিলো ফজিলুদ্দিন। ফজিলুদ্দিন বর্তমান হিরাতে আছেন। কিন্তু খানজাদা বেগম ভ্রাতৃর কাছে কথাটা জিজ্ঞাসা করতে লজ্জাবোধ করে বিষণ্ন হয়ে উঠলেন এবং নীরবতা অবলম্বন করলেন।
বাবর হতাশভাবে ভগ্নীর দিকে তাকালেন। তিনি অনুভব করলেন, ভগ্নীর চোখেমুখে যেন বিষণ্ন মৌন বেদনার অভিব্যক্তি ফুটে
উঠেছে। ভগ্নীর হৃদয় যেন কোনো এক গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন। কিন্তু কী সেই বেদনা বাবর উপলব্ধি করতে পারলেন না। এক মুহূর্তের জন্য তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রইলেন। পরের মুহূর্তে তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন- আপাজান, লাইব্রেরীতে চলুন। আমি আপনাকে হিরাত থেকে আসা পত্রটি দেখাব।
উভয় লাইব্রেরীতে এলেন। বাবর আলীশের নবাই তাঁরজন্য লিখা পত্রটি ভগ্নীর হাতে দিয়ে বললেন- আপাজান, এটাই সেই পত্র।
খানজাদা বেগম সভ্রম সহকারে পত্রটি হাতে নিয়ে মনযোগ সহকারে পড়তে লাগলেন। পত্রটিতে বাবরের প্রশংসার সাথে হিরাতের বিশিষ্ট ব্যক্তি কয়েকজনের কুশল সংবাদ লেখা ছিলো। খানজাদা বেগম আশা করা মতেই পত্রের শেষে ফজিলুদ্দিনের বিষয়ে লেখা ছিলো। ফজিলুদ্দিনের বিষয়ে লেখা কথাটুকু পড়ে খানজাদা বেগমের চোখ জলে ছলছল করতে লাগলো।
ভগ্নীর চোখে জল দেখে বাবরের হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। তিনি ভগ্নীকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন- আপনার চোখে জল কেন, আপাজান? আমি তো আপনাকে সব সময় আনন্দিত দেখতে চাই।
বাবরের প্রশ্নের উত্তরে খানজাদা বেগম কিছু বললেন না। তিনি অশ্রুসজল নয়নে ভ্রাতৃর দিকে তাকিয়ে মাথা নত করলেন।
ভগ্নীর চোখের জলের কারণ যে ফজিলুদ্দিন এ কথা উপলব্ধি করতে বাবরের অসুবিধা হল না। খানজাদা বেগম যে ফজিলুদ্দিনকে ভালবাসে এ কথা বাবর কিছু পরিমাণে অবগত।
আহম্মদ তনয়াল মির্জা জাহাঙ্গীরের হয়ে আন্দিজানের উপরে আক্রমণ সংঘটিত করার সময়ে খানজাদা বেগমের হয়ে প্রতিবাদ করার জন্য আক্রোশবশতঃ তনয়াল ফজিলুদ্দিনকে বন্দি করার কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। তনয়ালের সেই আক্রোশের কারণ ছিলো খানজাদা বেগম। কারণ তনয়াল খানজাদা বেগম ও ফজিলুদ্দিনের প্রেমের কথা অবগত ছিলো। এদিকে তনয়াল নিজেও খানজাদা বেগমের প্রতি আসক্ত ছিলো। খানজাদা বেগমকে সে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাবও দিয়েছিলো। তবে খানজাদা বেগম সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন। ফলে খানজাদা বেগমের প্রতি তনয়াল মনে মনে বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলো। খানজাদা বেগম তনয়ালের প্রস্তাব প্রত্যাখানের মূলে যে ফজিলুদ্দিন ছিলো এ কথা তনয়াল অবগত ছিলো। ফলে তনয়াল ফজিলুদ্দিনের প্রতিও বিদ্বেষী হয়ে উঠেছিলো। সেই বিদ্বেষ চরিতার্থ করার জন্যই তনয়াল ফজিলুদ্দিনকে বন্দি করেছিলো। হয়তো সুযোগ বুঝে ফজিলুদ্দিনকে হত্যাই করত। কিন্তু খাজা আবদুল্ল্যাহ এবং তাহিরজানের তৎপরতার জন্য ফজিলুদ্দিন প্রাণ নিয়ে হিরাত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বর্তমান ফজিলুদ্দিন হিরাতে আলীশের নবাইর নিকটে আছেন। হিরাত যাওয়ার পরে ফজিলুদ্দিন এবং খানজাদা বেগমের সাথে দেখা সাক্ষাত তো দূরের কথা কোনো রকমের যোগাযোগও ছিল না উভয়ের সাথে। সেজন্য হিরাত থেকে পত্র আসার কথা শুনে পত্রটিতে ফজিলুদ্দিনের কুশল সংবাদ লেখা থাকতে পারে বলে খানজাদা বেগম একপ্রকার নিশ্চিত ছিলেন। সেজন্যই তিনি পত্রটি পড়তে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ভাবা মতেই পত্রটিতে ফজিলুদ্দিনের কুশল সংবাদ লেখা ছিলো। ফজিলুদ্দিনের কুশল সংবাদ পেয়ে তিনি উৎফুল্লিত হয়ে উঠলেন এবং অনেক দিনের সঞ্চিত আবেগ চোখের জল হয়ে তাঁর অজ্ঞাতেই বেরিয়ে এলো। কিন্তু তিনি বাবরের সন্মুখে এই দুর্বলতার কথা প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করছিলেন। প্রকৃতার্থে প্রকাশ করা সম্ভবো ছিলো না।
সেজন্য খানজাদা বেগম নিজের দুর্বলতা লুকোতে তারাতারি নিজেকে সামলে নিয়ে চোখের জল মুছে বললেন- এই চোখের জল আনন্দের জল, ভাই। আপনার খ্যাতি দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ার জন্য আমি আনন্দিত। আপনাকে আমি শুভ কামনা জানাচ্ছি।
ফজিলুদ্দিনের বিষয়ে লেখা কথাটুকুই যে ভগ্নীর চোখের জলের কারণ এ কথা উপলব্ধি করতে বাবরের অসুবিধা হলো না। তবে তিনি সরাসরি কথাটা প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করলেন। সেজন্য তিনি পাকেপ্রকারে তাঁদের ভালবাসার প্রতি সন্মতি তাঁর সন্মতি থাকা কথাটা প্রতিপন্ন করতে এবং ভগ্নীকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন- আপনি আনন্দিত থাকাটা আমি মনেপ্রাণে কামনা করি। আপনার সন্তুষ্টির জন্য আমি যেকোনো প্রকারে সহায় করতে প্রস্তুত।
কিন্তু কী করবেন! আপনার ভগ্নী যে অভাগিনী।
কিন্তু আপনার ভ্রাতৃ তো সবার উপরে বিজয় সাব্যস্ত করার ক্ষমতা রাখে! বাবর প্রতিটি কথা হাসি তামাশার রূপ দিতে যত্ন করছিলেন। সেজন্য তিনি কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে ভগ্নীকে আশ্বাস দেওয়ার জন্য বললেন- আমি আপনাকে সর্বপ্রকারে সহায় করতে প্রস্তুত।
আমার জন্য আপনি অনেক যাতনা সহ্য করতে হয়েছে। সেবার আমি আহম্মদ তনয়ালকে বিয়ে করতে সম্মত হলে হয়তো সে আপনার শত্রু হত না।
খানজাদা বেগমের এই দ্বিধাহীন স্বীকারোক্তিতে বাবর অভিভূত হয়ে পড়লেন। তাঁর অন্তরে ভগ্নীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি উথলে উঠলো। ভগ্নীয়ে বলা কথা অবশ্যেই সত্য। খানজাদা বেগম তনয়ালের প্রস্তাবে সম্মত হলে অবশ্যেই তনয়াল তাঁর বিরোধিতা করত না। কণ্টকহীনভাবে তিনি রাজত্ব করতে পারতেন। এতে অবশ্যে কারো দ্বিমত থাকার কথ নয়। কিন্তু ভগ্নী তনয়ালের প্রস্তাবে সন্মত হলে ভগ্নীর থেকে তিনি-ই দুঃখ পেতেন সবচেয়ে বেশি। তনয়ালের মতো একজন নিষ্ঠুর, স্বার্থপর লোককে ভগ্নীর স্বামী হিসাবে তিনি মেনে নিতে কষ্ট পেতন। খানজাদা বেগম এবং তিনি একই মাতৃর গর্ভজাত। সেই হিসাবে খানজাদা বেগমের মতো আপন এই সংসারে তাঁর অন্য কেউ নেই। সেজন্য ভগ্নীকে সুখী করার জন্য তিনি যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে সর্বদা প্রস্তুত।
বাবর জানে, খানজাদা বেগম তাঁকে একজন মহান ও বিখ্যাত শাসক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা মনেপ্রাণে কামনা করেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরাঁ বিরাট বিরাট মহৎ সৌধ নির্মাণ করে গেছেন। সেগুলো এখন সদম্ভে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে তাঁদের গুণ গরিমা ও কীর্তি প্রকাশকরতেছে। খানজাদা বেগম একজন শিল্পপ্রিয় মহিলা। তিনি বাবরকে পূর্বপুরুষদের মতো সৌধ, শিক্ষানুষ্ঠান প্রভৃতি নির্মাণ করে কীর্তিমন্ত শাসক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা কামনা করেন। মৃত্যুর পরেও যাতে সেইসব কর্মরাজির কীর্তিগাঁথাই বাবরকে যুগ যুগ অমর করে রাখে। তিনি জানেন, একজন শিল্পী হাজারজন শাসকের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। শিল্পী একজন মৃত্যুর পরেও তাঁর শিল্পকর্মের মাঝে অমরহয়ে থাকে। বাবর জানেন, তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর ভগ্নী তাঁকে শিল্পকর্মের মাঝে অমর হয়ে থাকাটা কামনা করেন।
সেজন্য বাবর খানজাদা বেগমকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন- আপাজান, তনয়াল শুধু আপনার জন্যই আমার শত্রু হয়নি। আসলে তার রক্তে মিশে রয়েছে পাশবিক প্রবৃত্তি। সাপ সব সময় সাপই। সাপকে যতই দুধ খাওয়ান না কেন, সে কখনও ধ্বংসাত্মক কার্য থেকে নিরস্ত হয় না।
আমি কৃতজ্ঞ, বাবরজান। খানজাদা বেগম সন্তুষ্ট হয়ে আবেগে মাতৃর মতো বাবরজান বলে সম্বোধন করলেন। কারণ মাতৃ বাবরকে কখনও কখনও বাবরজান বলে সম্বোধন করেন।
আলীশের নবাই মহৎ এবং কীর্তিমান কাজ করার জন্য আমাকে উপদেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন। বাবরের কন্ঠস্বর আবার কৌতুকবহ হয়ে উঠলেন- আমরাও মাউরা উন্নহর এবং খোরাসানের সৌধের চেয়েও অধিক গৌরবময় সৌধ নির্মাণ করব। সেগুলো নির্মাণের দায়িত্ব ফজিলুদ্দিনের উপরে ন্যস্ত করা হবে। কারণ সেসব কাজের জন্য ফজিলুদ্দিন সবার থেকে বেশি উপযুক্ত।
ফজিলুদ্দিনের নাম শুনার সাথে সাথে ভগ্নীর সকল বেদনা দূর হয়ে যাবে বলে বাবর জানেন। সেজন্য তিনি জেনেবুঝে ইচ্ছাকৃতভাবে ফজিলুদ্দিনের নাম উচ্চারণ করলেন।
বাবর ভাবা মতেই হলো। ফজিলুদ্দিনের নাম শুনার সাথে সাথে খানজাদা বেগমের চোখেমুখে প্রসন্নতার ঢেউ খেলে গেলো। মেঘমুক্ত চন্দ্রের মতো তাঁর মুখমন্ডল আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সাথে বাবরকে উৎসাহিত করতে বললেন- আমার মতে, আপনি মাউরা উন্নহরের আকাশে দীপ্তিমান নক্ষত্রের মাঝে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। আপনার জন্য আমরা গৌরাবান্বিত।
আপাজান, আল্লাহর কাছে আপনি এই প্রার্থনা করুন, যাতে আমি শৈবানি খাঁকে আমাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হতে পারি। আল্লাহ যেন অতিশীঘ্রে আমাদের শান্তির নিশ্বাস নিতে শক্তি দেন। শৈবানি খাঁকে আমাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে পারলেই আমি আপনার আকাংক্ষা পূরণ করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করব। বাবর এভাবে বলেই উশ-এ নির্মিত মসজিদের কথা মনে করিয়ে দিলেন- আপনার মনে পড়ছে নাকি আপাজান, উশে আমরা এরকম কাজ কীভাবে শুরু করেছিলাম?
বাবরের কথায় খানজাদা বেগমের স্মৃতিপটে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো উশের সেই সোনালী দিনগুলোর প্রতিচ্ছবি। উশে নির্মিত উপাসনা গৃহের শিল্পকর্ম নিরীক্ষণ করে বাবর কীরকম অভিভূত হয়ে পড়ছিলেন। অদূর ভবিষ্যতে তিনি বৃহৎ বৃহৎ সৌধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন খানজাদা বেগম এবং ফজিলুদ্দিনকে। আশ্বাস পেয়ে উভয়ে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিলেন এবং ফজিলুদ্দিন খানজাদা বেগমের সাথে পরামর্শ করে অনেক নক্সাও অঙ্কন করেছিলেন। নক্সাগুলো ফজিলুদ্দিনের কাছে ছিলো যদিও হিরাতে পালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি নক্সাগুলো খানজাদা বেগমকে দেওয়ার জন্য তাহিরজানের হাতে দিয়ে গিয়েছিলেন। নক্সাগুলো এখনও আছেখানজাদা বেগমরে কাছে। তিনি সযত্নে সেগুলো সংরক্ষণ করে রেখেছেন। কিন্তু ভ্রাতৃকে কথাটা বলা উচিত হবে না ভেবে তিনি শুধু বললেন- ভাই, আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য আল্লাহ আপনাকে শক্তি দিন। এর জন্য আমি দিনরাত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করব।
এর পরে ভ্রাতৃ-ভগ্নীদ্বয়ে সৌধ নির্মাণের বিষয়ে অনেক কথা আলোচনা করলেন। খানজাদা বেগম ভ্রাতৃর কাছ থেকে সৌধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি পেয়ে আনন্দ মনে নিজের কক্ষে চলে গেলেন।
খানজাদা বেগম কক্ষ ত্যাগ করে যাওয়ার পরে বাবরের কল্পনা বিলাসী মন কল্পনার রথে চড়ে কল্পলোকে বিচরণ করতে লাগলো। কাগজ কলম নিয়ে বসে অসম্পূর্ণ গজল একটি সম্পূর্ণ করতে তিনি গভীরভাবে মনোনিবেশ করলেন।
*
* *
শৈবানি খাঁ উঁচু টিলা একটির উপরে দাঁড়িয়ে সেনাদের যুদ্ধাভ্যাস প্রত্যক্ষ করছিলেন। তাঁর চোখ সেনাদের উপরে নিবদ্ধ হয়ে ছিলো যদিও মনের মাঝে ধূমায়িত হচ্ছিলো বিদ্বেষ আক্রোশের ধূম্রজাল। মনের চিন্তাধারা সাপের মতো একেঁবেঁকে পথে চলতেছিলো এবং ব্যস্ত হয়েছিলো কূটকৌশল রচনায়। চোখে জ্বলছিলো প্রতিহিংসার আগুন... হৃদয়ে পাক খাচ্ছিল বিদ্বেষের ঝঞ্ঝা।
শৈবানি খাঁ বৰ্তমান এক গভীর সংকটময় পরিস্থিতর করাল গ্রাসে পতিত। অদৃষ্টের নির্মম পরিহাসে তাঁর মান-সন্মান, যশ, খ্যাতি বর্তমান ভূলুণ্ঠিত।
শৈবানি খাঁর প্রায় সব কয়টি দূর্গ বর্তমান বাবরের দখলে। বর্তমান তাঁর দখলে রয়েছে মাত্র দু'টি দূর্গ। বুখারা এবং স্তেপী। বুখারার ভাগ্যও অনিশ্চিত। যেকোনো মুহূর্তে বাবরের হস্তগত হওয়ার সম্ভাবনা।
একমাত্র স্তেপী-ই সুরক্ষিত। তবে, সেখানেও সৈন্য সংখ্যা সীমিত। কারণ শৈবানি খাঁ বর্তমান সমরকন্দ আক্রমণের আশায় অধিক সংখ্যক সেনা নিয়ে দবুসিয়ায় ছাউনি পেতে রয়েছে। ফলে স্তেপীও সুরক্ষিত বলে জোর দিয়ে বলা যায় না। সেজন্য বেগবর্গ সমরকন্দ আক্রমণের যোজনা ত্যাগ করে স্তেপী চলে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিতেছে। কারণ স্তেপী শত্রুর হস্তগত হলে তাঁদের দাঁড়ানোর জায়গা পর্যন্ত থাকবে না। শৈবানি খাঁ কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল। দবুসিয়া দূর্গ দখলের পরে তাঁর মনোবল অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিজের ভাগ্যের উপরেও তাঁর বিশ্বাস জন্মেছে। সমরকন্দ দখল করতে সক্ষম হবেন বলে বর্তমান তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস। সেজন্য তাঁর সকল ধ্যান- ধারণা, চিন্তা-চর্চা সমরকন্দকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। সময় যত এগিয়ে চলছে, তাঁর আত্মবিশ্বাসও যেন তত উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শৈবানি খাঁর এই আত্মবিশ্বাসের কারণও রয়েছে। কারণ তিনি গুপ্তচরের মুখে অবগত হয়েছেন যে, বাবর বর্তমান কবিতা এবং পণ্ডিতদের নিয়ে ব্যস্ত। কবি এবং কবিতা নিয়ে ব্যস্ত থাকার ফলে বাবর আসন্ন যুদ্ধের জন্য মনসংযোগ করতে পারেন নি। সর্বোপরি সমরকন্দের অর্থনীতি বর্তমান বিপর্যস্ত। বিগত বছরগুলোতে সমরকন্দের ভাগ্যাকাশে অনেক কয়েকজন শাসকের আবির্ভাব হয়েছে। শাসক পরিবর্তনের সাথে সাথে বয়ে গেছে প্রচণ্ড ঝঞ্ঝার তাওব। ফলে বিপর্যস্ত হয়েছে অর্থনীতি- বেড়েছে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা। সর্বোপরি শৈবানি খাঁ বিশ্বস্ত সূত্রে অবগত হয়েছেন যে, সমরকন্দে বর্তমান মহামারির তাণ্ডব শুরু হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে শুরু হবে ক্ষুধার তাণ্ডব— অনাহার- অদ্ধাহারে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে শত শত মানুষ। কথাটা ভাবতেই আসন্ন বিজয়ের আনন্দে শৈবানি খাঁর ওঠের কোনায় ক্রুর হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
বাবর একজন সাহসী এবং বিচক্ষণ যোদ্ধা। তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হলে সুশিক্ষিত সহনশীল তেজী ঘোড়ার সাথে অসীম সাহসী ধৈর্যশীল সুশিক্ষিত অশ্বারোহীর প্রয়োজন। না হলে যুদ্ধ জয়ের আশা বৃথা ।
টিলার পাদদেশে বর্তমান যে যুদ্ধাভ্যাস অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেটা আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতি উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সুপরিকল্পিত যুদ্ধাভ্যাস মাত্র। অনেকদিন থেকে এই যুদ্ধাভ্যাস অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কয়েকদিন আগে শৈবানি খাঁ এই কঠোর যুদ্ধাভ্যাসের ফল লাভ করতেও সক্ষম হয়েছেন। তাঁর বিপর্যস্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে বয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে বিজয় বার্তা।
বিজয় যাত্রার প্রস্তুতি হিসাবে কয়েকদিন আগে শৈবানি খাঁ দবুসিয়া দূর্গ আক্রমণ করেছিলেন এবং সেই আক্রমণের সুফলো তিনি লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন। বাবর গত শীতের মরশুমে তাঁর কাছ থেকে দবুসিয়া দূর্গ কেড়ে নিয়েছিলেন। বর্তমান সেই দূর্গ শৈবানি খাঁর দখলে। দুর্দিনের সময় তাঁর জন্য এ এক বিরাট সাফল্য।
শৈবানি খাঁর আত্মসন্তুষ্টির জন্যেই বাবর দূর্গটা দখল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। দুবুসিয়া দূর্গ বুখারার মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। বসন্ত ঋতুর নির্মল আকাশের নিচে দবুসিয়া দূর্গটা শৈবানি খাঁর মনে মানব নির্মিত প্রাচীরের মতো সুরক্ষিত মনে হয়েছিলো। তিনি ভেবেছিলেন, বাবরের বুদ্ধি এবং সেনাবল যতই শক্তিশালী হোক না কেন সে দবুসিয়া দূর্গ দখল করাটা সম্ভব হবে না। কিন্তু তাঁর সব ধারণা ভুল প্রতিপন্ন করে গত শীতের মরশুমে বাবর সেনা দূর্গটি দখল করেছিলো। কিন্তু শৈবানি খাঁ প্রথম আক্রমণেই দূৰ্গটা নিজের দখলে আনতে সক্ষম হয়েছেন।
দবুসিয়া দূর্গ দখল করার সময়ে শৈবানি খাঁর সেনারা অসীম বীরত্ব প্রদর্শন করেছে। যার ফলে তাঁর মনোবল বর্তমান তুঙ্গে। শৈবানি খাঁর সেনারা যখন দূর্গটা আক্রমণ করেছিলো, তখন দবুসিয়া দূর্গের সুরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাবর সেনা দূর্গ শিখর থেকে পাথর এবং শর নিক্ষেপ করেছিলো। তেলে আগুন ধরিয়ে শৈবানি খাঁর সেনার উপরে নিক্ষেপ করেছিলো।
ক্ষয়-ক্ষতির প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে শৈবানি খাঁর সুশিক্ষিত ও সাহসী সেনারা মৈ বেয়ে দূর্গ শিখরে উঠে গিয়েছিলো এবং এক সময় বাবর সেনার আক্রমণ শিথিল হয়ে পড়েছিলো। তখন শৈবানি খাঁর কয়েকজন বাছা বাছা সেনা শত্রুসেনার উপরে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। শৈবানি খাঁর সেনার নেতৃত্ব দিচ্ছিলো ভ্রাতৃ সুলতান মাহমুদ এবং খুড়ার ছেলে তৈমূর। সেনারা যখন প্রত্যক্ষ করলো, যে শৈবানি খাঁ নিজের ভ্রাতৃকেও নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। তখন সেনাদের মনোবল দুগুণে বেড়ে গিয়েছিলো এবং প্রচণ্ড গতিতে প্রতিপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। মরণপণ তীব্র আক্রমণের সম্মুখে টিকতে না পেরে প্রতিপক্ষ সেনা ঝরাপাতার মতো দূর্গ শিখরের পরিখায় পড়ে মরছিলো। এদিকে প্রতিপক্ষের সেনার চেয়ে শৈবানি খাঁর সেনা সংখ্যাও অনেক বেশি ছিলো। ফলে শৈবানি খাঁ অতি সহজে দবুসিয়া দূর্গ নিজের দখলে আনতে সক্ষম হয়েছিলো এবং জীবিত সেনাদের শৈবানি খাঁর বিজয়ী সেনারা শৈবানি খাঁর আদেশে নির্বিচারে হত্যা করেছিলো।
দূর্গ আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ জানিয়ে বাবরের কাছে পত্র প্রেরণ করা হয়েছিলো যদিও বাবর সেনা পৌঁছানোর আগেই শৈবানি খাঁ বিজয় উৎসব পালন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
একটার পরে একটা পরাজয়ের পরে শৈবানি খাঁ একবারে হতোদ্যম হয়ে পড়েছিলেন। সেনাদেরও মনোবল ভেঙে গিয়েছিলো। কিন্তু দবুসিয়া দূর্গ বিজয়ের ফলে শৈবানি খাঁ নিজেও অনুপ্রাণিত এবং সেনাদের মনোবলও তুঙ্গে। সেজন্য কঠোর অনুশীলন এবং নবোদ্যমে সমরকন্দ বিজয়ের জন্য প্রস্তুতি চালাতেছে তারা। বাবরের বর্তমান অবস্থান এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পর্কে সংবাদ নিতে সুশিক্ষিত গুপ্তচর নিয়োগ করে সময়ের সংবাদ সময়ে সংগ্রহ করার ব্যবস্থাও করেছে শৈবানি খাঁ। এমন কী কূটনীতির আশ্রয় নিয়ে শৈবানি খাঁ বাবরের দরবারেও কিছুসংখ্যক বাছা বাছা গুপ্তচর নিয়োগ করেছে ইতিমধ্যে।
শৈবানি খাঁ পূর্বে কোনোদিন এভাবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়নি। শুধু সেনাবল দিয়ে বাবরকে পরাজয় করা অসম্ভব। বাবরকে পরাজয় করতে হলে প্রয়োজন হবে সাহসী এবং সুশিক্ষিত সেনা। শুধু সাহসী হলেই হবে না, সেনারা কঠোর পরিশ্রমী এবং মানসিক ভাবেও দৃঢ় হতে হবে। এসব কথা ভেবেই শৈবানি খাঁ এই কঠোর যুদ্ধাভ্যাস চালাচ্ছেন।
বাবরের সাথে যুদ্ধ করা এবং সাহসী সুচতুর বাঘের সাথে যুদ্ধ করা একই কথা। বাবরের বয়স কম, কিন্তু তিনি অসীম সাহসী, উদার ও সৌভাগ্যবান। বাবরের অভিজ্ঞতাও বয়সের তুলনায় অনেক বেশি। বাবর বয়সে নবীন হলেও ধৈর্য, নিষ্ঠা ও বুদ্ধিতে প্রবীণ। বুদ্ধির বলেই মাউরা উন্নহরের প্রতিটা গাঁও এবং সহর বর্তমান বাবরের দখলে।
বেগদের প্রতি শৈবানি খাঁর মোটেই বিশ্বাস নেই। কারণ ধনের বিনিময়ে তাদের কেনা-বেচা করা সম্ভব। যেদিকে শক্তি বেশি সেইদিকে যোগদান করাটা তাদের মজ্জাগত স্বভাব। তারা শুধু অর্থের জন্য লালায়িত। বাজারু মেয়েদের মতো তারা অর্থের বিনিময়ে হাত বদল হয়ে থাকে।
সুলতান আলীর বেশিসংখ্যক বেগই এক সময় শৈবানি খাঁর সাথে হাত মিলিয়ে ছিলো। কিন্তু বাবর সমরকন্দ দখল করার পরে তারা বাবরের সাথে হাত মিলিয়ে তাঁর অধীনে চলে গেছে। সেজন্য শৈবানি খাঁ বেগদের বাজারু মেয়েদের সাথে তুলনা করছেন।
এদিকে বাবরের সৈন্যসংখ্যাও দিনে দিনে বানের জলের মতো বৃদ্ধি হইতেছে। বাবরের চিরশত্রু আহম্মদ তনয়ালও বর্তমান বাবরের প্রতিপত্তি দেখে ভয়ে ত্রস্তমান। সেও বর্তমান দুই শত সেনা দিয়ে তার ভ্রাতৃকে বাবরের সেবার জন্য পাঠিয়েছে। হায় ক্ষমতা! এভাবে যদি বাবরের ক্ষমতা দিন দিন বেড়ে যেতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে বাবরকে পরাভূত করাটা দুরূহ কাজ হবে। সেজন্য বাবরের শক্তি অধিক বাড়তে দেওয়াটা কোনোমতেই উচিত হবে না। অচিরেই তাঁকে দমন করা প্রয়োজন। শুধু সেনাবল দিয়ে নয়, কৌশলগতভাবেও বাবরকে পেছনে ফেলতে হবে। তবেই তো অভীষ্ট সিদ্ধি সম্ভব হবে।
এ সব কথা চিন্তা করেই শৈবানি খাঁ সেনাদের কঠোর অনুশীলন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং নিজে কীভাবে বাবরকে কৌশলগতভাবে পরাজয় করতে পারে সেই কৌশল রচনায় অহোরাত্র ব্যস্ত হয়ে রয়েছেন।
গতকাল আয়েশা বেগম একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছে বলে গুপ্তচর সকলে সংবাদ এনেছে। কন্যা সন্তানের নাম বোলে রেখেছে ফখরুন্নিসা। বাদশাহের প্রথম সন্তান জন্ম হওয়ার আনন্দে সমগ্র সহর বর্তমান উৎসবমুখর। প্রথম পিতৃত্বের আনন্দে বাবর নিজেও সেই আনন্দ উৎসবে যোগদান করেছেন।
শৈবানি খাঁ অনেক ভেবেচিন্তে এটাই যুদ্ধাভিযানের উপযুক্ত অবসর বলে সিদ্ধান্ত নিলেন এবং বেগদের ডেকে এনে তাঁর সিদ্ধান্তের কথা অবগত করলেন- আমরা কালই যুদ্ধ যাত্রা করব। যাত্রার জন্য আয়োজন সম্পূর্ণ করে তুলুন।
সিদ্ধান্ত মর্মে পরের দিন শৈবানি খাঁ বুখারা এবং দবুসিয়া রক্ষার জন্য কিছু সেনা রেখে বাকি সেনা নিয়ে সমরকন্দ অভিমুখে যাত্রা করলেন। যাত্রার আগমুহূর্তে সেনাদের বীরোচিত চিন্তা-ভাবনায় অভ্যস্ত করতে শৈবানি খাঁ বাবরকে একটি পত্র প্রেরণ করলেন। পত্রটি পত্রবাহকের হাতে দেওয়ার আগে তিনি নিজেই সেনাদের পড়ে শুনালেন- ‘বীরে নিজের শক্তি, বল-বিক্রম খোলা প্রান্তরে, সন্মুখ সমরে প্রদর্শন করা উচিত। রুদ্ধদ্বার দূর্গের ভেতরে একজন শিশুও সুরক্ষিতভাবে বসে থাকতে পারে। সেজন্য যদি সাহস আছে, দূর্গ ছেড়ে বেরিয়ে এসে নিজের শক্তির পরীক্ষা দিন।'
পত্রপাঠ শেষ হওয়ার সাথে সাথে শৈবানি খাঁর বিজয় ঘোষণা করে সেনারা সমরকন্দ অভিমুখে যাত্রা আরম্ভ করলো।
যথাসময়ে শৈবানি খাঁর পত্র এসে বাবরের হাতে পড়ল।
পত্র পড়ে বাবরের আত্মসন্মানে আঘাত লাগলো। আগ-পাছ না ভেবে তিনি তারাতারি সিদ্ধান্ত নিয়ে শৈবানি খাঁকে শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিজের বাহিনী নিয়ে দূর্গ থেকে বের হয়ে শৈবানি খাঁর দিকে অগ্রসর হলেন। কিন্তু শৈবানি খাঁর ব্যংগাত্মক আহ্বানে রাগান্বিত হয়ে দূর্গ ছেড়ে বেরিয়ে এলেও শেষ মুহূর্তে তিনি সজাগ হয়ে উঠলেন।
বাবরের সহায়ের জন্য তুর্কিস্থান থেকে একদল সেনা আসার কথা। সেই সেনাদল তখনও এসে পৌঁছোয়নি। সেজন্য শৈবানি খাঁ যতই প্রলোভিত এবং ব্যংগ করুন না কেন, তুর্কিস্থান থেকে সেনা এসে না পৌঁছোনো পর্যন্ত তিনি শৈবানি খাঁকে আক্রমণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে শৈবানি খাঁর ছাউনি থেকে ছয় মাইল দূরে সরেপুলের কাছে জাফরসন নদীর পাড়ে ছাউনি খাড়া করলেন। ছাউনি খাড়া করে তিনি তুর্কিস্থান থেকে সেনা এসে পৌঁছোলে শৈবানি খাঁকে পেছন দিক থেকে আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে যুদ্ধের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ছাউনির চারদিকে গভীর পরিখা খনন করে যাতে শর বেড়া ভেদ করে আসতে না পারে তারজন্য গাছের ডাল-পালা দিয়ে বেড়া দিয়ে ছাউনি সুরক্ষিত করলেন এবং তুর্কিস্থান থেকে সেনা আসার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
বাবরের এই সিদ্ধান্তের কথা শৈবানি খাঁর কানেও পৌঁছোলো। বাবরের সহায়ের জন্য তুর্কিস্থান থেকে সেনা আসার কথা শুনে শৈবানি খাঁ বিচলিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু কয়েকদিন পরে তিনি সংবাদ পেলেন যে সদ্য তুর্কিস্থান থেকে সেনা আসার সম্ভাবনা নেই। সংবাদটা পেয়ে তিনি উৎফুল্লিত ও উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু তাঁর সেই উৎসাহ বেশি সময় স্থায়ী হল না।। পরের মুহূর্তে তিনি অন্য একটি সংবাদ পেয়ে শংকিত হয়ে উঠলেন। তিনি বিশ্বস্তসূত্রে অবগত হলেন যে তর খাঁ নামের একজন বেগ বাবরের সহায়ের জন্য দুই হাজার সেনা নিয়ে সমরকন্দ অভিমুখে যাত্রার আয়োজন করছে এবং সে এক হাজার নতুন সেনা ভর্তি করতেছে। সেনা ভর্তি করা শেষ হলেই সে শীঘ্র সমরকন্দ এসে পৌঁছোবে।
খবর পেয়ে শৈবানি খাঁ সজাগ হয়ে উঠলেন। যত শীঘ্র সম্ভব তিনি যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তর খাঁ এসে পৌঁছোনোর আগে কীভাবে যুদ্ধ শেষ করতে পারে সেই চিন্তায় তিনি বিভোর হয়ে পড়লেন। তাঁর কূটিল মস্তিষ্ক কূটিল চিন্তার আবর্তে ক্রিয়াশীল হয়ে উঠলো।
নানান জল্পনা-কল্পনার পরে শৈবানি খাঁ একটি কৌশল অবলম্বন করলেন। বাবর যাতে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে বাধ্য হয় তারজন্য একদিন গভীর রাতে তিনি একদল বাছা বাছা তীরন্দাজ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে বাবরের ছাউনি ঘেরাও করলেন। তিনি সরাসরিভাবে ছাউনি আক্রমণ না করে রণশিঙা, ঢোল-নাগারার কর্ণভেদি শব্দের মাঝে বাবরের ছাউনির উপরে তীর বর্ষণ করতে লাগলেন। কিন্তু এই আক্রমণের ফলে তিনি বাবর সেনার কোনো ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম হলেন না। শৈবানি খাঁর সেনারা ছাউনির চারদিকে নির্মিত পরিখা অতিক্রম করতে সক্ষম হল না। অবশ্যে পরিখা অতিক্রম করা তাদের উদ্দেশ্যও ছিল না। শৈবানি খাঁর সেনারা পূর্ব পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত অনুসারে দৌড়াদৌড়ির সাথে অপমানসূচক গালাগাল দ্বারা বাবর সেনাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলল- লুকিয়ে আছিস কেন? খোলা প্রান্তরে যুদ্ধ করতে ভয় করছিস নাকি? বাবর ভয়ে কাঁপতেছে নাকি? সাহস আছে যদি বেরিয়ে আয়..….......ইত্যাদি ইত্যাদি অশ্রাব্য ভাষা, গালাগাল দেওয়ার সমান্তরালভাবে তীরবর্ষণ করতে লাগলো।
রাতের অন্ধকারে সাধারণ উপদ্রব মানুষের চেতনায় বিরূপ প্রভাব ফেলে। শত শত অশ্বারোহী ছাউনির চারদিকে চক্রাকারে ঘুরে তীরবর্ষণের সমান্তরালভাবে করা গালাগালের শব্দ তরঙ্গে এক ভয়াবহ আতঙ্কজনক পরিবেশ সৃষ্টি করলো। অশ্বক্ষুরার শব্দ ও হেসা ধ্বনিয়ে আকাশ-বাতাস কম্পিত করে তুলল। নৈঃশব্দের মাঝে কোলাহলমুখর বিকট শব্দ তরঙ্গে রাতের গভীরতা ভয়াল করে তুলল। কাঠ ও ডাল-পালা দ্বারা নির্মিত বেড়ায় অবিরাম তীরবর্ষণের ফলে বাবর সেনা আতঙ্কিত হয়ে উঠল। দৌড়াদৌড়ি এবং আতঙ্কের মাঝে সাধারণ অগ্নিশিখাও ভয়ঙ্কর শিখার মতো প্রতীয়মান হয়। সেজন্য শৈবানি খাঁর সেনারা বাবর সেনাদের অধিক আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলার জন্য ঘোড়াদের খাওয়ানোর জন্য জমা করে রাখা শুষ্ক ঘাসের পুঁজির মাঝে অগ্নি সংযোগ করল। লেলিহান শিখা মেলে অগ্নি জ্বলে উঠলো। পরিখা থেকে কিছু দূরে অবস্থিত খালী তাঁবুগুলোতেও অগ্নি সংযোগ করলো। বিন্দুতে সিন্ধুর মতো রাতের অন্ধকারে সাধারণ অগ্নিশিখাও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে প্রচণ্ড জিহ্বা মেলে দপদপ করে জ্বলতে লাগলো।
বাবর সেনা এই ঝঞ্ঝা সদৃশ আক্রমণে প্রথমাবস্থায় কিছু সন্ত্রাসিত হয়ে উঠছিলো যদিও পরের পর্যায়ে তারা নিজেদের সামলে নিয়ে প্রত্যাক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠলো। বেড়ার ফাঁক দিয়ে প্রতিপক্ষ সেনার উপরে অবিরামভাবে তীর বর্ষণ করতে লাগলো। বাবর সেনারা প্রত্যাক্রমণ করাতে শৈবানি খাঁর সেনারা রণভঙ্গ দিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেলো।
এই যুদ্ধে কোনো পক্ষকে উৎসাহিত করতে পারল না। কিন্তু শৈবানি খাঁর উদ্দেশ্য সফল হলো। তিনি বাবরকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য এই আক্রমণ চালিয়ে ছিলেন এবং তিনি আশা করা মতে উক্ত যোজনায় সফলো হলেন।
শৈবানি খাঁ রণে ভঙ্গ দিয়ে চলে যাওয়ার পরে জ্যোতিষী সাহাবুদ্দিন বাবরের তাঁবুতে এলেন। কয়েকদিন ধরে তিনি বাবরকে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করতে ছিলেন। বাবরকে উৎসাহিত করতে তিনি বলতে ছিলেন যে, বাবরের নক্ষত্র যোগ ভাল। এ সময়ে আক্রমণ করলে তাঁর জয় অনিবার্য। কিন্তু বাবর তাঁর কথায় কান দিচ্ছিলেন না।
সেজন্য সাহাবুদ্দিন শৈবানি খাঁর সেনা চলে যাওয়ার পরে বাবরের তাঁবুতে এসে পুনরায় সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিতে আকাশের দিকে আঙুল তুলে রহস্যময় ভঙ্গীতে অনুচ্চস্বরে বলতে লাগলেন- জাহাপনা, ওই যে দেখুন, আটটা নক্ষত্র একসাথে কীভাবে অবস্থান নিয়েছে। এরকম নক্ষত্র যোগ খুব কমই দেখা যায়। আটটা নক্ষত্র একটা সারিতে অবস্থান নিয়ে কীভাবে জ্বলজ্বল করে জ্বলতেছে! এটা আল্লাহর অনুগ্রহের লক্ষণ। নক্ষত্রের অবস্থানে আপনার জয়ের কথা নিশ্চিত করছে। দেরি করাটা মোটেই উচিত হবে না। দুই তিন দিন অপেক্ষা করলে নক্ষত্র কয়টার মাঝ থেকে কয়েকটা নক্ষত্র শত্রুর দিকে চলে যাবে এবং তখন আপনার যুদ্ধ জয় কঠিন হয়ে পড়বে।
সাহাবুদ্দিনের কথায় বাবর উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ বেগদের ডেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দিলেন। কাশিম বেগ সহরসব্জ থেকে তর খাঁর সেনা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে অনুরোধ করতে লাগলেন। কিন্তু বাবর তাঁর কথা ভ্রূক্ষেপ না করে নিজের মতে অটল হয়ে রইলেন।
পরের দিন সকালে বেগবর্গ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠলেন। অর্ধচন্দ্রখচিত পতাকা উড়িয়ে বাবর বাহিনী সরেপুলের দিকে অগ্রসর হলেন। সাহাবুদ্দিনের উদ্দেশ্য সফল হলো। বাবর বাহিনী সরেপুল অভিমুখে যাত্রারম্ভ করার পরে তিনি শৈবানি খাঁর ছাউনি অভিমুখে অতি গোপনে রওয়ানা হলেন।
সাহাবুদ্দিন প্রকৃতপক্ষে শৈবানি খাঁর গুপ্তচর। বাবর প্রথমবার সমরকন্দ দখল করার সময়ে সাহাবুদ্দিন বাবরেরই অনুগত ছিলো। কিন্তু শৈবানি খাঁ সমরকন্দ দখল করার পরে শৈবানি খাঁর অনুগত হয়ে পড়ছিলেন।
সহানুভূতি, বিশ্বাস, উদারতা বাবরের চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট ছিলো। তাঁর এই উদারতার বিষয়ে সবাই ভালোভাবে অবগত ছিলো। শৈবানি খাঁ নিজেও বাবরের এই সমূহ গুণের বিষয়ে অবগত ছিলেন। সেজন্য শৈবানি খাঁ বাবরের সরল জীবনের মহিমায় উদ্ভাসিত মানবিকতার মাথায় কুঠারাঘাত করতে পশুসূলভ কূটিলতার আশ্রয় নিয়েছিলেন। বাবরের সৈন্যবল, গতিবিধি ও মনোভাবের উপরে নজর রাখার জন্য তিনি নিজের বিশ্বাসী কয়েকজন গুপ্তচর বাবরের দরবারে নিয়োগ করেছিলেন। শৈবানি খাঁর নির্দেশ মতে তারা বাবরের দরবারে এসে শৈবানি খাঁর অমানবিক অবর্ণনীয় অত্যাচারের কল্পিত কাহিনী বলে বাবরের দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলো। বাবর সরল বিশ্বাসে তাদের আশ্রয় প্রদান করে বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করেছিলেন। সাহাবুদ্দিন ছিলো সেই গুপুতচরদেরই একজন।
শৈবানি খাঁ এক সপ্তাহের ভেতরে বাবরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে সাহাবুদ্দিনকে নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়ে ছিলেন। শৈবানি খাঁর নির্দেশ মতেই সাহাবুদ্দিন নক্ষত্রের গতিবিধির কল্পিত কাহিনী বলে বাবরকে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে পাঠালো এবং যোজনা মতেই শৈবানি খাঁর উদ্দেশ্য সফল হলো।
এদিকে ঝঞ্ঝা আক্রমণের রাতে শৈবানি খাঁ সারারাত প্রায় জেগেই কাটিয়ে দিলেন। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে তিনি আধাঘণ্টার জন্য বিছানায় শোয়ে বিশ্রাম নিলেন। বিশ্রামের পরে তিনি বিছানা ত্যাগ করে ঘোড়া ছুটিয়ে টিলার উপরে উঠে এলেন।
টিলার উপর থেকে বাবরের ছাউনি এবং ছাউনিতে যাওয়া রাস্তা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে।
টিলার উপরে উঠে তিনি প্রথমে সহরসব্জ থেকে আসা রাস্তার দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। কিন্তু সহরসব্জ থেকে আসা রাস্তায় কোনো সেনা তাঁর দৃষ্টিগোচর হল না। তিনি গুপ্তচরদের মুখ থেকে জানতে পারছিলেন যে, কাল তাসকন্দের শাসক মহম্মদ খাঁ বাবরকে সহায় করার জন্য তিন চার শত সেনা পাঠিয়েছে। সেনাদল আজ এসে বাবরের সাথে মিলিত হওয়ার কথা।
মোগলদের প্রতি অবশ্যে শৈবানি খাঁর তত ভয় নেই। কারণ মোগল এবং সমরকন্দবাসীর মধ্যে তেমন সদ্ভাব নেই বলে শৈবানি খাঁ ভালোভাবে অবগত। সর্বোপরি আলাদা আলাদা স্থান থেকে আসা মোগলদের সম্বন্ধও খুবই খারাপ বলে তিনি জানতেন।
সেজন্য মহম্মদ খাঁর সেনাদের প্রতি তাঁর কোনো ভয়ের কারণ ছিলো না।
আসন্ন যুদ্ধ
শৈবানি খাঁর ভাগ্য নির্ণায়ক যুদ্ধ। সেজন্য তিনি তাঁর সব প্রকার কৌশল, অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা
এবং অনুভবের সাহায্যে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছেন। বিগত দিনগুলোতে আসন্ন
যুদ্ধের অনুকূল-প্রতিকূল অবস্থা এবং সেনা পরিচালনার কৌশল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ছিলেন।
আক্রমণের সময়ে সূর্য কোনদিকে থাকলে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে থাকবে, কোনদিক থেকে বাতাস বইলে সুবিধা হবে এসব ছোট-খাটো বিষয় নিয়েও তাঁর
চিন্তাভাবনার অন্ত ছিলো না।
শৈবানি খাঁ
সহরসব্জের রাস্তা থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বাবরের ছাউনির দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন।
দৃশ্য দেখে তিনি উৎফুল্লিত হয়ে উঠলেন। তিনি আশা করামতেই বাবর যুদ্ধের জন্য সেনা
সমাবেশ করে থাকা তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো। বাবরের অর্দ্ধচন্দ্রখচিত পতাকা বাতাসে উড়তে
দেখেই তিনি টিলার উপর থেকে নেমে দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে নিজের বাহিনীর কাছে এলেন।
শৈবানি খাঁ
নিজের বাহিনীর কাছে এসেই তরবারির ঝনঝন শব্দের মতো তীক্ষ্ণ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলতে
লাগলেন- আমার প্রিয় সেনাগণ, বর্তমান একমাত্র সৃষ্টিকর্তার বাহিরে আমাদের ত্রাণকর্তা নেই। আমাদের স্বদেশ এখান থেকে অনেক দূরে। যদি শত্রুসেনা আমাদের পরাজয় করে, তাহলে আমরা একটি প্রাণীও প্রাণ নিয়ে স্বদেশে ফিরে যেতে পারব না। সেজন্য
জীবনপণ যুদ্ধ করে হলেও শত্রু সেনাদের পরাজিত করতে হবে। আল্লাহর উপরে আমার ভরসা
রয়েছে। আমরা সবাই আল্লাহর সেনা। জয় আমাদের হবেই।
আল্লাহ
সর্বজ্ঞ, সব আল্লাহর হাতে। আমরা জীবনপণ
করে যুদ্ধ করব। হাজার হাজার সেনার কণ্ঠের সমবেত সুরে আকাশ বাতাস কম্পিত করে তুললো।
পা-য় পা
মিলিয়ে হাজার হাজার সেনা পিপীলিকার মতো সারি বেঁধে বাবরের ছাউনি অভিমুখে অগ্রসর হলো। বাহিনীর শৃংখলা দেখে অনুমান হলো যেন হাজার হাজার সেনা এক দেহে বিলীন
হয়ে গেছে।
শৈবানি খাঁ
বাহিনীর বামদিকে জাফরসন নদী। শৈবানি খাঁ তাঁর সেনাদের গতি কিছু তেরছা করে ডানদিকের
সেনাদের দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে নির্দেশ
দিলেন। ডানদিকে জমি ঢালু ছিলো এবং পেছন দিক থেকে বাতাস বইছিল। ফলে ডানদিকের সেনা নির্দেশ অনুসারে কম সময়ের ভেতরে বামদিকের সেনার
চেয়ে এগিয়ে যেতে সক্ষম হলো।
শৈবানি খাঁ
বাবর সেনাদের চারদিক থেকে ঘেরাও করার উদ্দেশ্যে ডানদিকের অশ্বারোহী সেনাদের বিজুলি
সঞ্চারে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ অনুসারে অশ্বারোহী সেনা এগিয়ে গেলো।
বাবরও প্রতিপক্ষ
সেনার গতিবিধি তির্যকভাবে লক্ষ্য করছিলেন। তিনি প্রতিপক্ষ বাহিনীর বামদিকের সেনার
চেয়ে ডানদিকের সেনা দ্রুত গতিতে এগোতে দেখে শৈবানি খাঁর রণকৌশল অনুধাবন করতে
গভীরভাবে মনসংযোগ করলেন। ডানদিকের সেনা বামদিকের সেনার চেয়ে অনেক এগোনোর পরে
বামদিকের সেনাদের একটু বামদিকে ঘুরতে দেখে প্রতিপক্ষ সেনার রণকৌশল সম্পর্কে তিনি
বুঝে উঠলেন। প্রতিপক্ষ বাহিনী যে তাঁর বাহিনীকে চারদিক থেকে ঘেরে ধরার জন্য জাল
বিস্তার করছে সেই কথা উপলব্ধি করতে তাঁর দেরি হল না। তিনি প্রতিপক্ষ সেনার
বিরুদ্ধে সন্মুখ সমরে অবতীর্ণ না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং নিজের বাহিনীর ডানদিকের
সেনাদের নদীর দিকে পিঠ দিয়ে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন।
শৈবানি খাঁর
সেনা দ্রুত এগিয়ে আসছিলো। বাছা বাছা দেহরক্ষী এবং কিছু বিশ্বস্ত সেনা নিয়ে
শৈবানি খাঁ অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে উভয় পক্ষের সেনাদের গতিবিধি
নিরীক্ষণ করছিলেন। শৈবানি খাঁর সেনা ডের মাইল দূরে থাকতেই বাবরও শৈবানি খাঁর মতো একটু
উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁর পেছনে উদীয়মান সূর্যের কিরণ জাফরসন নদীর জলে
পড়ে ঝলমল করতে ছিলো। কিন্তু বাবরের তখন প্রকৃতির সেই অনিন্দ্য সৌন্দর্য উপভোগ করা
মন বা মানসিকতা কোনোটাই ছিল না। তাঁর হৃদয় তখন আসন্ন যুদ্ধের জয় পরাজয়ের
সংঘাতমুখর উত্তেজনায় প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত হচ্ছিলো। অনিশ্চিত ফলাফলের দুঃশ্চিন্তাই
তার দেহ মন তখন পাষাণ পিষ্টের মতো পিষ্ট করছিলো। কে পড়বে জয়মাল্য? বাবর, না শৈবানি খাঁ? এই প্রশ্নের উত্তর ছিলো তখন অনিশ্চয়তার গর্ভে।
বাবরের অশ্বারোহী সেনার চেয়ে শৈবানি খাঁর অশ্বারোহী সেনা অনেক বেশি ছিলো।
বাবরের বাহিনীতে ফার্সি তরবারি, উঁচু ঢাল এবং বর্শাধারী পদাতিক সেনা সংখ্যা অধিক ছিলো। অবশ্যে শৈবানি খাঁর অশ্বারোহী সেনার জন্য বাবরের পদাতিক বাহিনীর উঁচু ঢাল, ফার্সি তরবারি এবং বর্শাধারী সেনার ব্যূহভেদ করাটা সহজ কাজ ছিল না। তবে শৈবানি খাঁর অশ্বারোহী সেনা বাবরের পদাতিক সেনার চেয়ে গতিতে অনেক এগিয়ে ছিলো। যারজন্য ব্যূহভেদ করাটা অসম্ভবও ছিল না।
বাবরের পদাতিক সেনার আধিক্য দেখে শৈবানি খাঁর অশ্বারোহী বাহিনী দ্রুত তরবারি সঞ্চালন করে-- তীর, বর্শা, তরবারি থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রেখে বাবরের পদাতিক সেনার মাঝে প্রবেশ করে আঘাত করার জন্য লক্ষ্যস্থির করে দ্রুত এগোতে লাগলো।
বাবরের পদাতিক সেনা থেকে আধা মাইল দূরে থাকতেই মাহমুদ সুলতান, জানিবেগ এবং তৈমূর সুলতান শৈবানি খাঁর নির্দেশ মর্মে নিজের নিজের অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে বাবর সেনার মধ্যভাগ এবং বামদিকের সেনা এড়িয়ে হঠাৎ ডানদিকে ঘুরে দ্রুত এগোতে লাগলো। শৈবানি খাঁ স্বয়ং তীরন্দাজ সেনা নিয়ে প্রতিপক্ষের মধ্যভাগ থেকে দূরে অবস্থান নিয়ে বামদিক লক্ষ্য করে দ্রুত এগোতে লাগলেন।
বাবর নিজের বাহিনীর সবচেয়ে সুশিক্ষিত এবং শক্তিশালী সেনা বাহিনীর মধ্যভাগে রেখেছিলেন। কিন্তু প্রতিপক্ষ বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করে তিনি মধ্যভাগের সেনা দুই ভাগে বিভক্ত করে এক ভাগ বামদিকে এবং অন্যভাগ ডানদিকে পাঠাতে বাধ্য হলেন। এই কাজ অতি দ্রুত করতে হলো। শৈবানি খাঁর সেনা মধ্যভাগে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছিলো। সেজন্য বাবর সেনা প্রথমে প্রতিপক্ষের মধ্যভাগে আক্রমণ করলো। এভাবে আক্রমণের ফলে তারা কিছু আশাব্যঞ্জক সফলতাও লাভ করলো।
তবে একটু পরেই বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। কে শত্রু, কেন মিত্র উভয় পক্ষের জন্য চিনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়লো। জয় পরাজয় তখন পারদর্শিতার চেয়ে ক্ষিপ্রতার উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়লো। যে পক্ষের আক্রমণের গতি ক্ষিপ্রতর হবে সেই পক্ষেরই জয় সুনিশ্চিত হবে। আকস্মিকভাবে এ রকম পরিস্থিতি উদ্ভব হলো।
বাবর সেনা ক্ষিপ্রতায় শৈবানি খাঁর সেনা থেকে পেছনে পড়ে গেলো। বাবরের অশ্বারোহী সেনা শৈবানি খাঁর অশ্বারোহী সেনাদের ডানদিক বা বামদিক কোনো দিকে বাধা দিয়ে রাখতে পারল না। মাহমুদ সুলতান বাবর বাহিনীর পেছন দিকে যেতে সক্ষম হলো। হামজাহ সুলতানের অশ্বারোহীরা বাবরের দুই দিকের বাহিনী পেছনে ফেলে মাহমুদ সুলতানের সাথে মিলিত হলো। পেছন দিক থেকে সংঘটিত অপ্রত্যাশিত আক্রমণের ফলে বাবর বাহিনীর মাঝে হুলস্থূল লেগে গেলো। বাবর নিজের বাছা বাছা সৈন্য একত্রিত করে বিশৃংখল পরিস্থিতি থেকে অগ্নিশিখার মতো বেরিয়ে এসে শৈবানি খাঁর স্তেপীবাসী সেনার ব্যূহ ভেদ করে বিজুলি সঞ্চারে শৈবানি খাঁর দিকে এগোতে লাগলেন। বাবর বাহিনীর এই আক্রমণ ছিলো অতি ধ্বংসাত্মক।
বাবরকে শৈবানি খাঁর দিকে ধাবিত হতে দেখে কোপেকবে’র অশ্বারোহী সেনা শৈবানি খাঁকে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করতে বাবর সেনার পশ্চাদধাবন করলো। কিন্তু বাবর সেনার অন্য একটি দল এসে কোপেক বে’র সেনাদের বাধা প্রদান করলো। সেই বাধা অতিক্রম করে কোপেক বে’র সেনা শৈবানি খাঁর নিকট পৌঁছোনোর আগেই বাবর সেনা শৈবানি খাঁকে ঘিরে ফেললো। তাঁরা শৈবানি খাঁর সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা সেনাদের নিমিষের মধ্যে তছনছ করে ফেললো।
শৈবানি খাঁর দেহরক্ষী সর্দার ভয়ে সন্ত্রাসিত হয়ে শৈবানি খাঁকে কাকূতি-মিনতি করতে লাগলো- জাহাপনা, সময় থাকতে আমরা এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া উচিত হবে।
শৈবানি খাঁর মুখমণ্ডল ভয়ে মলিন হয়ে উঠলো। অন্তরাত্মা আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠলো। তাঁর সকল কাঠিন্য ও দৃঢ়তা কর্পূরের মতো উড়ে গেলো। শৈবানি খাঁর নিজেরও পিছিয়ে যেতে ইচ্ছে হলো।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই শৈবানি খাঁ নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি ভাবলেন, এই জটিল পরিস্থিতিতে পিছিয়ে গেলে সেনারা তাদের বাদশাহের পতাকা না দেখে তছনছ হয়ে যাবে। তখন সেটা হবে পরাজয়ের পূর্ব লক্ষণ।
সেজন্য শৈবানি খাঁ ভয়-শংকা ঝেড়ে ফেলে নিজের বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বলতে লাগলেন- প্রয়োজন হলে যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দেব, তবুও পিছিয়ে যাবো না। এভাবে বলে তিনি বাছা বাছা সেনাদের নির্মম আদেশ দিলেন- যাও, সবাই একত্রিত হয়ে শত্রুসেনাদের বাধা প্রদান কর। মরলে মরবে, তবুও বাধা দাও।
শৈবানি খাঁর অন্তিম আশা ছিলো তাঁর একশ জনের ছোট দল একটার উপরে। শৈবানি খাঁর আদেশ পেয়ে তারা পরাজয়ের সন্মুখীন হয়েও প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে পড়লো এবং মরণপণ করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করতে এগিয়ে এলো। বাবর সেনার আক্রমণের ফলে তাদের কয়েকজন সেনা মাত্র জীবিত রইলো। বাকি সব যুদ্ধে নিহত হলো।
ইতিমধ্যে কোপেক বে'র সেনা এসে সেখানে পৌঁছোল। তার চার শত সেনা বাবর সেনাদের ঘিরে ফেললো। বাবরের অতি তেজী বিশজন অশ্বারোহী কেপেক বে’ সেনার ব্যূহভেদ করে শৈবানি খাঁর দিকে এগিয়ে আসতে সক্ষম হলো। শৈবানি খাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা একদল সেনা ভয়ে শৈবানি খাঁকে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে পিছিয়ে গেলো। শৈবানি খাঁ মরণপণ করে নিজের স্থানে দাঁড়িয়ে শর নিক্ষেপ করতে লাগলো। সেই শরে কারো কোনো ক্ষয়ক্ষতি করতে না পাড়লেও কোপেক বে’ বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধি করলো। তারা সাহস পেয়ে বাবর সেনার উপরে ঝাঁপিয়ে পরে বাবর সেনাদের একজন একজন করে হত্যা করতে লাগলো।
মুহূর্তের ভেতরে বাবরের পদাতিক সেনা বিশৃংখল হয়ে পড়লো। তারা বাবরের আদেশ পালন করার মানসিক স্থিতিও হারিয়ে ফেললো। প্রাণের ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে লাগলো। পরাজয়ের সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠাতে অনেকে আবার
আরোহীবিহীন ঘোড়া নিয়ে শৈবানি খাঁর দলে যোগদান করতে লাগলো। তাসকন্দ থেকে আসা মোগল
সেনারা এই ক্ষেত্রে আগভাগ নিলো। কিছুসংখ্যক অশ্বারোহী সেনা যুদ্ধের বিশৃংখল
পরিস্থিতিতে শত্রু-মিত্রের চিহ্ন-পরিচয় হারিয়ে নিজের দলের সেনাদের সাথে যুদ্ধে
লিপ্ত হলো। অনেকে আন্দিজানী এবং সমরকন্দী সেনাদের থেকে ঘোড়া কেড়ে নেওয়ার
উদ্দেশ্যে আত্মঘাতী সংগ্রামেও লিপ্ত হলো। অনেকে আবার নিজের সেনাদল থেকে ঘোড়া
কেড়ে নিয়ে শৈাবনি খাঁর দলে যোগদান করতে লাগলো।
ফলে বাবরের সেনাসংখ্যা কমে যেতে লাগলো। অল্পসংখ্যক সেনার মাঝে বাবরকে অরক্ষিত
অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাহমুদ সুলতানের সেনার অগ্রণীভাগ বাবরের দিকে ধেয়ে
এলো।
পরিস্থিতি ঘোরতর দেখে বাবর নিজের সেনা নিয়ে নদীর দিকে নেমে যেতে লাগলেন।
একবার সাপে কামড়ালে তখন কেঁচো দেখেই ভয় করে। শৈবানি খাঁ দূর থেকে বাবরের
গতিবিধি লক্ষ্য করছিলেন। বাবরকে অরক্ষিত অবস্থায় নদীর দিকে নেমে যেতে দেখে তিনি
সজাগ হয়ে উঠলেন। বাবর কোনো নতুন কৌশল প্রয়োগ করার জন্যই নদীর দিকে নেমে যাচ্ছে
ভেবে তিনি নিজের সেনাদের বাবরের পশ্চাদ্ধাবন করতে নির্দেশ দিলেন।
প্রকৃতপক্ষে সেটা বাবরের কোনো রণকৌশল ছিল না। যুদ্ধে পরাজয়ের সম্ভাবনা প্রকট
হয়ে উঠায় তিনি আত্মরক্ষার জন্য পলায়ন করছিলেন।
শত্রুসেনা এগিয়ে আসতে দেখে বাবরের অশ্বারোহী কয়েকজনে বাবরকে পালিয়ে যাওয়ার
সুযোগ করে দেওয়ার জন্য নদীর পাড়ে প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে রইলো।
নদীতে স্বল্প জল ছিলো। বাবর ঘোড়া জলে নামিয়ে যতদূর সম্ভব দ্রুত সেপাড়
অভিমুখে যেতে লাগলেন।
বাবর যে প্রকৃতার্থে পালিয়ে যাচ্ছে এ কথা উপলব্ধি করতে শৈাবনি খাঁর দেরি হল
না। শৈবানি খাঁ উল্লসিত হয়ে উঠলেন। তিনি দুই হাত আকাশের দিকে তুলে আল্লাহকে
কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলতে লাগলেন- তোমাকে ধন্যবাদ, হে আমার আল্লাহ। তোমাকে অনেক অনেক
ধন্যবাদ। এভাবে বলেই তিনি নিজের দেহরক্ষী সেনাদের উদ্দেশ্য করে আদেশ দিলেন- যাও,
তারাতারি যাও। সেনাদের জানিয়ে দাও, বাবরের
মাথা যে এনে দিতে পারবে তাকে বাবরের মাথার সমান ওজনে স্বর্ণ প্রদান করা হবে।
দেহরক্ষী কয়জন আদেশ পেয়ে বাবরের দিকে ধেয়ে গেলো।
শৈবানি খাঁ আনন্দে উন্মাদপ্রায় হয়ে উঠলেন। মুহূর্তে মুহূর্তে তাঁর মনের
স্থিতি পরিবর্তন হতে লাগলো। সেনারা কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পরে তিনি চিল্লায়ে
চিল্লায়ে বলতে লাগলেন- না না, আমার প্রিয় সেনাবর্গ। বাবরকে জীবিত ধরে
আন। যে বাবরকে জীবিত অবস্থায় ধরে আনতে পারবে তাকে বাবরের শরীরের উচ্চতা বরাবর
স্বর্ণের পুঁজি প্রদান করা হবে। যাও, সত্বর যাও। বাবরকে আমার
পা-র তলে দেখতে চাই। শৈবানি খাঁ আকাশের দিকে দুই হাত তুলে মাটির মূর্তির মতো
নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আল্লাহর কাছে কি বলে প্রার্থনা করবে সেই কথাও তিনি
ভুলে গেলেন। আনন্দে তাঁর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। মুচকি হাসি হেসে তিনি
দুই হাত তলের দিকে নামিয়ে এনে হাতের পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছে ফেললেন।
বাবর নদী পার হওয়ার পরে তাঁকে সুরক্ষা দেওয়া সেনারাও নদী পার হলো। নদী পার
হয়ে তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে ঘোড়া ছুটালো। শৈবানি খাঁর কয়েকজন সেনা তাদের পেছনে
পেছনে ধেয়ে এলো।
বাবর সামান্য কয়েকজন সেনা নিয়ে দূর্গে ফিরে এলেন। ইতিমধ্যে বাবরের
অধিকসংখ্যক সেনা শৈবানি খাঁর দলে যোগদান করেছিলো। সেজন্য বাবর অল্প সংখ্যক সেনা
নিয়ে শৈবানি খাঁর বৃহৎ সংখ্যক সেনার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে সরাসরি দূর্গের
ভেতর প্রবেশ করে দূর্গদ্বার বন্ধ করে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন।
বাবরের নির্দেশে দূর্গদ্বার বন্ধ হয়ে গেলো। দূর্গদ্বার বন্ধ হওয়াতে তাঁদের
পেছন পেছন ধেয়ে আসা সেনারা থমকে দাঁড়িয়ে গেলো।
কিছুক্ষণ পরে শৈবানি খাঁ সসৈন্যে এসে দূর্গদ্বারে উপস্থিত হলেন। তবে তিনি দূর্গে প্রবেশর চেষ্টা করলেন না। তিনি বাবরকে হাতে না মেরে ভাতে মারার সিদ্ধান্ত নিলেন।
সিদ্ধান্ত মর্মে শৈবানি খাঁ দূর্গ অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে দূর্গের চারদিকে ছাউনি নির্মাণ করলেন। দূর্গের ভেতর থেকে যাতে একটি প্রাণীও বের হতে না পারে তার প্রতি দৃষ্টি রাখতে তিনি সেনাদের নির্দেশ দিলেন।
সমরকন্দবাসীসহ বাবর দূর্গের ভেতরে বন্দি হয়ে পড়লেন। সরেপুল যুদ্ধের পরাজয়ে বাবরের ভাগ্যাকাশ পুনরায় দুর্যোগের কালো মেঘে ছেয়ে ফেললো। দূর্গবন্দি হয়ে তিনি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে পা বাড়ালেন।
*
* *
সরেপুল যুদ্ধের সাত মাস পরের কথা।
বাবর ‘উলুগ বেগ’ মাদ্রাসার ছাদে বসে সহরের পরিস্থিতি নিরীক্ষণ করছিলেন। ববারের হঠাৎ আস্তাবলের দিকে চোখ গেলো। যে আস্তাবলে শত শত ঘোড়া বাঁধা ছিলো, সেখানে খুব বেশি দশটা ঘোড়া দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর চোখে পড়ল। দৃশ্যটা দেখে বাবরের অন্তরাত্মা হাহাকার করে উঠলো।
সরেপুল যুদ্ধের পরে প্রায় সাত মাস কাল মহাকালের বুকে বিলীন হয়ে গেছে। এই সাতমাস কাল যুদ্ধবন্দি হয়ে দুর্বিসহ জীবন অতিবাহিত করতে হচ্ছে। জনজীবন বিপর্যস্ত-- দুর্ভিক্ষের তাণ্ডবে থাবা মেলে ধরেছে চারদিকে। মানুষগুলো ক্ষুধায় ছট্ফট্ করে মরতেছে। এমনকি রাজকীয় সদস্যরাও ঘোড়ার মাংস খেয়ে জীবন ধারণ করতে হচ্ছে। দুর্ভিক্ষ এমনভাবে গ্রাস করে ফেলেছে যে ঘোড়ার দানা-পানী যোগার করাও বর্তমান কঠিন হয়ে পরেছে।
বাবর মাদ্রাসার ছাদ থেকে তাহিরজান এবং হলুদ গোঁফের মমতকে আস্তাবলে কোনো কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকা প্রত্যক্ষ করলেন।
তাহিরজান সাহসী যুবক। তাহিরজানই বর্তমান বাবরের দেহরক্ষীদের সর্দার। তাহিরজান সাহসী ও বিশ্বাসী। বাবরের প্রতি তার অগাধ ভক্তি।(তাহিরজানের বিষয়ে সময়ে কিছু কথা বলার প্রতিশ্রুতি রইলো পাঠকের কাছে। খুবই মর্মান্তিক তাহিরজানের সেই বিয়োগাত্মক কাহিনী।)
সরেপুলের যুদ্ধের সময়ে বাবরের বাছা বাছা সেনাদের ভেতর তাহিরজানই সবার থেকে বেশি সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শন করে ছিলো। যে কয়জন সেনা নিজের জীবন বিপন্ন করে বাবরকে জাফরসন নদী পার হতে সহায় করেছিলো তাহিরজান ছিলো তাদের অন্যতম। তাহিরের স্ত্রী রাবিয়া বর্তমান কুলতুগ নিগার বেগমের পরিচারিকা। নিজের নিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা এবং কর্মদক্ষতা দিয়ে সে অল্পদিনের ভেতরেই কুলতুগ নিগার বেগমের প্রিয়পাত্রী হয়ে উঠেছে। দুর্ভিক্ষের ফলে অন্নাভাবে কষ্ট পাওয়া দেখে কুলতুগ নিগার বেগম বর্তমান তাকে নিজের সাথে রেখেছেন। রাবিয়ার অতীত ইতিহাস বড় করুণ। দুর্ভাগ্য তাকে আখসি থেকে সমরকন্দ নিয়ে এসেছে। তাহিরজানের বিষয়ে বলার সময়ে রাবিয়ার কথাও প্রকাশ হয়ে পড়বে ঘটনা স্রোতে।
সময় পার হওয়ার সাথে সাথে দুর্ভিক্ষের প্রকোপও বেড়ে যেতে লাগলো। গরিবের কুটির থেকে শুরু হয়ে ক্রমান্বয়ে সেনা, বেগ এবং পরে স্বয়ং বাবরের প্রাসাদেও দুর্ভিক্ষ মুখব্যদন করে এগিয়ে এলো।
বাবর স্মরণ করতে যত্নপর হলেন তিনি কতদিন ধরে রুটি খাননি। আঙুলের মাথায় গোনে গোনে তিনি হিসাব করে দেখলেন। আজ থেকে দশদিন আগে তিনি রুটি খেয়েছিলেন। আটা কবেই শেষ হয়ে গেছে। কোথাও আটা পাওয়া যায়না। এই কয়দিন তাঁকে সোনার থালায় কিসমিস ও সরবত দেওয়া হয়েছে। রাতে দেওয়া হয়েছে উটের শুষ্ক মাংস। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। এক সময়ের বাদশাহ বর্তমান এক টুকরো রুটির জন্য লালায়িত।
এক ঝুড়ি সোনার চেয়েও এখন একটি রুটির মূল্য বেশি। যেখানে রুটি নেই, সেখানে সোনার থালার কী প্রয়োজন? মনের ক্ষুধার চেয়ে দেহের ক্ষুধার প্রয়োজন বেশি। দেহের ক্ষুধা নিবারণ হলেই তো মনের ক্ষুধা উপলব্ধি হয়। সোনা মানুষের দেহের ক্ষুধা নিবারণ করতে পারে না-- মনের ক্ষুধা শুধু নিবারণ করতে পারে। বাবরের ভাবনায় সোনার ভ্রমাত্মক প্রয়োজনের বিষয়ে এক ফাকি কবিতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। কিন্তু পরিস্থিতি এতই সংকটময় ও জটিল যে কবিতা লেখার অবসর বা মন মানসিকতা কোনোটাই তখন তাঁর ছিল না। কবিতাও মনের খোরাক-কবিতারও দেহের ক্ষুধা নিবারণ করার ক্ষমতা নাই। বাবরের বর্তমান দেহের ক্ষুধা নিবারণ করা প্রয়োজন। মনের খোরাকের তাঁর প্রয়োজন নেই।
কয়েকদিন আগে বাবর ক্ষুধার তাড়নায় ছটফটিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরা কলিজার টুকরো ফখরুন্নিসাকে নিজ হাতে মাটি চাপা দিয়ে শোইয়ে রেখে এসেছেন। কিন্তু এখনও সেই ফুলের মতো কোমল নিষ্পাপ ফখরুন্নিসার শুকনো মুখের প্রতিচ্ছবি অবসর সময়ে তাঁর চোখের সন্মুখে ভেসে বেড়ায়। সেই শুকনো মুখের প্রতিচ্ছবি তিনি আজ পর্যন্ত ভুলতে পারেন নি। ফখরুন্নিসার মুখ স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠলেই তাঁর কলিজায় কাঁটার খোচা অনুভব হন-তখন হৃদয় হাহাকার করে উঠে।
সাত মাসের শিশু ফখরুন্নিসা। সেদিন ক্ষুধা পিপাসায় খুবই কাতর হয়ে পড়েছিলো। তার জ্ঞান না থাকলেও উপলব্ধি নিশ্চয় ছিলো। উপলব্ধি তাকে জানিয়ে দিয়েছিলো দেহের ক্ষুধার কথা। ক্ষুধার তাড়নায় সে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাঁদছিলো। এদিকে অনাহার অর্দ্ধাহারে থেকে আয়েশা বেগমের বুকে দুধের লেশমাত্রও ছিল না। সন্তানের মুখে স্তন গুঁজে দিয়ে তিনি মন ভোলাতে চেষ্টা করছিলেন।
মন ভুলিয়ে মনের খোরাক যোগাতে পারলেও দেহের ক্ষুধা নিবারণ করা সম্ভব নয়। সেজন্য বাবর দৃশ্যটা দেখে বিচলিত হয়ে একটি দুগ্ধবতী গাভী যোগার করে এনেছিলেন। গাভীটা যেখান থেকে এনেছিলেন সেখানে কলেরা মহামারি রূপ ধারণ করেছিলো। ফলে সেই গাভীর দুধ খেয়ে ফখরুন্নিসারও একদিন কলেরা হয়। দুই তিনদিন রোগ ভোগের পরে বাবরের চোখের সন্মুখেই ফখরুন্নিসা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। আয়েশা বেগম সন্তানের শোকে উন্মাদপ্রায় হয়ে পড়েছিলেন। নিয়তির বিধান যতই নিষ্ঠুর এবং অপ্রিয় হোক না কেন, সে মেনে নেওয়ার বাইরে অন্য কোনো উপায় নেই। যে যায় সে কখনো ফিরে আসেনা। কাফনাবৃত ফখরুন্নিসার প্রাণহীন দেহ বাবর নিজে দাফন করতে নিয়ে গিয়েছিলেন। চোখের জল মুছে তিনি আপ্লুত কণ্ঠে বলেছিলেন-কলেরা আমাকে মারল না কেন? আমি মরলেই তো সকল দুঃখ-কষ্টের অবসান হয়। এ ভাবে কেঁদে কেঁদে আক্ষেপ করে তিনি মৃত সন্তানের অধরে চুমা খেয়েছিলেন।
চোখের জল মুছে বাবর কবর থেকে উঠে-- তাঁর গর্ব--তাঁর বিজয়ের প্রতীক ফখরুন্নিসাকে মাটি চাপা দিয়েছিলেন। তাঁর তখন অনুভব হয়েছিলো, তিনি যেন নিজের কলিজার টুকরোকে মাটি চাপা দিয়েছিলেন সেদিন।
দূর্গের অভ্যন্তরে দুঃখ-দৈন্যতা যত বাড়ছিলো দূর্গের বাইরে অবস্থানরত শত্রুসেনা তত উল্লসিত হয়ে আনন্দ উৎসব উদযাপন করছিলো।
সাত মাস পর্যন্ত বাবর অসীম ধৈর্য ধারণ করে হিরাতের শাসক খুড়া হোসেন বায়কারা এবং তাসকন্দের শাসক মামা মাহমুদ খাঁর তরফ থেকে সহায় পাওয়ার আশায় দিন যাপন করছিলেন। বাবর তাঁদের নিকট সহায় প্রার্থনা করে পত্রও প্রেরণ করেছিলেন। তবে সকল আশা ভরসা অর্থহীন হয়ে পড়লো। কেউ তাঁকে সহায় করতে এগিয়ে এলেন না। সেজন্য তাঁর নিজের উপরে ভরসার বাহিরে অন্য উপায় ছিল না।
দূর্গের অভ্যন্তরে সংঘটিত হয়ে থাকা দুর্ঘটনার খবর শৈবানি খাঁ নিয়মিতভাবে পাচ্ছিলেন। ফখরুন্নিসার মৃত্যুর খবর পেয়ে শৈবানি খাঁ আনন্দোৎসব পর্যন্ত পালন করছিলেন। বাবরের প্রতিটা দুঃখপ্রদ্ ঘটনাই শৈবানি খাঁর অন্তরে আনন্দের জোয়ার তুলছিলো এবং আনন্দ উল্লাসে তিনি প্রেতের মতো নৃত্য করছিলেন। শত্রু পক্ষের দুর্দশাই প্রতিপক্ষের আনন্দ বর্দ্ধন করে। এ কেমন এক অমানবীয় প্রহসন!
বাবর হোসেন বায়কারা এবং মাহমুদ সুলতানের সহায় পাওয়ার আশা নেই বলে জানতে পেরে শৈবানি খাঁ পাশবিক উল্লাসে নেচে উঠলেন। প্রত্যেক রাতে তাঁর সেনারা ঢোল নাগারা বাজিয়ে সমরকন্দবাসীদের আতঙ্কিত করে তুলতে লাগলো। শৈবানি খাঁর ঘোষকরা দূর্গ দেয়ালের উপরে উঠে সমরকন্দবাসীদের শৈবানি খাঁর সাথে হাত মেলানোর জন্য আহ্বান জানাতে লাগলো। শৈবানি খাঁর সাথে হাত মেলালে পেট পুরে খেতে দেয়ারও প্রলোভন দিতে লাগলো। দুই বেলা দুই মুঠো পেট পুরে খাওয়ার আশায় নিঃসন্দেহে বাবর পক্ষের অনেক বেগ এবং সেনা লুকিয়ে লুকিয়ে শৈবানি খাঁর দলে যোগদান করতে লাগলো।
একদিন বাবরের একজন দেহরক্ষী সর্দার মনে মনে পালিয়ে গিয়ে শৈবানি খাঁর দলে যোগদান করলো। কথাটা শুনে বাবর দুঃখে ম্রিয়মান হয়ে পড়লেন। তিনি এখন কার উপরে বিশ্বাস করবেন? কার উপরে তিনি ভরসা করবেন এই দুর্দিনের সময়ে ? কথাটা ভাবতেই তাঁর তাহিরজানের কথা মনে পড়লো। তাহিরজানের আনুগত্য এবং বিশ্বস্ততার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তিনি তাহিরজানকে বেগ-এর মর্যদা প্রদান করেছেন। তাহির বেগের কথা মনে পড়ার সাথে সাথে বাবর তাঁকে ডেকে পাঠালেন।
তাহিরজান বাবরের নিকট আসার পরে বাবর ভূমিকা দিয়ে শুরু করলেন- তাহির বেগ, আরবি নীতি কথায় আছে, পৃথিবী তোর দিকে পিষ্ঠ প্রদর্শ করার আগেই তুই পৃথিবীর দিকে পিষ্ঠ প্রদর্শন কর। কলেরা আমাকে মেরে নিলে সবারই মঙ্গল হতো। কিন্তু কলেরা আমাকে মারল না।
খোদা আপনাকে সুরক্ষিত রাখুন, জাহাপনা। বর্তমান আমাদের আশা ভরসার স্থল শুধু আপনি-ই। আপনার বাহিরে আমাদের আশা-ভরসার স্থল কে আছে?
তাহির কথা কয়টি খুব কষ্ট করে উচ্চারণ করলো। কারণ খাদ্যাভাবে সে এমন শুকিয়ে গিয়েছিলো যে, তার স্কন্ধ যেন আচকান ভেদ করে বেরিয়ে আসার জন্য বিদ্রোহ করতেছিলো।
সময় পার হয়ে যাইতেছে, তাহির বেগ। বাবর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন- গতকাল আমি এই বয়েত(পংক্তি)টা লেখেছি-
দাবি ধমক দিবেনা যে পৃথিবীতে বাবর জট লাগিয়েছে
এই ভাবুক পৃথিবীতে কষ্টের বাইরে আর কী বাকি রয়েছে?
তাহির বেগ মাথা নুইয়ে বললো- এটা সত্যি, জাহাপনা। বর্তমান আমাদের জীবনে দুঃখের বাইরে কিছুই নেই। কিন্তু জাহাপনা, মাসের পনের দিন আন্ধার এবং পনের দিন জ্যোৎস্না। এখনও আমাদের বাহুতে শক্তি এবং কোমরে তরবারি ঝুলতেছে, জাহাপনা।
তাহলে এখন কী করতে পারি? আমরা এখন চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সমাগত। এখন দেহের সমগ্র শক্তি প্রয়োগ করে শত্রুর ব্যূহ ভেদ করে যাওয়ার বাহিরে অন্য উপায় নেই। এখন পর্যন্ত যদি আমাদের জীবনের অন্তিম ক্ষণ উপস্থিত হয় নাই, তাহলে আমরা শত্রুর ব্যূহ ভেদ করে বেরিয়ে যেতে নিশ্চয় সক্ষম হবো। যদি আমাদের অন্তিম ক্ষণ সমাগত তাহলে তরবারি নিয়েই মরবো।
আল্লাহর ইচ্ছায় নিশ্চয় আমরা ব্যূহ ভেদ করে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হবো, জাহাপনা।
আমাদের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে একমাত্র কাশিম বেগ অবগত। তুমিও এটা গোপনে রেখো। এভাবে বলেই বাবর আবেগিকভাবে বললেন- প্রস্তুত হও দোস্ত, প্রস্তুত হও।
বাবরের ভাগ্যে প্রকৃতপক্ষে মৃত্যু লেখা ছিল না। সেদিন রাতে অবরোধ ভাঙার বিষয়ে কাশিম বেগের সাথে আলোচনা চলে থাকতে কোনো রকমের অগ্রিম সঙ্কেত না দিয়েই মাতৃ কুলতুগ নিগার বেগম এবং মাতামহী এহসান দৌলত বেগম কক্ষের ভেতর প্রবেশ করলেন। এহসান দৌলত বেগম কোনো রকমের ভূমিকা না করে সরাসরি বাবরকে উদ্দেশ্য করে বললেন- শৈবানি খাঁ সন্ধির প্রস্তাব দিয়ে পাঠিয়েছেন, বাবরজান।
সন্ধি! শব্দটা বাবরের নিকট মুক্তির মতই মধুর লাগলো। কিন্তু শৈবানি খাঁর কথা শুনে তাঁর মনে সন্দেহ ঘণীভূত হয়ে উঠলো। শৈবানি খাঁ শান্তিকামী এবং মুক্তিদাতা হতে পারবে কী? বাবর অবিশ্বাসের ভাবে প্রথমে মাতামহী এবং পরে মাতৃর দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন।
এহসান দৌলত বেগমের হাতে একটি রাজকীয় মোহরযুক্ত লেফাফা ছিলো। তিনি লেফাফাটা বাবরকে দেখিয়ে বললেন- এটা শৈবানি খাঁর পইগাম।
কে আনল? বাবর শংকাযুক্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন।
একজন খোদার দরবেশ। দরবেশ জ্ঞানী এবং খাজা ইয়াহিয়ার ভক্ত।
বাবর লেফাফার দিকে কৌতূহল মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন- আপনাকে উদ্দেশ্য করে কিছু লিখেছে নাকি?
না, এহসান দৌলত বেগম লেফাফাটা বাবরের দিকে এগিয়ে ধরে বললেন- এটা খানজাদা বেগমের নামে পাঠিয়েছে।
আচরিত কথা! বাবর অবজ্ঞা সহকারে লেফাফাটা হাতে নিয়ে বিতৃষ্ণা মিশ্রিত দৃষ্টিতে লেফাফাটার দিকে চেয়ে রইলেন।
আমি যা বলতে চাইছি, সেটা আমার জন্য বলাটা অবশ্যে উচিত নয়। এহসান দৌলত বেগম এভাবে বলেই কয়েকটা মুহূর্ত মনে মনে থেকে আবার বললেন- কিন্তু বলাটা জরুরি বলেই বলছি। শৈবানি খাঁ খানজাদা বেগমের রূপগুণের কথা অবগত হয়েই এই পত্রটা পাঠিয়েছেন।
বাবর বিতৃষ্ণা সহকারে লেফাফাটা খুলে পত্রটি বের করে অবজ্ঞা মিশ্রিত দৃষ্টিতে পত্রটির দিকে তাকিয়ে মাতৃ এবং মাতামহীর দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। পরে পত্রের ভাঁজ খুলে খানজাদা বেগমের নিকট প্রেম নিবেদন করে প্রেরণ করা পত্রটির প্রথম পংক্তি পড়েই ঘৃণায় তাঁর নাক কুঞ্চিত হয়ে উঠলো। তিনি প্রচণ্ড ক্ষোভে পত্রটি মেঝেতে ছোঁড়ে ফেলে বলে উঠলেন- এ কখনও সম্ভব নয়। আমি বেঁচে থাকতে আপাজানকে কখনও একজন ঠগ, প্রবঞ্চকের অংকশায়িনী হতে দিব না। এটা আমার প্রতিজ্ঞা।
বাবর কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও নিজের প্রতিজ্ঞা রাখতে পারলেন না। বাবরের সব বাধা নিষেধ লঙ্ঘন করে খানজাদা বেগম নিজে গিয়ে শৈবানি খাঁর তাঁবুতে উপস্থিত হলেন। কারণ তিনি জানতেন যে তিনি যদি শৈবানি খাঁর প্রস্তাবে সম্মত না হোন, আহম্মদ তনয়ালের মতো শৈবানি খাঁও বাবরের প্রতি প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে উঠবে। এই দুর্দিনের সময়ে বাবর কখনও তাঁর প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে সক্ষম হবে না। বাবরকে হত্যা করে হলেও শৈবানি খাঁ তাঁকে অংকশায়িনী করবেই। বাধা দিতে গিয়ে বাবরকে অকালে প্রাণ বলি দিতে হবে। সেজন্য তিনি বাবরকে বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নিয়েই বাবরের অনিচ্ছা সত্ত্বেও শৈবানি খাঁর ছাউনিতে চলে গেলেন।
খানজাদা বেগমের সিদ্ধান্তে বাবর গ্লানি, ক্ষোভ, আক্রোশ, বিতৃষ্ণায় উন্মাদ প্রায় হয়ে উঠলেন। নিরুদ্ধ যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে তিনি দূর্গদ্বার খুলে দিতে নির্দেশ দিলেন- খুলে দাও দূর্গদ্বার। এই পৃথিবীতে কেউ আমার আপন নয়। আমার পক্ষে এখন কাউকে বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। এতো অনুরোধের পরেও আপাজান আমার মান-সন্মান ভূলুণ্ঠিত করে শত্রুর অংকশায়িনী হতে চলে গেলেন। এই পৃথিবীতে কেউ আমার বেদনা উপলব্ধি করতে পারল না। আমি মুহূর্তের জন্যও সমরকন্দে থাকবো না। খুলে দাও দূর্গদ্বার।
বাবরের নির্দেশে দূর্গদ্বার খুলে দেওয়া হলো। বাবর তাঁর বিশ্বাসী বেগ, সৈন্য-সামন্ত, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে খোলা দ্বার দিয়ে দূর্গ থেকে বেরিয়ে এলেন। অনেকেই পরে বলা-কওয়া করছিলো যে, শৈবানি খাঁ নিজেই বাবরকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। যাই হোক না কেন, বাবর নিরাপদেই মাহমুদ খাঁর নিকট আসতে সক্ষম হলেন।
তাসকন্দ আসার পরে বাবর মামার উষ্ম সম্বর্ধনা পাওয়ার পরিবর্তে অবজ্ঞাপূর্ণ ব্যবহার পেলেন। তবুও লজ্জা, অপমান অগ্রাহ্য করে তিনি মামার নিকট সৈন্য সাহায্য প্রার্থনা করলেন। তিনি মামাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে, শৈবানি খাঁ একজন নিষ্ঠুর ও লোভী শাসক। তদুপরি সে মোগলের ঘোর শত্রু। সমগ্র মাউরা উন্নহর থেকে মোগল শাসন উৎখাত করাটাই বর্তমান তাঁর প্রধান ব্রত। সেজন্য অতিসত্বর তাঁকে দমন না করলে অদূর ভবিষ্যতে তাসকন্দের উপরেও আক্রমণ চালানোর সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। মোগলদের সুরক্ষার জন্যই শৈবানি খাঁ অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠার আগেই তাঁকে দমন করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
কিন্তু মাহমুদ খাঁ বাবরের প্রস্তাবে মোটেই গুরুত্ব দিলেন না। তিনি তলে তলে শৈবানি খাঁর সাথে বন্ধুত্ব করার
সিদ্ধান্ত নিলেন।
মাহমুদ খাঁর
দ্বারা প্রত্যাখাত হয়ে বাবর লজ্জা, অপমানে জর্জরিত হয়ে পড়লেন। তাঁর মনে জেগে উঠলো অসহ্যকর
ব্যথার অনুভূতি। নিরুদ্ধ অভিমানে তিনি উরাতেপা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
বাবর একদিন
আয়েশা বেগমের নিকটে এসে উরাতেপা যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানালেন। আয়েশার বড়বোন
রেজিয়াও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আয়েশা বেগম কোনো মন্তব্য করার আগেই রেজিয়া বেগম
প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে হাত নাচিয়ে নাচিয়ে বললেন- আপনারা যেতে চান যদি যেতে
পারেন; কিন্তু আয়েশাকে আপনাদের সাথে
যেতে দেব না। আয়েশা জীবনে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। এর স্বাস্থ্যও এখন পর্যন্ত
সম্পূর্ণভাবে ভালো হয়ে উঠেনি। সেজন্য আমি ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে আয়েশাকে উরাতেপা
যেতে দেব না। বেচেরী আর কত দুর্ভোগ সহ্য করবে?
কিন্তু কী
করব? আমাদের কপালে যে দুভোর্গই লেখা
রয়েছে।
ক্ষমা করবেন, মির্জা। মানুষের ভাগ্য কপালে
লেখা থাকে না-লেখা থাকে মস্তিষ্কে।
তবুও একই
নৌকার যাত্রীর ভাগ্য একই রকম হয়ে থাকে, না কী বলেন?
ভালোই বলছেন, মির্জা। একই ভাগ্য! আয়েশার এই
দুর্ভাগ্যের জন্য আয়েশা দায়ী নয়। দায়ী আপনি। আয়েশার এই দুর্ভাগ্য আপনারই
অবদান। অনাহার, অর্দ্ধাহারে ছটফটিয়ে আয়েশা শুধু হাড় কয়টা
নিয়ে এখানে এসেছে। এখানে আসার পরে স্বাস্থ্য কিছু উন্নত হয়েছে যদিও সম্পূর্ণরূপে
ঠিক হয়ে উঠেনি। স্বাস্থ্য ঠিক হওয়ার পূর্বেই আপনি আবার দুর্ভোগের পথে পা দিতে
বলছেন। এটা কী উচিত হচ্ছে?
রেজিয়া
বেগমের মন্তব্যে বাবর মর্মাহত হলো। শাওন মাসের শস্যক্ষেত্রের মতো তাঁর মন সিক্ত
হয়ে উঠলো। কিন্তু রেজিয়া বেগমের সাথে অধিক যুক্তি-তর্ক করতে তাঁর প্রবৃত্তি হল
না। সেজন্য আয়েশা বেগমকে তাসকন্দে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বললেন- আচ্ছা, আপনার কথাই মানলাম। আয়েশা
বর্তমান এখানেই থাকুক। কখনও যদি আমাদের ভাগ্যাকাশ থেকে দুর্ভাগ্যের কালো মেঘ ঠেলে পাঠাতে
সক্ষম হই, তখন আমার সাথে থাকতে নিয়ে যাব। এখন নিশ্চয়
আপত্তি নেই? শেষের বাক্যটি আয়েশা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন।
এতক্ষণ
আয়েশা বেগম ভগ্নী এবং বাবরের যুক্তিতর্ক শুনছিলেন। বাবরের সিদ্ধান্তের কথা শুনে
তিনি নির্বিকারভাবে বললেন- আপনি আমাকে এখানে কয়েকদিনের জন্য রেখে যাওয়ার কথা
বলছেন, তার থেকে বরং আপনি আমায়
চিরদিনের জন্য আজাদ করে যান।
আয়েশা
বেগমের কথায় বাবর অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। রাগ, ক্ষোভ, অভিমানের পরিবর্তে তাঁর
হৃদয়ে বিতৃষ্ণা ধূমায়িত হয়ে উঠলো। প্রচণ্ড বিতৃষ্ণার উন্মত্ত মাতাল প্রবাহে
তাঁর চিত্তলোকের তটভূমিতে আঘাত করে তাঁকে অস্থির করে তুললো। আয়েশা তাঁরনিকট থেকে
আজাদী চাইছে? এতদিনের দাম্পত্য প্রেমের উচ্ছসিত প্রবাহ সে
চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দিতে চাইছে? তাঁর প্রতি আয়েশার
ভালোবাসা এত ঠুনকো নাকি? যারজন্য সে দুর্ভাগ্যের সমগ্র দোষ
তাঁর উপরে ঝেড়ে দিয়ে তাঁর কাছ থেকে আজাদী চাইছে? আবার
ভাবলেন, ঠিকই তো আয়েশাই তাঁর জন্যেই তো দুভোর্গ সইতে হচ্ছে।
সে যাতে আরও দুর্ভোগ সহ্য করতে না হয় তার ব্যবস্থাই তিনি করবেন। আয়েশা যা চাইছে,
সেটাই করবেন তিনি। আজাদী দিবে....চিরদিনের জন্য আজাদী.…....
এই সব কথা
মনে মনে ভেবে বাবর শান্ত সমাহিত কণ্ঠে বললেন- তারমানে, আপনি আমার নিকট থেকে
তালাক(বিচ্ছেদ)খুঁজছেন। ঠিক আছে, আপনি খুঁজা মতেই কাজ করা
হবে। আজ থেকে আপনার পৃষ্ঠদেশ আমার মাতৃর পৃষ্ঠদেশ। আমি আপনাকে চিরদিনের জন্য ত্যাগ
করলাম। ....তালাক! তালাক!! তালাক!!!
বাবর
বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে তিনবার তালাক শব্দ উচ্চারণ করে এক মুহূর্তও বিলম্ব না করে কক্ষ
থেকে বেরিয়ে এলেন।
এভাবেই বাবরের প্রথম প্রেমের সমাধি হলো।
পরের দিন বিশ্বাসী বেগ এবং আত্মীয়-স্বজন নিয়ে বাবর উরাতেপা অভিমুখে ভাগ্যের সন্ধানে রওয়ানা হলেন।
উরাতেপা এসে বাবর দহক নামের একটি গ্রামে তাঁবু খাড়া করলনে। গ্রামের লোকগুলো উষ্ম সম্বর্ধনা জানিয়ে সন্মান সহকারে বাবরকে গ্রহণ করলো। গ্রামের লোকদের আত্মিক আতিথ্যে বাবর মুগ্ধ হলেন। সুখ স্বচ্ছন্দে বাবরের কর্মহীন দিনগুলো অতিবাহিত হতে লাগলো। কিন্তু কয়েক দিনের ভেতরে তাঁর কর্মহীন নিরলস জীবন একগুঁয়ে হয়ে উঠলো। কর্মবিমুখ বৈচিত্রহীন জীবনের প্রতি তিনি বিরক্তি অনুভব করতে লাগলেন। গ্রামের উদ্যমী লোকগুলোর উৎসাহ উদ্দীপনা এবং পরস্পরের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখে রাজ্য শাসনের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা জন্মে গেলো।
ছাউনি থেকে বেরিয়ে এসে বাবর সময়ে সময়ে শস্যক্ষেত্রে কৃষকদের মাঝে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
কৃষকরা ক্ষেতে কোদাল মারে—তিনি তন্ময় হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে ভাবেন, এই কর্ম পাগল উদ্যমী লোকগুলো কত সুখী! এদের রাজ্য লোভ নেই- ঐশ্বর্যের লোভ নেই-- রয়েছে শুধু স্নেহ, ভালোবাসা— মানুষের প্রতি মানুষের অকৃত্রিম হৃদ্যতা। রাজ্যলোভেএদের প্রলোভিত করে না-ঐশ্বর্যের চাকচিক্যে এদের চোখে লালসার অগ্নি প্রজ্বলিত করে না। চোখের দৃষ্ঠি অন্ধ করে না। দুই বেলা দুই মুঠো খেতে পারলেই এরা বেহেস্তের সুখ অনুভব করে। একজন বাদশাহর চেয়ে এইসকল সহজ সরল লোকগুলো যেন অনেক সুখী। বাবর কর্মরত লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে এইসব কথা ভেবে তন্ময় হয়ে পড়ে।
বাবর একদিন এইসব কথা ভেবে থাকতেই মনের খেয়ালে জোতা খুলে খালি পা-য় হাঁটতে লাগলেন। তাহির নিকটেই ছিলো। বাবরকে খালি পায় হাঁটতে দেখে সে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। সে জোতা নিয়ে বাবরের নিকট এসে জোতা জোড়া নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরে বললো- জাহাপনা, আপনি শূন্য পায় হাঁটাটা শোভা পায় না। জোতা পরুন।
আমি তোমাদের মতো খালি পায় থাকবো, তাহির বেগ। তোমরা যদি শূন্য পায় হাঁটতে পার, আমি পারব না কেন?
আপনার এবং আমার মাঝে অনেক পার্থক্য, জাহাপনা। আপনি বাদশাহ এবং আমি আপনার দাশ। এই গ্রামের লোকগুলো আপনাকে কত সন্মান করে, আপনি লক্ষ্য করেন নি, জাহাপনা?
অবশ্যে তাহির বলা কথা মিথ্যা নয়। গ্রামের লোকগুলো বাবরের সন্মুখ দিয়ে যেতে সব সময় মাথা নুইয়ে যায়। তাঁকে রাস্তায় হাঁটতে দেখলে সসন্মানে রাস্তা ছেড়ে দেয়।
কিন্তু লোকগুলো আমায় এতো সন্মান করে কেন, তাহিরজান? আমার তো এখন রাজ্য নেই?
হাতী মরলেও তার মূল্য লক্ষ টাকা,জাহাপনা। রাজ্য না থাকলেও আপনার ধমনী থেকে এখন পর্যন্ত রাজকীয় রক্তের স্রোত স্তব্ধ হয়ে যায়নি, জাহাপনা! সব সময় এই দুর্দিন থাকবে না, একদিন সুদিন নিশ্চয় আসবে।
আচ্ছা, তোমার কথাই মানলাম। দাও, জোতা দাও। এভাবে বলেই বাবর তাহিরজানের হাত থেকে জোতা জোড়া নিলো। তবে, তিনি জোতা পরলেন না। জোতা জোড়া হাতে নিয়ে তিনি অন্যমনস্কভাবে ধীরে ধীরে টিলার উপর উঠে এলেন। টিলার উপরে চড়ে তিনি এক টুকরো পাথরের উপর জোতা জোড়া নামিয়ে রেখে নিজে অন্য এক টুকরো পাথরের উপর বসে পড়লেন। তারপরে তিনি অবসন্নভাবে নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভাবতে লাগলেন।
টিলা থেকে একটু দূরেই একটি নদী বইছিলো। খরা মাসের নদী। স্বল্প জল। মাত্র এক আঁঠু। হঠাৎ তাঁর নদীর দিকে দৃষ্টি প্রসারিত হলো। নদীর মাঝ দিয়ে একজন লোককে ঘোড়া ছুটিয়ে আসতে দেখলেন। অশ্বারোহী লোকটি তিনি বসে থাকা টিলার দিকেই আসছিলো। টিলার নিকট আসার পরে তিনি লক্ষ্য করলেন, অশ্বারোহী লোকটি অন্য কেউ নয়, কাশিম বেগ।
রাজ্য হারানোর পরে বাবরের অধীনস্থ বেগ এবং সেনাদের কোনো কাজ ছিলো না। প্রথম কয়দিন আশ্রয় গ্রহণ করা গ্রামের লোকেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে খাদ্যসামগ্রী যোগান ধরছিলো। কিন্তু গ্রামের লোকদের সামর্থ ছিলো খুবই সীমিত। সেজন্য তাদের উপর বেশিদিন বসে খাওয়াটা সম্ভব ছিল না। এই কথা উপলব্ধি করে বেগ এবং সেনারা পেটের ভাত যোগারের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে কৃষিকর্মে নিয়োজিত হয়েছিলো। কিন্তু কাশিম বেগ কৃষিকর্মে অভ্যস্ত ছিলেন না। সেজন্য বাবর তাঁকে কর্মের সন্ধান করতে হিসার পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
বাবরকে টিলার উপরে বসে থাকতে দেখে কাশিম বেগ ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ঘোড়াটা একটি গাছের সাথে বেঁধে টিলার উপরে উঠে এলেন। বাবরের নিকটে এসে মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানিয়ে বাবরের কুশল সংবাদ জিজ্ঞাসা করলেন- কেমন আছেন, জাহাপনা?
বাবর সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললেন- হ্যাঁ, ভালো আছি। আপনি কাজ পেয়েছেন নাকি?
হ্যাঁ, পেয়েছি, জাহাপনা। হিসারের রাজ দরবারে একটি সাধারণ কাজ পেয়েছি। এভাবে বলেই তিনি মুহ্যমানের মতো বললেন- আপনার ভবিষ্যত বাণী আখরে আখরে ফলেছে, জাহাপনা। শৈবানি খাঁ মাহমুদ খাঁকে হত্যা করেছে। মাহমুদ খাঁর ষোল বছরের কন্যা মুঘল খানমকে শৈবানি খাঁ নিজে বিয়ে করেছে এবং মাহমুহ খার ভগ্নী দৌলত খানমকে শৈবানি খাঁর খুড়োর ছেলে তৈমূর সুলতান বিয়ে করে তৃতীয় স্ত্রীর মর্যদা দিয়েছে।
খবরটা শুনতে বাবরের জন্য উৎসাহজনক হলেও প্রকৃতার্থে তাঁর জন্য খুবই বেদনাদায়ক ও হতাশাজনক ছিলো। খবরটা শুনে বাবর ম্রিয়মান হয়ে পড়লেন। মাহমুদ খাঁ তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখান করে অপমান করলেও তিনি তাঁর মামার এতখানি নির্মম পরিণতি আশা করছিলেন না। মামার মৃত্যু সংবাদ এবং পরিজনবর্গের লাঞ্ছনার কথা শুনে তিনি বিচলিত হয়ে উঠলেন। ভয়ার্ত এবং শংকাযুক্ত দৃষ্টিতে তিনি কাশিম বেগের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে জিজ্ঞাসা করলেন- আয়েশা বেগম, আয়েশা বেগমের কী হয়েছে?
আয়েশা বেগমকে শৈবানি খাঁর পঞ্চান্ন বছরের বেগ কিসমিস সুলতান এবং রেজিয়া বেগমকে জানি বেগ নামের একজন বেগ নিকাহ করেছে।
কাশিম বেগের কথা শুনে বাবর দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে চিৎকার করে উঠলেন- উঃ, কী ঘৃণার কথা!
আয়েশা বেগমের দুর্দশা এবং কলহপ্রিয় মদগর্বী রেজিয়া বেগমের ভূরি মোটা জানি বেগের সাথে বিয়ে হওয়ার কথা শুনে বাবরের হৃদয় বিষাদাচ্ছন্ন হয়ে উঠলো।
কাশিম বেগ বাবরের কানের কাছে মুখ এনে বললেন- জাহাপনা, শৈবানি খাঁর পুত্র এবং বেগবর্গ সমগ্র মাউরা উন্নহর দখল করার স্বপ্ন দেখতেছে। বর্তমান তারা আন্দিজানের দিকেও চিলের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে উরাতেপা পর্যন্ত হাত প্রসারিত করার সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠেছে। আমরা এখন এখানে বেশিদিন থাকাটা নিরাপদ নয়, জাহাপনা। আমরা যতদূর সম্ভব তারাতারি পাহাড় পার হয়ে হিসার চলে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
হিসারের শাসক খশ্রুর কথা মনে পড়ার সাথে সাথে বাবরের চোখের সম্মুখে খশ্রুর হিংস্র ও নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠলো। খশ্রু বাবরের চাচার পুত্র বায়সঙ্কুরের কাছ থেকে সিংহাসন কেড়ে নিয়েছিলো এবং সিংহাসনের অন্য একজন উত্তরাধিকারীর চোখে লোহার গরম শলাকা বিঁধিয়ে ভবিষ্যতে যাতে সিংহাসন দাবি করতে না পারে তারজন্য অন্ধ করে দিয়েছিলো। সেই মর্মান্তিক দৃশ্য মনে পড়ার সাথে সাথে বাবর বলে উঠলেন- কিন্তু বেগ সাহেব, আকাশ থেকে খসে খেজুরের কাঁটার মাঝে পড়তে চাইছেন নাকি? এর থেকে আকাশে ভেসে থাকাই উত্তম হবে, না কী বলুন?
না না জাহাপনা, আমি খশ্রুর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলছি না। আমি হিসারের বেগদের সাথে গত বছর গোপনে কথা বলেছিলাম। বেগদের বেশি সংখ্যক-ই খশ্রুর উপরে অসন্তুষ্ট। তারা বলা মতে খশ্রু নীচ বংশজাত একজন সৈনিকের সন্তান। হিসারের উপরে বোলে তার কোনো অধিকার নেই। আপনি সেখানে গেলে হিসারের বেগবর্গ আপনার সাথে সহযোগ করবে। এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত।
আবার সিংহাসনের জন্য কুকুরের মতো টানাটানি! না না বেগ সাহেব, সিংহাসনের প্রতি আমার মোটেই আকর্ষণ নেই। এখন আমার নির্জনতার প্রয়োজন। এ রকম নির্জনতা যেখানে বসে আমি শায়েরি লিখতে পারব। শায়েরির বাইরে এখন আমি কিছুই চাই না। আমি মুকুটধারীদের জিঞ্জির ছিঁড়ে স্বাধীন হতে চাই। আমি যে শক্তিশালী, ভব্য, ঝাকঝমক মাউরা উন্নহরে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেখানে আমি অসফল হয়েছি। মারা-মারি, কাটা-কাটি, হিংসা-দ্বেষপূর্ণ জীবন আমি চাই না। প্রকৃতির বুকে আমি মুক্তভাবে বেঁচে থাকতে চাই।
বাবরের দৃষ্টিপথে যেন অন্ধকার নেমে এলো। তিনি থরথর করে কাঁপতে লাগলেন।
কাশিম বেগ বাবরকে জড়িয়ে ধরলেন। বাবর অসহায়ভাবে কাশিম বেগের দিকে তাকালেন। তিনি লক্ষ্য করলেন কাশিম বেগের দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
কাশিম বেগের চোখে জল দেখে বাবর নিরুৎসাহিত হয়ে উঠলো। তিনি কাশিম বেগকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বললেন- দুঃখ করবেন না বেগ সাহেব। আমার সিদ্ধান্তের কথা পরে আপনাকে জানাব। এখন ছাউনিতে চলুন।
ভারাক্রান্ত মন নিয়ে উভয়ে টিলা থেকে নেমে ছাউনিতে এলেন।
পুনরায় মিলিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাশিম বেগ পরের দিন হিসার চলে গেলেন।
কয়েকদিন পরে স্তেপীবাসী কয়েকজন বাবর সেনা বাজার করতে গিয়ে খবর নিয়ে এলো যে, শৈবানি খাঁ উরাতেপা আসতেছে। শৈবানি খাঁ বৰ্তমান আকতংগী নামের একটি স্থানে ছাউনি পেতে রয়েছেন। বাবর আশ্রয় নিয়ে থাকা স্থান থেকে আকতংগী মাত্র পনের মাইল দূরে। শৈবানি খাঁর শিকারি কুকুরগুলো যে কোনো মুহূর্তে দহতকত পর্যন্তও আসতে পারে। কারণ শৈবানি খাঁ বাবরের মস্তকের পরিবর্তে সোনা পুরস্কার প্রদানের কথা ঘোষণা করেছেন। সেজন্য দহকত থেকে চলে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে বাবরের কয়েকজন সেনা পরামর্শ দিলেন।
কুলতুগ নিগার বেগম খবরটা শুনে উৎকণ্ঠিতভাবে বাবরের নিকট এসে বললেন- আপনি আমাদের সবার একমাত্র আশা ভরসার স্থল। এখন আপনার বৈরাগ্য নেওয়ার সময় নয়। আপনাকে এখনও সবাই বাদশাহ হিসাবে সন্মান করে। হিসার এবং অন্যান্য স্থানের বেগবৃন্দও আপনার জন্য অপেক্ষা করতেছে। শৈবানি খাঁর লোক পর্যন্ত আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তদুপরি এই গ্রামের লোকদের প্রতিও আপনার কর্তব্য রয়েছে। আপনি এই গ্রামে থাকলে এই গ্রামের লোকদের উপরেও শৈবানি খাঁর সেনারা উৎপীড়ন করবে। সেজন্য আপনি এই গ্রাম ছেড়ে গিয়ে গ্রামের লোকদের অযথা অন্যায় অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করা কর্তব্য।
বাবর ভাবলেন, মাতৃর কথা সম্পূর্ণরূপে সত্য। তাঁর উপরে ভরসা করা, তাঁর হয়ে অস্ত্র ধারণ করা লোকদের নেতৃত্ব প্রদান করাটা তাঁর নৈতিক দায়িত্ব।
খালি পায় হাঁটার পরেও বাবরের দুর্ভাগ্য বাবরের সংগ ত্যাগ করল না। তিনি তাঁর মামা শেরিম বেগকে ডেকে এনে বললেন- মামা, আমরা এখানে থাকাটা মোটেই নিরাপদ নয়। সেজন্য আমি এখান থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
কোথায় যাওয়ার কথা ভাবছেন, জাহাপনা? শেরিম বেগ চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন।
কাশিম বেগ আমাকে হিসার যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা এখন হিসার যাওয়াটা ঠিক হবে না। বর্তমান আমরা ইসফারা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেজন্য এখন ইসফারা যাব। ইসফারা যাওয়ার পরে অন্য কথা চিন্তা করব। বর্তমান কাশিম বেগ নেইসেজন্য আমি আপনাকে উজির-এ-আজম পদে সাময়িকভাবে নিযুক্ত করলাম। আপনি সৈন্যদের যাত্রার জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দিন। আমরা আজ রাতেই দহকত ছেড়ে চলে যাব।
বাবর পুনরায় যুদ্ধের পোশাক পড়লেন। সেদিন রাতেই বাবর সেনাবাহিনী এবং আত্মীয়-পরিজন নিয়ে পূর্ব দিকের ইসফার অভিমুখে ভাগ্যের অন্বেষণে যাত্রা করলেন।
* * *

Comments
Post a Comment