দিগ্বিজয়ী বাবর (তৃতীয় খণ্ড)
দিগ্বিজয়ী বাবর (তৃতীয় খণ্ড)
ইসফারা!
বাবর একটি টিলার উপরে বসে ছিলেন। টিলার পাদদেশ দিয়ে প্রস্তরে প্রস্তরে ঠেকা খেয়ে সংগীতের মূর্ছনা তুলে ইসফারা নদী বয়ে চলছে।
বাবর খোজন্দের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে তাকিয়ে ছিলেন। স্বল্পদূরে অবস্থিত ধূসর পাহাড়ের ঢাল এবং পাহাড়ের শিখরের উপরে ভেসে বেড়ানো মেঘের ছায়া দৃষ্টিপথে পড়ছিলো। হিমাচ্ছাদিত পাহাড় শিখর থেকে স্নিগ্ধ মনোরম ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে এসে শরীর স্পর্শ করতেছিলো।
বাতাসের ঠাণ্ডা স্নিগ্ধ সুকুমার পরশে বাবরের মনে ভাবের লহর তুললো। তাঁর মানসপটে ভেসে উঠলো পাহাড়ের সেপ্রান্তে অবস্থিত দেশগুলোর দৃশ্য।
পাহাড়ের সেপ্রান্তে এক সময়ের কোলাহল মুখর এবং বর্তমান কিঞ্চিত ম্রিয়মান হয়ে পড়া তাসকন্দ। কিছুদিন পূর্বেও তিনি স্বাধীনভাবে বিচরণ করা জিজ্জখ, সমরকন্দ, মার্গিলান,আন্দিজান প্রভৃতি স্থানের ধূসর ছবিও তাঁর মানসপটে ভেসে উঠলো।
কিন্তু মাউরা উন্নহরে বর্তমান এমন কোনো স্থান নেই যেখানে বাবর শান্তিতে বসবাস করতে পারেন। মাউরা উন্নহরের সকল স্থান বর্তমান শৈবানি খাঁ এবং আহম্মদ তনয়ালের দখলে। বাবর দাঁড়ানোর মতো এক টুকরো স্থানো নেই কোথাও। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ভাবলেন বাবর।
শেরিম বেগ কয়েকদিন ধরে বাবরকে খোরাসান যাওয়ার জন্য অনুনয় বিনয় করতেছে।
কিন্তু শেরিম বেগের সাথে বাবর সহমত হতে পারেন নি। তাঁর ধারণা, একবার মাউরা উন্নহর ত্যাগ করলে চিরদিনের জন্য তিনি জন্মভূমি থেকে বঞ্চিত হতে হবে। পুনরায় তিনি জন্মভূমিতে পা দিতে সক্ষম হবেন না। জন্মভূমি-মাতৃভূমি। জন্মভূমি জন্মধাত্রী মাতৃর বুক। নিরাপদ আশ্রয়। মাতৃভূমি ত্যাগ করার কথা ভাবলেই বাবরের অন্তর হাহাকার করে উঠে। মাতৃভূমির প্রতি যেন অধিক আকর্ষণ অনুভব করেন।
তনয়াল এবং শৈবানি খাঁ। বাবর বিশ্বস্তসূত্রে অবগত হয়েছেন যে কয়েকদিন পূর্ব থেকে এই দুই মিত্র বোলে পরস্পরের শত্রু হয়ে উঠেছে। একজন আরেকজনের রক্তের জন্য লালায়িত হয়ে উঠেছে। দুই পরষ্পর বিরোধী শাসকের ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় অত্যাচারিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সন্ত্রাসিত হয়ে উঠেছে সমগ্র মাউরা উন্নহর। এই দু’টি শিকারী কুকুর যদি পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করে মরে তাহলেই তো তিনি নিষ্কণ্টক হতে পারেন!
বর্তমান বাবরের পরামর্শ করার মতো তেমন কোনো লোকও নেই। কাশিম বেগ হিসারে, তাঁর বিশ্বস্ত নুয়ান কুশল দাশ নিহত। গতবছর আহন গরাণে তনয়ালের সাথে সংঘটিত যুদ্ধে তনয়ালের সেনারা তাকে গভীর খাদে ফেলে হত্যা করেছে। বর্তমান তাহিরজানই তাঁর একমাত্র সহচর। তার পরামর্শ মতেই বাবর বর্তমান শৈবানি খাঁ এবং তনয়ালের যুদ্ধের শেষ পরিণিতি দেখার জন্য আন্দিজানের এলেকাধীন ইসফারায় অবস্থান করতেছেন। তাহিরজান বর্তমান তনয়াল এবং শৈবানি খাঁর যুদ্ধের শেষ পরিণিতি জানার জন্য আন্দিজানে অবস্থান করছে। বাবরই তাকে সেখানে পাঠিয়েছেন।
বর্তমান কাগজ কলমই বাবরের একমাত্র সহচর। কিতাপই তাঁর একমাত্র বন্ধু। কবিতা লিখে এবং গ্রন্থ অধ্যয়ন করে তিনি উৎকণ্ঠিত বিপর্যস্ত জীবন অতিবাহিত করতেছেন।
তরবারির দ্বারা কেড়ে নেওয়া সফলতা তরবারি-ই আবার কেড়ে নেয়। কিন্তু কবিতার দ্বারা আহরণ করা সফলতা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। যুগ যুগ ধরে ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকে।
এটাই বর্তমান বাবরের দর্শন।
পূবে ফর্সা
হওয়ার পূর্বেই সেদিন আন্দিজান থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে দেড় মাস পরে তাহিরজান
ইসফারা পৌঁছোলেন।
এক ঘণ্টার
থেকে কম সময়ের ভেতর এসে বাবর তাহিরজানের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। সংকটময় মুহূর্তে
দেড় মাসকাল অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করে থাকাটা বাবরের জন্য মুখের কথা ছিল না।
প্রদীপের
আলোতে বাবরের তাঁবুতে দাঁড়িয়ে আন্দিজানের পরিস্থিতি সম্পর্কে তাহিরজান
পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবরণ দিয়ে গেলো। প্রথমে সে প্রধান ঘটনাগুলো বললো-
আন্দিজান
বর্তমান শৈবানি খাঁর দখলে। শৈবানি খাঁর সেনারা সহরে লুটপাটের তাণ্ডব চালিয়েছে।
সহর দখল করার পরেও শৈবানি খাঁর সেনারা অনেক আন্দিজানী সেনা বর্বরভাবে হত্যা করেছে।
তাহিরজানের সাথে যাওয়া সহচর গুপ্তচরটিকেও শৈবানি খাঁর সেনারা নির্মমভাবে হত্যা
করেছে।
তাহির বেগ খুবই পরিশ্রান্ত এবং দুর্বল হয়ে পড়ছিলো।
সেজন্য সে নিজের পায় কোনো মতে দাঁড়িয়ে বাবরের সাথে কথা বলছিলো। তার পা জোড়া কাঁপছিলো। বাবর প্রথমে দাঁড়িয়ে
দাঁড়িয়ে তাহিরজানের কথা শুনছিলেন। তাহিরের অবস্থা দেখে তিনি নিজে বিছানার উপরে বসে তাহিরজানকেও বসতে বললেন।
ইসফারা আসার
পরে তাহিরজান বাবরের নির্দেশে তার সাথে অন্য একজন সহযোগী নিয়ে আন্দিজানের
পরিস্থিতির বুঝ নিতে আন্দিজান
গিয়েছিলো। সে আন্দিজান গিয়ে
আন্দিজান সহরের নিকটে খাজাকত্তা নামক একটি গ্রামে একজন জমিদারের বাড়িতে চাকর ছিলো। তার সহযোগি সেনাটি তনয়ালের সেনাদলে ভর্তি
হয়েছিলো। তারা নিজের পরিচয় গোপনে রেখে আন্দিজানের পরিস্থিতির বুঝ নিচ্ছিলো। তাহিরজান মনযোগ সহকারে বিভিন্ন
মানুষের কথা-বার্তা শুনত এবং প্রয়োজনবোধে খুব সতর্কতা অবলম্বন করেমানুষের কাছে
প্রশ্ন করে পরিস্থিতির বুঝ নিতো। সে যখন জামিদারের মালপত্র নিয়ে সহরে যেতো, তখন সে নিজ চোখেও অনেক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে।
আন্দিজান
সহরের উপকন্ঠের একটি খোলা প্রান্তরে শৈবানি খাঁ এবং আহম্মদ তনয়ালের মাঝে যুদ্ধ
সংঘটিত হয়। উক্ত যুদ্ধে সন্মুখ সমরে পরাজিত হয়ে আহম্মদ তনয়াল দূর্গের ভেতর আশ্রয় গ্রহণ করার পরে
শৈবানি খাঁ দূর্গের চারদিকে ছাউনি পেতে দূর্গ অবরোধ করে রাখে। ফলে ক্ষুধা পিপাসা, রোগ-ব্যাধি এবং নিজেদের মধ্যে
মারামারি করে দূর্গের ভেতর আবদ্ধ জনতা এক সময় শিয়াল- কুকুরের মতো মরতে শুরু করে। বাবরকে ছেড়ে
তনয়ালের দলে যোগদান করা সেনাদের অনেকে ক্ষুধা পিপাসায় মরার ভয়ে তনয়ালের সংগ ত্যাগ করে শেষমুহূর্তে শৈবানি খাঁর
দলে যোগদান করতে শুরু করে। আন্দিজানে যেন সমরকন্দের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হলো। একদিন শৈবানি খাঁর সেনারা দূর্গদ্বার ভেঙে
দূর্গে প্রবেশ করে। উপায় বিহীন হয়ে তনয়াল তখন তার ভ্রাতৃ এবং পরিয়াল- পরিজনসহ দূর্গের আর্কের ভেতর আশ্রয় গ্রহণ করার
জন্য বাধ্য হয়। এক সময় আর্কও অসুরক্ষিত হয়ে পড়ে। সেজন্য তনয়াল শৈবানি খাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার সিদ্ধান্ত নেয়।
সিদ্ধান্তমর্মে
তনয়াল শৈবানি খাঁর বশ্যতা স্বীকার করে একটি পত্র লিখলেন- আমি আমার সমগ্র সেনা, ধন-সম্পত্তি আপনাকে সমর্পণ করে চিরদিনের জন্য আপনার অনুগত হয়ে থাকার শপত
নিলাম। আপনি শুধু আমায় প্রাণভিক্ষা দিন।
তনয়াল একজন
বৃদ্ধের হাতে পত্রটি দিয়ে শৈবানি খাঁর নিকট পাঠিয়েছিলো। কিন্তু পত্রবাহক ফিরে
এলো না। শৈবানি খাঁর সেনারা পত্র বাহককে হত্যা করে আর্ক আক্রমণ করলো। নিরূপায় হয়ে তনয়াল গলায়
তরবারি ঝুলিয়ে বিজেতার কাছ থেকে উদারতাসূলভ প্রাণ ভিক্ষা পাওয়ার আশায় আর্কের বাহিরে
বেরিয়ে এলো। কিন্তু তনয়ালের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হলো না।
তনয়ালকে
দেখে সহানুভূতি জানানোর পরিবর্তে তৈমূর সুলতান নির্মম আদেশ দিলো- তাকে বন্দি করতে
হবে না...হত্যা কর...
আদেশ পেয়ে সেনারা তনয়ালকে তার ভ্রাতৃদের সাথে নৃশংসভাবে হত্যা করে কেটে টুকরো টুকরো করে বস্তায় ভরে শৈবানি খাঁকে দেখাতে নিয়ে যায়।
শৈবানি খাঁর সন্মুখে তনয়ালের টুকরো টুকরো দেহ উপস্থিত করে সেনারা আত্ম অহংকারে ফুলে উঠছিলো। তাহিরজান সব ঘটনা আদ্যোপান্ত প্রকাশ করে শেষে এভাবে মন্তব্য করলো।
হে খোদা! বাবরের মুখ থেকে আপনাআপনি ইষ্ট নাম বেরিয়ে এলো।
প্রায়শ্চিত্ত ! তনয়াল নিজের জীবন দিয়ে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে গেলো। বিশ্বাসঘাতক তনয়াল বাবরের উপরে তরবারি তুলেছিলো। সে নিজেই সেই তরবারির আঘাতে প্রাণ বিসর্জন দিলো। নিদোষী খাজা আবদুল্ল্যাহকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা দরজার নিকটেই সে নির্মম মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলো। বেচেরাচগ্রক(রাশিয়ার এক উপজাতি)দের মতো নিজের ছিন্ন মস্তকের সাথে তার ভ্রাতৃদের ছিন্ন মস্তকও বস্তা থেকে বের হলো।
বাবরের কল্পনায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো, শৈবানি খাঁ হয়তোতাদের ছিন্ন মস্তক প্রত্যক্ষ করে ঘৃণাভাবে স্পর্শ করে দেখেছেন। পা দিয়ে উলটিয়ে দেখেছেন। তাঁকে ব্যতিব্যস্ত করা
তনয়ালকে হয়তো ঘৃণাভাবে সেই দেহহীন মস্তকগুলোর মাঝে খুঁজে দেখেছেন। কারণ শৈবানি খাঁ তনয়ালকে জীবিত অবস্থায় কখনো দেখেনি।
হয়তো তনয়ালের ছিন্নমুণ্ড শৈবানি খাঁ হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখতেও ঘৃণাবোধ করেছেন।
দৃশ্যগুলো
কল্পনা করে বাবর বলে উঠলেন- হে খোদা! হে খোদা!! এটা ক্রুর ন্যায়, না প্রতিশোধ? ক্রুরতায় শৈবানি খাঁ তনয়ালের চেয়েও উগ্র। তবুও প্রতিহিংসার তরবারি পরমেশ্বর
শৈবানি খাঁকে অর্পণ করলেন কেন?
বাবর
বিক্ষিপ্ত বিকেন্দ্রীভূত মাউরা উন্নহর কেন্দ্রীভূত করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু বাবর বিফল হলো। বাবর যে
কাজ করতে পারলেন না, সেই কাজটি করলেন শৈবানি খাঁ।
শৈবানি খাঁ কিসের বলে বাবরের চেয়ে অধিক শক্তিশালী? চতুরতা,
ক্রুরতা, না অমানবীয় হিংস্রতায় ?
এই পৃথিবীতে
বর্তমান শৈবানি খাঁর মতো কূটিল চরিত্রের মানুষ হওয়াটা হয়তো আবশ্যক। বাবর একজন
ন্যায়পরায়ণ শাসক হওয়ার জন্য চেষ্টা
করছিলেন। নিজের অধিকাংশ সময় কাব্য, শিল্পকলার নামে সমর্পণ করতে চেয়েছিলেন। মানবতার কথা
চিন্তা করছিলেন। এইসব কারণেই তিনি
শৈবানি খাঁর মতো কুটিল চরিত্রের হাতে মার খেতে হলো নাকি?
কিন্তু মুখ্য
কি? মানবতা, না
হিংস্রতা?
জাহাপনা।
বাবরকে অন্যমনস্ক দেখে তাহিরজান বললো।
তাহিরের
কণ্ঠস্বরে বাবরের ধ্যান মানবতার চিন্তা থেকে বাস্তবে ফিরে এলো। তিনি অপ্রস্তুতের
মতো বললেন- বল।
তাহির বিচলিত
কণ্ঠে বললো- আমি জানতে পেরেছি, শৈবানি খাঁর সেনারা উল্লসিত হয়ে আপনাকে খুঁজতেছে। তাদের গুপ্তচর ইতিমধ্যে এসে হয়তো ইসফারাও পৌঁছেছে!
তাহিরের
মন্তব্যে বাবর সজাগ হয়ে উঠলেন। হ্যাঁ, তিনি এখন নিজের জীবন রক্ষা করার কথা চিন্তা করা উচিত।
তনয়ালের পরাজয়ের জন্য তাঁর
অভিস্পিত ধ্যান-ধারণায় ইতিমধ্যে ভাঙন শুরু হয়েছে। মাতৃভূমির চিন্তা থেকে বেরিয়ে
এসে নিজের জীবন রক্ষার চিন্তাও শুরু
হয়েছে বর্তমান। মাতৃভূমি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রায় সব রাস্তাই বর্তমান বন্ধ
হয়েছে। হয়তো দুই একটা রাস্তা এখনও খোলা রয়েছে। কিন্তু যদি অতিসত্বর বেরিয়ে না যান, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো অন্তিম
সম্ভাবনাও শৈবানি খাঁ বন্ধ করে দিবে! হয়তো নয়, এটা প্রায় নিশ্চিতই বলা যেতে পারে!
সন্মুখে যে
সাধারণ একজন সৈনিক বসে রয়েছে, উত্তেজনাবশতঃ বাবর সেই কথাও ভুলে গেলেন। তিনি বাষ্পারুদ্ধ কণ্ঠে বললেন- আমাদের মাথার উপর দিয়ে ইতিমধ্যে কম ঝঞ্ঝা বয়ে
যায় নি, তাহিরজান। এখন আমরা মাতৃভূমি
থেকেও চোরের মতো পালিয়ে যেতে হবে নাকি?
বাবরের চোখে
জল দেখে তাহিরজন শোকাভিভূত হয়ে পড়লো। অতি কষ্টে চোখের জল সম্বরণ করে তাহিরজান
কম্পিত কণ্ঠে বললো- জাহাপনা, পরের দেশে বেঁচে থাকাটা সবার
জন্যই পীড়াদায়ক। তিনি বাদশাহই হোন, বা অন্য কেউই হোন। কেউ
নিজের ইচ্ছায় মাতৃভূমি ত্যাগ
করেন না। পরিস্থিতির পাকে পড়েই মাতৃভূমির মোহ ত্যাগ করতে হয়। ইসফারায় বর্তমান
আপনার জীবন বিপন্ন। আপনি বুকে সাহস
সঞ্চয় করুন, জাহাপনা।
পরিবার-পরিজনের কথা চিন্তা করে হলেও আপনি বেঁচে থাকতে হবে, জাহাপনা। আমিও আর কুবায় ফিরে যাব না। আপনার সেবা
শুশ্রূষার জন্য নিশ্চয় শৈবানি খাঁ আমার উপরেও প্রতিশোধ নিবে। সেজন্য আমিও আপনার সাথে যাব। তদুপরি আমি আপনাকে ছেড়ে থাকতেও
পারব না। আন্দিজান থেকে আসার সময় আমি সিদ্ধান্ত নিয়েই এসেছি, আপনি যেখানে যাবেন, আমিও আপনার সাথে সেখানেই যাব।
বাবর প্রথম থেকে তাহিরজানকে ন্যায়পরায়ণ ও সাহসী সেনার সমান্তরালভাবে একজন বিশ্বাসী যুবক হিসাবে ভেবে এসেছেন। তাহিরের মতো চরিত্রের মানুষের ধারণা একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকই শুধু সাধারণ মানুষকে দুর্নীতি ও অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন। এই কথাও বাবর অবগত।
সেজন্য বাবর নিজের বিবেচনা প্রকাশ করে বললেন- কিন্তু আমি তোমরা আশা করা ধরণে বাদশাহ হতে পারলাম না। আগেও হতে পারব কি-না, সেটাও অনিশ্চিত.....
বাবর বাক্যটি সম্পূর্ণ করলেন না। তাহিরজানও কোনো রকম মন্তব্য করল না। একজন ভাগ্যহত নির্বাসিত শাসক এবং একজন দুর্ভাগা সৈনিক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে উভয়ে মুখামুখি হয়ে মৌনভারে বসে রইলেন।
এদিকে রাতের নির্জনতা ভঙ্গ করে ইসফারা নদী গর্জে গর্জে নৈঃশব্দের পটভূমিতে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করতে ছিলো।
মান-মর্যদায় আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকা ব্যক্তি দুজনকে সংকটময় পরিস্থিতি পরস্পরের নিকট সান্নিধ্যে টেনে আনল। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাধারণ সৈনিক একজন প্রথমবারের জন্য বাবরের সাথে এত নিঃসঙ্কোচে কথা বলছিলো। প্রদীপের স্নান আলোয় বসে তাহিরজান এরকম কিছু কথা বললো, যা দিনের আলোতে বা অন্য সময় বলা তো দূরের কথা সে হয়তো কল্পনাও করতে পারতো না।
তাহিরজান বলতে লাগলো- জাহাপনা, আমি একজন সাধারণ সৈনিক, তুবও কেন জানিনা, আপনাকে আমার সহোদরের মতো মনে হয়। আপনার শায়েরি, আপনার সাহস এবং উদারতা দেখে আমার উপলব্ধি হচ্ছে, আপনার জন্য যেন এক অপূর্ব বিরাট সাফল্য অপেক্ষা করতেছে। আপনার বেশিসংখ্যক শত্রু এখন নিহত। তদুপরি আপনি ইতিমধ্যে অনেক জীবনঘাতক কঠিন বিপদ থেকে কোনোমতে প্রাণরক্ষা করে ফিরে এসেছেন। এগুলো হয়তো আপনার অসাধারণ ভাগ্যেরই নিদর্শন।
বিপদের সময়ে ছোট ভ্রাতৃকে সাহস প্রদান করা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃর মতোই তাহিরজানকে মনে হলো বাবরের। বাস্তবেও তাহিরজান বাবরের চেয়ে সাত বছরের জ্যেষ্ঠ। সেজন্য তাহিরজানকে নিজের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃর মতো ভেবে ভালো লাগলো বাবরের। সেজন্য তিনি অকপটে নিজের দুর্ভাগ্যকে দোষারূপ করে বললেন- কিন্তু আমার ভাগ্য বারে বারে আমায় প্রতারণা করছে কেন, তাহির বেগ?
আপনার ভাগ্য আপনার সাথে সৎ মায়ের মতো আচরণ করছেন, জাহাপনা। দুর্ভাগ্য নির্দয়ভাবে আপনার প্রতি আঘাত হেনেছে। দুর্দিন দূর হয়ে একদিন নিশ্চয় সুদিন আসবে। তখন মানুষ আপনার কথা বুঝতে পারবে। কিন্তু এখন.…... তাহির নড়েচড়ে বসে পুনরায় বললো- অতিসত্বর ইসফারা থেকে চলে যাওয়াটাই উচিত হবে, জাহাপনা। হিরাত তো আপনার পর নয়! হোসেন বায়কারা আপনার আত্মীয়। মামা ফজিলুদ্দিন বর্তমান হিরাত রয়েছেন। সেজন্য সেখানে গেলে আপনার নিশ্চয় কোনো অসুবিধা হবে না।
বাবর আবেগ বিহ্বল কণ্ঠে বললেন- আচ্ছা, তোমার কথাই মানলাম। বিপদসংকুল রাস্তায় তুমিই হবে আমার সবচেয়ে বিশ্বাসী সহচর। আমি আমার জীবন আগে আল্লাহর হাতে সমর্পণ করে, পরে তোমার হাতে সমর্পণ করলাম, তাহির বেগ।
বরফাবৃত বিশাল পর্বতের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে বাবরের হৃদয় কেঁপে উঠলো। তাঁরা ঐ পর্বত শৃংখলা পার হয়ে যেতে পারবে কী? ওই বিশাল হিমাচ্ছাদিত পর্বতশ্রেণী পার হলেই পামীর মালভূমি এবং পামীর থেকে এগিয়ে গেলেই হিন্দুকোশ পর্বত।
* * *
শৈবানি খাঁর দৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচাতে বাবর ইসফারা ত্যাগ করে হিরাত অভিমুখে যাত্রা শুরু করলেন। তাঁর সাথে বের হলো বেগবর্গ এবং আত্মীয়-পরিজন। দীর্ঘ বিপদসংকুল রাস্তা। দিবা-রাত্র এক করে তাঁরা এগোতে লাগলেন। পথশ্রমে লোকগুলো শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তবুও বিশ্রামের অবকাশ নেই। অবকাশ নেই পেছনে ঘুরে দেখার। দুর্ভাগা পথচারীরা সন্মুখের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগোতে লাগলেন।
এক সময় তাঁদের মধ্যে খাদ্যাভাবে দেখা দিলো। পেটের ক্ষুধা নিবারণ করতে তাঁরা অবশেষে শুধু উট এবং ঘোড়ার মাংস খেয়ে জীবনধারণ করতে লাগলেন। চারদিকে শুধু উঁচু উঁচু পর্বত এবং বুক কাঁপানো পর্বতের খাড়া ঢাল। দীর্ঘ যাত্রাপথে ঘোড়াগুলো শ্রান্ত- ক্লান্ত হয়ে পড়ল। স্বয়ং বাবর নিজের ঘোড়া মাতৃকে দিয়ে নিজে পদব্রজে যেতে লাগলেন। পর্বত আরোহণ করে করে অনেকের জুতার তলদেশ ফেটে গেলো। মাথার উপরে খোলা আকাশ এবং পর্বতের বাইরে কিছুই নেই। সমগ্র যাত্রা পথে কোথাও বিশ্রাম নেওয়ার মতো তেমন কোনো সুবিধাজনক স্থানও নেই।
পথশ্রমে লোকগুলো অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো। তাঁরা কোনো কোনো সময় বাবরের সাথে অসংযত আচরণও করতে লাগলো।
পথশ্রমে ক্লান্ত মহিলারা কোথাও জিরাইতে বসলেও তারা বিরক্তিভরা কণ্ঠে গালি-গালাজ দিতে থাকে- দীর্ঘ যাত্রাপথ ! এভাবে বসে থাকলে রাস্তা আপনা-আপনি শেষ হবে নাকি? যত তারাতারি সম্ভব এগোতে হয়। তা না করে সময় বরবাদ করতেছে। কখনও কখনও বাবর
এবং মহিলাদের দিকে ইশারা করে সাথীদের উদ্দেশ্যে বলে-ভাইসব, চল,
আমরা এগিয়ে যাই। এরা জিরাইয়ে-টিরাইয়ে পরে আসবে’খন।
বেগদের এ রকম অশিষ্ট ব্যবহারের জন্য তাহিরজান কখনও কখনও ধৈর্য হারিয়ে ফেলে।
সে বেগদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য তরবারি বের করে। তখন বাবর তাকে বুজিয়ে-ভাঁড়িয়ে
শান্ত করতে হয়- ধৈর্য ধরুন, বেগ। আমরা অধৈর্য হলে চলবে না। যাত্রাপথের অনিশ্চয়তায়
ওরা অধৈর্য হয়ে উঠেছে। কষ্টও তো কম হয়নি! তারা তো মিথ্যা কথাও বলেনি। যাত্রাপথ
এমনিতেই দীর্ঘ। এভাবে বসে থাকলে আরও অধিক দীর্ঘ হবে। চলুন, তারাতারি
চলুন। আমরা যতদূর সম্ভব তারাতারি অমু দরিয়া পার পার হওয়া দর্কার। অমু দরিয়া পার
হতে পারলেই তো শৈবানি খাঁর থেকে নিরাপদ হতে পারব।
এভাবে বাবর নানান দুঃখ-কষ্ট, বাধা-বিঘ্নের মধ্য দিয়ে এগোতে লাগলেন। অমু
দরিয়া পার হয়ে তিনি একটি সুখবর পেলেন। তিনি একটি পত্রও পেলেন হিসার থেকে।
বাবর কখনও কখনও কথা প্রসঙ্গে কাশিম বেগকে ভবিষ্যত বাণী করে বলছিলেন- শৈবানি
খাঁ একজন সাম্রাজ্যলোভী শয়তান। সে একদিন সমগ্র মাউরা উন্নহর দখলের জন্য চেষ্টা
চালাবে। বর্তমান সে হিসারের সাথে বন্ধুত্বের অভিনয় করলেও সুযোগ পেলেই সে হিসার
গ্রাস করার জন্য চেষ্টা করবে।
কাশিম বেগের সাথে বলা এইসব কথা-বার্তা তাহির বেগও শুনেছিলো। অমু দরিয়া পার
হওয়ার সাথে সাথে বাবরের ভবিষ্যত বাণী সফল হওয়াতে সে বাবরের প্রতি অধিক
শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠলো।
অমু দরিয়া পার হওয়ার সাথে সাথে তাঁরা খবর পেলেন যে শৈবানি খাঁ হিসার আক্রমণ
করেছে।
হিসারের শাসক খশ্রু একজন কাপুরুষ স্বভাবের শাসক ছিলেন। তিনি শৈবানি খাঁর
বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ভয় পেয়ে সেনাবাহিনী শত্রুর হাতে ছেড়ে দিয়ে একাই পালিয়ে
গেছেন। বেগবর্গই বর্তমান শত্রুর হাত থেকে হিসার রক্ষা করার জন্য যুদ্ধ পরিচালনা করতেছেন।
কাশিম বেগ বর্তমান হিসারে রয়েছেন। হিসারের বেগবর্গ কাশিম বেগের সাথে পরামর্শ
করে বাবরকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। সিদ্ধান্ত মর্মেই
তাঁরা বাবরকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তাঁরা বাবরকে পত্র লিখে পাঠিয়েছেন যে, হিসারের
সিংহাসন এখন শূন্য পড়ে রয়েছে। সেজন্য আপনি অতিসত্বর হিসার আসুন। হিসার এলেই
আপনাকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করে শৈবানি খাঁর বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ যাত্রা করা করব।
তবে, বাবর
আমন্ত্রণ অস্বীকার করলেন। তিনি ভাবলেন, বেগদের বিশ্বস্ততার কী
প্রমাণ রয়েছে। তাঁকে ডেকে নিয়ে তাঁরা শৈবানি খাঁর হাতে সমর্পণও তো করতে পারে!
সেজন্য বাবর তাঁদের ডেকে পাঠালেন- যদি আপনারা আমাকে সমর্থন করেন, তাহলে আপনারা নিজেই এখানে আসুন।
হিসারের বেগবর্গ এবং বাবরের মধ্যে বুঝা-পড়া হওয়ার আগেই শৈবানি খাঁ হিসার দখল
করলেন। শৈবানি খাঁর পরিকল্পিত আক্রমণের সম্মুখে টিকতে না পেরে খশ্রুর ত্রিশ হাজার
সেনা লণ্ড-ভণ্ড হয়ে পড়ল। ফলে হিসারের বেগদের মধ্যে বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি
হলো। অনেকেই শৈবানি খাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করলো। তবে, আত্মমর্যদাসম্পন্ন কয়েকজন বেগ
শৈবানি খাঁর বশ্যতা স্বীকার করতে কষ্ট পেয়ে বিশৃংখল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে
যত্নপর হলো এবং সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একজন শাসক তালাশ করতে লাগলো।
সেজন্য সগা নিয়ানি নামক বেগ একজন চারশত সেনা নিয়ে বাবরের নিকট এলো।
সগা নিয়ানি নিজে আশা করার থেকেও বেশি সন্মান দিয়ে বাবর তাঁকে উজির-এ-আজম পদে
অধিষ্ঠিত করলেন।
সগা নিয়ানির পরে আরও কয়েকজন বেগ এসে বাবরের সাথে মিলিত হলো। ফলে বাবরের
ভাগ্যাকাশ আবার মেঘমুক্ত হলো।
বাবর মাত্র দুই শত চল্লিশজন সেনা নিয়ে অমু দরিয়া পার হয়েছিলেন। চার মাসের
ভেতরে তাঁর সেনা সংখ্যা চার হাজারে বৃদ্ধি পেলো। কাশিম বেগকেও বাবর হিসার থেকে
ডেকে আনালেন। সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধির পরে বাবর নিজের বাহিনী নিয়ে কাবুলের দিকে
অগ্রসর হয়ে কাবুল অবরোধ করেন। অবরোধের ফলে কাবুলের বিতর্কিত শাসক মুকিন বেগ কাবুল
ছেড়ে দিয়ে কান্দাহার পিছু হটতে বাধ্য হয়। তখন বাবর কাবুল এবং গজনী অঞ্চল নিয়ে
একটি নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নতুন রাজ্য তাঁকে উজবেক সমস্যা থেকে অবসর
দিয়েছিলো।
বাবর হিরাতের সুলতান তথা তাঁর দূর সম্পর্কের আত্মীয় মির্জা হোসেন বায়কারার
সাথে মিলিত হয়ে উভয়ের শত্রু উজবেক শৈবানি খাঁর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার কথা
ভেবেছিলেন। সেজন্য বাবর হিরাত এসে হোসেন বায়কারার সাথে মিলিত হয়েছিলেন। তবে
অভিযান শুরু করার আগেই হোসেন বায়কারার মৃত্যুর হয়। হোসেন বায়কারার মৃত্যুর পরে
বাবর হিরাতের নবনিযুক্ত শাসক মুজাফ্ফরের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। বাবর সতের দিন হিরাতে ছিলেন।
বাবরকে উষ্ণিয়ার একটি ভব্য প্রাসাদে থাকতে দেওয়া হয়েছিলো। প্রাসাদটা বিখ্যাত শায়ের আলীশের নবাইর বাসস্থান ছিলো। প্রাসাদের উঁচু দরজা, নীল গম্বুজ এবং বিভিন্ন কারুকার্য প্রত্যক্ষ করে বাবরের সমরকন্দে অবস্থিত উলুগ বেগের মাদ্রাসার কথা মনে পড়ে গেলো।
প্রাসাদের একটি কক্ষে আলীশের নবাইর গ্রন্থাগার ছিলো। বাবর আগ্রহ সহকারে গ্রন্থগুলো পড়তে লাগলেন এবং নিজেও কাব্য চর্চায় মনোনিবেশ করলেন। সতের দিনে তিনি অনেক গজল লিখে ফেললেন।
মুজাফ্ফর একদিন একটি ভোজ উৎসব পেতে বাবরকে নিমন্ত্রণ জানালেন। ভোজ উৎসবে ‘মৈনাব’(এক প্রকার তেজী ও সুগন্ধি সুরা) অবাধে পরিবেশন হচ্ছিল। বাবরকেও মৈনাব পরিবেশন করা হলো।
হিরাতের সুপ্রসিদ্ধ গায়কবর্গ সাবলীল সংগীত পরিবেশন করছিলেন। বাবর পূর্বে কোনোদিন সুরাপান করেননি। সংগীতের লহরে তিনি এতই মুগ্ধ হয়ে পড়ছিলেন যে, সেদিন তাঁরও সুরা পান করতে ইচ্ছে হলো।
কাশিম বেগ তাঁর নিকটেই বসেছিলেন। অভ্যাসবশতঃ তিনি কাশিম বেগের দিকে তাকালেন।
কাশিম বেগ নিজে ধর্মভীরু ছিলেন এবং কোনোদিন সুরা পন করেন নি। বাবরকেও তিনি সুরা পান থেকে বিরত থাকার জন্য সব সময় উপদেশ দিতেন। বাবর কাশিম বেগের দিকে তাকানোয় তিনি বাবরের মনোভাব উপলব্ধি করতে পেরে বাবরের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন- জাহাজনা, বদিউদ জামানও সেদিন আপনাকে সুরা পান করতে বলেছিলেন; তবে, সেদিন আপনি সুরা পান করেন নি। আজ যদি আপনি সুরা পান করেন, বদিউদ জামান শুনলে খারাপ পেতে পারে।
কাশিম বেগ বলা কথাটা মিথ্যা নয়। বদিউদ জামান এবং মুজাফ্ফর উভয়ে ভ্রাতৃ। কিন্তু ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে মোটেই সদ্ভাব নেই। সেদিন বদিউদ জামানও বাবরকে একটি ভোজ উৎসবে নিমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন। সেদিনকার উৎসবেও অবাধ সুরা পরিবেশন হচ্ছিল। বদিউদ জামান তাঁকে সুরা পানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে সেদিন বাবর সুরা পান করেন নি। সেজন্য বাবর সুরা পানের ইচ্ছা দমন করে বললেন- ক্ষমা করবেন মির্জা সাহেব। আমি পূর্বে কোনোদিন সুরা পান করিনি।
ইতিমধ্যে মুজাফফরের নেশা হয়ে গিয়েছিলো। সুরার নেশায় তিনি সাধারণ ভদ্রতাটুকুও ভুলে গেলেন। বাবরকে উদ্দেশ্য করে তিনি অশিষ্টতাপূর্বকভাবে বললেন কেন, আপনি সুরা পান করতে ভয় করেন নাকি? আন্দিজান এবং সমরকন্দের লোকেরা সুরা পান করেনা নাকি? তবে আপনি কেমন করে আনন্দ প্রকাশ করেন?
মুজাফ্ফরের কথায় বাবর একটু আহত হলেন যদিও নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন- এ রকম আনন্দ সমরকন্দ এবং আন্দিজানে বেশি উপভোগ করা হয়। আসলে আমি শরিয়তের বিধান মেনে চলতে চাই। সেদিন আপনার ভ্রাতৃ বদিউদ জামানের ভোজ উৎসবেও আমি সুরা পান করিনি।
বদিউদ জামানের নাম শুনামাত্র মুজাফফর গম্ভীর হয়ে উঠলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, বদিউদ জমান নিজেও তো শরিয়তের বিধান মেনে চলে। তবুও তো তিনি সুরা পান করেন। আসলে বাবর একজন নিবোধ।
মুজাফফর বাবরকে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও, বাবরকে পরিবেশন করা সুরার পাত্রটি তিনি উজির-এ-আজম জুন্নুন বেগ আগুনকে পরিবেশন করার জন্য পরিচারককে নির্দেশ দিলেন। পরিচারক সেই নির্দেশ পালন করলেন।
মুজাফ্ফর উন্মাদপ্রায় হয়ে উঠেছিলেন। তিনি নিলর্জ্জের মতো নাচতে শুরু করলেন।
মুজাফ্ফরের অধঃপতন দেখে কাশিম বেগ বাবরের কানের কাছে মুখ এনে বললেন- এই অকর্মণ্য বাদশাহের সাথে এখন আপনি কোনো কথা বলা উচিত হবে না। তদুপরি এর স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করারো কোনো অধিকার নাই। এর মাতৃ খাদিজা বেগমের নির্দেশ মতো সব কাজ চলে। চলুন, আমরা তাঁর সাথে কথা বলিগে’।
শৈবানি খাঁ একটার পর একটা দেশ জয় করে খোরাসানের সীমা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছিলেন। খবরটা শুনার পর থেকে বাবর উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছিলেন। শৈবানি খাঁ হিরাত পর্যন্ত এসে পৌঁছোলেও আচরিত কথা হবে না। সেজন্য তিনি এই বিষয় মুজাফ্ফরের সাথে পরামর্শ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মুজাফ্ফরের পরিবর্তে কাশিম বেগ খাদিজা বেগমের সাথে পরামর্শ করার কথা বলাতে বাবর ইতস্ততঃ করে বললেন- কিন্তু মাতৃর সাথে আলোচনা করলে মুজাফ্ফর খারাপ পাবেন না?
কাশিম বেগ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন- কিছুই হবে না। এ বিষয়ে আমি খাদিজা বেগমের সাথে আগেই আলোচনা করেছি। তিনি এখন আপনার জন্য অধীরভাবে অপেক্ষা করেতেছেন হয়তো।
বাবর মুজাফ্ফরের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে খাদিজা বেগমের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য বের হলেন। তাঁর সাথে বের হলেন কাশিম বেগ, জুন্নুন বেগ, বুরন্দুক বেগ। তাঁরা নরম কোমল কার্পেট মাড়িয়ে উপর মহলায় উঠে এলেন।
খাদিজা বেগম বাবরকে ভব্য অভিজাত একটি কক্ষে বসতে দিলেন। ঐশ্বর্য সম্ভার প্রদর্শনের জন্যই হয়তো খাদিজা বেগম বাবরের সন্মুখে খাঁটি সোনার ছয় পায়ার একটি টেবিল পেতে দিলেন। কক্ষটি সোনা, হীরা, জহরত আদি করে অনেক মূল্যবান আসবাব এবং নানান উপকরণ দিয়ে সজ্জিত ছিলো। দরজা, খিড়কিসমূহেও ছোট ছোট অনেক মুক্তা ঝিলমিল করছিলো। চারদিকে ঝিলমিল করে থাকা উজ্জ্বলতার তীব্রতার মধ্যে বুক ফুলিয়ে বসে থাকা খাদিজা বেগমকে বাবরের মনে চল্লিশ বছরের অপূর্ব সুন্দরীর মতো অনুমান হলো। তাঁর শরীরে কোনো রকমের অলঙ্কার ছিলো না। শুধু তাঁর কারুকার্যখচিত কালো পোশাক জোড়া রুপোর মতো ঝিলমিল করছিলো। তাঁর মাথায় ছিলো বহুমূল্যবান হীরা মুক্তাখচিত শংকু আকারের টুপি। তাঁর পরিচারিকা কয়জনের পরনে ছিলো রঙবিরঙের পোশাক। সেই পোশাকের ঝিলমিল আভায় বাবরের চোখ ঝলসে নিতে লাগলো।
ভব্য অভিজাত বিলাসী মহিলাটির সাথে বাবর কীভাবে কথা শুরু করবেন সেটা মনে মনে ভাবতে লাগলেন।
খাদিজা বেগম শান্ত স্নিগ্ধ মুচকি হাসি হেসে প্রথমে কথা শুরু করলেন- মির্জা সাহেব, আপনি আমাদের মেহমান। খাদিজা বেগম পরিচারিকা কয়জনের দিকে ইশারা করে বললেন- এরা সবাই আমার পুত্রবধূ। মুজাফ্ফরের বেগম। এরাও আপনাকে যথেষ্ট সন্মান করে। খাদিজা বেগম কৃত্রিম লজ্জামিশ্রিত হাসি হেসে বললেন- লজ্জা করবেন না। কথা শুরু করুন।
ধন্যবাদ। বাবর এর থেকে বেশি কিছু বলতে পারলেন না।
মমবাতির ক্ষীণ ধূসর আলোতে মহিলাদের অর্দ্ধাবৃত মুখমণ্ডল দেখে বাবরের পক্ষে তাঁদের বয়স অনুমান করা কঠিন হলো। মেহেন্দি রাঙানো হাত, উন্নত বুক এবং সরু কোমর দেখে মহিলা কয়জন যুবতী বলে অনুমান হলো বাবরের।
মুজাফ্ফরের সবচেয়ে প্রিয় বেগম কারাকোজ বেগম শাশুড়ির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে কিছু বলে হেসে ফেললেন।
খাদিজা বেগমও তাঁর সাথে হাসিতে যোগ দিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন- মির্জা সাহেব হিরাত রাজবংশের প্রতেকজন যুবতী আপনাকে কামনা করে বলে আমি শুনে আসছি। কিন্তু আপনার মতো এতো ক্ষমতাশালী একজন বাদশাহ, সাহসী নওজোয়ান এবং খ্যাতিমান কবি এখন পর্যন্ত অবিবাহিত থাকাটা সত্য নাকি?
বাবর লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠলো। তিনি বিবাহিত, না অবিবাহিত এ কথা জেনে এদের লাভ কী? তদুপরি তিনি যে অবিবাহিত এ কথাও সবাই অবগত। এরাও নিশ্চয় অবগত। তবুও সব জেনেশুনেও এ রকম ব্যক্তিগত প্রশ্ন উত্থাপন করার কারণ কী?
আমার বিশ্বাস, ভাগ্য আপনার উপরে প্রসন্ন। আপনি মুজাফ্ফরের ভ্রাতার মতো। আপনারা উভয়ে তৈমূর বংশীয়। আপনি হিরাতে মুজাফ্ফরের সাথে থেকে যান। হিরাতের সবচেয়ে সুন্দরী কন্যার সাথে আমি আপনার বিয়ে দিয়ে দিব।
লঘু হাসি-তামাশার আড়ালে অবশ্যেই গম্ভীর সংকেত প্রচ্ছন্ন হয়ে ছিলো। সাধারণ দৃষ্টিতে কথাগুলো লঘু যেন লাগলেও কথাগুলোর মাঝে লুকিয়ে ছিলো দূরদর্শী খাদিজা বেগমের গভীর ষড়যন্ত্র। মুজাফ্ফর এবং বদিউদ জামান উভয়ে তাঁর গর্ভজাত সন্তান হলেও তিনি মুজাফ্ফরকে বেশি স্নেহ করেন। মুজাফ্ফর চিরদিন বাদশাহ হয়ে থাকাটা তিনি মনে-প্রাণে কামনা করেন। সেজন্য সিংহাসন নিষ্কণ্টক করার জন্য তিনি সিংহাসনের সাম্ভাব্য দাবিদার মির্জা মোমিন এবং সুলতান হোসেনকে আগেই হত্যা করিয়েছেন। বর্তমান বদিউদ জামানই মুজাফ্ফরের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বি। বদিউদ জামানকে সরাতে পারলেই মুজাফ্ফর নিষ্কণ্টক। সেজন্য তিনি বিয়ের টোপ দিয়ে বাবরকে মুজাফ্ফরের ভ্রাতৃ করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কাজটায় সফল হলেই তিনি ঈস্পিত লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারেন।
আমার জন্য চিন্তা করার জন্য আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। বাবর কৃত্রিম প্রশংসা করে খাদিজা বেগমকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য বললেন- কিন্তু আমাদের রাস্তায় প্রাচীর দাঁড়িয়ে রয়েছে।
প্রাচীর! কেমন প্রাচীর? খাদিজা বেগম উৎকণ্ঠিতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন।
মাফ করবেন। সেসব কথা .....বাবর পরিচারিকা কয়জনের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে, পরে খাদিজা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলনে- এই ভদ্র মহিলাদের সন্মুখে সেসব কথা বলতে আমি লজ্জাবোধ করছি।
বাবর মাথা নত করলেন। খাদিজা বেগম পরিচারিকাদের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। ইংগিত পেয়ে পরিচারিকাবর্গ কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো।
বাবর গুরু গম্ভীরভাবে শুরু করলেন- মালিকা সাহেবা, আমার দিকে বর্তমান এক সংকটময় মুহূর্ত মুখব্যাদান করে এগিয়ে আসছে। সেই সংকটের নায়ক হলো শৈবানি খাঁ। শৈবানি খাঁ আন্দিজান থেকে শুরু করে খোরাসান, মর্ব, তুর্কিস্থান দখল করে এক বিশাল বাহিনী গঠন করেছেন। তিনি প্রত্যেকটা যুদ্ধের আগে অতি নিখুঁত যোজনা প্রস্তুত করে নেন। ফলে তিনি যখন যুদ্ধে অবতীর্ণ হন অতি সতর্ক এবং নিপুণ যোদ্ধাও তাঁর সন্মুখে টিকতে পারেনা। আমি নিজ চোখে তাঁর সেই যুদ্ধ কৌশল প্রত্যক্ষ করেছি।
বাবর এইভাবে বলে শৈবানি খাঁর সৈন্যবল এবং ক্রুরতার বিষয়ে দু-চারটে উদাহরণও দিলেন।
খাদিজা বেগমের মুখমণ্ডল ভয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠলো। তিনি অতিশয় বিচলিত কণ্ঠে বললেন- আমরা সেই আপদ কেমনে দূর করতে পারবো, বলুন? আপনার বর্ণনা শুনেই আমার হাতপা জঠর হয়ে আসছে।
খদিজা বেগমকে ভয় পাওয়া দেখে বাবর উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন- সেই বিপদ থেকে পরিত্রাণের উপায়
নিশ্চয় বের হবে। কিন্তু তার আগে আমরা শত্রুতা ভুলে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা সকল তৈমুর বংশীয় লোকদের একত্রিত করে এক সন্মিলিত বাহিনী গঠন করতে হবে। যেসব স্থানে আমাদের শাসক পরিবর্তন হয়েছে সেই সব স্থানে নতুন সেনা ভর্তি করে আমরা একসাথে প্রশিক্ষিত হতে হবে। আমাদের সন্মিলিত বাহিনীতে কমেও পঞ্চাছ যাঠ হাজার সৈন্য থাকতে হবে।
কিন্তু সেই বাহিনীর সেনানায়ক কে হবে? খাদিজা বেগম সজাগ হয়ে উঠলেন।
কাশিম বেগ অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে বাবরের দিকে তাকালেন। কাশিম বেগের মতে একমাত্র বাবরই সেই সেনা বাহিনীর নায়ক হওয়ার জন্য উপযুক্ত। বাবর নিজেও নিজেকে সেই বাহিনীর নায়ক হওয়ার জন্য উপযুক্ত বলে ভাবছিলেন এবং সেনানায়ক হওয়ার ইচ্ছাও ছিলো। কিন্তু বাবর এ কথাও জানছিলেন যে, খাদিজা বেগম কখনও তাঁকে সমর্থন করবেন না। তিনি একমাত্র মুজাফ্ফরকে এই ক্ষেত্রে সমর্থন করবেন।
সেজন্য বাবর খাদিজা বেগমকে সন্তুষ্ট করার জন্য মুজাফ্ফরে কথা বলতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু বদিউদ জামানের উজির-এ-আজম জুন্নুন বেগ সেখানে উপস্থিত ছিলো। সেজন্য তিনি কথাটা সরাসরি না বলে দ্ব্যর্থবোধকভাবে বললেন- সেনানায়ক কে হবেন, সেই সিদ্ধান্ত হিরাতের দুই শাসক ভ্রাতৃয়ে নেওয়া উচিত হবে।
খাদিজা বেগম উপস্থিত বেগদের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য সন্ধানী দৃষ্টিতে বেগদের দিকে তাকালেন।
জুন্নুন বেগ দাঁড়িয়ে বললেন- আমাদের মহামান্য মেহমান শৈবানি খাঁর শক্তি এবং চতুরতা সম্পর্কে আমাদের সচেতন করার জন্য আমি মহামান্যকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। কিন্তু আমার বিশ্বাস শৈবানি খাঁ মাউরা উন্নহরে বিজয় সাব্যস্ত করতে পারলেও খোরাসানে তার পরাজয় অনিবার্য। সেজন্য আমরা এ বিষয় নিয়ে এখনই ব্যতিব্যস্ত হওয়ার কোনো অর্থ দেখছি না। যদি মহামান্যই বলা ধরণে শৈবানি খাঁ খোরাসানের দিকে হাত বাড়ায় তখন কাঁথা দেখে পা মেললেই হবে। কারণ আমাদের সেনাবলও তো কম নয়!
খাদিজা বেগম ছোট ছেলে মুজাফ্ফরের পক্ষে ছিলেন এবং মুজাফ্ফরই বাবরের কল্পিত সেনা বাহিনীর নায়ক হওয়াটা কামনা
করছিলেন। কিন্তু বাহিনী গঠন হওয়ার পরে যদি বদিউদ জামান সেনা বাহিনীর নায়ক হয়! এই সন্দেহের শিকার হয়েই তিনি জুন্নুন বেগকে সমর্থন করে বললেন- আমিও বেগ সাহেবকে সমর্থন করছি। সদ্য সন্মিলিত বাহিনীর চিন্তা না করাটাই উত্তম হবে।
সেদিনের আলোচনা সেখানেই ইতি টেনে পরের দিন বদিউদ জামানের নিকট গিয়ে বাবর সেই একই প্রস্তাব রাখলেন। বদিউদ জামানও তাঁকে নিরাশ করলেন। সন্মিলিত বাহিনী গঠন করলে যদি তিনি নায়ক হতে না পারেন, এই সন্দেহের বশবর্তী হয়েই তিনি বাবরের প্রস্তাব প্রত্যাখান করলেন।
সন্মিলিত বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে নিরাশ হয়ে বাবর কয়েকদিন পরে সৈন্যসামন্ত নিয়ে কাবুল অভিমুখে যাত্রা করলেন।
কাবুলের সিংহাসন তখন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে ছিলো। সেজন্য কাবুলের বেগবর্গ সর্বসম্মতিক্রমে বাবরকে কাবুলের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করলেন। সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েই তিনি হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য সেনা সংগ্রহে মনোনিবেশ করলেন।
বাবর কাবুলের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার কিছুদিন পরেই বাবরের ভবিষ্যত বাণী ফললো।
শীতকাল শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শৈবানি খাঁ তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে হিরাতের দিকে এগিয়ে এলেন। মুজাফ্ফর এবং বদিউদ জামান দুর্যোগের সময়েও বিদ্বেষ ভুলে একত্রিত হতে পারল না। তাঁরা পৃথকে পৃথকে শৈবানি খাঁর গতিরোধ করতে চেষ্টা করে বিফল হলো। ফলে দুই ভ্রাতৃ শৈবানি খাঁর হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো।
যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বদিউদ জামান ধন-সম্পত্তি ঘোড়ার পিটে বোজাই দিয়ে আত্মীয়-স্বজন নিয়ে কান্দাহার পালিয়ে গেলেন। অন্যদিকে মুজাফ্ফর আত্মীয়-স্বজন শত্রুর হাতে ছেড়ে দিয়ে পশ্চিম দিকে অবস্থিত আস্তারাবাদের দিকে শুধু নিজের জীবন নিয়ে পালিয়ে গেলেন।
শৈবানি খাঁর বিজয়োন্মত্ত সেনারা অবাধে লুটপাটের তাণ্ডব চালালো। দুই রাজকীয় ভ্রাতৃর বিশিষ্ট লোকগুলোর উপরে চালালো অকথ্য নির্যার্তন। ‘আর্ক’-এ অবস্থানরত মহিলাদের খুঁজে খুঁজে বের করে অমানবীয় পশুসূলভ আচরণ করতেও তারা কুণ্ঠাবোধ করল না। অমানুষিক বর্বর অত্যাচারের ফলে হিরাতের জনতা আতঙ্কিত হয়ে উঠলো। লুটপাটের তাণ্ডবে তারা সর্বহারা হয়ে পড়লো। রাজ পরিয়াল এবং সর্বসাধারণ জনতার নিরাপত্তা ও শান্তি সমুলঞ্চে রইল না।
শৈবানি খাঁ আর্ক থেকে জুর-জুলম করে ধরে এনে মুজাফ্ফরের মাতৃ খাদিজা বেগমকে মনসুর বক্সী নামক একজন বেগের সাথে নিকাহ দিলো এবং নিজে মুজাফ্ফরের বেগম কারাকোজ বেগমকে নিকাহ করলেন।
রাতের পরে দিন এবং দিনের পরে রাত এটাই হলো সৃষ্টির নিয়ম। হিরাত দখলের কিছুদিন পরে শৈবানি খাঁর ভাগ্যাকাশ পরাজয়ের কালো মেঘে ছেয়ে ফেললো। তাঁর অন্যায় অত্যাচারের খবর পেয়ে ইরানের শাসক ইসমাইল ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে হিরাতের দিকে রওয়ানা হলেন। ইসমাইলের আগমনের খবর পেয়ে শৈবানি খাঁ ইসমাইলকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিজের বাহিনী নিয়ে বের হলেন। কিন্তু ইসমাইলের সাথে সংঘটিত সন্মুখ সমরে শৈবানি খাঁ শোচনীয়ভাবে পরাজয় হলো। শৈবানি খাঁ নিজেও নিহত হলেন উক্ত সমরে। ইসমাইলের সেনারা শৈবানি খাঁর মাথা কেটে বাদশাহকে উপহার দিলেন। সাথে সাথে একজন লোভী, বর্বর, বিভীষিকাময় শাসকের কলঙ্কিত জীবনের অন্ত হলো।
ইসমাইল হিরাত অধিকার করে শৈবানি খাঁর সম্পত্তি এবং মহিলাদের তাঁর অধীনে আনলেন। পূর-নারীদের ভেতর বাবরের ভগ্নী খানজাদা বেগমও ছিলো। খানজাদা বেগম তখন শৈবানি খাঁর আট বছরের পুত্র সন্তানের জননী।
এদিকে ইসমাইল হিরাত আক্রমণের সময়ে বাবর ইসমাইলকে সহায় করার জন্য নিজের বাহিনী নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু সহায়ের প্রয়োজন হবে না বলে ইসমাইল বাবরকে বলে পাঠানোতে বাবর নিজের হৃতরাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য আন্দিজান এসে অনায়াসে আন্দিজান দখল করলেন। আন্দিজান দখলের পরে বাবরের মনোবল বৃদ্ধি পেলো এবং তিনি হিসার দখল করার জন্য হিসার অভিমুখে রওয়ানা হলেন।
হিসার আক্রমণ করতে এসে বাবর কুন্দুজ নামের একটি স্থানে তাঁবু স্থাপন করলেন। তখনই বাবর শৈবানি খাঁর পরাজয়ের সংবাদ পেলেন। ইসমাইল শৈবানি খাঁর পুর নারীদের আটক করার সংবাদ পেয়ে বাবর তাঁর ভগ্নী খানজাদা বেগমকে মুক্ত করে দেওয়ার জন্য ইসমাইলকে একটি পত্র প্রেরণ করলেন। ইসমাইল বাবরের ভব্যতা, সভ্যতা এবং ক্ষমতার বিষয়ে ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। সেজন্য পত্র পেয়েই তিনি খানজাদা বেগমকে মুক্ত করে দিলেন।
মুক্তি পেয়ে খানজাদা বেগম তাঁর আট বছরের সন্তান খুরমকে নিয়ে কুন্দুজ এসে বাবরের সাথে মিলিত হলেন। সুদীর্ঘ আঠ বছর পরে ভগ্নীকে দেখে বাবরের চোখের জল বেরিয়ে এলো। দীর্ঘদিন পরে ভ্রাতৃ-ভগ্নীর মিলনের ফলে ছাউনির সবাই উৎফুল্লিত হয়ে উঠলেন।
* * *
কুন্দুজ!
কুন্দুজ চারদিকে পাহাড় ঘেরা হিন্দুকোশ পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত এক দুর্গম নিচু জলাশয় স্থান। নিরাপত্তার খাতিরেই বাবর দুর্গম স্থানে ছাউনি পেতে হিসার আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি চালাচ্ছিলেন। যুদ্ধের প্রস্তুতি চলে থাকতেই বাবর অন্য এক বিপর্যয়ের সন্মুখীন হলেন।
শৈবানি খাঁ নিহত হওয়ার পরে তাঁর একাংশ সেনা ইসমাইলের রোষ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য বাবরের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। সেই সেনাদলের একাংশ সেনা বাবরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। কথাটা কাশিম বেগমের কানে পড়ল। বিদ্রোহী সেনাদের দলপতি ছিলো কবচ খাঁ নামক একজন বেগ। তাঁর অধীনে বিশ হাজার সেনা ছিলো। সেনাগুলো সুক্ষিশিত এবং যুদ্ধ পাগল ছিলো। ভাড়াটিয়া হিসাবে যুদ্ধ করাই ছিলো তাদের জীবন নির্বাহের একমাত্র উপায়। যে পক্ষ থেকে টাকা পেতেন সেই পক্ষের হয়েই তারা যুদ্ধ করতো। যে পক্ষের হয়ে যুদ্ধ করে লুটপাট করে অধিক ধন-সম্পত্তি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখত সেই পক্ষের হয়ে তারা যুদ্ধ করতে অধিক আগ্রহী ছিলো। বাবরের জয়ের পূর্বাভাষ পেয়েই তারা বাবরের দলে যোগদান করেছিলো। সেই সেনাদলে শৈবানি খাঁর সাথে সুসম্পর্ক থাকা সেনা সংখ্যাই ছিলো অধিক।
এদিকে কবচ খাঁর সাথে বাবরের ব্যক্তিগত শত্রুতাও ছিলো। কাবুলে থাকাকালীন কবচ খাঁর একজন ভ্রাতৃ গত বছর বাবরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলো। কথাটা অবগত হয়ে বাবর তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিলেন। সেটাই ছিলো বাবরের প্রতি কবচ খাঁর শত্রুতার প্রকৃত কারণ। ফলে বাবরের উপরে ভ্রাতৃ হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যেই সে এখান ওখান থেকে সেনা সংগ্রহ করে বাবরের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। তবে, রাজবংশোদ্ভব লোকের অভাবেই সে তার প্রতিশোধ স্পৃহা পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। কারণ বিদ্রোহ ঘোষণা করতে হলে একজন রাজবংশোদ্ভব লোকের প্রয়োজন হবে এবং তাঁর অধীনে সেনাবাহিনী পরিচালনা করতে হবে। তা না হলে অন্যান্য শাসকেরা গর্জে উঠে বাবরের পক্ষ নেবেন। এদিকে কবচ খাঁর সাথে বাবরের ব্যক্তিগত শত্রুতাও ছিলো। কাবুলে থাকাকালীন কবচ খাঁর একজন ভ্রাতৃ গত বছর বাবরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলো। কথাটা অবগত হয়ে বাবর তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিলেন। সেটাই ছিলো বাবরের প্রতি কবচ খাঁর শত্রুতার প্রকৃত কারণ। ফলে বাবরের উপরে ভ্রাতৃ হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যেই সে এখান ওখান থেকে সেনা সংগ্রহ করে বাবরের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলো। তবে, রাজবংশোদ্ভব লোকের অভাবেই সে তার প্রতিশোধ স্পৃহা পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। কারণ বিদ্রোহ ঘোষণা করতে হলে একজন রাজবংশোদ্ভব লোকের প্রয়োজন হবে এবং তাঁর অধীনে সেনাবাহিনী পরিচালনা করতে হবে। তা না হলে অন্যান্য শাসকেরা গর্জে উঠে বাবরের পক্ষ নেবেন।
বাবরের চাচা
আলাসা খাঁর সতের বছরের পুত্র সৈয়দ খাঁ বাবরের সেনা বাহিনীর একজন সদস্য ছিলো।
সৈয়দ খাঁর উপরে কবচ খাঁর চোখ যায় এবং সে তার অভীষ্ট সিদ্ধির উদ্দেশ্যে সৈয়দ
খাঁকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার জন্য তৎপর হয়ে উঠে। সে সাম্রাজ্যের লোভ
দেখিয়ে সৈয়দ খাঁকে নিজের জালে ফেলার চেষ্টা চালায়। কিন্তু সৈয়দ খাঁ ছিলো
বিশ্বস্ত ও বুদ্ধিমান। সেজন্য সৈয়দ খাঁ সরাসরিভাবে প্রস্তাবটা প্রত্যাখান না করে
তার মতামত পরে ভেবেচিন্তে জানাবে বলে সময় নিয়ে গোপনে কাশিম বেগকে কথাটা অবগত
করে।
কাশিম বেগ
অতি গোপনে কথাটা বাবরকে অবগত করেন। কথাটা শুনে বাবর গর্জে উঠলেন- শঠ প্রবঞ্চক!
তোরা আমার পিঠে আর কতদিন ছুরিকাঘাত করে থাকবি। এভাবে বলেই কাশিম বেগকে উদ্দেশ্য
করে বললেন- আহম্মদ তনয়ালের কথা আপনার নিশ্চয় মনে আছে, বেগ সাহেব? আহম্মদ তনয়ালও একজন মোগল ছিলো। তাকে বিশ্বাস করে ক্ষমা করেছিলাম এবং এই
উদারতার জন্য সে আমাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা করার সুযোগ পেয়েছিলো। আমি অনেক সহ্য
করেছি। আর সহ্য করব না। আপনি ষড়যন্ত্রকারীদের বন্দি করে কেটে টুকরো টুকরো করে
শিয়াল-কুকুরকে বিলিয়ে দিন।
তাঁরা
গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্যই একটি পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে আলোচনা বলতেছিলেন।
বাবরের রাগ দেখে কাশিম বেগ সচকিত হয়ে উঠলেন এবং তিনি পাহাড়ের পাদদেশের দিকে
দৃষ্টি প্রসারিত করলেন।
পাহাড়ের
পাদদেশে হাজার হাজার তাঁবু খাড়া করা ছিলো। তাঁবুগুলোর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে
তিনি শান্ত সমাহিত কণ্ঠে বললেন- কিন্তু জাহাপনা, ষড়যন্ত্রকারীরা যথেষ্ট শক্তিশালী। তাদের অধীনে বিশ
হাজারের অধিক সেনা রয়েছে।
সবগুলো মোগলই
এই ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত নাকি?
সম্ভবতঃ
সবগুলো নয়! সৈয়দ খাঁ তো মোগলই, সে দেখছি আমাদের প্রতি বিশ্বস্ততাই প্রদর্শন করতেছে। হয়তো বেশি সংখ্যক মোগলেরই
আমাদের প্রতি ভালো মনোভাব রয়েছে।
তাহলে
একমাত্র কবচ খাঁকে বন্দি করুন।
চিন্তার
গাম্ভীর্যে কাশিম বেগের ভ্রূযুগল কুঞ্চিত হয়ে উঠলো। তিনি হতাশা মিশ্রিত সুরে
বললেন- কিন্তু জাহাপনা, ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে কবচ খাঁর প্রভাবই সবচেয়ে বেশি। অনেক বেগ তাঁর
আত্মীয়ও। আমরা তার উপরে প্রতিশোধ নিতে গেলে বাকি বেগগুলো গর্জে উঠতে পারে এবং এর
প্রভাব হিসারের উপরেও পড়তে পারে।
কাশিম বেগের
ধারণা অমূলক ছিল না। বিশ হাজার সেনার মাঝে কে স্বপক্ষে এবং কে বিপক্ষে সঠিকভাবে
বলা কঠিন। তদুপরি শত্রু-মিত্র খুঁজে বের করতে হলেও যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। এদিকে যতদূর
সম্ভব সত্বর হিসার আক্রমণ করা প্রয়োজন। কিছুদিন পরেই বর্ষাঋতু শুরু হবে। বর্ষাঋতু
শুরু হলে সব রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাবে। রাস্তাঘাট বন্ধ হলে তখন হিসার আক্রমণ করা
সম্ভব হবে না।
সেজন্য বাবর
কাশিম বেগের যুক্তির সপক্ষে এবং বিপক্ষে নিজের মনে বিবেচনা করে দেখতে যত্নপর হলেন।
তবে বিপক্ষ যুক্তিই তাঁর মনে অধিক প্রভাব ফেললেন। যুক্তিতে হেরে অবশেষে রাগই
অসন্তোষের রূপ নিলো। নিরুদ্ধ আক্রোশে তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন- বিদ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক! কবচ খাঁ
বিদ্রোহীদের একত্রিত করে আমার উপরে আঘাত হানার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে!
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে তাকে আমি এরূপ শাস্তি দিব যে, তার
পরিনামের কথা ভেবে কেউ যেন ভবিষ্যতে আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সাহস না করে।
আপনি ঠিকই
ভেবেছেন, জাহাপনা। প্রবঞ্চকের বিরুদ্ধে
ন্যায়সংগতভাবে যুদ্ধ করা অবশ্যেই উচিত নয়। তবে, এই
ক্ষেত্রে আমি অন্য রকমে এগোনোর কথা ভাবছি।
অন্য রকমে!
কেমনে?
সৈয়দ খাঁ
আপনার বিশ্বস্ত। ষড়যন্ত্রকারীরা সৈয়দ খাঁকে তাদের নায়ক নির্বাচিত করার কথা
ভাবছে। সেজন্য আপনি তাদের মতামতকে সমর্থন করে সৈয়দ খাঁকে তাদের সাথে আন্দিজান
পাঠিয়ে দিন। আন্দিজান বর্তমান আমাদের অধীনে। সৈয়দ খাঁ সেখানে গিয়ে আন্দিজানের
শাসনভার নিজে সামলাকগে’। এভাবে আমি বর্তমান কবচ খাঁর হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
কিন্তু পরে
অন্যান্য বেগবর্গও যদি এর সুযোগ নিতে চায়?
অবশ্যে তেমন
হতে পারে! কাশিম বেগ কিছুক্ষণ ভেবে বলনে- আমি তারও ব্যবস্থা করব। আমি অন্যান্য
বিদ্রোহী বেগদের বুঝিয়ে বলব যে, তারা একমাত্র আমার জন্যই আপনার রোষ থেকে রেহাই পেয়েছে। ভবিষ্যতে কেউ এরকম
আচরণ করলে আমি তাদের রক্ষা করতে পারব না। তদুপরি আমরা তাদের উপরে সর্বদা চোখ রাখতে
হবে। যদি কখনো তাদের কোনো সন্দেহজনক আচরণ চোখে পড়ে তাহলে সাথে সাথেই তাদের বন্দি
করতে হবে।
সৈয়দ খাঁকে বিদ্রোহীদের সাথে আন্দিজান পাঠানোর মানে সৈয়দ খাঁকে বলি দেওয়ার মতোই ধারণা হলো বাবরের। সেজন্য কাশিম বেগের আত্মঘাতী পরামর্শ বাবরের পসন্দ হলো না। কিন্তু তিনি বিকল্প কোনো উপায়ও ভেবে পেলেন না। সেজন্য তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাশিম বেগের সাথে সহযোগ করতে বাধ্য হলেন এবং কাশিম বেগের যোজনা মতে কবচ খাঁর সাথে সৈয়দ খাঁকে আন্দিজান পাঠিয়ে দিলেন।
গ্রীষ্ম ঋতু শুরু হওয়ার সাথে সাথে বাবর সেনাবাহিনী নিয়ে পঞ্জ নদী পার হয়ে বুদুস ঘাটির দিকে অগ্রসর হলেন। ইরানের বাদশাহ ইসমাইল একদল কিজিলবাশ্বী(ইসমাইল ইরানের কিজিলবাশ্ব নামক স্থানের বাসিন্দা ছিলেন। সেজন্য ইরানের একাংংশ সেনাকে কিজিলবাশ্বী বলা হত।) সেনা বন্ধুত্বের চিহ্ন স্বরূপে বাবরের সহায়ের জন্য প্রেরণ করছিলেন। তারা তরমেজের নিকটে ছাউনি পেতে বাবরের আগমন অপেক্ষায় আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন।
বাবর বুদুস ঘাটির দিকে অগ্রসর হওয়ার কথা শুনে শৈবানি খাঁর পুত্র তৈমূর সুলতান
বিচলিত হয়ে উঠলো। সে জানতো যে, বাবর তরমেজের দিক দিয়ে এসে বুদুস ঘাটিতে ইসমাইলের সেনার সাথে মিলিত হলে
তার পরাজয় নিশ্চিত। সেজন্য সে নিজের বাহিনীর একটা অংশ উবেদুল্যা সুলতানের
নেতৃত্বে কর্শি ও সমরকন্দে রেখে মূল বাহিনী নিয়ে হিসার এসে আসন্ন আক্রমণ প্রতিরোধ
করার জন্য যোজনা প্রস্তুত করতে বাধ্য হলো। বাবর সেনা হিসার পৌঁছানোর আগেই সে এই
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো।
সিদ্ধান্ত
মর্মে তৈমূর সুলতান জানি বেগ, হামজাহ সুলতান এবং মেহেদি সুলতানের নেতৃত্বে ত্রিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল
বাহিনী নিয়ে স্তেপীর দিকে অগ্রসর হলো। তারা দ্রুত এসে স্তেপী পৌঁছোলেন।
স্তেপীতে বহস
নদীর পাড়ে একটি পাহাড় ছিলো। বাবর সেনা বহস নদী পার হয়ে সেই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে
উপরে উঠে অবস্থান নিতে পারে বলে অনুমান করে বাবর সেনা বহস নদী পার হওয়ার পূর্বেই
তাদের বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে তৈমুর সুলতান পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে আরোহণ করতে
লাগলো। কিন্তু পাহাড়ে উঠার মুখে তারা বাধার সম্মুখীন হলো।
তৈমূর
সুলতানের সেনা বাধার সম্মুখীন হওয়ার কারণ ছিলো বাবরের প্রত্যুৎপন্নমতিতা।
প্রত্যুৎপন্নমতিতার দৌড়ে বাবর তৈমুর সুলতানের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। তৈমূর সুলতান
ডালে ডালে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই বাবর পাতায় পাতায় হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
কারণ বাবর তাঁর পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে জানছিলেন, প্রতিপক্ষ সেনা তাঁদের বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে পাহাড়ের
উপরে উঠে অবস্থান নেওয়া সম্ভব। যদি তাই হয়, তখন পাহাড়ের
ঢাল বেয়ে উপরে উঠে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আক্রমণ সংঘটিত করা অসম্ভব হবে। সেজন্য
প্রতিপক্ষ সেনা এসে পৌঁছোনের আগেই বাবর সেনা সংগীন নামক স্থানে বহস নদী পার হয়ে
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরে উঠে এসেছিলো। প্রতিপক্ষ সেনা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপরের
দিকে উঠার সময়ে বাবর সেনা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নামছিলো। বাবর সেনার এক
বৃহৎ অংশ ইতিমধ্যেই পাহাড় থেকে উপত্যকার দিকে নেমে যাওয়া সংকীর্ণ পথের মুখে
অবস্থান নিয়ে মালভূমির উপরে চোখ রাখছিলো। প্রতিপক্ষ সেনা উপত্যকার দিকে নেমে
যাওয়া সংকীর্ণ পথের মুখে বাবর সেনা প্রত্যক্ষ করে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো এবং তারা
পাহাড়ে আরোহণ করা থেকে বিরত হয়ে কীভাবে উদ্ভব পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারে সে
বিষয়ে দলের মাঝে আলোচনায় মিলিত হলো।
বাবর পাহাড়ের
উপর থেকে প্রতিপক্ষ সেনার গতিবিধি নিরীক্ষণ করছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন যে, প্রতিপক্ষ সেনার বেগবর্গ পরস্পরের
সাথে শলা-পরামর্শ করে বিভিন্ন দিকে চলে গেলো। অল্পপরেই দশ হাজার সেনা নিয়ে সমতলের
দিকে নেমে যাওয়া রাস্তার দিকে তৈমুর সুলতানকে অগ্রসর হতে দেখলেন। প্রতিপক্ষের
গতিবিধি লক্ষ্য করে বাবর সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, প্রতিপক্ষ
সেনা তিনি দখল করে থাকা উঁচু স্থানটি সম্পূর্ণরূপে ঘেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েই
সেভাবে অগ্রসর হচ্ছে।
বাবরের
মস্তিষ্ক ক্রিয়াশীল হয়ে উঠলো। প্রতিপক্ষের মনোভাব উপলব্ধি করে তিনি বেগবর্গের
সাথে পরামর্শ করে মির্জা খাঁ নামক একজন বেগের নেতৃত্বে একদল সেনা প্রতিপক্ষ সেনা
বিশেষ করে তৈমূর সুলতানের নেতৃত্বে আসা সেনাদেরকে বাধা প্রদান করার জন্য প্রেরণ
করলেন।
তৈমূর
সুলতানের অধীনে আসা সেনা সরাসরি পাহাড়ের উপরে উঠে আসতে অসুবিধা হওয়ার জন্য
বৃত্তাকারে ঘুরে উঠে আসতে বাধ্য হলো। এই সুযোগে মির্জা খাঁ প্রতিপক্ষ সেনার আগে
গন্তব্য স্থানে এসে পৌঁছোলো এবং সমগ্র উঁচু স্থান দখল করে প্রতিপক্ষ সেনার আগমনের
জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।
তৈমূর সুলতান
গন্তব্য স্থানে পৌঁছে বাবর সেনাদের সমগ্র উঁচু স্থান দখল করে অবস্থান নেওয়া
প্রত্যক্ষ করে একটি সংকীর্ণ পথ বেয়ে পাহাড়ের উপরে উঠে আসতে লাগলো। মিজা খাঁ
প্রতিপক্ষের মনোভাব উপলব্ধি করতে পেরে সংকীর্ণ পথের মুখে একদল সেনা প্রেরণ করলো।
ফলে দুই পক্ষের মাঝে সংঘর্ষ লাগলো। তৈমূর সুলতান অসীম বীরত্বে যুঁজেও অগ্রসর হতে
ব্যর্থ হলো। বাবর সেনা পাহাড়ের উপর থেকে তীর, পাথর প্রভৃতি নিক্ষেপ করে তৈমূর সুলতানের সমগ্র প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিলো। তৈমূর সুলতানের সেনা প্রকৃতার্থে খোলা প্রান্তরে যুদ্ধ করায় অভ্যস্ত ছিলো। সেজন্য পাহাড়ের ঢালু স্থানে দক্ষতা অনুসারে যুদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়ে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হলো।
বাবর সংবাদ নিয়ে জানতে পারলেন যে, প্রতিপক্ষ সেনা অবস্থান গ্রহণ করা স্থান থেকে জল অনেক দূরে। সমতল অভিমুখে নেমেযাওয়া রাস্তা থেকে জল কমেও এক মাইল দূরে। এদিকে গরমও পড়েছিলো যথেষ্ট। সেজন্য বাবর অনুমান করলেন যে, প্রতিপক্ষ সেনা অতি সত্বর জলের সন্ধান করতে বাধ্য হবে। তিনি তৎক্ষণাৎ প্রতিপক্ষকে জল আহরণে বাধা প্রদানের জন্য একদল সেনা প্রেরণ করলেন।
তখন প্রায় সন্ধ্যে হয়ে আসছে। সূর্য অস্ত যাওয়ার মুখে। বাবর কূটনীতির আশ্রয় নিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামলেন। বাবরের মনোভাব উপলব্ধি করতে পেরে এক হাজার অশ্বারোহী সেনাও ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে লঘু পদক্ষেপে ছাউনির দিকে অগ্রসর হলো।
পাহাড়ের পাদদেশ থেকে প্রতিপক্ষ সেনা বাবর সেনার গতিবিধি লক্ষ্য করছিলো। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে বাবর সেনাদের ছাউনির দিকে অগ্রসর হওয়া দেখে সেদিনের জন্য যুদ্ধ স্থগিত হলো বলে প্রতিপক্ষ সেনারা ভেবে নিলেন। কিন্তু একদল বাবর সেনা তাদের উপরে চরম আঘাত হানার জন্য উপত্যকার সংকীর্ণ পথের দিকে অগ্রসর হওয়াটা তারা লক্ষ্য করলো না। ফলে সুলতানবর্গ নিজের নিজের সেনাদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য দুর্ভাগ্যজনক আদেশ দিলেন। আদেশ পেয়ে সেনাগুলো বিশ্রামের জন্য নিজের নিজের তাঁবুতে গেলো। কিছু সংখ্যক সেনা বের হলো জলের সন্ধানে। ফলে সমগ্র বাহিনী বিশৃংখল হয়ে পড়ল।
বাবর যে সুযোগের অপেক্ষায় অপেক্ষা করছিলেন প্রকৃতপক্ষে সেটাই হলো। প্রতিপক্ষ সেনা বিশৃংখল হয়ে পরার সাথে সাথে সেই সুযোগ এলো। প্রতিপক্ষ সেনাদের বিশৃংখল অবস্থায় দেখেই তিনি নিজের বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন- শত্রুসেনা বিশৃংখল হয়ে পরেছে। যাও, আক্রমণ কর। তাদের ধর এবং মেরে কেটে খতম করে দাও।
বাবরের আদেশ পেয়ে উপত্যকার সংকীর্ণ পথে ইতিমধ্যে গোপনে সমবেত হওয়া বার হাজার অশ্বারোহী বানের জলের মতো প্রচণ্ড গতিতে বেরিয়ে এলো। পাহাড়ের উপর থেকে তিন হাজার পদাতিক সেনা তাদের সহায় করার জন্য নিচের দিকে নেমে আসতে লাগলো। কোষমুক্ত তরবারি নিয়ে বাবর নিজেও পদাতিক সেনাদের আগে আগে নেমে আসতে লাগলেন।
প্রতিপক্ষের অপ্রস্তুত সেনা বাবর সেনার অতর্কিত আক্রমণের ফলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। প্রতি আক্রমণের অবসর না পেয়ে তারা যে যেদিকে পারে প্রাণ নিয়ে পালাতে লাগলো। ফলে অল্প সময়ের ভেতরে তারা বিশৃংখল হয়ে পড়লো। তৈমূর সুলতান নিজে শত্রুসেনার ব্যূহের মধ্যে পড়ার ভয়ে দূরের একটি উপত্যকার দিকে প্রাণ নিয়ে পালালো। মহম্মদ দুলহায় নামক বাবর সেনার বেগ একজন অসীম বীরত্বে যুদ্ধ করে প্রতিপক্ষের অনেক সেনা মেরে কেটে হামজাহ সুলতানকে বন্দি করলো। খাজা কালার নেতৃত্বে যাওয়া একদল সেনা দুপর রাতে মেহেদি সুলতানকে জীবন্তে বন্দি করে আনলো।
উভয় সুলতান আন্দিজান এবং কারাকোলে সাধারণ জনতাকে নির্বিচারে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ছিলো। বাবর উভয়কে মৃতুদণ্ডের আদেশ দিলেন।
যুদ্ধে বাবর জয়ী হলেন। দুর্ভাগের কালো মেঘ বিদীর্ণ করে আবার সৌভাগ্য রবি উদয় হলো। অবশেষে তিনি হিসার জয় করে স্বপ্নের সহর সমরকন্দের দিকে অগ্রসর হলেন।
*
* *
শরতের নির্মল আকাশ। জোৎস্না রাত। নানান রঙের অনেক ফুল ফুটেছিলো বাগানে। ডালিম, নাশপতি, আতা প্রভৃতি নানান রকমের ফল পেকে গাছে গাছে দুলছিলো। সংগীতের মূর্ছনার মতো ফলের কোমল স্নিগ্ধ সৌরভ ভেসে বেড়াচ্ছিলো বাতাসে।
মহান সমরকন্দ সহরের সমগ্র দরজা উন্মুক্ত। সবার সহরের ভেতর প্রবেশের ছিলো অবাধ স্বাধীনতা।
বিগত দশদিন সহরে কোনো শাসক বা সৈন্য নেই। বহসের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে শৈবানি খাঁর সমর্থকরা বাবরের ভয়ে সমরকন্দ ফিরে আসেনি। তারা বাবরের সাথে আবার সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার জন্য কর্শি এবং গুজারের আশেপাশে অবস্থান নিয়ে সেনা বাহিনী পুনর্গঠনের জন্য ব্যস্ত ছিলো এবং অল্প সংখ্যক সৈন্য সহরের পহারার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো। কিন্তু তারা যখন শুনলো, ইরানের শাসক ইসমাইল প্রেরিত ত্রিশ হাজার কিজিলবাসী সেনা বাবরের সহায়ের জন্য সমরকন্দ অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে, তখন তারা ভয়ে কুর্শি, বুখারা এবং সমরকন্দ অরক্ষিত অবস্থায় রেখে সোনা-রুপো, পশুর পাল, খাদ্যসামগ্রী নিয়ে স্তেপী পালিয়ে গেছে। ফলে তখন থেকে দূর্গদ্বার উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে।
মাউরা উন্নহরের কৃষক এবং সহরের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন সংঘটিত যুদ্ধের ফলে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিলো। বারে বারে শাসক পরিবর্তন হওয়ার ফলে তাদের উপর দিয়ে বয়ে গেছে অন্যায়-অত্যাচার ও লুটপাটের তাণ্ডব। ফলে তাদের জীবন হয়ে পরছে বিপর্যস্ত- বিধ্বস্ত। তারা প্রতি মুহূর্তে নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছিলো। সেজন্য তারা অঘরী সুলতান এবং বেগদের প্রতি হয়ে উঠেছিলো অতিষ্ঠ--বীতশ্রদ্ধ। তারা কামনা করছিলো একজন স্থায়ী শাসক। সেজন্য বাবরের আগমনের কথা শুনে তারা উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলো। শৈবানি খাঁর সমর্থকরা সহর ছেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে তারা দূর্গদ্বারসমূহ খোলে বাবরের আগমন অপেক্ষায় অধীরভাবে অপেক্ষা
করতেছিলো।
বাবর মিত্র বাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে কর্শি এবং বুখারা বিনাযুদ্ধে অধিকার করে উত্তর পশ্চিম দিক থেকে সমরকন্দ অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিলেন। বাবর সেনা সহর থেকে কিছু দূরে থাকতেই সহরের বাসিন্দারা তাঁদের উষ্ম অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছিলো। বাবরের সন্মানে সহরটা অতি সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছিলো। বাবর দূর্গের নিকট পৌঁছানোর সাথে সাথে বিশজন বিশিষ্ট নাগরিক দূর্গের চাবি ও অন্যান্য উপহার সামগ্রী নিয়ে বাবরকে অভ্যর্থনা জানাতে দূর্গদ্বারে সমবেত হলেন।
চারবাহা দরজার দিকে প্রসারিত রাস্তার দুই পাশে অগণন জনতা বাবরের অপেক্ষায় সারি বেধে দাঁড়িয়ে ছিলো। আনন্দ প্রকাশের প্রতীক হিসাবে এবং বাবরের সন্মানার্থে সুন্দরভাবে সাজানো সহরের সর্বত্র আনন্দ উল্লাস বিরাজ করছিলো। দালানের ছাদ এবং দরজায় দরজায় ধ্বনিত হচ্ছিল বাঁশির কোমল স্নিগ্ধ সুর। হিসার বিজয়ের জন্য বাবরের গুণকীর্তন করে এবং সমরকন্দে অভ্যর্থনা জানানোর
জন্য প্রশংসা করে গজল লেখা হয়েছিলো। সেইসমূহ গজল লিখে স্থানে স্থানে টানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো এবং অনেকে মুখে মুখে গাইতে ছিলো।
উষ্ম অভ্যর্থনা দেখে বাবর অভিভূত হয়ে পড়লেন। যে সহর থেকে তিনি এক সময় সহরবাসীদের ভাগ্যের হাতে সঁপে লুকিয়ে লুকিয়ে পালিয়ে গিয়ে ছিলেন, সে সহরে যে এতো উষ্ম সম্বর্ধনা পাবেন এটা ছিলো বাবরের কল্পনার অগোচর।
দোকান-পাট সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছিলো। নানাবিধ উপাদেয় খাদ্যসামগ্রীতে ভরে ছিলো হালুকরের দোকান। খাদ্যসামগ্রীর মিঠা স্নিগ্ধ সুবাস বাতাসে ভাসতে ছিলো। সমগ্র সহরে বিরাজ করছিলো উৎসবমুখর পরিবেশ। এইসব আয়োজন করা হয়েছিলো বাবর এবং কিজিসবাসী সেনাদের অভ্যর্থনার জন্য।
দীর্ঘ সাত বছরের মাথায় বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে বাবর সমরকন্দ সহরে প্রবেশ করলেন এবং হর্ষ-উল্লাসের মাঝে বাবর পুনরায় সমরকন্দের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হলেন। সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েই তিনি শৈবানি খাঁর সমর্থকদের দখলে থাকা স্থানসমূহ হস্তগত করার জন্য মনোনিবেশ করলেন।
বাবর কিজিলবাসী সেনার সাথে মিলিত হয়ে একটার পর একটা বিজয় সাব্যস্ত করতে লাগলেন। তাসকন্দ, সৈরাম, উজগন্ত এবং উশের শাসকবর্গ বশ্যতা স্বীকার করে বাবরকে বাদশাহ বলে স্বীকৃতি দিলেন। ইরানের বাদশাহ ইসমাইলকে সন্মান ও কৃতজ্ঞতা জানানোর উদ্দেশ্যে বাবর শ্বাহ ইসমাইলের ফটো সম্বলিত কয়েক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা প্রস্তুত করে কিজিলবাসী সেনার মাঝে বিতরণ করলেন।
বাবরের নিকট থেকে প্রভূত সন্মান এবং আনুগত্য পেয়ে কিজিলবাসী সেনা এক সময় উগ্র ও উদণ্ড হয়ে উঠলো। তাদের লুটপাট এবং উচ্ছৃংখল ব্যবহারের জন্য সমরকন্দবাসী জর্জরিত হয়ে পড়লেন। কিজিলবাসী সেনার লুটপাট, অন্যায়-অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সমরকন্দবাসী বাবরের নিকট তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানালেন।
‘সাপও যাতে মরে এবং লাঠিও যাতে নাভাঙে’ এই নীতি অনুসরণ করে বাবর কিজিলবাসী প্রভাবশালী বেগদের পোশাক-পরিচ্ছদ, তেজী ঘোড়া, সোনা-রুপোর বাসন-বর্তনের সাথে নানাবিধ উপহার দিয়ে তাদের মাউরা উন্নহর থেকে ইরান পাঠিয়ে দিলেন। তেমনভাবে সৈন্য-সামন্ত পাঠিয়ে দেওয়াতে শাহ ইসমাইল প্রকাশ্যে কিছু না বললেও পেটে পেটে ক্ষুণ্ন হয়ে উঠলেন। কিছুদিন পরে তাঁর সেই ক্ষুণ্নতার প্রমাণও পাওয়া গেলো।
স্তেপীতে তখনও শৈবানি খাঁর সমর্থক উবেদুল্যাহ সুলতান শাসনকার্য চালাচ্ছিলেন। তিনি তলেতলে সৈন্য সংগ্রহ করে বাবরের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন।
কথাটা বাবরের কানে পড়ল। এদিকে অনেকদিন শোয়ে-বসে থেকে বেগ এবং সেনাদের তরবারিতে মামরে ধরার উপক্রম হয়েছিলো। সেজন্য বেগবর্গ উবেদুল্যাহ সুলতানের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করার জন্য আগে থেকেই বাবরকে প্ররোচিত করতে ছিলো। খবর পেয়ে বাবর উবেদুল্যাহ সুলতানের উপরে ক্ষুণ্ন হয়ে উঠলেন এবং স্তেপী আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন। ত্রিশ হাজার সেনার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে বাবর উবেদুল্যাহ সুলতানকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য স্তেপী অভিমুখে অগ্রসর হলেন। বাবরের যুদ্ধযাত্রার খবর পেয়ে উবেদুল্যাহ সুলতান স্তেপী ত্যাগ করে রেগিস্থানের দিকে পালিয়ে গেলেন।
উবেদুল্যাহ সুলতান পালিয়ে যাওয়ার সংবাদ বাবরের কানেও পড়লো। সেজন্য তিনি ঘোড়ার দানা-পানী এবং সেনাদের খাদ্য সহজে সংগ্রহ করতে পারবে তেমন এক স্থানে ছাউনি পেতে উবেদুল্যাহ সুলতান রেগিস্থান থেকে ফিরে আসার অপেক্ষায় অপেক্ষা করতে লাগলেন। কিন্তু অনেকদিন অপেক্ষা করার পরেও উবেদুেল্যাহ সুলতান রেগিস্থান থেকে ফিরে এলো না। এদিকে অনেকদিন অপেক্ষা করে করে সেনারাও অধৈর্য হয়ে উঠলো। বাবরের নিজেরও ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটলো। সেজন্য তিনি সেনাবাহিনী নিয়ে রেগিস্থানের দিকে অগ্রসর হলেন।
বাবরের একাংশ সেনা পাহাড়ের অধিবাসী ছিলো। তারা পাহাড়ীয়া স্থানে চলা-চলে অভ্যস্ত। সেজন্য তারা রেগিস্থানের বালু ও কাদাময় স্থানে চলা-চল করতে অসুবিধা অনুভব করতে লাগলো। এদিকে রেগিস্থান নদীর পাড়ে অবস্থিত ছিলো। স্থানে স্থানে নদীর চোরাবালির মরণফান্দ ছিলো। কোনো কারণে চোরাবালিতে পা দিলে ঘোড়াসহ মানুষ চোরাবালির মাঝে ঢোকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। এদিকে পাহাড়ীয়া সেনার জন্য আগে থেকে চোরাবালি চিনাক্ত করাও অসুবিধা হচ্ছিলো। সেজন্য তাঁরা ঘোড়া নিয়ে আস্তে আস্তে অগ্রসর হতে বাধ্য হলেন।
এদিকে বারূদ-তোপ বয়ে নেওয়া গাড়ীর চাকাও বালির মাঝে বসে যেতে লাগলো। সেগুলো টেনে তুলতে গিয়ে অযথা অনেক সময় নষ্ট হতে লাগলো। ফলে চোরাবালির মরণফান্দ এড়িয়ে চলতে গিয়ে এক সময় সেনাবাহিনী একটি দীঘল সারিতে পরিণত হলো এবং সেনাবাহিনী বিশৃংখল হয়ে পরলো। বিশৃংখল সেনাবাহিনীর মাঝে এক সময় অসন্তোষে দেখা দিলো। এই অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে একদল সেনা বাবরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো। তারা বাবরের সংগ ত্যাগ করে দশ হাজার সেনা নিয়ে উবেদুল্যাহ সুলতানের সাথে যোগদান করতে চলে গেলো।
প্রকৃতার্থে উবেদুল্যাহ সুলতান কৌশলগতভাবেই রেগিস্থানে ছাউনি পেতে অবস্থান করছিলেন। রেগিস্থানের প্রতি ইঞ্চি স্থানের বিষয়ে তিনি ভালোভাবে অবগত ছিলেন। সেজন্য তিনি বাবরকে বেকায়দায় ফেলার জন্য রেগিস্থানের মতো বিপজ্জনক স্থান বেচে নিয়েছিলেন। তিনি প্রতিপক্ষ সেনার গতিবিধি প্রতিমুহূর্তে নিরীক্ষণ করছিলেন এবং বাবর সেনা বিশৃংখল হয়ে পরার সাথে সাথে তিনি খেরাবাদ, কোলে মলিক হ্রদ এবং কারাকোলের নিকটে বাবর সেনাব উপরে আক্রমণ চালালেন। ফলে খণ্ডযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো।
দীর্ঘ সারিতে পরিণত হওয়ার জন্য বাবর এক সময় নিজের সেনার উপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন। ফলে খণ্ডযুদ্ধে উবেদুল্যাহ সুলতান জয় লাভ করলেন। উক্ত খণ্ডযুদ্ধে বাবরের অনেক সেনা হতাহত হলো। ফলে বাবর নিজের বাহিনী নিয়ে বুখারা হয়ে সমরকন্দের দিকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হলেন।
সমরকন্দ এসে বাবর পুনরায় সেনা সংগ্রহ করতে লাগলেন। সেনা সংগ্রহ করে তিনি আবার যুদ্ধযাত্রা করলেন। তবে এইবার বুখারার দিক দিয়ে না গিয়ে হিসারের দিক দিয়ে স্তেপী অভিমুখে অগ্রসর হতে লাগলেন। ইতিমধ্যে শাহ ইসমাইল বাবরের সহায়ের জন্য ষাট হাজার সেনার এক বিশাল বাহিনী প্রেরণ করছিলেন। উক্ত বাহিনী হিসার এসে বাবরের সাথে মিলিত হলো।
শাহ ইসমাইল দেখাতে বাবরের সহায়ের জন্য সেনা প্রেরণ করেছিলেন যদিও তাঁর অন্তনির্হিত উদ্দেশ্য ছিলো অন্য রকম। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো বাবরকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে নিজের অনুগত ও বিশ্বাসী অন্য কোনো শাসককে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করা। কারণ আগের বার সমরকন্দ থেকে কিজিলবাসী সেনা তারাতারি পাঠিয়ে দেওয়াতে তিনি মনে মনে বাবরের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তদুপরি তিনি গুপ্তচরের মুখ থেকে জানতে পেরেছিলেন যে, বাবর সমগ্র মাউরা উন্নহর দখলের জন্য চেষ্টা করতেছে। এইসব কারণে শাহ ইসমাইল বাবরের প্রতি উপরে উপরে বন্ধুত্বের অভিনয় করলেও মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং তলে তলে মাউরা উন্নহরে ইরানের আধিপত্য বিস্তারের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছিলেন।
ইরানী সেনা নায়ক নজমে সানির সাথে হওয়া প্রথম সাক্ষাতেই শাহ ইসমাইলের এই আগ্রাসী মনোভাবের ইংগিত পেয়ে বাবর সতর্ক হয়ে উঠলেন।
ঘটনাটা ঘটেছিলো এরকম- বাবরের সাথে পরামর্শ না করেই শাহ ইসমাইলের সেনাপতি নজমে সানি শৈবানি খাঁর বংশধরদের উপরে আক্রমণ সংঘটিত করে।
নিজ দুয়ান নামক স্থানে ইরানী সেনা এবং শৈবানি খাঁর বংশধরদের মাঝে যুদ্ধ শুরু হয় এবং সেই যুদ্ধে ইরানী সেনাদের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বাবরের সাথে পরামর্শ না করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়াতে ইরানী সেনার সাথে সহযোগিতা না করে বাবর হিসারের দিকে চলে আসে। উক্ত যুদ্ধে অধিকাংশ ইরানী সেনা নিহত হয় এবং নজমে সানি নিজেও মৃত্যুবরণ করে। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ইরানী সেনা অমু দরিয়া পার হতে গিয়েও অনেক সেনা জলে ডুবে মারা যায়।
বাবর বায়সানের মধ্য দিয়ে হিসারের কারাতান আসেন। তিনি পরবর্তী আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হতে কারাতানে ছাউনি পেতে রইলেন। কিন্তু এক রাতে একদল বিদ্রোহী সেনা বাবরের তাঁবু আক্রমণ করে। বাবরের দেহরক্ষীরা গণ্ডগোলের শব্দে জাগ্রত হয়ে বিদ্রোহীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
খানজাদা বেগমের পুত্র খুরমের তখন এগার বছর বয়স। বাবরের শৌর্য-বীর্যের প্রতি সে খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিলো খুরম। মামাকে সে খুব ভালও বাসতো। বাবরও তাকে খুব স্নেহ করতেন। খুরম অবসর সময়ে বাবরের সাথে হাসি তামাশা করে সময় অতিবাহিত করতো। সেজন্য বাবরের উপর আক্রমণ সংঘটিত হওয়া দেখে সে ধৈর্য ধরে থাকতে পারল না। বাবরকে বাচাতে সে তীর-ধনু নিয়ে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে এলো।
খানজাদা বেগম খুরমকে বাধা দিয়ে বললেন-আরে আরে, কোথায় যাচ্ছ? বাইরে যেওনা। যুদ্ধ চলতেছে।
খুরম অসহিষ্ণুভাবে বললো- আমাকে বাধা দিবেন না। আমায় যেতে দিন। মামার উপরে হামলা হচ্ছে। আমি মামাকে সহায় করতে চাই।
এমন সময় দুটি ঘোড়া নিয়ে তাহিরজান সেখানে পৌঁছোলো। সে খানজাদা বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললো- আপনারা ঘোড়ার পিঠে চড়ে পালান। এটা জাহাপনার আদেশ।
মহিলারা ঘোড়ায় চড়ে কাশিম বেগের নেতৃত্বে নিরাপদ স্থানের দিকে অগ্রসর হলেন।
বাইরে পূর্ণোদ্যমে যুদ্ধ চলছিলো। যুদ্ধের অবস্থা দেখে খুরম আতঙ্কিত হয়ে উঠলো। মামার উপরে আক্রমণ সংঘটিত করা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষ জেগে উঠলো তার হৃদয়ে। মামাকে সহায় করার জন্য তার হৃদয়ে তীব্র ইচ্ছা জেগে উঠলো। একদল সেনা তাদের দিকে অগ্রসর হতে দেখে সে তীর-ধনু নিয়ে প্রস্তুত হলো। সে একটার পর একটা করে তিনটা শর নিক্ষেপ করলো। এমন সময়ে একটি শর এসে তার বুকে বিদ্ধ হলো। তীব্র আর্তনাদ করে সে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গেলো। খুরমকে ঘোড়ার পিঠ থেকে পতিত হওয়া দেখে খানজাদা বেগম ‘খুরম’ বলে চিৎকার করে ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝাঁপ মেরে নেমে খুরমকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বিদ্রোহীরা পালিয়ে গেলো। তাহিরজান অচেতন অবস্থায় খুরমকে তাঁবুতে নিয়ে এলো। হেকিম সাথে সাথে চিকিৎসা শুরু করলেন। তবে, যৎপরোনাস্তি চেষ্টা করেও খুরমের জ্ঞান ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলেন না হেকিম। মৃত্যুর সাথে যুঁজে যুঁজে এক সময় শৈবানি খাঁর বংশধর, খানজাদা বেগমের কলিজার টুকরো খুরম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।
খুরমের মৃত্যুতে বাবর মর্মান্তিক আঘাত পেলেন। শৈবানি খাঁর বংশধর বলে প্রথমাবস্থায় বাবর খুরমকে ঘৃণা করতেন যদিও পরে তার অমায়িক ব্যবহারে সন্তুষ্ট হয়ে ভালোবাসতে শুরু করেছিলেন। খুরমও মামাকে শ্রদ্ধা-ভক্তি করতো। সেজন্য খুরমের অকালবিয়োগে বাবর শোকে ভেঙে পড়লেন এবং স্তেপী জয়ের আশা ত্যাগ করে আবার কাবুল ফিরে এলেন।
কাবুল এসে বাবর কাবুলের শাসনভার সমঝে নিলেন। শাসনভার সমঝে নেওয়ার পরে তিনি সেনা সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য মনোনিবেশ করলেন। সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি হওয়ার পরে তিনি সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করলেন। একটার পর একটা দেশ জয় করে দশ বছরের ভেতরে তিনি এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে পরলেন। কুন্দুস থেকে কান্দাহার এবং বক্সার থেকে হিন্দুকোশ পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করলো। অবশেষে তিনি হিন্দুস্থান আক্রমণের জন্য তৎপর হয়ে উঠলেন।
হিন্দুস্থান আক্রমণের আয়োজন চলে থাকতে একদিন রাতে প্রধানা বেগম মহিম বেগম বাবরকে বললেন- আমার একটা অনুরোধ রাখবেন কী, জাহাপনা?
অনুরোধ! কী অনুরোধ করতে চাইছেন, বেগম? সহরের বাইরে নতুন উদ্যান নির্মাণের জন্য অনুরোধ করবেন, নাকোনো মূল্যবান সামগ্রী কেনার জন্য টাকা খুঁজবেন!
বাবর এভাবে নিজের মনে প্রশ্ন কয়টা ভেবে প্রকাশ্যে বললেন- আমার সামর্থের ভেতরে হলে নিশ্চয় রাখব। বলুন, কী বলতে চাইছেন?
মাহিম বেগম ভাবছিলেন অন্য কথা। বাবরের তিনজন বেগম। মাহিম বেগম, গুলরুখ বেগম এবং দিলদার আলাসা বেগম। বেগম কয়জনের মধ্যে মাহিম বেগমই জ্যেষ্ঠা। মাহিম বেগমকে হিরাতে থাকতে বিয়ে করিয়েছিলেন এবং বাকি দুইজনকে বিয়ে করিয়েছেন কাবুল আসার পরে।
তিনজন বেগমের গর্ভে মোট পাঁচজন সন্তান। চারজন পুত্র এবং একজন কন্যা। মাহিম বেগমের গর্ভে একমাত্র সন্তান মির্জা হুমানয়ূন।
গুলরুখ বেগমের গর্ভে দুই পুত্র সন্তান। মির্জা কামরান এবং মির্জা আব্বারা। দিলদার আলাসা বেগমের গর্ভে পুত্র হিন্দাল এবং কন্যা গুলবদন।(এই গুলবদনই প্রাপ্ত বয়সে হুমায়ূন নামা রচনা করেছিলেন।)
পুত্র কয়জনের মধ্যে হুমায়ূন জ্যেষ্ঠ। মাত্র ষোল বছর বয়সে বাবর তাঁকে কাবুল থেকে অনেক দূরে অবস্থিত বদ্বখসায় সুবেদার হিসাবে পাঠিয়েছেন। বদ্বখসা চারদিকে পাহাড় ঘেরা অতি বিপজ্জনক স্থান। সুমালি বিদ্রোহীদের ঘাটি ছিলো বদ্বখসাতে। সেজন্য মাহিম বেগম একমাত্র পুত্রের অমংগল আশংকায় দুঃশ্চিন্তা এবং উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সময় পার করতেছিলেন এবং হুমায়ূনকে বদ্বখসা থেকে ফিরিয়ে এনে নিজের সাথে রাখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন।
বাবরের নিকট থেকে অনুমতি পেয়ে মাহিম বেগম কিছুক্ষণ ভেরে অনুরোধের সুরে বললেন- আপনি হুমায়ূনকে কাবুল ডেকে পাঠান।
বাবর গম্ভীর হয়ে উঠলেন। মাহিম বেগমের দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বললেন- কিন্তু কী বলে ডেকে পাঠাব? চিরদিনের জন্য, না আপনার সাথে দেখা করে যাওয়ার জন্য?
মাহিম বেগম দুঃশ্চিন্তা প্রকট করে আবেগ জড়িত কণ্ঠে বললেন- সে আজ দুই বছর যাবত সোমালি বিদ্রোহীদের মাঝে রয়েছে। তার অমংগল আশংকায় আমার চোখে ঘুম নাই। হুমায়ূনের পরিবর্তে আপনি সেখানে অন্য কাউকে পাঠান।
কিন্তু কাকে পাঠাব? বাবর কিঞ্চিত বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন।
মির্জা কামরানকে পাঠান। সে হুমায়ূনের থেকে মাত্র দু’বছরেরই তো ছোট। সে নিশ্চয় শাসন কার্য চালাতে পারবে। গুলরুখ বেগমও দেখছি মির্জা
কামরান নওজোয়ান হয়ে উঠেছে বলে গৌরব করেন। সেজন্য হুমায়ূনের পরিবর্তে কামরানকে
সেখানে সুবেদার করে পাঠান। তখন গুলরুখ বেগমেও নিশ্চয় কথাটায় আপত্তি করবেন না।
মাহিম বেগমের
কথা শুনে বাবরের মুখমণ্ডল উদাস ও গম্ভীর হয়ে উঠলো। সন্তান কয়জন বড় হয়ে উঠার
সাথে সাথে যেন বেগমদের মাঝে বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেছে। কেউ কাউকে সহ্য করতে
পারেনা। সাধারণ কথা নিয়েই যেন বেগমদের মাঝে মনোমালিন্য সৃষ্টি হচ্ছে। সেজন্য বাবর
অনেকদিন যাবত অশান্তিতে ভূগতেছেন। বেগমদের মাঝে কখনও কখনও প্রকাশ্য শত্রুতার ভাবও
প্রকট হয়ে উঠা তিনি লক্ষ্য করতেছেন। হুমায়ূনের পরিবর্তে কামরানকে সুবেদার করে
পাঠানোর মূলেও যে সেই বিদ্বেষের বিষবাষ্প প্রচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে এ কথা অনুমান করতে
বাবরের অসুবিধা হল না। তিনজন বেগমই নিজের নিজের সন্তানের মংগল চিন্তায় ব্যস্ত।
ভবিষ্যতের জন্য এই মনোভাব খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে! বাবরের ভবিষ্যত যোজনার
উপরেও যে এই আপনসর্বস্ব মনোভাবে প্রভাব ফেলবে এটা নিশ্চিত। সেজন্য বাবর মাহিম
বেগমের প্রস্তাবের বিপক্ষে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে শুধু সান্ত্বনা দেওয়ার
জন্য বললেন- বেগম, আপনি গুলরুখ বেগমের কথায় কর্ণপাত করবেন না। বয়স দিয়ে মানুষের জ্ঞানের
পরিধি মাপা যায় না। কামরান হুমায়ূনের সম বয়স্ক হলেও তার জ্ঞান এখনও হুমায়ূনের
মতো পরিপক্ক হয়নি। হুমায়ূনের মতো কামরান এই গুরুদায়িত্ব সামলাতে পারবে না।
গুরুত্বপূর্ণ কাজে এখন আমি একমাত্র হুমায়ূনকেই নিয়োগ করতে পারি, কামরানকে এখনও গুরু দায়িত্ব অর্পণ করার সময় হয়নি।
হুমায়ূনের
প্রশংসা শুনে মাহিম বেগমের মন কিছু পাতল হলো যদিও নিজের ভাগ্যকে দোষারূপ করে
বললেন- আমার ভাগ্যই মন্দ। আমার চেয়ে গুলরুখ বেগমই সুখী। তাঁর দুই পুত্র।
দু'জনকেই নিজের কাছে রেখে
আমোদ-আহ্লাদ করে নিশ্চিন্ত মনে খেয়েধেয়ে আছেন। আমার একমাত্র পুত্র হুমায়ূন।
তাকে দূরদেশে বিদ্রোহীদের মাঝে রেখে আমাকে দুঃশ্চিন্তায় সময় কাটাতে হচ্ছে। এক
বছর যাবত তার মুখখানাও দেখতে পারিনি। দূরদেশে থাকার জন্য সময় মতো তার খবরও নিতে
পারি না। ঘোড়া ছুটিয়ে গেলেও দু’সপ্তাহের পথ। তদুপরি তার
চারদিকে শৈবানি খাঁর ছেলেরা বাচ্চা হারানো বাঘিনীর মতো গর্জে-গুমরে রয়েছে। কখন কী
বিপদ হয়, বলা যায়না! হুমায়ূনের কথা মনে পড়লে বুকটা
হাহাকার করে উঠে।
আপনি অনর্থক
উদ্বিগ্ন হচ্ছেন, বেগম। তিন হাজার সুপ্রশিক্ষিত সেনা রয়েছে হুমায়ূনের সাথে। তদপরি শৈবানি
খাঁর পুত্ররাও পরস্পরের সাথে কাজিয়া করে বর্তমান হীনবল হয়ে পড়েছে। তাদের তরপ
থেকে বর্তমান কোনো ভয় নেই। তবুও যদি হুমায়ূনকে দেখতে আপনার আকাঙ্খা হয়েছে,
তিন চার সপ্তাহের মধ্যে আপনি হুমায়ূনের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবেন।
কোথায়? মাহিম বেগম ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞাসা
করলেন- কাবুলে?
না, আদিলপুরে।
মাহিম বেগম
শুনছিলেন যে আদিলপুর কাবুল থেকে দক্ষিণ দিকে হিন্দুস্থানের নিকট অবস্থিত। বাবর
বর্তমান আদিলপুরের দিকে সেনা প্রেরণ করে থাকার কথাও তিনি এর-ওর মুখে শুনেছেন।
হিন্দুস্থান অভিযানের উদ্দেশ্যেই যে এই সেনা সমাবেশ এ বিষয়ে বাবর কিছু না বললেও
লোকমুখে শুনেই তিনি কথাটা উপলব্ধি করতে পারছেন।
সেজন্য মাহিম
বেগম বিচলিত কণ্ঠে বললেন- আদিলপুরে? তারমানে আপনি হুমায়ূনকেও হিন্দুস্থান নিয়ে যেতে চাইছেন
নাকি?
বাবর
হিন্দুস্থান অভিযানের প্রস্তুতি অতি গোপনে চালাইতে ছিলেন এবং কথাটা তিনি গোপনেই
রাখতে চাইছিলেন। সেজন্য তিনি মাহিম বেগমের মুখে হিন্দুস্থান অভিযানের কথা শুনে
সচকিত হয়ে উঠলেন। আশেপাশে কেউ আছে নাকি তার সন্ধান নিতে তিনি কান খাড়া করলেন।
আগুনে পোরা গরু রাঙা মেঘ দেখেও আতঙ্কিত হয়ে করে। বাবরও বর্তমান হিন্দুস্থান
আক্রমণ সম্পর্কে তেমনই আতঙ্কিত।আতঙ্কিত। জীবনে তিনি অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার সন্মুখীন হয়েছেন। সেজন্য তিনি হিন্দুস্থান অভিযানের প্রস্তুতি অতি গোপনে চালাচ্ছেন। বর্তমান তিনি মাউরা উন্নহর বিজয়ের আশা ত্যাগ করেছেন। বর্তমান তাঁর একমাত্র লক্ষ্য হিন্দুস্থান। গত বছর তিনি হিন্দুস্থানে গুপ্তচর পাঠিয়েছেন। ভারতের শুভচিন্তক অনেকে বর্তমান তাঁর সাথে যোগাযোগও করতেছে। বর্তমান তাঁরও অনেক শুভচিন্তক রয়েছে হিন্দুস্থানে। তাঁদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকই রয়েছে। হিন্দুস্থান থেকে মুসলমান শাসক এবং হিন্দু রাজার দূত ইতিমধ্যে ছয় বার কাবুল এসেছে। তাঁরা দিল্লীর সুলতান ইব্রাহীম-এর উপর অসন্তুষ্ট। তাঁদের মতে ইব্রাহীম লোডী একজন অদূরদর্শী এবং স্বেচ্ছাচারি শাসক। লোডীর শোষণ শাসনে জনসাধারণ সর্বস্বান্ত। দেশের উন্নতির জন্য ইব্রাহীম লোডীর বর্তমান কোনো যোজনাই নেই। একটার পরে একটা গৃহযুদ্ধ লেগেই আছে। গৃহযুদ্ধের ফলে দেশের শান্তি বিঘ্নিত। দেশ টুকরো টুকরো বিধ্বস্ত। বর্তমান দেশটিকে সুসংহত এবং পুনর্গঠন করে শান্তি স্থাপনের জন্য এক সুসংগঠিত শক্তির আবশ্যক। তাঁদের ধারণা, একমাত্র মির্জা জহিরুদ্দিন বাবরই সেই শক্তির অধিকারী।
মাহিম বেগমের উৎকণ্ঠা প্রত্যক্ষ করে বাবর মোটামুটি যোজনার কথা বললেন- বেগম, আমার উপরে বিশ্বাস রাখুন। আমি সেখানে নিজ ইচ্ছায় যেতে চাচ্ছিনা না। হিন্দুস্থানের লোকের আমন্ত্রণ মর্মে সেখানে যেতে চাইছি। তদুপরি আমি সেখানে লুটপাটের জন্যও যাব না—আমি যেতে চাইছি এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য স্থাপনের জন্য। হিন্দুস্থান আক্রমণ করার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানাতে পঞ্জাবের শাসক দৌলত খাঁ তাঁর পুত্র দিলোয়ার খাঁকে আমার নিকট প্রেরণ করেছিলেন। হিন্দু রাজা সংগ্রাম সিঙও আমার সাহায্য প্রার্থনা করে দূত প্রেরণ করেছিলেন। সেজন্য হিন্দুস্থানের জনসাধারণকে অন্যায়-অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সবাই মিলিত হয়ে ইব্রাহীম লোডীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যারজন্য অভিযান নিয়ে ভয়ের কোনো হেতু নেই।
মাহিম বেগম বাবরের কথা মনযোগ সহকারে শুনে সংশয় প্রকাশ করে বললেন- যুদ্ধ বিজয় এবং পাপের দ্বারা অর্জন করা ফলাফলের মধ্যে সর্বদা গভীর খাদ থাকে। সেই খাদের তল অতল, সেখানে কোনো নিশ্চয়তা নেই। আছে শুধু অনিশ্চয়তায় ভরা মৃত্যুর বিভীষিকা।
বাবর দৃঢ় কণ্ঠে বললেন- আমরা সততা দিয়ে সেই খাদ পার হয়ে নিশ্চয় মৃত্যুর বিভীষিকা অতিক্রম করতে সক্ষম হবো, বেগম। কারণ আমাদের সাথে থাকবে নিপীড়িত জনসাধারণের শুভাশীষ।
কত এতিম এবং বিধবার চোখের জল বয়ে যাবে, কত পুত্রহারা, মাতৃহারার হা-হুতাশে আকাশ বাতাস বিষাক্ত করে তুলবে সেটা একবার ভেবে দেখছেন, জাহাপনা?
গৃহযুদ্ধের জন্য এখনও তো হিন্দুস্থানে অনেক লোক মারা যাচ্ছে। অনেক লোক মৃত্যুর বিভীষিকা থেকে রক্ষা পেতে আমার সহায়ের জন্য এখানে আসতেছে। অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে ইব্রাহীম লোডীর অধীনে কাজ করা হিন্দুবেগ হিন্দুস্থান থেকে পালিয়ে এসে আমাদের এখানে চাকরি করতেছে। সেজন্য আমরা নিপীড়িতদের সহায়ের জন্য হিন্দুস্থান যাচ্ছি বলে ভেবে নেন না কেন, বেগম।
জাহাপনা, আপনি আমার একটা প্রার্থনা রাখুন। আপনি হুমায়ূনকে কাবুল রেখে হিনুস্থান যান। আপনার অনুপস্থিতে সে কাবুলের শাসনভার সামলাতে পারবে।
আপনি নিজে শাসনকার্য চালাতে চান নাকি, বেগম?
আমি ! আমি তো মেয়ে মানুষ। এ ক্ষেত্রে একজন পত্নীর চেয়ে একজন পুত্রের দাবি অনেক বেশি। হুমায়ূন আপনার সাথে গেলেও মির্জা কামরান ও আক্সারি তো এখানেই থাকবে। আইনতঃ শাসনকার্য চালোনোর জন্য আমার চেয়ে তারাই বেশি যোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
মাহিম বেগমের কথা শুনে বাবর তৎক্ষণাৎ একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। সিদ্ধান্ত মর্মে তিনি বললেন- আপনি যাতে নির্বিঘ্নে শাসনকার্য চালাতে পারেন তার ব্যবস্থা আমি করে যাব। মির্জা কামরানকে আমি কান্দাহারের শাসনকর্তা নিযোজিত করে যাব এবং মির্জা আক্সারিকে আমার সাথে নিয়ে যাব। আপনার সহায়ের জন্য কাশিম বেগকে এখানে রেখে যাব। এখন হবে তো, বেগম?
আপনার সিদ্ধান্তে আমি সত্যিই অভিভূত। আমার অনুমান হচ্ছে, আপনার সিদ্ধান্তের কথা শুনে আমি যেন আকাশের সীমা স্পর্শ করছি। তবে, জাহাপনা, আমি শাসনকার্য পরিচালনার জন্য লালায়িত নই।
যে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য লালায়িত নয়, আসলে তাঁকেই শাসনকার্য পরিচালনা করতে দেওয়া উচিত, বেগম। আপনি মির্জা হিন্দালের নামে শুধু হুকুম জারি করবেন এবং কাশিম বেগ সব দেখা-শুনা করবেন। তখন সবই আইনসংগতভাবে চলে থাকবে।
মির্জা হিন্দাল দিদার আলাসার গর্ভজাত যদিও তাকে লালন-পালন করেন মাহিম বেগম। হিন্দালও মাহিম বেগমের খুব ভক্ত। জন্মধাত্রী মাতৃর চেয়ে হিন্দাল মাহিম বেগমেব বেশি অনুরক্ত। মাহিম বেগমকেই সে মাতৃ বলে জানে। সেজন্য বাবর হিন্দালের কথা বলে মাহিম বেগমকে অপ্রস্তুত করতে চাইলেন। কিন্তু মাহিম বেগম বাবরের কথায় বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে নিজের মতে অটল হয়ে বললেন- হুমায়ূন কাবুল থাকলে কী ক্ষতি হবে?
শাহী খানদানের পরম্পরা অনুসারে বাদশাহ যুদ্ধে নিহত হলে, তখন তাঁর উত্তরাধিকারীয়ে সেনাবাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া নিয়ম। তা নাহলে বেগবৃন্দ সিংহাসনের অন্যান্য সাম্ভাব্য উত্তরাধিকারীর পক্ষ নিয়ে বিশৃংখল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। বাবর কথাটা অধিক স্পষ্ট করার জন্য বললেন- যুদ্ধ মানে অনিশ্চয়তার খেলা। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমার মৃত্যু হলে, তখন জ্যেষ্ঠ হিসাবে হুমায়ূনই আমার স্থান নিতে হবে। সেজন্য আমি হুমায়ূনকে সঙ্গে নিতে চাচ্ছি।
মাহিম বেগম বাবরের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে পারলেন এবং উপলব্ধি করতে পারার জন্যই তাঁর জন্য বিষয়টা অধিক উদ্বেগজনক ও পীড়াদায়ক হয়ে উঠলো। তাঁর ধারণায় হিন্দুস্থান এমন একটি দেশের মতো অনুমান হতে লাগলো, যেখানে গেলে কেউ ফিরে আসতে পারে না। তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন- ইয়া আল্লাহ, পৃথিবীটা কেমন নির্দয়!
বাবর কোনো রকম মন্তব্য না করে মনে মনে রইলেন। তাঁর মানসপটে ভেসে উঠলো-নদী-নালা, পর্বত-পাহাড়ে ভরা, নিত্য সাগর চরণ ধৌত করা হিন্দুস্থানের অনিন্দ্যসুন্দর প্রতিচ্ছবি।
*
* *
বাবর সেনা বাহিনী নিয়ে হিন্দুস্থান অভিমুখে যাত্রা করার পরে কয়েকদিন পার হয়ে গেছে। তাঁরা এসে এসে খাইবার গিরিপথ অতিক্রম করে হিন্দুস্থানের সীমায় পদার্পণ করলেন।
চতর্দিকে দিগন্ত বিস্তৃত গভীর ঘন অরণ্য। অরণ্যের মাঝ দিয়ে বন-জঙ্গলে আবৃত রাখা সরু পথ। কোনো কোনো স্থানে পথের কোনো চিন-ছাপ নেই। সেরকম স্থানে তাঁরা বন-জঙ্গল কেটে পথ বের করে অগ্রসর হতে লাগলেন। যতই এগোতে লাগলেন, বন- জঙ্গল ততই ঘন হতে লাগলো।
গভীর অরণ্যের মাঝে মাঝে বিশৃংখলভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো উঁচু উঁচু বৃহৎ গাছ-বৃক্ষ। বৃহৎ বৃহৎ বৃক্ষের কাণ্ড এবং শাখা-প্রশাখা থেকে শিকড় বেরিয়ে মাটি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিলো। কাণ্ড এবং শাখা-প্রশাখা থেকে বের হওয়া শিকড় মাটি পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়াতে একটি গাছই এক বিস্তীর্ণ এলেকা জুড়ে ব্যাপ্ত ছিলো। কাণ্ডের মাঝে জড়িয়ে ছিলো অজস্র কাঁটাযুক্ত গুল্মলতা। লতাগুলি একটি গাছ থেকে অন্য একটি গাছে বেয়ে গিয়ে অভেদ্য প্রাচীর সৃষ্টি করেছিলো। তৃণ, বন-জঙ্গলের জন্য পা-র তলের মাটি পর্যন্ত দেখার উপায় ছিল না।
বাতাস ছিলো আর্দ্র এবং সিক্ত। সবারই শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কষ্টদায়ক শ্বাস-প্রশ্বাসের ফলে সবার মাথা চক্কর কাটতে লাগলো। ফলে সবাই শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়লেন।
বাবর রেশমের পাতল জামা পরেছিলেন। কষ্টকর পথশ্রম এবং প্রচণ্ড গরমের ফলে তিনি ঘামে ভিজে উঠেছিলেন। অসহ্য ক্লান্তিতেতিনি বাতাসের অবস্থিতি জানার জন্য একটি উঁচু গাছের উপরের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। গাছটি হেলে-দুলে থাকা তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো। অর্থাৎ গাছের উপর দিয়ে বাতাস বইতেছে। অথচ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম বাতাসটুকুও গাছের শাখা-প্রশাখার প্রাচীর ভেদ করে নিচের দিকে বয়ে আসতে পারছে না। কাথাটা ভাবতেই বাবরের মাথা চক্কর কাটতে লাগলো।
কোথাও হঠাৎ একটা বান্দরের চিৎকার শুনা গেলো। সময় এগোনোর সাথে সাথে নানান বন্য জীব-জন্তু, পশু-পক্ষীর কোলাহলমুখর শব্দ বৃদ্ধি পেতে লাগলো। সময়ে সময়ে ভেসে আসতে লাগলো ময়ূরের শ্রবণকটু কোলাহলমুখর কলরব। চারদিকে যেন বিরাজ করছে এক ভয়ঙ্কর ভয়াল পরিবেশ।
লতা-পাতার প্রাচীর ভেদ করে উট একটি পার করে নিয়ে যাওয়া অবস্থায় হঠাৎ একজন সৈনিক চিৎকার করে উঠলো। ভয়ার্ত আর্তচিৎকার। তার পাশে অবস্থানরত সৈনিক একজন ব্যগ্রভাবে চিৎকারের কারণ জিজ্ঞাসা করলো- কি হলো? এরূপ চিৎকার করছ কেন?
সৈনিকটি আতঙ্কিত কণ্ঠে বললো- সাপ! আমায় সাপে কামড়েছে।
সা পের কথা শুনে সে আশেপাশে থাকা সবাইকে সাবধান করে দিলো- ভাইসব, সাপ, সাবধান। এভাবে সাবধান করে দিয়েই সে লাফ মেরে সাপে কামড়ানো সৈনিকটির নিকটে এসে জিজ্ঞাসা করলো- কোথায় কামড়েছে?
সর্পদংশিত সৈনিকটি সর্পদংশিত স্থানে দেখিয়ে বললো- এই যে, এইখানে।
ডান পা-র আঁঠুর তলে কামড়েছিলো। সাপে কামড়ানো স্থান থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। বিষ যাতে উজাতে না পারে তারজন্য সৈনিকটি সর্পদংশিত স্থানের কিছু উপরে একটি রশি দিয়ে কষে বাঁধলেন। ইতিমধ্যে আশ-পাশের কয়েকজন সৈনিক সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছিলো। তোপবাহী একটি গাড়ীতে তুলে সর্পদংশিত সৈনিকটিকে অপেক্ষাকৃত এক টুকরো খোলা স্থানে নিয়ে আসা হলো।
মানুষ, হাতি, ঘোড়া, উট প্রভৃতির জন্য ঘন কাঁটাযুক্ত লতা-পাতার মধ্য দিয়ে হাঁটাটা খুবই কষ্টকর হচ্ছিল। তার উপরে ভূতের উপরে দানব পড়ার মতো কোনো কেনো স্থানে মাটিও কাদাযুক্ত ছিলো। ভারি তোপবাহী গাড়ীর চাকা স্থানে স্থানে কাদার মধ্যে ঢোকে যেতে লাগলো। সেগুলো কাদা থেকে টেনে তুলতে সৈনিকগুলো শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে পড়লো। ফলে যাত্রাপথ বিরক্তিজনকভাবে দীর্ঘ হতে লাগলো।
একবার এক স্থানে গাড়ীর চাকা গভীরভাবে কাদায় ঢোকে গেলো। সৈনিকরা যৎপরোনাস্তি চেষ্টা করেও গাড়ীর চাকা কাদা থেকে টেনে তুলতে সক্ষম হলো না।
কাদায় লুটোপুটি হয়ে আলীকুলি খাঁ নামক সর্দার একজন বাবরের নিকট এসে বললো-জাহাপনা, এই ঘন অরণ্যের মধ্য দিয়ে তোপবাহী গাড়ী নিয়ে যাওয়াটা আমাদের সাধ্যের বাহিরে। চারদিকে শুধু কাদা। সব কয়টা গাড়ী কাদার জন্য অচল হয়ে পরেছে। একটি গাড়ী তো কাদার মধ্যে ঢোকেই পরেছে। অনেক সময় চেষ্টা করেও গাড়ীটি কাদা থেকে টেনে তুলতে সক্ষম হইনি। লোকগুলো শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
বাবর তাঁর পেছনে পেছনে আসা তাহির বেগের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন- তাহির বেগ সাহেব, আপনি যান। পথপ্রদর্শক লোকটিকে এখানে ডেকে আনুনগে'।
পথপ্রদর্শক লোকটি হিন্দুস্থানী। নাম লালচান্দ। সবার আগে আগে সে হাতীতে উঠে যাচ্ছিলো। তাহির বেগ এগিয়ে এসে লালচান্দকে উদ্দেশ্য করে বললো- লালচান্দ সাহেব, জাহাপনা আপনাকে স্মরণ করেছেন।
বাবর স্মরণ করা বলে জেনে লালচান্দ তৎক্ষণাৎ হাতীর পিঠে চড়েই বাবরের নিকট এলো।
হাতী দেখে বাবরের ঘোড়াটি চিঁহিহি চিৎকার করে ছটফট করতে লাগলো। লালচান্দ বিশালকায় হাতীটি বাবরের কাছ থেকে কিছু দূরে থামিয়ে হাতীর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে কিছু বললো। হাতীটা শুঁড় তুললো। লালচান্দ শুঁড় বেয়ে হাতীর পিঠ থেকে নেমে বাবরের নিকট এসে হাতজোড় করে অভিবাদন জানালো।
লালচান্দ ফার্সি ভাষা জানতো। সেজন্য বাবর লালচান্দকে উদ্দেশ্য করে ফার্সি ভাষায় বললেন- লালচান্দ সাহেব, পথ খুব খারাপ। মানুষ চলাচলের জন্য একেবারে অনুপযুক্ত। আপনি অন্য পথের সন্ধান করুন।
লালচান্দ বিনীতভাবে বললো- জাহাপনা, আমরা এখন পাঞ্জাব এসে পৌঁছেছি। পাঞ্জাব পঞ্চ নদীর দেশ। নদীগুলোতে বর্তমান বান এসেছে। দুই কূল ছাপিয়ে জল ক্ষেত-খোলায় ঢুকে পড়েছে। রাস্তা-ঘাট, ক্ষেত-খোলা বর্তমান জলের তলে। সেজন্য অসুবিধা হলেও আমরা এখান দিয়েই যেতে হবে, জাহাপনা।
আমি জানামতে পাঞ্জাবে রাস্তা-ঘাটের অভাব নেই। বর্ষায় চলাচলের জন্য উঁচু উঁচু অনেক রাস্তা রয়েছে বলে আমি শুনেছি। গাড়ী নিয়ে যাওয়ার জন্য বোলে ভালো ভালো রাস্তা রয়েছে। আমাদের গাড়ীগুলো কাদার জন্য এগোতে পারছে না। চাকাগুলো মাটিতে ঢোকে যাচ্ছে। বাবর সন্দেহ প্রকাশ করে বললেন- আমরা ভুল রাস্তায় আসিনি তো?
না না, জাহাপনা, আমরা সঠিক রাস্তায়ই এসেছি। গাড়ীর চাকা কোথায় ঢুকে গেছে? আমায় আদেশ দিন, আমার হাতী সেগুলো কাদা থেকে টেনে বের করে দিবে। আমরা এখন দ্রুত এগিয়ে যাওয়া উচিত। অপেক্ষা করে থাকলে আমাদের অসুবিধা আরও বেশি হবে।
আচ্ছা, আপনি হাতী নিয়ে গিয়ে গাড়ীগুলো কাদা থেকে বের করে দিনগে’। বাবর লালচন্দকে গাড়ী তোলার জন্য অনুমতি দিলেন।
আলীকূলি খাঁ নিকটেই ছিলো। সে বাবরের উদ্দেশ্যে মাথা নুইয়ে লালচান্দের দিকে তাকিয়ে বললো- আচ্ছা, চলুন আপনার হাতী নিয়ে।
লালচান্দের শরীরে মাংসের লেশমাত্র নেই। চর্মসার শরীর। তার শরীর দেখতে একটি কংকালের মতো। আলিকুলির আহ্বান মর্মে সে হাতী নিয়ে আলীকুলির পেছনে পেছনে অগ্রসর হলো।
গন্তব্যস্থানে পৌঁছে হাতীটিকে কাদা থেকে গাড়ী টেনে তুলতে নির্দেশ দিলো। নির্দেশ পেয়ে হাতীটি অনায়াসে কাদা থেকে গাড়ী টেনে তুললো। হাতীর বিক্রম প্রত্যক্ষ করে সেখানে উপস্থিত সৈনিকগুলো অবাক হয়ে গেলো।
সর্পদংশিত সৈনিকটি গাড়ীর উপরে শোয়ে যন্ত্রণায় উঁআঁ করতে ছিলো। তার মুখমণ্ডল পাণ্ডুর হয়ে গিয়েছিলো। বিষক্রিয়া নষ্ট করার জন্য সাপ কামড়ানো ক্ষতস্থানে লতা-পাতা ছেঁচে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। তবে, ঔষুধের ক্রিয়ার থেকে বিষের ক্রিয়া প্রবল হওয়াতে সৈনিকটির বেঁচে থাকার আশা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছিলো। শরীরের বর্ণ এক সময় নীল পড়ে গেলো। একজন সৈনিক তার শিতানে বসে পাখা দিয়ে বাতাস করতে ছিলো।
গাড়ী আবার এগোতে লাগলো। বিকেল বেলা তাঁরা এসে রাবী নদীর পাড়ে উপস্থিত হলো। একশত জন সৈনিক নিয়ে হিন্দু বেগ এসে রাবী নদীর পাড়ে বাবরের সাথে মিলিত হলেন।
হিন্দু বেগ দিল্লীর একজন প্রতিষ্ঠিত নাগরিক। তিনি বর্তমান বাবরের দরবারের একজন সভাসদ। সাত বছর পূর্বে তিনি ইব্রাহীম লোডীর সভাসদ ছিলেন। কিন্তু তিনি ইব্রাহীম লোডীর স্বেচ্ছাচারিতা পসন্দ করতেন না। সেজন্য ইব্রাহীম লোডীর সাথে তাঁর মনোমালিন্য হয় এবং লোডীর রোষ থেকে পরিত্রাণ পেতে তিনি কাবুল পালিয়ে গিয়ে বাবরের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন।
হিন্দু বেগ সুশিক্ষিত এবং বুদ্ধিমান ছিলেন। তুর্কি এবং ফার্সি ভাষায় তাঁর যথেষ্ট বুৎপত্তি ছিলো। বাবর গুণীর গুণের মূল্য বুঝতেন। প্রথম সাক্ষাতেই তিনি হিন্দু বেগের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেয়ে নিজের দরবারের একজন কর্মচারি হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন এবং কর্মদক্ষতার বলে অল্পদিনের ভেতরে তিনি বাবরের প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছিলেন।
ইব্রাহীম লোডী ছিলো একজন স্বেচ্ছাচারি ও নিষ্ঠুর শাসক। তাঁর অন্যায় অত্যাচার এবং শাসন শোষণে হিন্দুস্থানের জনসাধারণকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিলো। হিন্দুস্থান থেকে ইব্রাহীম লোডীর শাসন উপরে ফেলে শোষণমুক্ত সমৃদ্ধিশালী হিন্দুস্থান গঢ়াই ছিলো হিন্দু বেগের প্রধান লক্ষ্য। বাবরের দরবারে কর্মচারি হিসাবে নিয়োগ হয়েই তিনি এই বিষয়ে বাবরের সাথে আলোচনা শুরু করেন এবং হিন্দুস্থান আক্রমণের জন্য বাবরকে উৎসাহিত করতে থাকেন।
বাবর আগে থেকেই হিন্দুস্থানের প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করছিলেন। হিন্দু বেগের কাছ থেকে উৎসাহ পেয়ে বাবরের সেই আকর্ষণ অনেক গুণে বৃদ্ধি পায় এবং তিনি হিন্দুস্থান আক্রমণের জন্য ইতিবাচক সন্মতি প্রকাশ করেন। বাবরের নিকট থেকে সন্মতি পেয়ে ইব্রাহীম লোডীর প্রতি অসন্তুষ্ট হিন্দুস্থানী রাজন্যবর্গ, শাসক এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের সাথে হিন্দু বেগ বাবরের হিন্দুস্থান আক্রমণ সম্পর্কে আলোচনা শুরু করেন।
হিন্দু বেগ বিনাযুদ্ধে হিন্দুস্থান দখলের পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁর বুদ্ধিমত্তার জন্যই গত বছর বাবর ঝীলাম নদীর পাড়ে অবস্থিত ভীরা সহর দখল করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে হিন্দু বেগের প্রতি বাবরের আস্থা অনেক গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইব্রাহীম লোডীর প্রতি অসন্তুষ্ট শাসক এবং নাগরিকদের সাথে আলোচনার জন্য হিন্দু বেগকে ভীরা সহরের সুবেদার নিযুক্ত করে রেখে গিয়েছিলেন।
কিছুদিন আগে পাঞ্জাবের শাসক দৌলত খাঁর পুত্র দিলোয়ার খাঁ হিন্দু বেগের নির্দেশ মর্মে বাবরের সাথে সাক্ষাৎ করতে কাবুল গিয়েছিলেন। দিলোয়ার খাঁর সাথে আলোচনা করে সহমতে উপনীত হয়ে গতবারের মতো এইবারও বাবর বিনাযুদ্ধে লাহোর অধিকার করার উদ্দেশ্যে হিন্দু বেগকে লাহোরের শাসক দৌলত খাঁর সাথে আলাপ-আলোচনা করতে নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। হিন্দু বেগ বাবরের নির্দেশ মর্মেই দৌলত খাঁর সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করে ইতিবাচক অগ্রগতি লাভ করে বাবরকে ডেকে পাঠিয়েছেন। হিন্দু বেগের আহ্বান মর্মেই বর্তমান বাবরের এই অভিযান।
হিন্দু বেগ বাবরের নিকট এসেই অভিবাদন জানিয়ে কোনো রকমের ভূমিকা না করে সরাসরি বললেন- জাহাপনা, দৌলত খাঁর অভিপ্রায় ভালো নয়, তিনি আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। কোনোমতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছি।
বাবর প্রথমে হিন্দু বেগের কথার অর্থ উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছিলেন না যদিও হিন্দু বেগের বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত চেহেরা এবং উৎকণ্ঠা প্রত্যক্ষ করে কথাটা উপলব্ধি করতে তাঁর অসুবিধা হল না। তিনি উৎকণ্ঠিতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন- কী বললেন? দৌলত খাঁ.....
উত্তেজনা উৎকণ্ঠায় বাবর বাক্যটা সম্পূর্ণ করতে পারলেন না।
হ্যাঁ জাহাপনা, দৌলত খাঁ আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। হিন্দু বেগ বিপর্যস্ত স্খলিত কণ্ঠে বললেন।
তাঁর মনোভাব হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ কি? হিন্দু বেগের কথায় বাবরের রাগ উঠেছিলো যদিও নিজেকে সংযত করে শান্ত কণ্ঠে বলার জন্য যত্ন করে বললেন- দৌলত খাঁ কয়েক মাস আগে তাঁর পুত্রকে আমার নিকট আলোচনার জন্য পাঠিয়েছিলেন। আমি দিলোয়ার খাঁর সাথে আলোচনা করেই সব সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার সিদ্ধান্তে সেও সহমত প্রকাশ করে এসেছে। দৌলত খাঁর সাথে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে আপনিও আমার নিকট পত্র প্রেরণ করেছিলেন। দৌলত খাঁ একজন প্রবীণ ব্যক্তি। বয়োজ্যেষ্ঠ হিসাবে আমি তাঁর প্রতি সন্মান প্রদর্শন করে এসেছি। এখন এ রকম হঠকারিতার কারণ কি?
কিছুদিন আগেও সব ঠিকই ছিলো। কিন্তু এখন দৌলত খাঁ সেসব কথা ভুলে গেছেন। বর্তমান তিনি কটিদেশে দু’টি তরবারি ঝুলিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁর এই আচরণের উদ্দেশ্যও তিনি আমাকে বুঝিয়ে বলেছেন। তরবারি দু'টির একটি আপনার জন্য এবং অন্যটি ইব্রাহীম লোডীর জন্য। সময় সুযোগ পেলেই তিনি তরবারি দু’টির সদ্ব্যবহার করার জন্য বদ্ধপরিকর।
দিলোয়ার খাঁও আমাদের সাথে শত্রুতা করবে নাকি?
না না, দিলোয়ার খাঁ আমাদের পক্ষেই রয়েছে। আমাদের সাথে বুঝাপড়ার কথা সে ভুলেও যায়নি। সে বিনাযুদ্ধে লাহোর আমাদের হাতে সঁপে দিতে প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। তার জন্যই আমি আসন্ন মৃত্যুর হাত থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। সে তাঁর পিতৃর চক্রান্তের কথা আমাকে পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছিলো। না হলে আমি দৌলত খাঁর হাত থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হতাম না। অবশ্যে দৌলত খাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র গাজী খাঁ পিতৃর স্বপক্ষে।
এবং আলম খাঁ ?
আলম খাঁ বর্তমান কিংকর্তবিমূঢ় হয়ে পরেছেন। সে ইব্রাহীম লোডীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ভয় পাচ্ছে। কারণ ইতিমধ্যে ইব্রাহীম লোডীর কাছ থেকে সে শিক্ষা পেয়েছে। সেজন্য ইব্রাহীম লোডীকে সে বর্তমান যমের মতো ভয় করে। আমার ধারণা, আপনি লাহোর গেলেই সে মনে বল পাবে এবং আপনার বশ্যতা স্বীকার করবে। বর্তমান আমাদের সবচেয়ে প্রধান বাধা হলো গাজী খাঁ। সেনা বাহিনীর উপরে দৌলত খাঁর চেয়ে গাজী খাঁর প্রভাব বেশি। গাজী খাঁকে হারাতে পারলেই যে তাঁর সেনাবাহিনী আমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে, এটা নিশ্চিত। হিন্দু বেগ কিছুক্ষণের জন্য থেমে চারদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- কিন্তু জাহাপনা, আপনি এই দুর্গম পথ দিয়ে আসছেন কেন?
আমরা তো পথ প্রদর্শকের নির্দেশিত পথ দিয়েই আসতেছি। সে আমাদের ভুল পথে এনেছে নাকি?
কোথায় সেই পথ প্রদর্শক? আপনি আমাকে তার সাথে কথা বলতে অনুমতি দিন। বাবরের নির্দেশে তাহিরজান লালচান্দকে ডেকে আনলো।
লালচান্দ হাতীর পিঠে চড়ে বাবরের নিকট এলো। বাবর এবং হিন্দু বেগ ঘোড়ার পিঠে বসে কথা বলছিলেন। সেজন্য লালচান্দ হাতীর পিঠে বসেই বাবরকে অভিবাদন এবং হিন্দু বেগকে নমস্কার জানালো। হিন্দু বেগ হিন্দু প্রথামতে প্রতি নমস্কার জানিয়ে ঘোড়ার পিঠে নড়েচড়ে বসে হিন্দুস্থানী ভাষায় জিঞ্জাসা করলেন- তুমি কোন জায়গার লোক?
আগ্রার হুজুর। লালচান্দ বিনম্রভাবে বললো।
পাঞ্জাব কেন এসেছ?
কাজের সন্ধানে, হুজুর। ক্ষুধা নিবারণ করতে তো কিছু একটা করতেই হয়।
হাতী তোমার নিজের নাকি?
হ্যাঁ হুজুর, নিজের......
এ রকম হাতী থাকতে ইব্রাহীম লোডীর সেখানে কাজ করলে না কেন?
তিনি খুব কৃপণ লোক, হুজুর। সোনা-দানা তিনি শুধু সিন্দুকে জমা করতেছেন। সেগুলো তিনি খরচ করতে চান না।
তুমি একেবারে সত্যি কথা বলেছ। হিন্দু বেগ লালচান্দের মনের খবর নিতে তার সাথে সহমত প্রকাশ করে বললেন- আমি নিজেও ইব্রাহীম লোডীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তাঁর সংগ ত্যাগ করে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি। ইব্রাহীম লোডীর পিতৃ সিকন্দর লোডী আমার পিতৃর বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার মিথ্যা অভিযোগ এনে হাতীর পা-র তলে ফেলে দিয়েছিলেন এবং হাতী আমার পিতৃকে পা দিয়ে মাড়িয়ে হত্যা করেছিলো। আমিও তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমি নিজের চোখেই সেই মর্মান্তিক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিলাম। আমি এখন পর্যন্ত সেই দৃশ্য ভুলতে পারিনি। হুজুর, এখনও আমার চোখের সন্মুখে ভেসে রয়েছে সেই ভয়াবহ দৃশ্য।
হিন্দু বেগ আশা করা মতেই লালচান্দের চোখেমুখে সহানুভূতির ছাপ প্রকট হয়ে উঠলো। সে জিজ্ঞাসা করলো- আপনি ক্ষত্রিয় নাকি?
হ্যাঁ আমি ক্ষত্রিয়। আমার প্রকৃত নাম ইন্দার সিং। হিন্দু বেগ ইশারায় বাবরকে দেখিয়ে বললেন- জাহাপনা আমায় হিন্দু বেগ বলে সম্বোধন করেন। বর্তমান সবাই আমাকে এই নামে সম্বোধন করতে পসন্দ করে। হিন্দু বেগ এভাবে নিজের পরিচয় দিয়ে লালচান্দের নাম জানতে চাইলেন-আচ্ছা, তোমার নাম কি?
লালচান্দ। লালচান্দ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো।
আচ্ছা লালচান্দ, ইব্রাহীম লোডীর অত্যাচার থেকে বর্তমান কে আমাদের রক্ষা করতে পারবে?
লালচান্দ চিন্তাভাবনা না করেই ফট করে উত্তর দিলো- ভগবান।
ভগবান তো নিজে কিছুই করেন না। তিনি মানুষের দ্বারা কাজ করায়। তোমার মতে সেই মানুষ কে হতে পারে?
লালচান্দ চিন্তামগ্ন হলো। সে হিন্দু বেগের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না।
লালচান্দকে চিন্তামগ্ন দেখে হিন্দু বেগ তার মনের ভাব জানার জন্য টোপ ফেললেন- দৌলত খাঁ এ রকম কাজ করতে পারবে নাকি?
লালচান্দ টোপ গিললো। সে হিন্দু বেগের দিকে তাকিয়ে উৎসাহিত কণ্ঠে বললো- দৌলত খাঁ একজন দয়ালু শাসক, কিন্তু গাজী খাঁ দৌলত খার চেয়েও ভালো।
হিন্দু বেগ ঘণিষ্ট হওয়ার জন্য নিম্নস্বরে বললেন-সত্যি কথা বল, তুমি বাবরকে এই দুর্গম পথে এনেছ কেন?
গাজী খাঁর এ রকমই নির্দেশ ছিলো। লালচান্দ গর্বিত কণ্ঠে বললো।
হিন্দু বেগ চিন্তিত কণ্ঠে বললেন- কিন্তু গাজী খাঁ এই দুর্গম পথ দিয়ে আনতে নির্দেশ দেওয়ার কারণ কি?
লালচান্দ বাবরের দিকে লক্ষ্য করেই পুনরায় হিন্দু বেগের দিকে তাকিয়ে নিম্নস্বরে বললো- এদের জন্য এটাই উত্তম পথ।
এরা তোমার কি ক্ষতি করেছে?
আমাদের জন্য ইব্রাহীম লোডীই যথেষ্ট। এখন আরও একজন অত্যাচারি আসতেছে। সেও একজন বিদেশী।
গাজী খাঁ তোমার সাথে ছলনা করেছে। হিন্দু বেগ নিজের ধারণা ব্যক্ত করলেন।
লালচান্দ সচকিত হয়ে উঠলো। হিন্দু বেগের কথায় সে হিন্দু বেগকে বাবরের সমর্থক বলে বুঝতে পারল। সে হঠাৎ তার হাতীটিকে লতা-পাতার মাঝে ঠেলে নিয়ে বললো- এরা বিদেশী- আক্রমণকারী। এরা জল্লাদ। এরা গতবছর আমাদের তিন হাজার সেনা হত্যা করেছে। সহর, গ্রাম লুটপাট করে লোকদের সর্বস্বান্ত করে গেছে। এরা আমাদের দেশের শত্রু—এরা হত্যাকারী জল্লাদ।
এভাবে বলেই লালচান্দ হাতী গভীর অরণ্যের দিকে ঠেলে নিতে লাগলো।
বাবর কিছু দূরে ছিলেন। লালচান্দ পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম করা দেখে হিন্দু বেগ উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন- জাহাপনা, লালচান্দকে বন্দি করার আদেশ দিন। এ আমাদের শত্রু। গাজী খাঁর নির্দেশে এ আপনাদের ভুল এবং দুর্গম পথে এনেছেন।
বাবরও উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। ক্ষোভ আক্রোশে তাঁর সিরা-উপসিরাগুলো স্ফীত হয়ে উঠলো। তিনি উত্তেজিত কণ্ঠে আদেশ দিলেন- ধর, এই বিশ্বাসঘাতককে ধরে ফেল। সে যাতে পালিয়ে যেতে না পারে।
বাবরের নির্দেশ পেয়ে কয়েকজন অশ্বারোহী সেনা লালচান্দের পেছনে পেছনে ধেয়ে গেলো। তিনজন অশ্বারোহী দ্রুত এগিয়ে গিয়ে হাতীটাকে ঘিরে ধরলো।
লালচান্দ হাতীর কানের কাছে মুখ নিয়ে অশ্বারোহী সেনাদের দিকে ইশারা করে ফিসফিস করে কিছু বললো। সাথে সাথে হাতী ঘিরে দাঁড়ানো অশ্বারোহীদের দিকে এগিয়ে গিয়ে তিনজনের দুজনকে শুঁড় দিয়ে প্রহার করে মাটিতে ফেলে দিলো। তাদের দুজনের অবস্থা দেখে পেছনে পেছনে ধেয়ে আসা বাকি অশ্বারোহীরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো। সামনে থাকা অন্যজন অশ্বারোহী ভয়বিহ্বল হয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে অরণ্যের মাঝে অদৃশ্য হয়ে পড়লো।
অন্যান্য অশ্বারোহী সেনারা নিজের স্থানে দাঁড়িয়ে ‘ধর ধর, মার মার’ বলে চিল্লাচিল্লি করতে লাগলো। সমবেত কণ্ঠের চিল্লাচিল্লিতে হাতীটা ক্রমে উন্মত্ত হয়ে উঠলো। হাতীটা গগন ফাটানো নিনাদ করে গাছের শাখা-প্রশাখা, ডাল-পাতা ভেঙ্গে, পা দিয়ে মাড়িয়ে অরণ্যের গভীরে ঢোকে গেলো।
তীরন্দাজ সেনারা ডাল-পাতা ভাঙার শব্দ লক্ষ্য করে অবিরাম তীর বর্ষণ করতে লাগলো। কিন্তু ঘন অরণ্য, ডাল-পাতার প্রাচীর ভেদ করে মাত্র দু’টি শর হাতীর শরীরে আঘাত করতে সক্ষম হলো। বাকিগুলি শর গাছ-লতায় লেগে হাতী পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই রয়ে গেলো। দু’চারটে শরে হাতীর কোনোরূপ ক্ষয়ক্ষতি করতে পারল না।
ঘটনার গুরুত্ব দেখে বাবর উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। তিনি তোপধারী সেনাদের তোপ দাগতে নির্দেশ দিলেন। পাথরে ঘষে আগুন জ্বালিয়ে তোপের শলতেয় আগুন ধরাতে ধরাতে হাতী তাদের থেকে অনেক দূরে চলে যেতে সক্ষম হলো।
বাবর ক্ষোভে জ্বলে উঠলেন। আহত সিংহের মতো নিরুদ্ধ আক্রোশে তিনি গর্জে উঠলেন- আহত সেনা দুজনকে গাড়ীতে তুলেনাও এবং আহত ঘোড়া দু'টিকে মেরে ফেল। এভাবে আদেশ দিয়েই তিনি দাঁতে দাঁত ঘর্ষণ করে বললেন- সেই বদমাশ তার বেইমানীর শাস্তি পেতেই হবে। পুনরায় তিনি সেনাদের উদ্দেশ্যে বললেন- যাও, বন-জংঘল ঘিরে ফেল। সে যাতে কোনোমতেই প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে।
বাবরের নির্দেশ অনুসারে একদল অশ্বারোহী লালচান্দকে খুঁজতে বের হলো। কিন্তু লতা-পতা, কাদার জন্য তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। তারা লালচান্দের সন্ধান বের করতে সক্ষম হল না। অবশেষে নিরাশ হয়ে তারা নিজের দলের সন্ধানে ফিরে এলো।
সন্ধ্যের আগে আগে হিন্দু বেগ সেনাসহ বাবরকে একটি শ্যামল প্রান্তরে নিয়ে এলেন। পথশ্রমে শ্রান্ত ক্লান্ত সৈনিকেরা তাঁবু খাড়া করতে ব্যস্ত হয়ে পরলো। বাবর উৎকণ্ঠিতভাবে লালচান্দকে খুঁজতে যাওয়া অশ্বারোহীদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
অশ্বারোহী কয়জন সন্ধ্যের পরে পরেই তাঁবুতে ফিরে এলো। তাদের জামা-কাপড় ফেটে-ছিঁড়ে গিয়েছিলো এবং ঘোড়াগুলো কাদায় লুটোপুটি হয়ে গিয়েছিলো। ক্ষুধা পিপাসায় কাতর হয়ে তারা কোনোমতে ঘোড়ার পিঠে চড়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলো
সকাল বেলা দৌলত খাঁ লোডী এবং দিলোয়ার খাঁ লোডী পঞ্চাশজনের একটি ছোট সেনাদল নিয়ে বাবরের ছাউনিতে উপস্থিত হলেন। বাবরের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পহরারত সৈনিকেরা তাঁদের ছাউনির ভেতর প্রবেশের অনুমতি দিলো। দৌলত খাঁ এবং দিলোয়ার খাঁ সেনাসহ ছাউনির ভেতর প্রবেশ করলেন। বাবর শুধু দিলোয়ার খাঁকে তাঁর তাঁবুতে ডেকে পাঠালেন। দৌলত খাঁ তাঁর সেনার সাথে তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
দিলোয়ার খাঁকে বেগদের মাঝে বসিয়ে বাবর কুশল সংবাদ জিজ্ঞাসার পরে সরাসরি অভিযোগের সুরে বললেন- জ্বনাব, আপনার
পিতৃকে আমি নিজের পিতৃর মতো সন্মান করি; অথচ তিনি সন্ধির শর্ত ভংগ করে আমার সাথে বেইমানী করলেন কেন? কি কারণে আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে চাইছে? এটাকে বিশ্বাসঘাতকতা না বলে কী বলব?
বাবরের কর্কশ প্রশ্নে দিলোয়ার খাঁর মুখমণ্ডল ভয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠলো। পিতৃকে দোষমুক্ত করার জন্য তিনি আমতা আমতা করে বললেন- জাহাপনা, পিতার অবশ্যে তেমন দোষ নেই। ভ্রাতৃ গাজী খাঁ পিতাকে ভুল পথে পরিচালনা করতেছেন। লাহোরে অন্য কোনো শাসক এলে লাহোরের ক্ষমতা আমাদের হাত থেকে চলে যাবে বলে তিনি পিতৃকে ভয় দেখাচ্ছেন। ইব্রাহীম লোডীর মতো আপনিও যে আমাদের একজন শত্রু এই কথা প্রতিপন্ন করার জন্য তিনি অহরহ চেষ্টা করতেছে। ফলে পিতা বর্তমান মনের স্থিরতা হারিয়ে ফেলেছেন। কোনটা ভালো এবং কোনটা মন্দ এই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে না পেরে তিনি বর্তমান উন্মাদপ্রায় হয়ে উঠেছেন।
এবং উন্মাদপ্রায় হয়ে প্রবীণ ব্যক্তি দৌলত খাঁ আমাদের ভুল পথে নিয়ে আসার জন্য একজন মিথ্যুক পথপ্রদর্শক আমাদের নিকট পাঠিয়েছিলেন, আমরা যাতে গভীর অরণ্যের ফাঁদে বন্দি হয়ে মরে থাকি তারজন্যই নাকি?
না না জাহাপনা, পিতৃ এই ষড়যন্ত্রের বিষয়ে কিছুই জানেন না। এ নিশ্চয় গাজী খাঁর চক্রান্ত! পিতৃ স্বয়ং এ রকম চক্রান্ত করলে নিশ্চয় আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন না। জাহাপনা, আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য পিতা তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। পিতার এখন যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তিনি এখন রক্তপাত মোটেই পসন্দ করেন না। আপনি বিশ্বাস করুন জাহাপনা, আপনি লাহোর যাওয়াটা পিতা মনে-প্রাণে কামনা করেন। দিলোয়ার খাঁ অনুনয় বিনয় করে বললেন- আপনি পিতাকে দয়া করুন, জাহাপনা।
বাবরের মুখমণ্ডল কঠোর হয়ে উঠলো। তিনি দিলোয়ার খাঁর দিকে তাকিয়ে ভ্রূকুটি মিশ্রিত সুরে বললেন- দয়ার যোগ্য শুধু আপনি, জ্বনাব দিলোয়ার খাঁ; আপনার পিতা নয়। আপনার পিতৃ সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। শত্রুকে শাস্তি এবং মিত্রকে সহায় করার জন্য হজরত মহম্মদ(ছাঃ) আমাদের উপদেশ দিয়ে গেছেন। এটা নিশ্চয় আপনি অবগত। বাবর নিজের দেহরক্ষী সর্দারকে উদ্দেশ্য করে বললেন- শুনেছি দৌলত খাঁ কয়েক দিন যাবত কোমড়ে দু’টি তরবারি ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন! আমি দৃশ্যটা একটু দেখতে চাই। আপনি যান, তাঁর পসন্দের জায়গায় তরবারি ঝুলিয়ে এখানে নিয়ে আসুন।
আদেশ প্রতিপালিত হলো। দু’জন মজবুত সেনা দৌলত খাঁর দুই বাহুতে ধরে তাঁবুর ভেতর নিয়ে এলো। দৌলত খাঁ সেনা দু’জনের হাতের মুঠো থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ছটফট করছিলেন। ফলে তাঁর গলায় ঝুলানো তরবারি দু’টি পরস্পরের সাথে ঠেকা খেয়ে ধাতব শব্দ করতেছিলো। দৃশ্যটা প্রত্যক্ষ করে উপস্থিত বেগবর্গ একজন আরেকজনের মুখের দিকে চেয়ে মুখ টিপে হাসতে লাগলেন।
দৌলত খাঁ বাবরের দিকে তাকিয়ে ক্ষোভের সাথে চিৎকার করে বলতে লাগলেন- আমাকে এখানে কেউ বন্দি করে আনেনি। আমি নিজ ইচ্ছায় আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছি। আপনি আমার সাথে বেইমানী এবং দুর্ব্যবহার করছেন।
বেইমানী কে করছে? আমি, না আপনি? বাবর গর্জে উঠলেন- হিন্দু বেগ যখন আমার আজ্ঞা নিয়ে আপনার নিকট গিয়েছিলেন, তখন আপনি তাঁকে হত্যা করার জন্য ষড়যন্ত্র করেছিলেন এবং গাজী খাঁ আমাদের মারতে কাদাময় গভীর অরণ্যের মাঝে ঠেলে দিয়েছিলো। গাজী খাঁ আপনার পুত্র। সে কার নির্দেশে এরকম কাজ করেছে? সেই পরামর্শ দাতা আপনার বাহিরে অন্য কেউ নয়। আপনি আমাদের সাথে বেইমানী করেছেন। বেইমানের সাথে আমরা বেইমানী-ই করি। বাবর কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে নিজের উজির-এ-আজম দুলহায়কে উদ্দেশ্য করে বললেন- জ্বনাব, আপনি একেঁ এর বংশধরসহ বন্দি করে ভীরা পাঠিয়ে দিন এবং মিলবত দূর্গে বন্দি করে রাখার জন্য নির্দেশ দিয়ে পাঠান। এদেঁর অনুপস্থিতিতেও আমরা যুদ্ধের কাজ চালাতে পারব।
আশ্চর্যচকিত দৌলত খাঁর হাত-পা শিথিল হয়ে এলো। তাঁর পা দু'টি নিজের দেহের ভার বহন করতে অসমর্থ হলো। তিনি লেপটে মাটিতে বসে পড়লেন।
দু’জন সেনা দৌলত খাঁকে টেনে-হিঁচড়ে তাঁবুর বাইরে নিয়ে গেলো।
অন্য দু'জন সেনা দিলোয়ার খাঁর পেছনে এমনভাবে এসে দাঁড়ালো যেন তারা মাটি ফুটে বেরিয়ে এলো।
দিলোয়ার খাঁর মুখমণ্ডলও পাংশুবর্ণ ধারণ করলো।
এর পরে কয়েকদিনের কষ্টকর যাত্রার পরে বাবর সসৈন্যে পাঞ্জাব এসে পৌঁছোলেন। পাঞ্জাব অধিকার করে গাজী খাঁকে বন্দি করে পাঞ্জাবের শাসনভার নিজের হাতে আনলেন।
পাঞ্জাব অধিকার করার কয়েকদিন পরে দিল্লী অভিমুখে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। বাবরের এই মনোভাবের সংবাদ পেয়ে ইব্রাহীম লোডী বাবরকে বাধা প্রদানের জন্য দাউদ খাঁ এবং হামিদ খাঁর নেতৃত্বে বিপুল সেনা পঞ্জাব অভিমুখে পাঠালেন। বাবর অতি সহজেই লোডী বাহিনীকে পরাজিত করে রূপার, আম্বালা প্রভৃতি স্থান দখল করতে সক্ষম হলেন।
কিন্তু পথশ্রমের ক্লান্তি এবং উপর্যুপরি যুদ্ধে ব্যস্ত থাকার জন্য বাবর সেনা ক্লান্ত হয়ে পড়লো। ফলে বাবর সেনাবহিনীকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য দিল্লী অভিযান কিছুদিনের জন্য স্থগিত রাখলেন। দিল্লী অভিযান স্থগিত রেখে তিনি সেনাবাহিনী সুবিন্যস্ত করতে মনোনিবেশ করলেন।
*
* *
শীতের শেষে বসন্তের আগমন হলো। বসন্তের আগমনের সাথে সাথে গাছ-লতায় নতুন পল্লব অঙ্কুরিত হলো। প্রকৃতি হিন্দুস্থানের বিশাল বিস্তৃত প্রান্তরে পেরে দিলো সবুজ শ্যামল চাদর। শ্যামল রূপ ধারণ করলো সর্বত্র। প্রকৃতি হয়ে উঠলো উদ্ভিন্ন যৌবনা। দিকে দিকে ফুটে উঠলো নানান রঙের ফুল। ভোমোরার গুঞ্জন, পক্ষীর কলরবে মুখর হয়ে উঠলো ধরণী।
ঠিক এমনি একটি সময়ে বাবর সসৈন্যে ভীরা থেকে পানীপত অভিমুখে যাত্রা করলেন।
বাবর অতি সাবধানে, ধীরে ধীরে অগ্রসর হলেন।
অবশেষে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে তাঁরা এসে এসে দিল্লী থেকে পঞ্চান্ন মাইল উত্তর পশ্চিম দিকে অবস্থিত পানীপত নামক স্থানে এসে পৌঁছোলেন। বাবর পানীপত সহর এবং যমুনা নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে ছাউনি পেতে আসন্ন নির্ণায়ক যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
সেদিকে আগ্রা থেকে এক লক্ষ সেনার এক বিশাল বাহিনী নিয়ে ইব্রাহীম লোডী বাবরকে বাধা প্রদানের জন্য পানীপত অভিমুখে অগ্রসর হতে লাগলেন।
ইব্রাহীম লোডীর বাহিনীতে অসংখ্য যোদ্ধা হাতী ছিলো এবং তাঁর মনোবলো ছিলো যথেষ্ট উন্নত। কারণ গত বছর আলম খাঁ, দিলোয়ার খাঁ এবং অন্যান্য দেশীয় রাজার সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীর দিল্লী সীমান্তে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। সেই যুদ্ধে সন্মিলিত বাহিনীর চল্লিশ হাজার সেনার বিরুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীর জয় হয়েছিলো।
বর্তমান ইব্রাহীম লোডীর বাহিনীতে এক লক্ষ সেনা। বিপরীত পক্ষে বাবরের বাহিনীতে মাত্র বার হাজার সেনা। সেনার দিক থেকে ইব্রাহীম লোডী যথেষ্ট উপরে। তদুপরি বাবরের বাহিনীতে না থাকা অগণন যোদ্ধা হাতী ছিলো ইব্রাহীম লোডীর বাহিনীতে।
ইব্রাহীম লোডীর বিশাল সেনা বাহিনী এবং যোদ্ধা হাতীর কথা শুনে বাবরের অনেক সেনা ভয়বিহ্বল হয়ে পড়লো। তারা পরস্পরের মাঝে আলোচনা করতে লাগলো- আমরা আসন্ন যুদ্ধে পরাজিত হলে হিন্দুস্থানের এই বিশাল ভূ-খণ্ড থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেলেও লাভ হবে না। কারণ লুকিয়ে লুকিয়ে গেলেও শত্রুসেনার হাতে ধরা পড়তে হবে। সেজন্য আমরা প্রাণপণে যুদ্ধ করে শত্রুসেনাদের পরাজিত করার বাহিরে অন্য কোনো উপায় নেই।
কিছুসংখ্যক সেনার বাহিরে অধিকাংশ সেনার বাবরের যুদ্ধের অনুভব এবং রণকৌশলের উপরে অগাধ আস্থা ছিলো। ওস্তাদ আলীকুলির তোপ এবং বন্দুকের উপরেও প্রগাঢ় ভরসা ছিলো অধিকাংশ সেনার। ইব্রাহীম লোড়ীর হাতী থাকলেও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। তদুপরি ইব্রাহীম লোডীর সেনার চেয়ে বাবর বাহিনীর আত্মবিশ্বাস, অভিজ্ঞতা এবং পারদর্শিতা অনেক গুণে বেশি ছিলো।
হাতীর প্রতি অবশ্যে বাবর সেনার ভয়ভাব ছিলো। কারণ দৈহিক বল এবং তরবারি দিয়ে সেই অতিকায় প্রাণীর সাথে প্রতিযোগিতা করা কোনোমতেই সম্ভব হবে না বলে সবাই অবগত ছিলো। কিন্তু সেনাদের আত্মবিশ্বাস ছিলো যে, তোপ এবং বন্দুক দিয়ে অতিকায় প্রাণীটাকে ঘায়েল করতে সক্ষম না হলেও ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া নিশ্চয় সম্ভব হবে। সাধারণতঃ তখন হিন্দুস্থানের যুদ্ধের পরিণাম হাতীর উপরে নির্ভরশীল ছিলো। তোপ এবং বন্দুক দিয়ে হাতী তাড়িয়ে পাঠাতে পারলে যুদ্ধে জয়ী হওয়াটা অসম্ভব হবে না বলে বাবর সেনার ধারণা ছিলো।
বাবর পানীপত সহর এবং যমুনা নদীর মধ্যবর্তী একখণ্ড স্থান যুদ্ধের জন্য নির্ধারণ করলেন। কারণ স্থানটুকু ছিলো প্রশস্ত এবং উন্মুক্ত। তোপ এবং গুলি বর্ষণের জন্য প্রশস্ত উন্মুক্ত স্থান বেশি সুবিধাজনক।
পর্যাপ্ত সময় থাকতেই বাবর যুদ্ধের সকল প্রকার আয়োজন সম্পূর্ণ করে তুললেন। যুদ্ধ কৌশল, সেনা পরিচালনা এবং আত্মরক্ষার প্রত্যেকটা খুঁটিনাটি দিক তন্ন তন্ন করে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিচার-বিশ্লেষণ করে বাবর সঠিক সিদ্ধান্ত নিলেন। শত্রুসেনার ইচ্ছানুসারে যাতে যুদ্ধ করতে না হয় তারও তিনি ব্যবস্থা করলেন।
সকল আয়োজন সম্পূর্ণ করে বাবর যুদ্ধের অনুশীলন করতে নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ অনুসারে সেনারা নিজের নিজের কৌশল অনুশীলন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তোপ এবং বন্দুকধারীরা তোপ এবং বন্দুক পরিচালনা, তীরন্দাজসকলে তীর পরিচানার অভ্যাস করতে লাগলো। বাবর পদাতিক সেনাদের জন্য এক অভিনব যুদ্ধ কৌশল উদ্ভাবন করলেন। সেনাদের সেই অভিনব কৌশল অনুশীলন করার জন্য নির্দেশ দিলেন।
বাবর বাহিনীতে সাতশ গাড়ী ছিলো। গাড়ীগুলো টিলার উপরে তুলে এনে গরুর চামড়ার মজবুত রশি দিয়ে একটার পর একটা বেঁধে অর্ধবৃত্তাকারে সারি বেঁধে স্থাপন করা হলো। গাড়ীগুলো যাতে গড়িয়ে যেতে না পারে তারজন্য চাকার তলে গাছের ডালের গোঁজ গুঁজে দেওয়া হলো। গাড়ীর সামনের দিকে এবং পেছনের দিকে অনেক খালী জায়গা ছিলো। তীর যাতে ভেদ করে আসতে না পারে তারজন্য সেই সব খালী জায়গায় লোহার অভেদ্য ঢাল খাঁড়া করে দেওয়া হলো।
অভিনব সেই যুদ্ধ কৌশল সম্পূর্ণ হয়ে উঠলো। এখন বাকি রইল শুধু একটি কাজ। যুদ্ধ সঞ্চালন করা নায়কের নির্দেশে গাড়ীর চাকার তলের গোঁজগুলো একসাথে সরিয়ে নেওয়া হবে এবং সাতশ গাড়ী একসাথে উপর থেকে ঢাল বেয়ে নিচের দিকে গড়িয়ে যাবে।
গাড়ীগুলো একসাথে গড়িয়ে দেওয়ার জন্য সংকেতের ব্যবস্থা করা হলো। সেনানায়ক আলীকুলি খাঁ অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে হাত ইশারা করবে এবং তাহিরজান সারির শেষপ্রান্তে গিয়ে গোঁজগুলো সরিয়ে নেওয়ার জন্য উচ্চ কণ্ঠে নির্দেশ দিবে।
সিদ্ধান্ত অনুসারে তাহির বেগ ঘোড়া ছুটিয়ে গাড়ীর সারির একেবারে শেষপ্রান্তে এসে সেনানায়ক আলীকুলি খাঁর সংকেতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। এদিকে সেনাগুলোও তাহিরজানের ঘোষণার অপেক্ষায় প্রস্তুত হয়ে রইলো। আলীকুলি খাঁ অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো ।
সবার দৃষ্টি আলীকুলীর উপরে নিবদ্ধ হলো। এক সময় আলীকুলি খাঁ হাত ইশারা করলো। সাথে সাথে তাহির বেগ উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলো- গোঁজগুলো সরিয়ে নাও।
নির্দেশানুসারে গোঁজগুলো সরিয়ে নেওয়া হলো। সাথে সাথে গাড়ীগুলো নিচের দিকে গড়িয়ে যেতে লাগলো। কিন্তু আশা করা মতে গাড়ীগুলো সমানে সমানে গড়িয়ে গেলো না। কিছু সংখ্যক এগিয়ে গেলো এবং কিছু সংখ্যক পিছিয়ে পড়লো। কয়েকটা গাড়ী আবার রশি ছিঁড়ে পংক্তিচ্যুত হলো। কয়েকটার আবার গাড়ীর সাথে বাঁধা ঢালগুলো উলটে গেলো।
বাবর পেছনে দাঁড়িয়ে অনুশীলন প্রত্যক্ষ করছিলেন। গাড়ীগুলো বিশৃংখল হয়ে পড়া দেখে তিনি আদেশ দিলেন- ওস্তাদ আলীকুলি, রশিগুলি না ছিঁড়া পর্যন্ত এবং গাড়ীগুলি উলটে না যাওয়া পর্যন্ত অনুশীলন অব্যাহত রাখুন।
সেনারা ঘেমে-জেমে আবার গাড়ীগুলি আগের জায়গায় আনলো।
কয়েকজন সেনা পরিশ্রমের ফলে একেবারে শ্রান্ত-ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো। তারা এই পরিশ্রম থেকে শরীর বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা চালালো। সর্দাররা তাদের গালাগাল দিতে লাগলো। আলসে কয়েকজনকে মারধোর পর্যন্ত করা হলো।
বাবর সেনাদের অমনোযোগিতা প্রত্যক্ষ করে নির্মমভাবে আদেশ দিলেন- অনুশীলনের সময়ে কাউকে অনুগ্রহ করা হবে না। কাজে সফল না হওয়া পর্যন্ত অনুশীলন চালিয়ে যেতে হবে।
এভাবে নির্মম আদেশ দিয়েই তিনি পরিখার কাজের অগ্রগতি নিরীক্ষণ করতে চলে গেলেন।
তিনবার অনুশীলন করার পরে গাড়ীগুলো ঠিক-ঠাক মতো গড়িয়ে দিতে সক্ষম হলো।
কিছুসংখ্যক সেনা নদীর পাড়ে পরিখা খনন করছিলো। একটি হাতী অনায়াসে যাতে ঢোকে যেতে পারে তেমন প্রশস্ত এবং গভীর করে খনন করা হয়েছিলো পরিখা গুলি। পরিখা খননের পরে উপরে ডাল-পাতা বিছিয়ে দেওয়া হলো। পরিখার চিন-ছাপ লুকোনোর জন্য ডাল-পাতার উপরে মাটি চেপে দেওয়া হলো।
তাহির বেগ দেহরক্ষীর সর্দার হওয়ার জন্য সব সময় সে বাবরের সাথেই থাকতো। ডাল-পাতা এবং মাটি চেপে পরিখা ঢেকে দেওয়ার পরে তাহির বেগ পরিখার দিকে তাকিয়ে ভাবলো- শত্রু যদি এদিক দিয়ে আক্রমণ করতে আসে খুব মজা হবে! তবে এদিক দিয়ে না এসে যদি অন্য দিক দিয়ে আসে, তাহলে সব পরিশ্রম ব্যর্থ হয়ে যাবে।
বাবর কিন্তু সকল বিষয়ের উপরে সমানে দৃষ্টি রাখছিলেন। গুপ্তচরদের মুখ থেকে তিনি অবগত হয়েছিলেন যে, পানীপতের দুই দিকে গভীর অরণ্য এবং কাদাময়। ডানদিকে যমুনা নদী। একদিকে ঘন বসতিপূর্ণ পানীপত সহর। সহরের শত শত অলি-গলি। অলি-গলিগুলিতে প্রতিনিয়ত অগণন লোক চালাচল করে। সেজন্য শত্রুসেনা সহরের মধ্য দিয়ে আসা সম্ভব হবে না। একমাত্র সন্মুখ দিক দিয়ে আসা সম্ভব। অর্থাৎ পরিখা পার হয়ে আসতে হবে। এই সব দিক ভেবেচিন্তেই বাবর পরিখা খননের কথা ভেবেছিলেন।
অবশেষে প্রতীক্ষিত দিন এলো। উভয় পক্ষের সেনা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে বের হলো। সেটা ছিলো পনের শ ছাব্বিশ সালের একুশ এপ্রিল। উক্ত দিনটি ইতিহাসের পাতায় বিখ্যাত পানীপত যুদ্ধ নামে লিপিবদ্ধ হয়ে রয়েছে।
সেদিন সূর্যটা যমুনা নদীর বামপাড়ে উদয় হয়ে ইব্রাহীম লোডীর এক লক্ষ সেনা প্লাবিত করে তীরবেগে নিজের শীর্ষদিন্দুর দিকে এগিয়ে আসছিলো। সূর্যের সাথে সাথে পিঁপড়ার জাঙ্গালের মতো এগিয়ে আসছিলো ইব্রাহীম লোডীর এক লক্ষ সেনা। দূর থেকে দেখে অনুমান হচ্ছিলো যে, চলন্ত সাগর একটি যেন বাবরের বার হাজার সেনা বানের মুখে ধৌত করে নিতে এগিয়ে আসছে। অগণন সেনার জন্য মাটি পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে পড়েছিলো এবং চলন্ত হাতী শুধু জাহাজের মতো দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল।
বাবর একটি টিলার উপরে দাঁড়িয়ে হিন্দুস্থানী সেনার গতিবিধি মনযোগ সহকারে নিরীক্ষণ করতে ছিলেন। টিলার উপর থেকে সেনার আকার-প্রকার বাবরের দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না। সেজন্য তাঁর অনুমান হলো, চলন্ত প্রান্তর একটি যেন তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে।
ইব্রাহীম লোডী সেনার আধিক্য দেখে বাবরের মতো সিংহ পুরুষের অন্তরেও ভয় সঞ্চার হলো। উৎকণ্ঠা উত্তেজনায় তাঁর বুক কেঁপে উঠলো।
বাবর ভাবতে লাগলেন- ওই হাতীগুলোর কোনো একটিতে আরোহণ করে ইব্রাহীম লোডী তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। বিশাল হাতীটির পিঠে বসেই হয়তো সে সমগ্র রণভূমি নিরীক্ষণ করতেছে। হয়তো সে বাবর সেনার সংখ্যালঘুত্ব প্রত্যক্ষ করে হাতীর পিঠে বসেই পৈচাশিক উল্লাসে নৃত্য করছে।
শত্রু সেনা ধীরে ধীরে নিকটে চেপে এলো। কিন্তু বাবর আগের মতোই শান্ত ও সংযতভাবে টিলার উপরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
গাড়ী এবং ঢালের মজবুত দেয়াল নির্দেশের অপেক্ষায় অপেক্ষা করছিলো। বাবরের অন্যান্য সেনাও নিজ নিজ দায়িত্ব দক্ষতা সহকারে সম্পন্ন করার জন্য সষ্টম হয়ে অপেক্ষা করতেছিলো। সবার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছিলো। সিরা- উপসিরাগুলো টনটন করতেছিলো। নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে শত্রুসেনার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য সবাই ব্যগ্রভাবে অপেক্ষা করছিলো।
বাবর সেনার ডান দিকের নায়ক ছিলেন শাহজাদা হুমায়ূন। পিতৃর মতোই হুমায়ূন বুদ্ধিমান ও সাহসী। তাঁর সাথে ছিলো, কালা বেগ, হিন্দু বেগ এবং অন্যান্য অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত সেনা নায়কগণ।
সেনাগুলো অর্ধবৃত্তাকারে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিলো। সারির মাঝভাগে ছিলো তোপধারী, বন্দুকধারী, তীরন্দাজ ও মজবুত অভিজ্ঞ পদাতিক সেনা। সারির দুই দিকে তুফানি হামলার জন্য সষ্টম হয়ে অপেক্ষা করতেছিলো অশ্বারোহী সেনা।
সন্মুখের দিক থেকে ধীর মন্থর গতিতে এগিয়ে আসছিলো ইব্রাহীম লোডীর এক লক্ষ সেনা। সেনাদলের অগ্রে অগ্রে আসছিলো বিশালাকায় যোদ্ধা হাতীর ঝাঁক। হাতীর ঝাঁকের অগ্রে অগ্রে আসছিলো ইব্রাহীম লোডীর বিশালাকায় হাতী। ইব্রাহীম লোডীর পেছনে পেছনে আসছিলো প্রয়োজনের চেয়েও অধিক পদাতিক সেনা। কম পরিসরে অধিক সেনা একসাথে আসার জন্য তারা ঠেলাঠেলি করে অগ্রসর হচ্ছিলো। ফলে তাদের গতি মন্থর হয়ে পড়ছিলো।
তাহির বেগ কয়েকজন দেহরক্ষীর সাথে বাবরের পরিজনবর্গ থেকে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো।
বাবরের থেকে অল্প দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো বাবর এবং সেনার সাথে সম্পর্ক রক্ষাকারী সংবাদবাহক সেনা। বাবর তাদের প্রয়োজন সাপেক্ষে নির্দেশ দিয়ে চলছিলেন। তাঁর নির্দেশের সুর ছিলো আত্মবিশ্বাসপূর্ণ এবং সুস্পষ্ট।
শত্রুসেনার দিকে তাকিয়ে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটা এক সময় বাবরের জন্য অসহ্যকর হয়ে উঠেলা। বেগবর্গও শত্রুসেনাদের বাধা প্রদানের জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠলো। কিন্তু বাবর অধৈর্য বেগবর্গ এবং সেনাদের শান্তশিষ্ট গুরুগম্ভীর কণ্ঠে সাবধান করতে লাগলেন- ধৈর্য ধরুন, অপেক্ষা করুন, কেউ এগিয়ে যাবেন না।
ইব্রাহীম লোডী লক্ষ্য করলেন, বাবর সেনা গাড়ী এবং ঢালের দেয়ালের পেছনে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেউ এগিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করছে না। বাবর সেনার নিষ্ক্রিয়তা প্রত্যক্ষ করে ইব্রাহীম লোডী তাঁর সেনাদের থামতে নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ পেয়ে চলন্ত জনসমূদ্র নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।
ইব্রাহীম লোডী তাঁর সেনা নায়কদের সাথে পরামর্শ করে সেনাদের ডান দিকে ঘুরতে নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশ এই কারণেই দিলেন যাতে মূল আক্রমণ মধ্যভাগে না করে প্রতিপক্ষের ডান দিকে করতে পারে। ডান দিক ভেদ করে সহরের দিক থেকে বেরিয়ে এসে যাতে প্রতিপক্ষ গাড়ী নিয়ে অবস্থানরত টিলাটি ঘিরে ফেলতে পারে।
কিন্তু এক লক্ষ সেনা শৃংখলাবদ্ধভাবে পরিচালনা করাটা সহজ কাজ ছিল না। নির্দেশ জারি করে থাকতেই কিছু সেনা বাবর সেনার ডান দিক লক্ষ্য করে ঘুরলো যদিও অধিক সংখ্যক সেনা ঘুরলো সহরের দিকে। ফলে সেনা বাহিনীতে বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি হলো। বিশৃংখল সেনা শৃংখলাবদ্ধ করতে ইব্রাহীম লোডীর অনেক সময় অপব্যয় হলো।
ইব্রাহীম লোডীর সেনা বিশৃংখল হওয়া দেখে বাবর উৎসাহিত হয়ে উঠলেন। প্রতি আক্রমণের জন্য দুই হাজার অশ্বারোহী প্রতিপক্ষের বাম দিকে পাঠিয়ে দিলেন।
অশারোহী সেনা তীব্র গতিতে এগিয়ে এসে কেন্দ্র থেকে দূরে থাকা লোডীর পদাতিক সেনা এবং হাতীর পেছন দিকে এলো।
অন্যদিকে হুমায়ূনের অশ্বারোহী বাহিনী প্রতিপক্ষকে ঘিরে ধরে তাদের পুনর্গঠিত হতে বাধা প্রদানের জন্য এগিয়ে এলো।
বাবর পূর্বের যুদ্ধের জয় এবং পরাজয়ের সব অভিজ্ঞতা পানীপতের যুদ্ধে প্রয়োগ করছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিলো, প্রতিপক্ষকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে প্রতিপক্ষের পরিকল্পিত যোজনা ভেঙে বিশৃংখল পরিবেশ সৃষ্টি করা।
বাস্তবেও বাবর সেটাই করলেন। ঘিরে ধরা সেনার থেকে ঘিরে ফেলা সেনার সংখ্যা অনেক বেশি ছিলো। প্রতিপক্ষ সেনা ঘিরে ধরা সেনার বেষ্টনি ভেঙে কখনও ডান দিকে, কখনও আবার বাম দিকে বের হয়ে আসতে
লাগলো।
এর মধ্যেই বাবর
একটি কৌশল করলেন। তিনি নিজের বাহিনীর কেন্দ্রভাগ খালী করার সিদ্ধান্ত
নিয়ে কোনো দিকে সংকটজনক পরিস্থিতি দেখলেই তাদের সহায়ের জন্য কেন্দ্রস্থিত সেনা থেকে
ডানে-বামে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেনা প্রেরণ
করতে লাগলেন।
বাবর জেনেশুনেই
এই কাজ করছিলেন। কেন্দ্র থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিলো দুটি। প্রথম উদ্দেশ্য ছিলো, কেন্দ্রস্থিত সেনার পিছন দিকেই গড়িয়ে দেওয়ার জন্য অপেক্ষারত গাড়ী এবং ঢালের
দেয়াল ছিলো। সেনা সরিয়ে না নিলে গাড়ী গড়িয়ে দেওয়া সম্ভব ছিল
না। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিলো, কেন্দ্রভাগ দুর্বল করে শত্রুসেনাদের প্রলোভিত করে গাড়ীর সন্মুখে টেনে আনা।
কৌশল কাজে এলো। কেন্দ্রভাগ দুর্বল হয়ে পড়ার সাথে সাথে ইব্রাহীম লোডী নিজের বাহিনীকে টিলার
দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। কারণ টিলার উপরেই
বাবর দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাবরকে আক্রমণ করার জন্য ইব্রাহীম লোডী এই নির্দেশ
দিলেন।
নির্দেশ পাওয়ার
সাথে সাথে ডানে-বামে এবং পেছন
দিকে সংঘটিত আক্রমণ উপেক্ষা করে প্রতিপক্ষ সেনার মুখ্য শক্তি যোদ্ধা হাতী নিয়ে টিলার
দিকে অগ্রসর হলো।
প্রতিপক্ষ সেনা
টিলার ঢাল বেয়ে কিছু উপরে উঠার পরে বাবর নির্দেশ দিলেন- গাড়ীর চাকার তলের গোঁজগুলি সরিয়ে
ফেল।
বাবরের নির্দেশ পেয়ে পরিকল্পনা অনুসারে একসাথে সাত
শ গাড়ীর চাকার তলের গোঁজ সরিয়ে ফেলা হলো। সাথে সাথে একটি
সারিতে সাত শ গাড়ী শত্রুসেনার দিকে কালান্তক যমের মতো গড়িয়ে যেতে লাগলো। ঠিক তখনই গর্জে উঠলো, আলীকুলি খাঁর কামান এবং বন্দুকধারীর বন্দুক।
ইব্রাহীম লোড়ীর
হাতী এবং পদাতকি বাহিনীর উপরে অবিরাম গুলী বর্ষণ হতে লাগলো। কামানের শব্দ কানে তালা মেরে ধরলো। কালো ধোঁয়ায়
আকাশ ছেয়ে ফেললো। শত্রুসেনা চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলো। এদিকে সাত শ গাড়ী ভয়ানক দৈত্যের মতো গড়িয়ে এসে শত্রুসেনার উপরে আঘাত করলো। শত্রুসেনার গগনভেদি আর্তনাদে আকাশ বাতাস কম্পিত করে তুললো। সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেলো ঈস্পিত দৌড়াদৌড়ি— বিশৃংখল পরিস্থিতি।
শত্রুসেনা এই অভিনব
আকস্মিক আক্রমণের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। কামান এবং বন্দুকের কানে তালা মারা শব্দে সেনার সাথে হাতীগুলিও আতঙ্কিত হয়ে
দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিলো। আহত সেনা এবং আতঙ্কিত
হাতীর চিৎকারে যুদ্ধক্ষেত্রে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করতে লাগলো। আহত এবং আতঙ্কিত হাতীগুলো আকাশ-বাতাস কম্পিত করে প্রচণ্ডভাবে চিৎকার করে ছট্ফট্ করতে লাগলো। মাউত বলপূর্বকভাবে
হাতীগুলি এগিয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করাতে হাতীগুলি অধিক উগ্র হয়ে উঠলো। শুরু হয়ে গেলো হাতীর তাণ্ডব। হাতীর পা-র তলে পড়ে ইব্রাহীম লোড়ীর অনেক সেনা
চেপটা হতে লাগলো।
কামান এবং বন্দুকের
গুলীবর্ষণ অবিরামভাবে চলতে থাকলো। কামানের আঘাতে
অনেক হাতী মরলো এবং আহত হলো। টিলার ঢালে অনেক
মৃত এবং আহত হাতী পড়ে রইল। এদিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে
বানের জলের মতো শত্রুসেনা এগিয়ে এসে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে লাগলো।
অবশেষে কামান এবং
বন্দুকের গুলীর সন্মুখে শত্রুসেনা তিষ্ঠাতে না পেরে উপায়বিহীন হয়ে বাবর সেনার দিকে
পিঠ দিয়ে পতঙ্গের মতো ছিটকে পালাতে লাগলো। দৌড়াদৌড়ি এতো
ক্ষিপ্রগতিতে চলছিলো যে, পলাতক সেনার ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে গিয়েও ইব্রাহীম লোডীর অনেক সেনা আহত ও নিহত
হলো। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে অনেকে অস্ত্র-শস্ত্র ফেলে দিয়েও উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ে
পালাল।
শত্রুসেনাদেরা
ঘিরে ধরা বাবর সেনা সংখ্যায় অল্প হওয়ার জন্য প্রতিপক্ষের পলাতক সেনাকে বাধা দিয়ে
রাখা কঠিন হয়ে পড়লো। প্রথমে হাতী ঠেলে-ঠেসে রাস্তা বের করে যেতে লাগলো এবং হাতীর পেছনে পেছনে পালাতে
লাগলো পদাতিক সেনা। বাবর টিলার উপরে দাঁড়িয়ে যুদ্ধের গতিবিধি নিরীক্ষণ করতেছিলেন। শত্রুসেনা পালিয়ে যেতে দেখে তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন- শত্রুসেনা পালিয়ে গিয়ে দিল্লীর দরজা বন্ধ করে দিতে পারে। বাধা দাও। তাদের যেতে দিবে না। ধরে ফেলো।
বাবর এভাবে চিৎকার করে নির্দেশ দিয়েই সম্পর্ক রক্ষাকারী সৈনিকদের দিকে তাকালো। তিনি দেখলেন সবাই যুদ্ধে ব্যস্ত। তাঁর কথা শুনার জন্য ধারে-কাছে কেউ নেই। সেজন্য তিনি দ্রুত অল্পদূরে দাঁড়িয়ে থাকা তাহির বেগের নিকটে এলেন।
বাবর তাহির বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন-তাহির বেগ, আমি জানতে চাই-- ইব্রাহীম লোডী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেছে, না এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছে? যদি সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেছে, তাহলে তার পশ্চাদধাবন করতে সেনা পাঠান। তাকে ধরে আনুন।
তাহির আচ্ছন্নের মতো যুদ্ধের গতিবিধি প্রত্যক্ষ করতেছিলো। বাবরের আহ্বানে সে সম্বিত ঘুরিয়ে পেয়ে পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠলো। সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্র মরণোন্মুখ প্রচণ্ড আর্তনাদ এবং দৌড়াদৌড়িমুখর। শ্বাসরুদ্ধকারী ধোঁয়ার আচ্ছাদনে চারদিক ছেয়ে ধরেছে। সামগ্রিকভাবে যুদ্ধক্ষেত্র তার উপলব্ধিতে নরক সদৃশ অনুমান হলো। দৃশ্য দেখে সে আতঙ্কে শিহরে উঠলো। নিজের দুর্বলতা লুকোতে সে কম্পিত কণ্ঠে আচ্ছন্নের মতো বললো- আপনার আদেশ শিরোধার্য, জাহাপনা।
তাহির বেগের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে একজন সংবাদবাহক ঘোড়া ছুটিয়ে বাবরের নিকটে এসে উল্লসিত কণ্ঠে বললো- জাহাপনা, যুদ্ধে আমাদের জয় হয়েছে। শত্রুসেনা যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে পালিয়ে যাইতেছে।
ইব্রাহীম লোডীও পালিয়েছে নাকি? সংশয়াহত কণ্ঠে বাবর জিজ্ঞাসা করলেন।
হ্যাঁ জাহাপনা, পলাতক হাতীর মাঝে তাঁর কালো কাপড়ের ঝালর পরানো হাতীটাও দেখেছি। সম্ভবতঃ সেও পালিয়েছে।
তাহির বেগ, কাশিমতায় মির্জা কোথায়?
চল্লিশ বছরের কাশিমতায় মির্জা এগিয়ে এসে অভিবাদন করে দাঁড়ালো।
বাবর কাশিমতায় মির্জাকে উদ্দেশ্য করে বললেন- ইব্রাহীম লোডী পালিয়ে গিয়ে যদি আগ্রার দূর্গে আশ্রয় নিতে সমর্থ হয়, তাহলে যুদ্ধ দীর্ঘ হবে। আমি বিনাযুদ্ধে আগ্রা দখল করতে চাই। আপনি ইমদাদী সেনা এবং তাহির বেগের অধীনস্থ সেনা নিয়ে শীঘ্ৰে ইব্রাহীম লোডীর পশ্চাদ্ধাবন করুন। প্রয়োজন হলে দিল্লী বা আগ্রা গিয়ে হলেও দূর্গে আশ্রয় গ্রহণ করার পূর্বেই তাঁকে বন্দি অথবা হত্যা করতে হবে। যান, দেরি করবেন না।
কাশিমতায় মাথা নুইয়ে বললো- আমার জীবন বিপন্ন করে হলেও আমি আপনার আদেশ পালন করব, জাহাপনা।
কাশিমতায়, বাবা সোহরা এবং তাহির বেগ ইব্রাহীম লোডীকে খুঁজতে বের হলো। কিন্তু তাঁরা অনেক সময় খুঁজেও ইব্রাহীম লোডীর সঠিক খবর সংগ্রহ করতে সক্ষম হল না। তারা বাবরের নিকটে এসে বললো- ইব্রাহীম লোডী যুদ্ধে নিহত হয়েছে, না বেঁচে আছে কেউ তার সঠিক তথ্য দিতে পারেনি। কিন্তু এটা ঠিক যে, সে পলাতক সেনার মাঝে নেই।
ইব্রাহীম লোডীর সঠিক সন্ধান বের করতে না পারলেও যুদ্ধে বাবরের জয় হলো।
ইব্রাহীম লোডীর অনেক সেনা পালিয়ে গেলো এবং অনেকে বাবর সেনার হাতে বন্দি হলো।
বিজয়ের আনন্দে উল্লসিত হয়ে বাবর সদলবলে দিল্লী অভিমুখে অগ্রসর হলেন। যাত্রার আগমুহুর্তে তিনি সেনাদের সতর্ক করে দিলেন- কেউ যেন কোনো নাগরিকের উপরে জুর-জবরদস্তি না করে।
* * *
বিজয়ের আনন্দে উল্লসিত হুমায়ূন একদল সেনা নিয়ে সবার আগে দিল্লী এসে পৌঁছোলেন।
হুমায়ূন দিল্লী এসেই বিনাযুদ্ধে সহর এবং দূর্গের উপরে বিজয় সাব্যস্ত করলেন। ইব্রাহীম লোডীর দিল্লীস্থিত কোষাগারো তিনি দখল করলেন। তার পরে তিনি হিন্দু বেগকে পথপ্রদর্শক হিসাবে এবং তিন শ সেনা নিয়ে সহর পরিভ্রমণ করতে বের হলেন।
বিশাল অসীম দেশ এবং বিশাল তার সহর।
দিল্লী সহর ছোট ছোট টিলা দিয়ে ভরা। তবুও অপেক্ষাকৃত সমতল। চারদিকে শ্যামলের সমাহার। অগণন ঘর-বাড়ি।
রাস্তা প্রায় জনশূন্য। দুই চারজন লোক রাস্তায় চলাচল করা দেখা গেলো। পানীপত যুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীর পরাজয়ের সংবাদ ইতিমধ্যে সহরে প্রচার হয়ে গিয়েছিলো। ফলে জনতা সম্ভবতঃ বিদেশী আক্রমণকারীর ভয়ে গৃহের মধ্যে আশ্রয় নিয়ে দুয়ার-খিড়কির ফাঁক দিয়ে সহরের গতিবিধি নিরীক্ষণ করতে ছিলো।
পবিত্র যমুনা নদীর পাড়ে একদল মানুষ দেখা গেলো। তাঁরা মৃতকের দাহ-সৎকার করতেছিলেন। তাঁদের পাশে লেলিহান শিখা মেলে আগুন(চিতা) জ্বলতেছিলো। লোকগুলি দাহ-সৎকারে ব্যস্ত। ইহলোকের প্রতি তাদের মোটেই ভ্রূক্ষেপ ছিল না। বিদেশী সেনার প্রতি লক্ষ্য করার মানসিকতা বা অবসর কোনোটাই যেন ছিল না তাদের।
হুমায়ূন কৌতূহলী দৃষ্টিতে হিন্দু বেগের দিকে তাকালেন।
হুমায়ূনের মনের ভাব উপলব্ধি করতে পেরে হিন্দু বেগ কথাটা বুঝিয়ে বললেন- হিন্দু প্রথামতে মৃতককে চিতার উপরে শোইয়ে ঘৃতাদি ঢেলে অগ্নি প্রজ্বলন করা হয়। অগ্নির দহনে নশ্বর দেহ পোরে ছাই হয়ে যায় এবং আত্মা পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায়। ছাইগুলি প্রবাহিত নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
হুমায়ূন এসে এসে একটি বাজারে উপস্থিত হলেন। কয়েকজন মহিলা এবং ছেলে-মেয়েদের ফুল নিয়ে খেলে থাকা প্রত্যক্ষ করলেন। তাদের পা-গুলো খালী। পাকা চুল এবং দাড়িবিশিষ্ট কয়েকজন লোকও ফুল হাতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের পা-গুলোও খালী। হুমায়ূনের জন্য সেটা এক অভিনব দৃশ্য। তিনি আবার কৌতূহলী হয়ে হিন্দু বেগের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন।
হুমায়ূনের পেছনে পেছনে আসা হিন্দু বেগ হুমায়ূনের দৃষ্টির অর্থ উপলব্ধি করতে পেরে বললেন- শাহজাদা, আমরা সহরের একটি বড় বাজারে এসেছি।
আজ ঈদ নাকি? এতো ফুল নিয়ে লোকগুলো কোথায় যাচ্ছে? হুমায়ূন জিজ্ঞাসা করলেন।
না শাহজাদা, আজ ঈদ নয়। ফুল নিয়ে লোকগুলো পূজা করতে মন্দিরে যাচ্ছেন। এরাঁ নিজেদের আরাধ্য দেব-দেবীর নিকট মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা জানাবেন। হিন্দুস্থানে প্রতি মাসেই এরকম উৎসব পালিত হয়।
আচরিত দেশ এই হিন্দুস্থান! হুমায়ূন স্বগতোক্তি করলেন।
রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় পুরানা বিশাল একটি ভবনের ছাদের উপরে দীর্ঘ হাত-পা, দীর্ঘ লেজ এবং কালো মুখবিশিষ্ট কয়েকটা বান্দর দৌড় লাফ পেরে থাকা দেখা গেলো। তাদের বাচ্চা কয়েকটা ছাদের উপরে দৌড়াদৌড়ি ও লাফালাফি করছিলো এবং কয়েকটা বান্দর একটি ডাল থেকে আরেকটি ডালে দ্রুতগতিতে লাফ মেরে মেরে খেলছিলো। দু'চারটে বান্দর রাস্তায়ও নেমে আসছিলো। কিন্তু পথচারিদের তাদের উপরে একটুও গুরুত্ব দেওয়া দেখা গেল না।
সহজ শিকার সন্মুখে দেখে একজন সৈনিক শরধনু প্রস্তুত করলো। হিন্দু বেগ ব্যস্তভাবে বাধা দিয়ে বললেন- বান্দর হত্যা মহাপাপ। হত্যাকারীর বিপদ হওয়াটাও বিচিত্র নয়।
হিন্দু বেগের ডান দিক দিয়ে আসা কালা বেগ হেসে হেসে ঠাট্টার সুরে বললো- আমরা গরুগুলোকেও রক্ষণাবেক্ষণ দেওয়া উচিত, না কি বলেন আপনি?
প্রতিটা কষ্টলব্ধ বস্তুকে আমরা রক্ষণাবেক্ষণ দেওয়া উচিত। হিন্দু বেগ গম্ভীরভাবে বললেন- হিন্দুস্থান গ্রীষ্মপ্রধান দেশ। গ্রীষ্মপ্রধান দেশের লোকগুলো কৃষির উপর নির্ভরশীল। গরু কৃষিকর্মের জন্য অতি প্রয়োজনীয় প্রাণী। সেজন্য হিন্দুস্থানে গরুকে লোকে পূজা করে। তদুপরি গরু থেকে উৎপন্ন পাঁচবিধ বস্তুকে লোকে সন্মান করে। সেজন্য হিন্দুলোকে গো হত্যাকে মহাপাপ বলে গণ্য করে।
হুমায়ূন আলোচনা সমাপ্ত করার জন্য শান্ত কণ্ঠে বললেন- আমরা বাদশাহের নির্দেশ ভুলে গেলে চলবে না। তিনি হিন্দুস্থানের প্রতিটা রীতি-নীতি এবং পরম্পরাকে সন্মান প্রদর্শন করার জন্য নির্দেশ দিয়ে পাঠিয়েছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের সন্মান হানি বা মনে আঘাত পেতে পারে তেমন সকল আচরণ থেকে আমরা বিরত থাকতে হবে।
খাজা কালা বেগ বুকে হাত স্থাপন করে বললো- জাহাপনার হুকুম শিরোধার্য। আমি আসলে হিন্দু বেগ সাহেবের সাথে তামাশা করছিলাম।
দূরে গাছ-বৃক্ষের উপর দিয়ে রোদের আলোতে দীপ্তিমান একটি গম্বুজ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো।
হুমায়ূন প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে হিন্দু বেগের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- ওই যে দীপ্তিমান ওই গম্বুজটা কী?
হিন্দু বেগ বললেন- ওইটা কুতুব মিনার। ওইটা দাসবংশের সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবাক নির্মাণ করিয়েছিলেন। ওইটা প্রায় দুশ বছরের পুরানা, শাহজাদা।
চলুন, বস্তুটা আমরা নিকট থেকে দেখে আসিগে'।
তাঁরা কুতুব মিনারের নিকটে এলেন। কুতুব মিনারের উচ্চতা দেখে সবাই অভিভূত হয়ে পড়লেন।
হুমায়ূন প্রশ্ন করেই ফেললেন- এতো উঁচু ! এটার উচ্চতা কত, বেগ সাহেব?
হিন্দু বেগ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন- দুইশত পঞ্চাশ ফুট, শাহজাদা।
উপরে উঠার সুবিধা রয়েছে নাকি?
নিশ্চয় রয়েছে। একেবারে উপরের মহলায় উঠে যেতে পারি। উপর মহলা থেকে সমগ্র দিল্লী সহর ভালোভাবে চোখে পড়ে।
হুমায়ূন ঘোড়া থেকে নেমে সেনাদের নিয়ে কুতুব মিনারের উপরের মহলায় উঠে এলেন।
কুতুব মিনারের উপর থেকে হুমায়ূন চতুর্দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করলেন। মিনার থেকে কিছু দূরে কালো স্তম্ভ একটির দিকে হুমায়ূনরে দৃষ্টি আকর্ষিত হলো। স্তম্ভটির চতুর্দিকে অনেক লোক ভির করে থাকা হুমায়ূনের চোখে পড়লো। তিনি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন- চতুর্দিকে লোক ভির করে থাকা ওই কালো বস্তুটা কী?
ওইটা লোহা দিয়ে নির্মিত স্তম্ভ। (স্তম্ভটার উচ্চতা ২৩ ফুট ৮ ইঞ্চি(৭.২১ মিটার। ব্যাস ১৬ ইঞ্চি(৪১ ছেণ্টিমিটার।) স্তম্ভটি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য-২ (৩৭৫-৪১৫) খ্রীষ্টপূর্বে নির্মাণ করিয়েছিলেন। স্তম্ভটি কুতুব মিনার কমপ্লেক্সে মেহরুলিতে অবস্থিত)। )শুনামতে ছয় শত বছরের পুরানা। কথিত রয়েছে, স্তম্ভটায় পিঠ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে পেছন দিকে দুই হাত প্রসারিত করে এক হাত দিয়ে অন্যটি হাতের আঙ্গুল পূর্ণ হয়।
হুমায়ূন মনযোগ সহকারে হিন্দু বেগের কথা শুনে যুবকসূলভ উৎসাহ প্রদর্শন
তাঁরা কুতুব। মিনার থেকে নেমে কালো স্তম্ভের নিকট এলেন। অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত সেনা দেখে ভির করে থাকা লোকগুলো রাস্তা ছেড়ে দিলো।
হুমায়ূন হিন্দু বেগকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আপনি একটু দেখিয়ে দিন তো কীভাবে হাতের আঙুল স্পর্শ করতে হয়?
স্তম্ভটার উপর এবং তলের অংশ কালো। অসংখ্য হাত এবং পিঠের ঘর্ষণের জন্য মাঝের অংশের রঙ উঠে গিয়ে তরবারির ফলকের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সেখানে সূর্যের রশ্মি পড়ে ঝিকমিক করতে ছিলো।
হি ন্দু বেগ স্তম্ভে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পেছন দিকে হাত প্রসারিত করে ডান হাতের আঙুল দিয়ে বাম হাতের আঙুল স্পর্শ করার জন্য চেষ্টা করে বিফল হলেন। তাঁর ব্যর্থতায় উপস্থিত সেনাগুলো হেসে ফেললেন।
হুমায়ূন নিজেও সেই হাসিতে যোগ দিয়ে হেসে হেসেই স্তম্ভে পিঠ ঠেকিয়ে পিছন দিকে দুই হাত প্রসারিত করে আঙুল স্পর্শ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তিনিও বিফল হলেন। তাঁর পরে অন্যান্য সেনারাও চেষ্টা করে কাজটা করতে বিফল হলো। অবশেষে দীর্ঘহাতের সমরকন্দী সেনা একজনে কাজটা করতে সক্ষম হলো। হুমায়ূন সাথে সাথে সেনাটিকে একমুষ্টি রুপোর মুদ্রা উপহার দিলেন।
হুমায়ূনের সাথে অন্যান্য সেনা নায়কদের অনেক ছোট ছোট দল নিজের অধীনস্থ সেনা নিয়ে সহর পরিভ্রমণ করতে বের হয়েছিলেন। তেমন একটি দলের সেনানায়ক ছিলো ইয়ার হোসেন। ইয়ার হোসেন লোভী এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক ছিলো। সহর পরিভ্রমণ করার চেয়ে সে লুটপাটের প্রতে বেশি আগ্রহী ছিলো। হিন্দু মন্দিরে অনেক সোনা-দানা। দেব-দেবীগুলো অনেক মূল্যবান রত্ন দিয়ে সজ্জিত। সেজন্য লোভ সামলাতে না পেরে লুটপাটের উদ্দেশ্যে সে একটি মন্দিরের উপরে আক্রমণ সংঘটিত করার জন্য অগ্রসর হলো।
মন্দিরের দেয়ালে সাদা মার্বল পাথর লাগানো ছিলো। সূর্যের রশ্মি পড়ে সাদা দেয়ালগুলো ঝিকমিক করতেছিলো। মন্দিরের বহির্ভাগের চাক্চিক্য মন্দিরের অভ্যন্তরের ঐশ্বর্য-বিভূতির কথা ঘোষণা করতে ছিলো।
ইয়ার হোসেন দলবল নিয়ে মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলো।
মন্দিরের বেদীতে স্থাপন করা ছিলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিশাল মূর্তি। মূর্তির সন্মুখে ধ্যানমগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন বৃদ্ধ পুরোহিত। তাঁর হাত দু'টি জোড়হাত করা ছিলো এবং চোখে ছিলো জল। অগণন স্ত্ৰী-পুৰুষ, বৃদ্ধ-যুবা এবং ছোট ছোট ছেলে- মেয়ে নৈস্বর্গিক আনন্দে মগ্ন হয়ে মূর্তির সন্মুখে নতমস্তকে ধ্যানমগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাহ্যিক জগতের প্রতি যেন কারো একটুও ভ্রূক্ষেপ নেই। সবাই ধ্যানস্থ ছিলেন।
ইয়ার হোসেন দলবল নিয়ে মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেই সঙ্গী সেনাদের নির্মম আদেশ দিলো- লণ্ডভণ্ড করে দাও এই ভূত পূজারীদের।
আদেশ দিয়েই ইয়ার হোসেন ভক্তদের ঠেলে ফেলে দিয়ে মূর্তির দিকে এগিয়ে গেলো। সে মূর্তির গা থেকে রত্নালংকার খুলতে হাত বাড়াতেই দুয়ারমুখ থেকে কেউ একজন চিৎকার করে বললেন- মহামান্য বাদশাহর নামে আদেশ দিচ্ছি, সাবধান মূর্তির গায় হাত দিবে না। মন্দির থেকে বেরিয়ে এসো।
মন্দিরের অস্পষ্ট আলোয় ইয়ার হোসেন আগন্তুককে চিনতে না পেরে অবজ্ঞার সুরে বললো- কে চিৎকার করছ? কেন, তুইও ভূত পূজারি নাকি? এভাবে বলেই সে সঙ্গীদের আদেশ দিলো- মণি-মুক্তা, সোনা-দানা মূর্তির গা থেকে খুলে নাও।
ইয়ার হোসেনের নির্দেশে একজন সেনা মূর্তির গা থেকে অলংকার খোলার জন্য হাত বাড়ালো। সাথে সাথে আগন্তুকে সৈনিকটির হাত লক্ষ্য করে শর নিক্ষেপ করলো। শর সৈনিকটির হাতে বিদ্ধ হলো। সৈনিকটি ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো।
ইয়ার হোসেন কালবিলম্ব না করে তরবারি কোষমুক্ত করে বললো- কে তুই বেকুব? এভাবে বলেই সে দ্রুত আগন্তুকের দিকে অগ্রসর হলো।
হিন্দু বেগ দ্রুত তরবারি কোষমুক্ত করে ইয়ার হোসেনকে বাধা দিতে এগিয়ে এলেন- সাবধান ইয়ার হোসেন, তোমার সন্মুখে স্বয়ং শাহজাদা হুমায়ূন দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
ইয়ার হোসেন হতচকিত হয়ে দরজার দিকে তাকালো। দরজার সন্মুখে হুমায়ূনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে ভয়ার্ত ও আতঙ্কিত কণ্ঠে বললো- ক্ষমা করবেন শাহজাদা। আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। ইয়ার হোসেন কৈফিয়তের সুরে কথাটা বলেই দুই পা পিছিয়ে এলো।
তরবারিটি আমাকে দিন। হুমায়ূন গুরুগম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দিলেন।
শাহজাদা, আমি আপনার পিতার বিশ্বাসী খেদমতগার।
কিন্তু আপনি সেই বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। আপনি লুটপাট এবং মন্দিরের পবিত্রতা ভঙ্গ করবেন না বলে বাদশাহের সন্মুখে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। আপনি বাদশাহের সন্মুখে করা সেই প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে পবিত্র গৃহে তরবারি কোষমুক্ত করে মহাপাপ করেছেন। এমন কী, আপনি পবিত্র উপাসনা গৃহেও লুটপাটের তাণ্ডব চালাতে ভয় করেন নি। আপনি এতো লোভী কেন, বেগ? এইসকল মানুষ...…....হুমায়ূন স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর দিকে ইশারা করে বললেন- এরাঁ আমাদের শত্রু নয়। বর্তমান এরাঁ আমাদের আপন লোক। এরাঁ এদের ইষ্ট দেবতার ইবাদত(উপাসনা) করছিলেন এবং আপনি এদেঁর উপরে জুর-জুলুম করতে অগ্রসর হয়েছিলেন। আমরা হিন্দুস্থানে লুটপাট করার জন্য আসিনি। আমরা এখানে এসেছি সাম্রাজ্য বিস্তার করে ইব্রাহীম লোডীর অত্যাচার থেকে এই শোষিত, বঞ্চিত লোকদের রক্ষা করার জন্য। ইব্রাহীম লোডীর মতো একজন লোভী, অত্যাচারী শাসকও হিন্দু দেব-দেবীর গা থেকে সোনা-দানা, হীরা, মুক্তা খুলে নিতে সাহস করেননি; কিন্তু আপনি সেটাই করতে উদ্যত হয়েছিলেন। এটা আমাদের জন্য অতি পরিতাপের কথা। হিন্দুর পবিত্র মন্দিরে প্রবেশ করে— শান্তি ভঙ্গ করে আপনি বাদশাহের সুনাম নষ্ট করেছেন। এর সমুচিত শাস্তি আপনি পেতেই হবে। এভাবে বলেই দেহরক্ষী সেনাদের দিকে তাকিয়ে কঠোর নির্দেশ দিলেন- এর হাত থেকে তরবারি কেড়ে নাও। একে এর সঙ্গীসহ কাল- কঠুরিতে বন্দি করে রাখুন। এদের দেখে আমাদের অন্যান্য সেনারাও শিক্ষা নিক।
আদেশ ঘোষণার সাথে সাথে একদল সেনা ইয়ার হোসেন এবং তার সঙ্গীদের হাত থেকে তরবারি কেড়ে নিয়ে মন্দির থেকে বের করে নিয়ে গেলো।
হুমায়ূন দো-ভাষীর দ্বারা পূজারী এবং উপস্থিত ভক্তদের সম্বোধন করে বলতে লাগলেন- মহামান্য বাদশাহর হয়ে আমি আপনাদের অবগত করতে চাইছি যে, আমরা আপনাদের শত্রু নয়। আমাদের ধর্ম ভিন্ন হলেও মানুষ হিসাবে আপনাদের এবং আমাদের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। আমরা সবাইকে একজন স্রষ্টার সৃষ্টি বলে ভাবি। আমাদের মসজিদ এবং আপনাদের মন্দির। আমরা নামাজ পড়ি---আপনারা পূজা করেন। উপাসনার রীতি-নীতি ভিন্ন হলেও উভয়ের উদ্দেশ্য কিন্তু একটাই——সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ এবং মানুষের মঙ্গল কামনা। সেজন্য আমরা সবাই আপনাদের দেব-দেবী এবং উপাসনা গৃহকে সন্মান করি। আমরা সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে হিন্দুস্থান এসেছি। আপনাদের সাথে মিলিত হয়ে আমরা মহান ভারত গঢ়তে চাই। মহান ভারতে আমরা বইয়ে দিতে চাই শান্তি এবং আনন্দের লহর। আপনাদের সহযোগিতা পেলেই তো সেই উদ্দেশ্য সফল করা সম্ভব হবে। আমরা নিজের ইচ্ছায় হিন্দুস্থানে আসিনি। ইব্রাহীম লোডীর শোষণ শাসনে জর্জরিত হয়ে একাংশ লোক আমাদের আমন্ত্রণ করে এনেছে। আমাদের হয়ে অস্ত্রধারণ করা হিন্দু বেগ সাহেব এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। হুমায়ূন শেষের কথাগুলো হিন্দু বেগের দিকে ইশারা করে বললেন।
হিন্দু বেগের দ্বারা অনুবাদ করে শুনানো কথাগুলো উপস্থিত জনতা গভীর মনযোগ সহকারে শুনে মাথা নেড়ে সহমত প্রকাশ করলেন।
ভাষণ সমাপ্ত করে হুমায়ূন দলবল নিয়ে বেরিয়ে এলেন।
হুমায়ূন বেরিয়ে আসার পরে পূজারি আবার মূর্তির সন্মুখে হাতজোড় করে আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য দেবতার নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন। চোখ থেকে জল গড়িয়ে এসে তাঁর বুক স্পর্শ করলো।
* * *
হিন্দু বেগ এবং খাজা খলিফার বুঝানোর পরে মৃত সম্রাট ইব্রাহীম লোড়ীর মাতৃ বৈদা সুলতানা অবশেষে আগ্রার প্রাসাদ ছেড়ে আসতে সন্মত হলেন। বাবর দিল্লীর সিংহাসন দখল করার পরেও তিনি আগ্রার প্রাসাদ ছেড়ে আসতে সম্মত হচ্ছিলেন না। নাছোড়বান্দার মতো তিনি অনেকদিন আগ্রার প্রাসাদে বসে ছিলেন। মাতৃস্থানীয় বলে বাবর তাঁকে জুর-জুলুম করে প্রাসাদ থেকে সরিয়ে আনতে কষ্ট পাচ্ছিলেন। সেজন্য বুঝিয়ে সুঝিয়ে প্রাসাদ ছেড়ে আসার জন্য সন্মত করানোর উদ্দেশ্যে হিন্দু বেগ এবং খাজা খলিফাকে নিয়োগ করেছিলেন।
পানীপতের যুদ্ধে ইব্রাহীম লোডীর দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুতে বৈদা সুলতানা শোকবস্ত্র পরিধান করে ছিলেন। শোকবস্ত্র পরিধান করেই তিনি প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন।
বৈদা সুলতানাকে বাবরের সন্মুখে হাজির করা হলো। তিনি আগ্রা দূর্গের চাবির গুচ্ছ বাবরের দিকে এগিয়ে দিলেন। চাবির গুচ্ছ নেওয়ার সময়ে বাবর তাঁর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়া লক্ষ্য করলেন। বৈদা সুলতানার প্রশস্ত উঁচু ললাটে জোড়া ভ্রূ দেখে বাবর চমকে উঠলেন। বাবরের অনুমান হলো, এরকম উঁচু ললাট এবং জোড়া ভ্রূ যেন তিনি কোথাও দেখেছেন!
বাবর স্মরণ করতে চেষ্টা করতে লাগলেন, তেমন জোড়া ভ্রূ তিনি কোথায় দেখেছেন! হঠাৎ তাঁর পানীপত যুদ্ধের কথা মনে পড়ে গেলো।
বাবরের নির্দেশে হাজার হাজার মৃতদেহের মধ্য থেকে ইব্রাহীম লোডীর মৃতদেহ খুঁজে বের করা হয়েছিলো। পরম্পরা অনুসারে ইব্রাহীম লোডীর মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বর্শায় বিদ্ধ করে বাবরের সন্মুখে হাজির করা হয়েছিলো। সেই বর্শাবিদ্ধ উন্নত ছিন্নমস্তকের ললাটেও এ রকম জোড় ভ্রূ ছিলো। বৈদা সুলতানের জোড়া ভ্রূ দেখে বাবরের এরকম অনুমান হলো, যেন ইব্রাহীম লোড়ী মাতৃর রূপে পুনরায় বিজেতার সন্মুখে উপস্থিত হয়েছে।
গর্বিতা এবং উদ্ধত মহিলার দিকে তাকিয়ে বাবর শ্রদ্ধা মিশ্রিত ব্যাকুলতা অনুভব করতে লাগলেন। সেজন্য তিনি ধীর শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন- সন্মানীয়া মাতৃ, আপনার কোনো কথা বলার ইচ্ছা আছে নাকি?
বৈদা সুলতানাই বিরক্তিভরা কণ্ঠে বললেন- আমাকে যেন আরও কষ্ট দেওয়া না হয়।
বাবর নিজের সভাসদবর্গকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আপনারা এই মাতৃস্থানীয়া ভদ্র মহিলাকে নিজের মাতৃর মতো সন্মান প্রদর্শন করবেন।
সভাসদবর্গ বাবরের এই নির্দেশের প্রতি সন্মতিসূচক মাথা দোলালেন।
বৈদা সুলতানা নিজেও কৃতজ্ঞতায় বাবরের প্রতি মাথা নুয়ালেন। তাঁর চোখের জলে সিক্ত চোখে ঘৃণার অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো যদিও বাবর এবং সভাসদবর্গের চোখে পড়ার আগেই সেটা বিলীন হয়ে গেলো।
বাবর বৈদা সুলতানাকে রাজপ্রাসাদ থেকে একটু দূরে একটি প্রাসাদে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। বৈদা সুলতানা বাবরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করলেন।
পানীপত যুদ্ধের নির্মম পরাজয় এবং ইব্রাহীম লোডীর মৃত্যু সংবাদ শুনে হঠাৎ আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ার মতোই বৈদা সুলতানার অনুভব হচ্ছিলেন। মৃত পুত্ৰকে দু’চোখে দেখে নিজ হাতে কবর দিয়ে তাঁর সমাধির উপরে শোকাশ্রু ফেলে মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য তাঁর প্রবল ইচ্ছে হয়েছিলো। তবে, তাঁর সেই ইচ্ছে সফল করা সম্ভব ছিল না। কারণ প্রচণ্ড বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে গেলেও আগ্রা থেকে পানীপত তিন দিনের পথ। সেজন্য তিনি ইব্রাহীম লোডীর সন্ধানে পানীপতে প্রেরণ করা বিশ্বস্ত ব্যক্তিবর্গ যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার এক সপ্তাহ পরে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েছিলো। তখন কিছু কিছু মৃতদেহ কবর দেওয়া হয়েছিলো এবং কিছু কিছু মৃতদেহ শিয়াল শকুনের আহার হয়েছিলো। বৈদা সুলতানা প্রেরণ করা ব্যক্তিগণ ইব্রাহীম লোডীর মৃতদেহ খুঁজে পায়নি। যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পরে ইব্রাহীম লোডীর দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করার পরে বর্শায় বিদ্ধ করে ছিন্নমস্তকটা বাবরকে দেখানো হয়েছিলো বলে তারা লোকমুখে শুনে এসে সংবাদটা বৈদা সুলতানাকে জানিয়েছিলো।
পুত্রের মৃতদেহের দুর্গতির কথা শুনে বৈদা সুলতানার হৃদয় প্রচণ্ড শোকে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলো। হাজার হাজার ছুরির খোঁচায় যেন তাঁর হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলছিলো। তিনি মনে মনে আক্ষেপ করে বলছিলেন- হায় ইব্রাহীম! এই পৃথিবীতে তোর একটা সমাধি চিহ্নও রইল না। তোর প্রাণহীন দেহও ওরা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিলো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানিছিলেন- হে আল্লাহ, বাবররেও যেন আমার পুত্রের মতো মৃত্যু হয়। যে আমার বাছাকে হত্যা করেছে তার যেন আমার পুত্রের চেয়েও হাজার গুণ ভয়ানক মৃত্যু হয়।
বৈদা সুলতানার পরিচারিকা, চাকরাণী এবং আত্মীয়স্বজনরা সহরে শুনে আসা কিছু উড়ো সংবাদ শুনিয়ে শোক সন্তপ্ত বৈদা সুলতানাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলো-
ঘাসের অভাবে বাবরের অশ্বারোহী সেনারা ক্ষেত-খোলার শস্যাদি ঘোড়াকে খাওয়ানোর জন্য কৃষকরা বিদ্রোহ করে কুড়োল এবং দা দিয়ে কেটে অনেক বিদেশী সেনা হত্যা করেছে। এমনও প্রচার হচ্ছিল যে, ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় অভ্যস্ত সেনা এবং ঘোড়া অসহ্য গরম সহ্য করতে না পেরে দলে দলে মরতেছে। এ রকম উড়ো সংবাদ প্রতিদিন প্রচার হচ্ছিলো এবং বৈদা সুলতানার হিতাকাংক্ষীরা সেই সব সংবাদ বলে বৈদা সুলতানাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলো। বৈদা সুলতানাও সেই সব উড়ো সংবাদ বিশ্বাস করে আত্মসন্তুষ্টি লাভ করছিলেন।
এই সব উড়ো সংবাদের সত্যাসত্যতা নিরূপণের জন্য বৈদা সুলতানা সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বাবরের দরবারে কর্মরত মৃত ইব্রাহীমের পুত্র বাহাদুর সুলতানকে ডেকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। এমনিতে আসতে দিবে না বলে তিনি তাঁর অসুখ হয়েছে বলে পত্র লিখে পাঠালেন।
সপ্তদশ বর্ষীয় বাহাদুর সুলতান ফার্সি এবং সংস্কৃত ভাষা ভালোভাবে জ্ঞাত ছিলেন। সেজন্য বাবর তাঁকে অত্যাবশ্যকীয় দলিল অনুবাদ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বাবরের অন্য অনুবাদকো ছিলো। তাই তাঁকে বেশি কাজের বোজা দেয়নি। ফলে তাঁর যথেষ্ট অবসর সময় ছিলো। তবে তাঁর সেই অবসর সময় ইচ্ছামতে উপভোগ করার স্বাধীনতা ছিলো না। কয়েকদিন পূর্বের শত্রুর সন্তান হওয়ার জন্য কেউ অপমান করতে পারে ভেবে তাঁর উপরে সবসময় নজর রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। তাঁর ইচ্ছামতে প্রাসাদের বাহিরে যাওয়ারও অনুমতি ছিল না।
বৈদা সুলতানার পত্র সরাসরি বাহাদুরের হাতে না দিয়ে উজির-এ-আজম দুলহায় পড়ে দেখলেন। বৈদা সুলতানার অসুখ বলে জেনে দুলহায় বাহাদুরকে মাতামহীর সাথে সাক্ষাতের অনুমতি দিলেন। বাহাদুরের সাথে সবসময় দু’জন দেহরক্ষী সৈনিক থাকতো। সেই দেহরক্ষী সৈনিক দু’জনের সাথে বাহাদুরকে মাতামহীর সাথে সাক্ষাৎ করতে পাঠিয়ে দিলেন এবং সেদিনই প্রাসাদে ফিরে আসার জন্য নির্দেশ দিয়ে পাঠালেন।
অসুখের ভান করে বিছানায় শোয়ে থাকা বৈদা সুলতানা বাহাদুরকে নিজের কক্ষে ডেকে পাঠালেন। বাহাদুর কক্ষে প্রবেশ করে শোকাভিভূতা মাতামহীকে নিশ্চল হয়ে বিছানায় শোয়ে থাকতে দেখলেন।
বাহাদুরকে দেখে বৈদা সুলতানা বালিশে হেলান দিয়ে উঠে বসলেন এবং বাহাদুরকেও বিছানায় বসার জন্য ইশারা করলেন।
বৈদা সুলতানা বাহাদুরের ঘর্মাসিক্ত মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ মনে মনে থেকে জিজ্ঞাসা করলেন- বিদেশিরা আমাদের এখানকার গরম সহ্য করতে পারছে না বলে শুনছি, কথাটা সত্য নাকি? শুনতেছি, গরমে বোলে তাদের অনকে লোক মরতেছে?
হ্যাঁ, কিছু লোক অবশ্যে মরেছে। বাহাদুর ভীত সন্ত্রস্ত সুরে বললেন।
তাদের অনেকেই বোলে বলতেছে, তারা আর হিন্দুস্থানে থাকবে না, নিজেদের ঠাণ্ডা দেশে চলে যাবে?
তাদের বাদশাহে তাদের কখনও তেমন কাজ করতে দিবেন না। অধিক সংখ্যক বিদেশি-ই বাদশাহের কথা মেনে চলে। তিনি নিজের যুক্তি সিদ্ধ করতেও সিদ্ধহস্ত। তাঁর মন ভুলানো মিষ্টি কথারও তুলনা নেই। হিন্দুস্থান থেকে যেসব বিদেশী চলে যেতে চেয়েছিলো তাদের ডেকে নিয়ে বাদশাহে উপদেশ দেওয়ার পরে সবাই চোপ মেরে আছে। বাহাদুর ভয়ে ভয়ে কথাগুলো বললেন।
তুমি তোমার পিতৃহন্তার প্রশংসা করছ?
বাহাদুর দরজার দিকে ভয়বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকালেন।
বৈদা সুলতানা এবার ফিসফিস করে বললেন- তোমার উপর নজর রাখে নাকি?
হ্যাঁ। বাহাদুর মাতামহীর মতোই ফিসফিস করে বললেন- আমি কারো সাথে একলা থাকতে বা কথা বলতে পারি না। পহরাদার সৈনিকরা সব সময় আমাকে ঘিরে থাকে এবং কথাগুলোও চোপে-চাপে শুনে থাকে। আমি কোনো আপত্তিজনক কাজ করলে তারা বাদশাহকে অবগত করবে।
চিন্তা করো না। এখানে তোমার আমার বাহিরে কেউ নেই। পূর্বে আমাদের সেবায় নিযুক্ত কোনো বিশ্বাসী লোক বর্তমান বিদেশীর প্রাসাদে রয়েছে নাকি?
হ্যাঁ রয়েছে। মালিক দাদ কারাণী এবং আমাদের লাইব্রেরীর দায়িত্বে নিয়োজিত আলেম সাহেব আছেন। বাদশাহ বাবর পূর্বে আমাদের দরবারে কর্মরত লোকদের নিজের পক্ষে নিতে অহরহ চেষ্টা করতেছেন। হিন্দু-মুসলমানের অন্তর জয় করার জন্যও অহরহ চেষ্টা করতেছেন। আমাদের খানসামা চারজনকে বাদশাহ নিজের খানসামা পদে নিযুক্ত করেছেন।
আচ্ছা আচ্ছা, ভালো, খুব ভালো। বৈদা সুলতানা উৎসাহিত হয়ে উঠলেন- তারা রন্ধন করা আহার্য বাদশাহ ভোজন করে নাকি?
ভোজন করেন বলে শুনেছি। তিনি বোলে হিন্দুস্থানী খানাসামাদের খুব প্রশংসাও করেন।
ভালো কথা। বৈদা সুলতানা উৎসাহিত হয়ে পালেঙ থেকে নামলেন। তাঁর হৃদয়ে প্রতিশোধ স্পৃহা প্রবল হয়ে উঠলো এবং কীভাবে প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করবেন তাহাও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। কথাটা ভাবতেই যেন তাঁর দেহে নতুন উদ্যম ও শক্তি সঞ্চার হলো। যদি বাবরকে একেবারে শেষ করা যায়....তাহলে নিশ্চয় বাবরের অনুগত লোকগুলো এখান থেকে চলে যাবে! অন্তত একজন খানসামাকে হাত করতে পারলেই তিনি অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হতে পারবেন বলে তিনি মনে মনে ভাবলেন।
বৈদা সুলতানা বাহাদুরের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলেন-তুমি খানসামাদের নিজেই দেখেছ নাকি?
হ্যাঁ দেখেছি। বাহাদুর স্বীকৃতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বললেন।
তাদের মাঝে আহাম্মদ রয়েছে নাকি?
বাহাদুর মাতামহীর কথার অর্থ উপলব্ধি করতে না পেরে বললেন- নেই। সে আগ্রা চলে গেছে। কিন্তু আহাম্মদকে দিয়ে কী করবেন?
এভাবে বলেই বাহাদুর ভয়ার্ত দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকালেন।
বৈদা সুলতানা মুচকি হাসি হেসে মনে মনে ভাবলেন- আমার নাতিটি নির্বোধ! তদুপরি এর উপরে সবাই নজর রাখে। হঠাৎ যদি এঁ এই গোপন পরিকল্পনা প্রকাশ করে ফেলে, তাহলে এঁ তো মরবেই সাথে আমার প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়ে যাবে। কোনো পরিস্থিতিতেই এঁকে এই বিপদসংকুল পরিকল্পনার কথা অবগত করানোটা উচিত হবে না।
বৈদা সুলতানা পুনরায় অসুখের ভান করে উঁআঁ ধ্বনি করে বলতে লাগলেন- এই পৃথিবীটা কী বিচিত্র! যেসকল লোক একদিন আমাদের আজ্ঞাধীন ছিলো, বর্তমান তারাই শত্রুর সেবায় নিয়োজিত। মালিক দাদ কারাণী, খানসামা এবং অন্যান্য লোক আমাদের দুর্ভাগ্য দেখে শত্রুর নিকট চলে গেছে। আমার অন্তর শোকে বিহ্বল....দেহ শোকে বিকল.......কিন্তু তুমি....যাও, তুমি শত্রুর সেবা করগে’.....তবে, পিতৃর দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর কথা কখনো ভুলে যেও না।
বাহাদুর মাতামহীর নিকট থেকে বিদায় নিয়ে কক্ষের বাহিরে বেরিয়ে এলেন।
বাহাদুর কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার পরে বৈদা সুলতানার চোখে-মুখে জেগে উঠলো পৈচাশিক উল্লাস..... বুকে জ্বলে উঠলো প্রতিহিংসার অগ্নি। উন্মত্ত অধীর হয়ে উঠলো তাঁর ভাবনার গতি। একজন বিশ্বাসী এবং সাহসী খানসামা তাঁর প্রয়োজন। কিন্তু কে হতে পারে সেই খানসামা? যে অর্থের বিনিময়ে আহার্যে বিষ মেশাতে সন্মত হবে? মালিক দাদ কারাণী? আহাম্মদ? তারা সন্মত হবে তো তাঁর প্রস্তাবে?
অবশ্যে বিজেতাদের পসন্দ করার মতো লোকের সমান্তরালভাবে ঘৃণা করা লোকের সংখ্যাও অনেক ছিলো বাবরের বশ্যতা স্বীকার করা লোকেদের মধ্যে।
বাবর সেনা কিছুসংখ্যকের ভ্রাতৃ, কিছুসংখ্যকের পিতৃ, আবার কিছুসংখ্যকের পুত্রকে হত্যা করেছিলো। অনেকের ভালো আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। সুযোগ পেলে তারা অবশ্যেই বাবরের বিরুদ্ধে শত্রুতা করতে কুণ্ঠিত হবে না.…..বরঞ্চ খুশিই হবে।
সেদিন থেকে বৈদা সুলতানা গোপনে বাবরের শত্রুর সন্ধান করতে লাগলেন।
বৈদা সুলতানা খবর নিয়ে জানতে পারলেন, বাহালুল নামের একজন খানসামা রয়েছে বাবরের রন্ধনশালায়। পানীপতের যুদ্ধে তার চাচার পুত্রকে হত্যা করা হয়েছিলো। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সে সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। বৈদা সুলতানা তাঁর যোজনার জন্য বাহালুলকেই উপযুক্ত ব্যক্তি বলে চিনাক্ত করলেন; তবে সরাসরিভাবে বাহালুলের সাথে আলোচনা করাটা নিরাপদ হবে না ভেবে তিনি একজন বিশ্বাসী লোক পাঠিয়ে আগ্রা থেকে আহাম্মদকে ডেকে আনালেন।
আগ্রাস্থিত ঘর-বাড়ি, সা-সম্পত্তি থেকে বাবর আহাম্মদকে বঞ্চিত করেছিলেন। যারজন্য বাবরের প্রতি আহাম্মদের বিদ্বেষ ভাব ছিলো। বৈদা সুলতানা বাবরের অনুমতি নিয়ে আহাম্মদকে নিজের সেবার জন্য নিযুক্ত করলেন। একদিন সুযোগ বুঝে বৈদা সুলতানা আহাম্মদের নিকট নিজের পরিকল্পনার বিষয়ে বললেন। কথাটা শুনে আহাম্মদ আতঙ্কে শিহরে উঠলো। কিন্তু বৈদা সুলতানা তাকে অভয় দিয়ে বললেন যে, তার ভয়ের কোনো কারণ নেই। কারণ সে নিজে কিছুই করতে হবে না। সে শুধু খানসামা একজনের সাথে কথাটা আলোচনা করলেই হবে।
বৈদা সুলতানার তরফ থেকে অভয় পেয়ে আহাম্মদ কাজটা করতে সম্মত হলো।
বৈদা সুলতানা একদিন বাহাদুর সুলতানের সাথে সাক্ষাৎ করার ছলনায় আহম্মদের মাথায় একটি ভারি টোপলা দিয়ে বাবরের প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। বৈদা সুলতানা বাহাদুরের সাথে বাক্যালাপ করার সময়ে আহাম্মদ পুরানা সঙ্গীদের সাথে সুখ-দুঃখের আলাপ করতে এলো।
আহম্মদ সুযোগ বুঝে বাহালুলের নিকট বৈদা সুলতানার পরিকল্পনার বিষয়ে বললো।
কথাটা শুনে বাহালুল প্রথমে আহাম্মদের মতোই আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলো যদিও শেষে অর্থের টোপ পেয়ে কাজটা করতে সম্মত হলো।
* * *তৃতীয় খণ্ড শেষ(পরবৰ্তী চতু্ৰ্থ খণ্ডে)

Comments
Post a Comment