The Death of Ivan Ilyich (“ইভান ইলিচের মৃত্যু”)

 

             


                 The Death of Ivan Ilyich

        (ইভান ইলিচের মৃত্যু”)

 

             লিও টলস্টয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয়

লিও টলস্টয় (Leo Tolstoy) ছিলেন রাশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, দার্শনিক ও চিন্তাবিদ। তাঁর পুরো নাম লেভ নিকোলায়েভিচ টলস্টয় (Lev Nikolayevich Tolstoy)তিনি ৯ সেপ্টেম্বর ১৮২৮ সালে রাশিয়ার ইয়াসনায়া পলিয়ানায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০ নভেম্বর ১৯১০ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

টলস্টয়ের সাহিত্যকর্মে মানুষের জীবন, মৃত্যু, প্রেম, পরিবার, নৈতিকতা, ধর্ম, সমাজ ও মানবিকতার গভীর অনুসন্ধান দেখা যায়। তাঁর লেখার বিশেষত্ব হলো—সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়েই তিনি মানুষের মনের জটিলতা ও জীবনের গভীর সত্য তুলে ধরেছেন।

তাঁর দুটি বিখ্যাত উপন্যাস হলো War and Peace (যুদ্ধ ও শান্তি) এবং Anna Karenina (আন্না কারেনিনা) War and Peace-এ রাশিয়ার সমাজ ও নেপোলিয়নিক যুদ্ধের পটভূমিতে অসংখ্য মানুষের জীবন ও ভাগ্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। আর Anna Karenina-তে প্রেম, বিবাহ, পরিবার ও সামাজিক মূল্যবোধের সংঘাত অত্যন্ত গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

টলস্টয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা The Death of Ivan Ilyich (ইভান ইলিচের মৃত্যু)এই ছোট উপন্যাসিকায় একজন মানুষের মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের জীবনকে নতুন করে উপলব্ধি করার কাহিনি বলা হয়েছে। বিশেষ করে মৃত্যুভয়, একাকিত্ব, সামাজিক ভণ্ডামি এবং জীবনের প্রকৃত অর্থএসব বিষয় এখানে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

টলস্টয় শুধু সাহিত্যিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গভীর নৈতিক ও সামাজিক চিন্তাবিদজীবনের শেষদিকে তিনি সরল জীবনযাপন, অহিংসা, আত্মশুদ্ধি ও মানবপ্রেমের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর চিন্তাধারা পরবর্তীকালে বিশ্বের বহু মানুষকে প্রভাবিত করে।

সংক্ষেপে বলা যায়, টলস্টয়ের সাহিত্য মানুষের বাহ্যিক জীবনের পাশাপাশি তার অন্তর্জগতকে বোঝার এক অসাধারণ দরজা খুলে দেয়। তাই এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও তাঁর লেখা পাঠকের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও জীবন্ত।

              The Death of Ivan Ilyich

        (ইভান ইলিচের মৃত্যু”)

                         লিও টলস্টয়

                                 প্রকাশ-১৮৮৬

                  অনুবাদক-লুইচ এণ্ড এলমার মাউড

                   উৎস- Wikisource

                          প্রথম অধ্যায়

মেলভিনস্কি মামলার শুনানির মাঝখানে বিরতির সময় আইন আদালতের বিশাল ভবনে আদালতের সদস্যরা ও সরকারি কৌঁসুলি ইভান ইয়েগোরোভিচ শেবেকের ব্যক্তিগত কক্ষে এসে জড়ো হলেন। সেখানে প্রসঙ্গ উঠল বহুল আলোচিত ক্রাসোভস্কি মামলাটি নিয়ে। ফিয়োদর ভাসিলিয়েভিচ জোর দিয়ে বললেন, মামলাটি তাঁদের আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। ইভান ইয়েগোরোভিচ তার সম্পূর্ণ বিপরীত মত পোষণ করলেন। আর পিওতর ইভানোভিচ শুরু থেকেই আলোচনায় যোগ না দেওয়ায় তর্কে কোনো পক্ষই নিলেন না; তিনি বরং সদ্য হাতে এসে পৌঁছানো সংবাদপত্রটি পড়ছিলেন।

হঠাৎ তিনি বললেন-ভদ্রলোকেরা, ইভান ইলিচ মারা গেছেন!”

কী বলছেন! সত্যি?”

এই যে, নিজেরাই পড়ে দেখুন,”—বলতে বলতে পিওতর ইভানোভিচ কাগজটি ফিয়োদর ভাসিলিয়েভিচের হাতে তুলে দিলেন। কাগজটি তখনও ছাপাখানার কালি ও স্যাঁতসেঁতে ভাব পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

কালো বর্ডার দিয়ে ঘেরা সংবাদটির ভাষা ছিল:-

প্রাসকোভিয়া ফিয়োদোরোভনা গোলোভিনা গভীর শোকের সঙ্গে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবকে জানাচ্ছেন যে, তাঁর প্রিয় স্বামী ইভান ইলিচ গোলোভিন, বিচারালয়ের সদস্য, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ... তারিখে পরলোকগমন করেছেন। তাঁর শেষকৃত্য শুক্রবার দুপুর একটায় অনুষ্ঠিত হবে।”

ইভান ইলিচ উপস্থিত ভদ্রলোকদের সহকর্মী ছিলেন এবং তাঁদের সকলেরই প্রিয় ছিলেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন; তাঁর রোগটি দুরারোগ্য বলেই জানা গিয়েছিল। তাঁর পদটি তাঁর জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল। তবে ইতিমধ্যেই জল্পনা চলছিল—তিনি মারা গেলে হয়তো আলেক্সেয়েভ তাঁর পদটি পাবেন এবং আলেক্সেয়েভের বর্তমান পদে ভিন্নিকভ অথবা শ্টাবেল নিযুক্ত হতে পারেন।

তাই ইভান ইলিচের মৃত্যুসংবাদ শোনামাত্র ওই ব্যক্তিগত কক্ষে উপস্থিত প্রত্যেক ভদ্রলোকের মনে প্রথম যে চিন্তাটি এসেছিল, তা ইভান ইলিচের মৃত্যু নিয়ে নয়; বরং এই মৃত্যুর ফলে তাঁদের নিজেদের কিংবা তাঁদের পরিচিতজনদের মধ্যে কী কী পদোন্নতি বা চাকরির পরিবর্তন ঘটতে পারে, সেই হিসাবটাই প্রথমে মনে জেগে উঠেছিল।

নিশ্চয়ই শ্টাবেলের পদটি অথবা ভিন্নিকভের পদটি আমি পাব,” মনে মনে ভাবলেন ফিয়োদর ভাসিলিয়েভিচ। “অনেক দিন আগেই আমাকে এই পদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। আর পদোন্নতি হলে ভাতাসহ বছরে আরও আটশো রুবেল বেশি পাব।”

এখন আমাকে কালুগা থেকে আমার শ্যালককে এখানকার সার্কিটে বদলি করানোর ব্যবস্থা করতে হবে,” ভাবলেন পিয়োতর ইভানোভিচ। “তাহলে আমার স্ত্রী খুব খুশি হবে। আর তখন সে আর বলতে পারবে না যে, আমি তার আত্মীয়স্বজনের জন্য কখনো কিছুই করি না।”

আমি তো ভেবেছিলাম, সে আর কোনো দিন বিছানা ছেড়ে উঠতে পারবে না,” পিয়োতর ইভানোভিচ উচ্চস্বরে বললেন। “খুবই দুঃখের ব্যাপার।”

কিন্তু আসলে তার কী হয়েছিল?”

ডাক্তাররা ঠিক করে বলতে পারেননি—অন্তত এককথায় বলতে পারেননি। প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা কথা বলেছিলেন। শেষবার যখন তাকে দেখেছিলাম, তখন তো মনে হয়েছিল সে সেরে উঠছে।”

আর ছুটির পর থেকে আমি একবারও তাকে দেখতে যাইনি। সব সময়ই ভেবেছি, একদিন যাব।”

তার কোনো সম্পত্তি ছিল?”

মনে হয়, তার স্ত্রীর কিছু সামান্য সম্পত্তি ছিল—তবে খুবই নগণ্য।”

আমাদের তো একবার তার কাছে যেতে হবে। কিন্তু তারা যে ভীষণ দূরে থাকে!”

তোমার কাছ থেকে দূরে, বলতে চাও। তোমার বাড়ি থেকে তো সব জায়গাই দূরে,” বললেন পিয়োতর ইভানোভিচ।

দেখছ তো, নদীর ওপারে আমার বাড়ি হওয়াটা সে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারে না,” শেবেকের দিকে মুচকি হেসে বললেন পিয়োতর ইভানোভিচ।

এরপরও তাঁরা শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দূরত্ব নিয়ে কিছুক্ষণ কথা বললেন। তারপর আদালতে ফিরে গেলেন।

ইভান ইলিচের মৃত্যুর ফলে কার বদলি হতে পারে, কার পদোন্নতি হতে পারে—এই ধরনের হিসাব-নিকাশ ছাড়াও, কাছের কোনো পরিচিত মানুষের মৃত্যুর খবর শুনলে মানুষের মনে, যথারীতি, এক ধরনের আত্মতুষ্টির অনুভূতি জেগে ওঠে—“মৃত্যুটা আমার নয়, তার হয়েছে।” প্রত্যেকেই মনে মনে ভাবল কিংবা অনুভব করল, “হ্যাঁ, সে মারা গেছে, কিন্তু আমি তো বেঁচে আছি!”

তবে ইভান ইলিচের ঘনিষ্ঠ পরিচিতজনেরা, যাদের তিনি বন্ধু বলেই মনে করতেন, তারা এটাও ভাবতে বাধ্য হল যে, এখন তাদের সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলার সেই বিরক্তিকর দায়িত্ব পালন করতে হবে—শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকতে হবে এবং বিধবার বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানাতে হবে।

ফিয়োদর ভাসিলিয়েভিচ এবং পিয়োতর ইভানোভিচ ছিলেন তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ পরিচিতদের মধ্যে। পিয়োতর ইভানোভিচ ইভান ইলিচের সঙ্গে একসঙ্গে আইন পড়েছিলেন এবং মনে করতেন, ইভান ইলিচের কাছে তাঁর কিছুটা ঋণ বা কৃতজ্ঞতার দায় রয়েছে।

রাতের খাবারের সময় স্ত্রীকে ইভান ইলিচের মৃত্যুর কথা বলেছিলেন পিয়োতর ইভানোভিচ। সেই সঙ্গে এ কথাও বলেছিলেন যে, হয়তো তাঁদের সার্কিটে তাঁর শ্যালকের বদলির ব্যবস্থা করা সম্ভব হতে পারে। এরপর নিজের প্রতিদিনের অভ্যাসমতো ঘুমানোর সময়টুকুও বিসর্জন দিয়ে, সন্ধ্যার পোশাক পরে, তিনি গাড়িতে করে ইভান ইলিচের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলেন।

প্রবেশদ্বারের সামনে একটি ঘোড়ার গাড়ি এবং দুটি ভাড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। নিচের হলঘরে, কাপড় রাখার স্ট্যান্ডের পাশের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা ছিল সোনালি কাপড়ে ঢাকা একটি কফিনের ঢাকনা। তাতে সোনালি ঝালর ও ঝুলন্ত গিঁট লাগানো ছিল, আর ধাতব গুঁড়ো দিয়ে ঘষে সেগুলো চকচকে করে তোলা হয়েছিল।

কালো পোশাক পরা দুজন মহিলা তাঁদের পশমের কোট খুলছিলেন। পিয়তর ইভানোভিচ তাঁদের একজনকে ইভান ইলিচের বোন বলে চিনতে পারলেন; অন্যজন তাঁর অপরিচিত। ঠিক সেই সময় তাঁর সহকর্মী শোয়ার্টজ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছিলেন। কিন্তু পিয়তর ইভানোভিচকে ভেতরে ঢুকতে দেখে তিনি থেমে গেলেন এবং চোখ টিপে যেন বলতে চাইলেন—‘ইভান ইলিচ বেশ গোলমাল করে গেলেন—তুমি আর আমি যেভাবে সবকিছু সামলাই, তেমন নয়।’

শোয়ার্টজের মুখে ছিল পিকাডিলি-ধাঁচের জুলপি, আর সন্ধ্যার উপযোগী পরিপাটি পোশাক পরা তাঁর রোগা শরীরটিতে সবসময়ই এক ধরনের মার্জিত গাম্ভীর্য ফুটে থাকত। তাঁর প্রকৃত চঞ্চল স্বভাবের সঙ্গে এই গাম্ভীর্যের ছিল এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। এই পরিস্থিতিতে সেই বৈপরীত্যই যেন ব্যাপারটিকে আরও কৌতুককর করে তুলেছিল—অন্তত পিয়তর ইভানোভিচের কাছে তাই মনে হলো।

পিয়তর ইভানোভিচ দুই মহিলাকে আগে যেতে দিয়ে নিজে ধীরে ধীরে তাঁদের পেছনে পেছনে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেন। শোয়ার্টজ নিচে নামলেন না; সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। পিয়তর ইভানোভিচ বুঝতে পারলেন, সেই সন্ধ্যায় তাঁরা কোথায় বসে ব্রিজ খেলবেন, সেই ব্যবস্থা ঠিক করার জন্যই শোয়ার্টজ সেখানে অপেক্ষা করছেন।

দুই মহিলা বিধবার ঘরে ঢুকে গেলেন। শোয়ার্টজ ঠোঁট দুটো গম্ভীরভাবে চেপে ধরলেন, কিন্তু চোখে ফুটে রইল এক ধরনের রসিকতার ঝিলিক। সামান্য বাঁকানো ভ্রু দিয়ে তিনি ডান দিকের সেই ঘরটি দেখিয়ে দিলেন—যেখানে মৃতদেহটি রাখা ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে অন্য সবার মতো পিয়তর ইভানোভিচও ঘরে ঢোকার সময় কিছুটা অস্বস্তি বোধ করলেন—কী করা উচিত, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। শুধু জানতেন, এই সময় বুকে ক্রুশের চিহ্ন আঁকাই নিরাপদ। কিন্তু সেটা করার সময় মাথা নত করতে হয় কি না, সে ব্যাপারেও তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। তাই মাঝামাঝি একটা উপায় অবলম্বন করলেন।

ঘরে ঢুকেই তিনি ক্রুশের চিহ্ন আঁকতে শুরু করলেন এবং একই সঙ্গে সামান্য মাথা নুইয়ে প্রণাম করার মতো একটি ভঙ্গি করলেন। মাথা ও হাতের সেই সামান্য নড়াচড়ার ফাঁকেই তিনি ঘরের চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন।

দুজন যুবক—দেখতে মৃত ইভান ইলিচের ভাতিজার মতো—ক্রুশের চিহ্ন আঁকতে আঁকতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল। তাঁদের একজন ছিল হাইস্কুলের ছাত্র। এক বৃদ্ধা একেবারে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর অস্বাভাবিক রকম ধনুকের মতো বাঁকানো ভ্রু-ওয়ালা এক মহিলা তাঁকে ফিসফিস করে কিছু বলছিলেন।

একজন বলিষ্ঠ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ গির্জার পাঠক ফ্রক-কোট পরে বেশ জোরে জোরে কিছু পড়ছিলেন। তাঁর মুখভঙ্গি এমন ছিল যে, তাঁকে কোনোভাবেই বাধা দেওয়া বা তাঁর কথায় আপত্তি করার সাহস যেন কারও ছিল না।

চাকর গেরাসিম পিয়তর ইভানোভিচের সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছিল এবং মেঝেতে কী যেন ছড়িয়ে দিচ্ছিল। সেটা দেখামাত্রই পিয়তর ইভানোভিচের নাকে পচতে শুরু করা মৃতদেহের হালকা একটা গন্ধ এসে লাগল।

শেষবার যখন পিটার ইভানোভিচ ইভান ইলিচের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, তখন তিনি স্টাডির ঘরে গেরাসিমকে দেখেছিলেন। ইভান ইলিচ তাকে বিশেষভাবে পছন্দ করতেন, আর সেই সময় গেরাসিমই তাঁর সেবাযত্নের দায়িত্ব পালন করছিল।

পিটার ইভানোভিচ মাথা সামান্য নত করে বারবার ক্রুশচিহ্ন আঁকতে লাগলেন—ঘরের এক কোণে রাখা টেবিলের ওপরের আইকন, কফিন এবং পাঠকের মাঝামাঝি একটি দিকে মুখ করে। কিছুক্ষণ পর তাঁর মনে হলো, এভাবে হাত নেড়ে ক্রুশচিহ্ন আঁকা বোধহয় একটু বেশিই দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। তাই তিনি থেমে গিয়ে মৃতদেহটির দিকে তাকালেন।

মৃত মানুষ যেমন শুয়ে থাকে, ইভান ইলিচও তেমনই এক অস্বাভাবিক ভারী ভঙ্গিতে শুয়ে ছিলেন। তাঁর শক্ত হয়ে যাওয়া হাত-পা কফিনের নরম গদির মধ্যে ডুবে ছিল, আর মাথাটি চিরদিনের মতো বালিশের ওপর একদিকে হেলে পড়ে ছিল। কপালটি হলুদ মোমের মতো ফ্যাকাশে; বসে যাওয়া কানের পাশের দুদিকে টাক পড়া জায়গাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। মৃতের স্বভাবসুলভ সেই অদ্ভুত ভঙ্গিতে কপালটি সামনের দিকে উঁচু হয়ে ছিল, আর বেরিয়ে থাকা নাকটি যেন ওপরের ঠোঁটের ওপর এসে ঠেকেছে।

পিটার ইভানোভিচ শেষবার তাঁকে দেখার পর থেকে ইভান ইলিচের চেহারা অনেক বদলে গেছে, শরীরও আরও শুকিয়ে গেছে। কিন্তু মৃত মানুষের ক্ষেত্রে যেমন প্রায়ই দেখা যায়, জীবিত অবস্থার চেয়ে তাঁর মুখ এখন আরও সুন্দর, এবং সর্বোপরি আরও মর্যাদাপূর্ণ মনে হচ্ছিল। মুখের অভিব্যক্তি যেন বলছিল—যা করার ছিল, তা সম্পন্ন হয়েছে, এবং যথাযথভাবেই সম্পন্ন হয়েছে।

তবে সেই অভিব্যক্তির মধ্যে জীবিতদের প্রতি এক ধরনের নীরব তিরস্কার ও সতর্কবার্তাও ছিল। পিটার ইভানোভিচের কাছে সেই সতর্কবার্তাটি যেন একেবারেই বেমানান মনে হলো—অন্তত তাঁর নিজের ক্ষেত্রে তো নয়ই। এতে তাঁর মনে এক ধরনের অস্বস্তি জন্মাল। তাই তিনি তাড়াতাড়ি আরেকবার ক্রুশচিহ্ন এঁকে ঘুরে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন—নিজের কাছেই তাঁর মনে হলো, একটু বেশিই তাড়াহুড়ো করে এবং শিষ্টাচারের প্রতি যথেষ্ট খেয়াল না রেখেই বেরিয়ে যাচ্ছেন।

পাশের ঘরে শোয়ার্টজ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি দু-পা বেশ ফাঁক করে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং দু-হাত পিঠের দিকে নিয়ে নিজের টপ-হ্যাটটি নিয়ে খেলছিলেন। তাঁর সেই হাসিখুশি, পরিপাটি ও রুচিশীল অবয়বটি দেখেই পিটার ইভানোভিচের মনটা যেন একটু হালকা হয়ে গেল। তাঁর মনে হলো, শোয়ার্টজ যেন এই সমস্ত ঘটনার ঊর্ধ্বে—কোনো বিষণ্নতার প্রভাবই তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না।

শোয়ার্টজের চেহারাই যেন বলে দিচ্ছিল, ইভান ইলিচের জন্য এই শোকানুষ্ঠান এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নয়, যার কারণে তাঁদের নিয়মিত সন্ধ্যার আড্ডা বা তাসের আসরে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। অর্থাৎ, আজ সন্ধ্যায় নতুন এক প্যাকেট তাস খোলা, ভৃত্য এসে টেবিলে নতুন মোমবাতি জ্বালানো এবং সবাই মিলে আনন্দ করে সন্ধ্যা কাটানো—এসবের কোনো কিছুতেই এই ঘটনাটি বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কথা নয়।

পিটার ইভানোভিচ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শোয়ার্টজ নিচু গলায় ঠিক সেটাই বললেন এবং ফিয়োদর ভাসিলিয়েভিচের বাড়িতে গিয়ে তাস খেলার প্রস্তাব দিলেন।

কিন্তু মনে হলো, সেদিন সন্ধ্যায় পিটার ইভানোভিচের ব্রিজ খেলা আর হয়ে উঠবে না।প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনা—খাটো, মোটা এক মহিলা। যতই চেষ্টা করুন না কেন, কাঁধ থেকে নিচের দিকে তাঁর শরীর ক্রমশ আরও চওড়া হয়ে উঠেছিল। আর তাঁর ভ্রু দুটিও অস্বাভাবিকভাবে ধনুকের মতো বাঁকানো—ঠিক সেই মহিলার মতো, যিনি একটু আগে কফিনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ কালো পোশাক পরেছিলেন, মাথায় ছিল লেসের আবরণ। অন্য কয়েকজন মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন, তাঁদের মৃতদেহ রাখা ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন,
এখনই ধর্মীয় প্রার্থনা শুরু হবে। আপনারা দয়া করে ভেতরে যান।”

শ্‌ভার্ট্‌স অস্পষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নত করে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। বোঝা গেল, তিনি আমন্ত্রণটি গ্রহণও করছেন না, আবার প্রত্যাখ্যানও করছেন না।

প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনা পিওতর ইভানোভিচকে চিনতে পেরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তাঁর কাছে এসে হাত ধরে বললেন-আমি জানি, আপনি ইভান ইলিচের একজন সত্যিকারের বন্ধু ছিলেন…”

এই বলে তিনি তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন উপযুক্ত কোনো জবাবের অপেক্ষা করছেন।

পিওতর ইভানোভিচ জানতেন, ওই ঘরে যেমন ক্রুশচিহ্ন এঁকে নিজেকে ধর্মীয়ভাবে শোকপ্রকাশের উপযুক্ত মানুষ হিসেবে দেখানোই কর্তব্য ছিল, তেমনি এখানেও তাঁর কর্তব্য হলো প্রাসকোভিয়ার হাতটা চেপে ধরা, দীর্ঘশ্বাস ফেলা এবং বলা—“বিশ্বাস করুন…”

তিনি ঠিক সেটাই করলেন। আর করতে করতে তাঁর মনে হলো, কাঙ্ক্ষিত ফলও পাওয়া গেছে—তিনি এবং প্রাসকোভিয়া দুজনেই যেন আবেগে আপ্লুত হয়েছেন।

আমার সঙ্গে আসুন। প্রার্থনা শুরু হওয়ার আগে আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই,” বিধবা বললেন। “আমাকে হাতটা দিন।”

পিওতর ইভানোভিচ তাঁর হাত বাড়িয়ে দিলেন। দুজনে ভেতরের ঘরগুলোর দিকে এগিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় তাঁরা শ্‌ভার্ট্‌সের পাশ দিয়ে গেলেন। শ্‌ভার্ট্‌স সহানুভূতিশীল ভঙ্গিতে পিওতর ইভানোভিচের দিকে চোখ টিপলেন।

সেই চোখের চাহনির যেন অর্থ ছিল—“ব্যস, আজকের তাস খেলা তো গেল! আপত্তি করবেন না, আমরা হয়তো আর একজন খেলোয়াড় খুঁজে নেব। আর আপনি যদি কোনোভাবে এই ঝামেলা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন, তখন হয়তো আবার খেলায় যোগ দিতে পারবেন।”

পিওতর ইভানোভিচ আরও গভীর ও বিষণ্ণভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। প্রাসকোভিয়া কৃতজ্ঞতাভরে তাঁর বাহুতে চাপ দিলেন।

বসার ঘরে পৌঁছে তাঁরা বসলেন। ঘরটির আসবাবপত্রে গোলাপি রঙের ক্রেটন কাপড়ের আবরণ ছিল, আর মৃদু আলো ছড়াচ্ছিল একটি ক্ষীণ-আলোয় জ্বলা বাতি। প্রাসকোভিয়া সোফায় বসলেন, আর পিওতর ইভানোভিচ বসলেন একটি নিচু প্যাফের ওপর। তাঁর ওজন পড়তেই প্যাফেটির স্প্রিংগুলো মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছিল।

প্রাসকোভিয়া প্রথমে তাঁকে অন্য কোথাও বসতে বলার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু তাঁর বর্তমান শোকাবস্থায় এমন কথা বলা বেমানান হবে মনে করে শেষ পর্যন্ত আর কিছু বললেন না।

প্যাফেতে বসতেই পিওতর ইভানোভিচের মনে পড়ল, ইভান ইলিচ কীভাবে একসময় এই ঘরটি সাজিয়েছিলেন এবং গোলাপি রঙের ওপর সবুজ পাতার নকশাওয়ালা এই ক্রেটন কাপড়টি বেছে নেওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন।

ঘরটি নানা রকম আসবাবপত্র ও ছোটখাটো সাজসজ্জার জিনিসে পরিপূর্ণ ছিল। সোফার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় বিধবার কালো শালের লেসের অংশটি টেবিলের কিনারায় আটকে গেল।

পিটার ইভানোভিচ উঠে দাঁড়িয়ে শালটি খুলে দেওয়ার জন্য হাত বাড়ালেন। তাঁর ওজন সরে যেতেই পাফটির স্প্রিংগুলোও যেন স্বস্তি পেয়ে ওপরে উঠে তাঁকে একটু ধাক্কা দিল। বিধবা নিজেই তাঁর শাল খুলতে শুরু করলেন, আর পিটার ইভানোভিচ আবার বসে পড়লেন—পাফটির বেয়াড়া স্প্রিংগুলোকে নিজের ওজন দিয়ে চেপে ধরে। কিন্তু বিধবা তখনও পুরোপুরি শাল থেকে মুক্ত হতে পারেননি। ফলে পিটার ইভানোভিচ আবার উঠে দাঁড়ালেন, আর পাফটিও আবার বিদ্রোহ করে উঠল, এমনকি কিঁচকিঁচ শব্দও করল।

শেষ পর্যন্ত শালের ব্যাপারটি মিটে গেলে তিনি একটি পরিষ্কার পাতলা মসলিনের রুমাল বের করে কাঁদতে শুরু করলেন। শাল খোলার সেই অস্বস্তিকর ঘটনা আর পাফটির সঙ্গে তাঁর লড়াই পিটার ইভানোভিচের আবেগ অনেকটাই ঠান্ডা করে দিয়েছিল। তিনি মুখ গোমড়া করে বসে রইলেন।

এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির অবসান ঘটালেন ইভান ইলিচের বাটলার সোকোলভ। তিনি এসে জানালেন, প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনা যে কবরের জায়গাটি বেছে নিয়েছেন, সেটির দাম পড়বে দুইশো রুবেল।

বিধবা কান্না থামিয়ে এমন এক অসহায় ভঙ্গিতে পিটার ইভানোভিচের দিকে তাকালেন, যেন তিনি নিজেই এক দুঃখকষ্টে জর্জরিত মানুষ। তারপর ফরাসি ভাষায় বললেন, তাঁর পক্ষে ব্যাপারটি কতটা কঠিন।

পিটার ইভানোভিচ নীরবে এমন একটি ভঙ্গি করলেন, যার অর্থ—তিনি সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করেন যে ব্যাপারটি সত্যিই খুব কঠিন।

দয়া করে ধূমপান করুন,” তিনি উদার অথচ বিধ্বস্ত কণ্ঠে বললেন। তারপর সোকোলভের দিকে ফিরে কবরের জায়গাটির দাম নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন।

পিটার ইভানোভিচ সিগারেটে আগুন ধরাতে ধরাতে শুনলেন, তিনি কবরস্থানের বিভিন্ন জায়গার দাম সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানতে চাইছেন এবং শেষ পর্যন্ত কোন জায়গাটি নেবেন তা ঠিক করছেন। সেই কাজ শেষ হলে তিনি গির্জার গায়কদল ভাড়া করার ব্যাপারেও নির্দেশ দিলেন। এরপর সোকোলভ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

সবকিছু আমিই নিজের হাতে দেখাশোনা করি, তিনি পিটার ইভানোভিচকে বললেনকথাটা বলতে বলতে  তিনি টেবিলের ওপর রাখা অ্যালবামগুলো একদিকে সরিয়ে রাখলেন। তারপর তাঁর নজরে পড়ল, পিটার ইভানোভিচের সিগারেটের ছাইয়ে টেবিলটি নোংরা হয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি একটি ছাইদানি এনে তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন— আমার কাছে এটা লোক দেখানো মনে হয় যে, শোকে এতটাই কাতর হয়ে পড়েছি যে বাস্তব জীবনের কাজকর্মের দিকে মন দেওয়ার মতো অবস্থায় আমি নেই। বরং উল্টো—কোনো কিছু যদি আমাকে সান্ত্বনা দেয়— সেটাকে সান্ত্বনা বলব না, বরং কিছুক্ষণের জন্য দুঃখ থেকে মন সরিয়ে রাখা বলব—

তিনি আবার রুমালটি বের করলেন, যেন এবার সত্যিই কেঁদে ফেলবেন। কিন্তু হঠাৎ নিজের আবেগকে সামলে নিয়ে শরীরটা ঝাঁকিয়ে নিলেন এবং শান্তভাবে কথা বলতে শুরু করলেন।

তবে আপনার সঙ্গে আমার একটা বিষয়ে কথা বলার আছে।”

পিটার ইভানোভিচ মাথা নত করলেন। একই সঙ্গে তিনি পাফটির স্প্রিংগুলোকে নিজের নিচে শান্ত রাখার চেষ্টা করছিলেন; কিন্তু সেগুলো তাঁর ওজনের ভারে আবারও কাঁপতে শুরু করল।

শেষ কয়েকটা দিন ও ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল।”

তাই?” পিটার ইভানোভিচ বললেন।

ওহ, ভীষণ কষ্টে ছিল! সে একটানা চিৎকার করত—কয়েক মিনিট নয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শেষ তিন দিন তো অবিরাম চিৎকার করেছে। সে চিৎকার অসহ্য হয়ে উঠেছিল। আমি কী করে যে তা সহ্য করেছি, নিজেই বুঝতে পারি না; তিনটি ঘর দূর থেকেও তার চিৎকার শোনা যেত। ওহ, কী যে কষ্ট পেয়েছি আমি!”

সে কি ততক্ষণই জ্ঞানসচেতন ছিল?” পিওতর ইভানোভিচ জিজ্ঞেস করলেন।

হ্যাঁ,” সে ফিসফিস করে বলল। “শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। মৃত্যুর পনেরো মিনিট আগে সে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিল এবং ভাস্যাকে অন্য ঘরে নিয়ে যেতে বলেছিল।”

এই মানুষটির—যাকে পিওতর ইভানোভিচ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে চিনতেন; প্রথমে এক চঞ্চল ছোট্ট ছেলে হিসেবে, তারপর সহপাঠী হিসেবে এবং পরে কর্মজীবনের সহকর্মী হিসেবে—এতটা যন্ত্রণা ভোগ করার কথা হঠাৎ তাঁর মনে তীব্র আতঙ্ক জাগাল। তার ওপর নিজের এবং এই মহিলার ভান-ভণিতার কথা মনে পড়ে তাঁর অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল। আবার তাঁর চোখের সামনে সেই কপালটি ভেসে উঠল, সেই নাকটি, যা ঠোঁটের ওপর চাপা পড়ে ছিল; আর তিনি নিজের জন্যও ভয় পেয়ে গেলেন।

তিন দিন ধরে এমন ভয়াবহ যন্ত্রণা, তারপর মৃত্যু! এ তো হঠাৎ যেকোনো সময় আমারও ঘটতে পারে,” তিনি ভাবলেন। এক মুহূর্তের জন্য তিনি ভয়ে শিউরে উঠলেন।

কিন্তু কীভাবে যেন—তিনি নিজেও বুঝতে পারলেন না—পরমুহূর্তেই তাঁর মনে সেই চিরপরিচিত যুক্তিটি ফিরে এল: ঘটনাটি তো ইভান ইলিচের সঙ্গে ঘটেছে, তাঁর সঙ্গে নয়; অতএব তাঁর সঙ্গে এমনটা ঘটার কথা নয়, ঘটতেও পারে না। আর এমনটা নিজের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে বলে ভাবা মানেই হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করা, যা তাঁর একেবারেই উচিত নয়—শোয়ার্টৎসের মুখের অভিব্যক্তিও যেন সেটাই স্পষ্ট করে দিচ্ছিল।

এই ভাবনায় পিওতর ইভানোভিচ আবার নিশ্চিন্ত হয়ে গেলেন। এরপর তিনি আগ্রহ নিয়ে ইভান ইলিচের মৃত্যুর খুঁটিনাটি জানতে চাইতে লাগলেন—যেন মৃত্যু ইভান ইলিচের মতো মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া একটি স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু তাঁর নিজের ক্ষেত্রে যার কোনো সম্ভাবনা নেই।

ইভান ইলিচ যে ভয়াবহ শারীরিক যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন, তার নানা বিবরণ শোনার পর—যদিও সেসব যন্ত্রণার কথা পিওতর ইভানোভিচ মূলত বুঝতে পেরেছিলেন প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনার স্নায়ুর ওপর তার যে প্রভাব পড়েছিল, তা থেকে—বিধবার মনে হল, এবার আসল কথায় আসা দরকার।

ওহ, পিওতর ইভানোভিচ, কী যে কষ্ট! কী ভীষণ, ভীষণ কষ্ট!” বলে সে আবার কাঁদতে শুরু করল।

পিওতর ইভানোভিচ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন এবং অপেক্ষা করতে লাগলেন, যতক্ষণ না সে নাক ঝেড়ে নেওয়া শেষ করে। তারপর বললেন, “বিশ্বাস করুন…”

কিন্তু সে আবার কথা বলতে শুরু করল এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে দেখা করার আসল উদ্দেশ্যটি প্রকাশ করল—স্বামীর মৃত্যুর কারণে সরকার থেকে কীভাবে আর্থিক অনুদান পাওয়া যায়, সে বিষয়ে তাঁর কাছে জানতে চাইল

সে এমনভাবে বিষয়টি তুলল যেন নিজের পেনশন সম্পর্কে পিওতর ইভানোভিচের পরামর্শ চাইছে। কিন্তু  অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারলেন, এ ব্যাপারে সে ইতিমধ্যেই এত খুঁটিনাটি জানে যে, বরং তাঁর চেয়েও বেশি জানে।

সে জানত, স্বামীর মৃত্যুর কারণে সরকারের কাছ থেকে কতটা অর্থ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, এর চেয়েও বেশি কিছু পাওয়ার কোনো উপায় আছে কি না, সেটা একবার ভালো করে খুঁজে দেখা দরকার। পিওতর ইভানোভিচও কীভাবে তা করা যায়, সে বিষয়ে ভাবতে চেষ্টা করলেন। কিছুক্ষণ চিন্তা করে, এবং ভদ্রতার খাতিরে সরকারের কৃপণতার নিন্দা করে, তিনি বললেন যে তাঁর মনে হয়, এর চেয়ে বেশি আর কিছু পাওয়া সম্ভব নয়।

তখন সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল এবং স্পষ্টতই কীভাবে তার অতিথিকে বিদায় করা যায়, সেই উপায় ভাবতে শুরু করল। ব্যাপারটি বুঝতে পেরে পিওতর ইভানোভিচ সিগারেটটি নিভিয়ে ফেললেন, উঠে দাঁড়ালেন, তার হাত চাপড়ে ধরে বিদায় জানালেন এবং বাইরের ঘরে চলে গেলেন।

খাওয়ার ঘরে, যেখানে সেই ঘড়িটি রাখা ছিল—যে ঘড়িটি ইভান ইলিচের খুব পছন্দের ছিল, যেটা তিনি একটি পুরোনো জিনিসের দোকান থেকে কিনেছিলেনপিওতর ইভানোভিচের সঙ্গে এক পাদ্রি এবং আরও কয়েকজন পরিচিতের দেখা হলো। তাঁরা মৃতের শেষকৃত্যের প্রার্থনায় যোগ দিতে এসেছিলেন। সেখানে তিনি ইভান ইলিচের মেয়েকেও দেখতে পেলেন—একজন সুন্দরী তরুণী। সে কালো পোশাক পরেছিল, আর তার ছিপছিপে দেহটিকে আগের চেয়েও বেশি রোগা ও সরু বলে মনে হচ্ছিল। তার মুখে ছিল বিষণ্ণ, দৃঢ়, প্রায় রাগান্বিত একটি অভিব্যক্তি। সে এমনভাবে পিওতর ইভানোভিচকে মাথা নত করে অভিবাদন জানাল, যেন কোনো না কোনোভাবে তাঁরও এই মৃত্যুর জন্য দোষ আছে।

তার পিছনে একই রকম অভিমানী মুখে দাঁড়িয়ে ছিল এক ধনী তরুণ—একজন তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট। পিওতর ইভানোভিচ তাকে চিনতেন। শুনেছিলেন, সেই তরুণই ইভান ইলিচের মেয়ের বাগদত্ত। পিওতর ইভানোভিচ তাদের দিকে বিষণ্ণভাবে মাথা নত করে মৃতের ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় সিঁড়ির নিচ থেকে বেরিয়ে এল ইভান ইলিচের স্কুলপড়ুয়া ছেলে। ছেলেটি তার বাবার সঙ্গে অসম্ভব রকমের সাদৃশ্যপূর্ণ।

তাকে দেখে পিওতর ইভানোভিচের মনে হলো, যেন ছোট্ট ইভান ইলিচই দাঁড়িয়ে আছে—যেমনটি তিনি বহু বছর আগে মনে রেখেছিলেন, যখন তাঁরা একসঙ্গে আইন পড়তেন। ছেলেটির চোখে জল লেগে ছিল। সেই চোখে তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলেদের চোখে যেমন দেখা যায় তেমন এক ধরনের লজ্জা-মেশানো, অপরিণত ভাব ছিলপিওতর ইভানোভিচকে দেখতে পেয়ে সে বিষণ্ণ ও লজ্জিতভাবে ভ্রু কুঁচকাল। পিওতর ইভানোভিচও তাকে মাথা নেড়ে অভিবাদন জানিয়ে মৃতদেহের ঘরে ঢুকে গেলেন।

শেষকৃত্যের প্রার্থনা শুরু হলো—জ্বলতে লাগল মোমবাতি, শোনা গেল গোঙানি, ধূপের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল, চারদিকে কান্না আর ফোঁপানোর শব্দ। পিওতর ইভানোভিচ বিষণ্ণভাবে মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি একবারও মৃতদেহটির দিকে তাকালেন না। চারপাশের শোকের পরিবেশও তাঁর মনে কোনো গভীর বিষণ্ণতা সৃষ্টি করতে পারল না। তিনি সবার আগে ঘর থেকে বেরিয়ে আসা লোকদের একজন হলেন।

বাইরের ঘরে তখন আর কেউ ছিল না। কিন্তু গেরাসিম মৃতের ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল। তার শক্ত হাত দিয়ে সে স্তূপ করে রাখা পশমের কোটগুলোর মধ্যে পিওতর ইভানোভিচের কোটটি খুঁজে বের করল এবং নিজ হাতে তাঁকে কোটটি পরিয়ে দিল।

কী বলা যায় ভেবে পিওতর ইভানোভিচ বললেন-কী বলো, বন্ধু গেরাসিম, ব্যাপারটা বড়ই দুঃখের, তাই না?”

গেরাসিম দাঁত বের করে বলল, “এ তো ঈশ্বরের ইচ্ছা। একদিন না একদিন আমাদের সবাইকেই তো এর মুখোমুখি হতে হবে।”

তার দাঁতগুলো ছিল সুস্থ-সবল কৃষকের মতো সমান ও ঝকঝকে সাদা। তারপর যেন অত্যন্ত জরুরি কোনো কাজের মাঝখানে থাকা একজন মানুষের মতোই সে তৎপরভাবে বাড়ির সদর দরজা খুলে দিল, গাড়োয়ানকে ডাকল, পিওতর ইভানোভিচকে স্লেজগাড়িতে উঠতে সাহায্য করল এবং তারপর এমনভাবে বারান্দায় ফিরে দাঁড়াল, যেন পরের কাজটির জন্যও সে প্রস্তুত।

ধূপ, মৃতদেহ এবং কার্বলিক অ্যাসিডের গন্ধে ভরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে পিওতর ইভানোভিচের কাছে বাইরের নির্মল, তাজা বাতাসটিকে অদ্ভুত রকমের স্বস্তিদায়ক ও মনোরম বলে মনে হলো।

কোথায় যাব, স্যার?” কোচোয়ান জিজ্ঞেস করল।

এখনও খুব বেশি দেরি হয়নি… আমি ফিয়োদর ভাসিলিয়েভিচের বাড়িতে একবার ঘুরে আসি।”

এই বলে তিনি সেখানে গেলেন। গিয়ে দেখলেন, তাঁরা সবে প্রথম দফার তাসের খেলা শেষ করেছেন। ফলে তাঁর পক্ষে খেলায় যোগ দেওয়ার জন্য সময়টাও বেশ উপযুক্তই ছিল।

                      দ্বিতীয় অধ্যায়

ইভান ইলিচের জীবন ছিল অত্যন্ত সরল ও সাধারণ—আর সেই কারণেই তা ছিল আরও ভয়াবহ। তিনি ছিলেন আদালতের একজন বিচারক এবং মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে মারা যান

তাঁর বাবা ছিলেন একজন সরকারি কর্মচারী। পিটার্সবার্গের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে কাজ করার পর তিনি এমন এক ধরনের কর্মজীবন গড়ে তুলেছিলেন, যার ফলে দীর্ঘদিন চাকরি করার কারণে তাঁকে আর পদচ্যুত করা সম্ভব ছিল না, যদিও স্পষ্টতই তিনি কোনো দায়িত্বশীল পদে থাকার উপযুক্ত ছিলেন না। তাই তাঁর মতো লোকদের জন্য বিশেষ বিশেষ পদ সৃষ্টি করা হতো—পদগুলো আসলে ছিল নামমাত্র, কিন্তু সেগুলোর বেতন ছিল একেবারে সত্যি; বছরে ছয় থেকে দশ হাজার রুবল পর্যন্ত। সেই বেতন পেতে পেতে তাঁরা অতি বার্ধক্য পর্যন্ত দিব্যি জীবন কাটিয়ে দিতেন। এই ছিলেন প্রিভি কাউন্সিলর ইলিয়া এপিমোভিচ গোলভিন—অপ্রয়োজনীয় নানা প্রতিষ্ঠানের অপ্রয়োজনীয় সদস্যদের একজন।

তাঁর তিন ছেলে ছিল। ইভান ইলিচ ছিলেন দ্বিতীয়। বড় ছেলে বাবার পদাঙ্কই অনুসরণ করেছিল, তবে অন্য একটি দপ্তরে। সেও ইতিমধ্যে চাকরিজীবনের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, যেখানে অচিরেই একই ধরনের একটি আরামদায়ক, প্রায় কাজবিহীন পদ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

তৃতীয় ছেলে ছিল সম্পূর্ণ ব্যর্থ। একের পর এক চাকরিতে সে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত রেল বিভাগে চাকরি করছিল। তার বাবা ও দুই ভাই তো বটেই, বিশেষ করে তাদের স্ত্রীরা—তার সঙ্গে দেখা করতেও পছন্দ করত না; এমনকি বাধ্য না হলে তার অস্তিত্বের কথাও মনে করতে চাইত না।

তাঁর বোনের বিয়ে হয়েছিল ব্যারন গ্রেফের সঙ্গে। তিনিও পিটার্সবার্গের একজন সরকারি কর্মচারী, তাঁর বাবারই মতো ধরনের মানুষ।

পরিবারের লোকেরা যেমন বলত, ইভান ইলিচ ছিলেন পরিবারের গর্ব ও শ্রেষ্ঠ সন্তান”le phénix de la famille তিনি তাঁর বড় ভাইয়ের মতো অতটা শীতল ও আনুষ্ঠানিক ছিলেন না, আবার ছোট ভাইয়ের মতো উচ্ছৃঙ্খলও ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন দুজনের মাঝামাঝি এক সুন্দর ভারসাম্য— বুদ্ধিমান, মার্জিত, প্রাণবন্ত এবং সবার কাছে আকর্ষণীয় একজন মানুষ।

তিনি তাঁর ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ল’ স্কুলে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু ছোট ভাই পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি; পঞ্চম শ্রেণিতে থাকতেই তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। অন্যদিকে ইভান ইলিচ সাফল্যের সঙ্গে পড়াশোনা শেষ করেছিলেন।

আইন বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও তিনি ঠিক তেমনই ছিলেন, যেমন সারা জীবন ছিলেন—সক্ষম, প্রফুল্ল, সদালাপী ও মিশুক একজন মানুষ। তবে নিজের কর্তব্য বলে যা মনে করতেন, তা পালনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিয়মানুবর্তী। আর তাঁর কাছে ‘কর্তব্য’ বলতে সেটাই বোঝাত, যেটিকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তব্য বলে গণ্য করত।

ছেলে হিসেবে কিংবা পরিণত বয়সেও তিনি কখনো তোষামোদকারী ছিলেন না। কিন্তু শৈশবের প্রথম দিক থেকেই স্বভাবতই তিনি উচ্চপদস্থ ও সম্ভ্রান্ত লোকদের প্রতি আকৃষ্ট হতেন—যেমন আলো দেখলে মাছি তার দিকে ছুটে যায়। তিনি তাঁদের চালচলন ও জীবনদৃষ্টিকে সহজেই নিজের মধ্যে গ্রহণ করতেন এবং তাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতেন।

শৈশব ও কৈশোরের সব রকমের আবেগ-উচ্ছ্বাস তাঁর জীবনে তেমন কোনো স্থায়ী ছাপ রেখে যায়নি। তিনি ইন্দ্রিয়সুখের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, অহংকার ও আত্মম্ভরিতার বশবর্তী হয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে সমাজের উচ্চস্তরে মিশতে গিয়ে উদারনৈতিক মতবাদের প্রতিও ঝুঁকেছিলেন। তবে সব সময়ই তিনি এমন এক সীমার মধ্যে থেকেছেন, যেটিকে তাঁর সহজাত বোধবুদ্ধি নির্ভুলভাবে ‘উপযুক্ত’ বলে নির্দেশ করত।

আইন বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি এমন কিছু কাজ করেছিলেন, যা একসময় তাঁর কাছে অত্যন্ত ঘৃণ্য বলে মনে হতো এবং সেগুলো করার পর নিজের প্রতিই তাঁর ঘৃণা জন্মাত। কিন্তু পরে যখন তিনি দেখলেন, সমাজের উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন লোকেরাও একই ধরনের কাজ করেন এবং সেগুলোকে তাঁরা অন্যায় বলে মনে করেন না, তখন ইভান ইলিচ সেসব কাজকে ঠিক ভালো বলে মেনে নিতে না পারলেও সেগুলোর কথা সম্পূর্ণ ভুলে যেতে পারলেন; অন্তত সেগুলো মনে পড়লেও আর বিশেষ অস্বস্তি বোধ করতেন না।

আইন বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে তিনি সরকারি চাকরির দশম শ্রেণির পদে যোগ দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছি্লেন। চাকরিতে যাওয়ার প্রস্তুতির জন্য বাবার কাছ থেকে কিছু টাকা পেয়ে তিনি সেই সময়ের নামী ফ্যাশনেবল দর্জি শার্মারের কাছ থেকে নিজের জন্য পোশাক বানিয়ে নিলেন। ঘড়ির চেনের সঙ্গে ‘Respice finem’—অর্থাৎ ‘পরিণতির কথা মনে রেখো’—লেখা একটি মেডেলিয়ন ঝুলিয়ে নিলেন। তারপর অধ্যাপক এবং বিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষক রাজপুত্রের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। সহপাঠীদের সঙ্গে দোনোঁর প্রথম শ্রেণির রেস্তোরাঁয় বিদায়ী ভোজও সেরে ফেললেন।

এরপর নতুন ও ফ্যাশনেবল একটি ভ্রমণ-সুটকেস, উন্নতমানের সাদা কাপড়, পোশাক, দাড়ি কামানো ও অন্যান্য প্রসাধনের সামগ্রী এবং একটি ভ্রমণ-কম্বল—সবই শহরের সেরা দোকান থেকে কিনে নিয়ে তিনি একটি প্রদেশের উদ্দেশে রওনা হলেন। সেখানে তাঁর বাবার প্রভাবের কারণে তাঁকে গভর্নরের অধীনে বিশেষ কাজের জন্য একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল।

প্রদেশে গিয়েও ইভান ইলিচ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আইন বিদ্যালয়ে থাকার মতোই আরামদায়ক ও মনোরম একটি অবস্থান নিজের জন্য তৈরি করে নিলেন। তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে সরকারি কাজ করতেন, ধীরে ধীরে পদোন্নতির পথে এগোচ্ছিলেন এবং একই সঙ্গে শালীন ও আনন্দময় জীবনযাপনও করছিলেন।

মাঝে মাঝে তাঁকে সরকারি কাজে গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যেতে হতো। সেখানে তিনি ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন—উভয়ের সঙ্গেই যথাযথ মর্যাদা ও ভদ্রতা বজায় রেখে আচরণ করতেন এবং তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন। তাঁর কাজের প্রধান অংশ ছিল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় মতাবলম্বীদের—বিশেষত ভিন্নমতাবলম্বী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর—সংক্রান্ত বিষয় দেখা। এসব দায়িত্ব তিনি এমন নিখুঁতভাবে এবং এমন নির্ভেজাল সততার সঙ্গে পালন করতেন যে, নিজের কাজ নিয়ে তাঁর গর্ব না করে উপায় ছিল না।

সরকারি কাজকর্মের ক্ষেত্রে, অল্পবয়স এবং হালকা-চালের আনন্দ-ফুর্তির প্রতি ঝোঁক থাকা সত্ত্বেও, তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংযত, কর্তব্যনিষ্ঠ, খুঁতখুঁতে এবং এমনকি কিছুটা কঠোরও। কিন্তু সামাজিক মেলামেশায় তিনি প্রায়ই ছিলেন রসিক ও বুদ্ধিদীপ্ত; আর সব সময়ই ছিলেন সদালাপী, মার্জিত ও ভদ্রস্বভাবের। গভর্নর এবং তাঁর স্ত্রী—যাঁদের পরিবারের একজনের মতোই তিনি ছিলেন—তাঁকে বর্ণনা করতে প্রায়ই বলতেন, তিনি একেবারে bon enfantঅর্থাৎ সরল, অমায়িক ও ভালো-স্বভাবের মানুষ।

প্রদেশে থাকাকালীন এক ভদ্রমহিলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক হয়েছিল; সেই মহিলা এই সুদর্শন তরুণ আইনজীবীর প্রতি নিজেই আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। এ ছাড়া এক টুপিওয়ালির সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ছিল। জেলার বাইরে থেকে আসা অ্যাডজুট্যান্টদের সঙ্গে তিনি মাঝে মাঝে মদ্যপান ও হৈ-হুল্লোড়ে মেতে উঠতেন; রাতের খাবারের পর শহরের এক নির্জন, কুখ্যাত পাড়াতেও যেতেন তিনিতাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রতি, এমনকি সেই কর্মকর্তার স্ত্রীর প্রতিও, তাঁর মধ্যে কিছুটা তোষামোদ করার প্রবণতা ছিল। কিন্তু এসবই তিনি এমন মার্জিত ও ভদ্র ভঙ্গিতে করতেন যে, এসব আচরণের জন্য তাঁকে কোনো কটু নামে অভিহিত করা যেত না। সবকিছুকেই সেই ফরাসি প্রবাদটির আওতায় ফেলা যেত—Il faut que jeunesse se passe”, অর্থাৎ, যৌবনের কিছু উচ্ছৃঙ্খলতা তো থাকবেই; যৌবনকে তার নিজের মতো করে কেটে যেতে দিতে হয়।”

সবই তিনি করতেন পরিচ্ছন্ন হাতে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাকে, মুখে ফরাসি বুলি, আর সর্বোপরি সমাজের উচ্চশ্রেণির লোকজনের সঙ্গে; ফলে পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদেরও এসব ব্যাপারে তাঁর প্রতি কোনো আপত্তি ছিল না। এইভাবেই ইভান ইলিচ পাঁচ বছর চাকরি করলেন। তারপর তাঁর সরকারি জীবনে পরিবর্তন এল।

নতুন ও সংস্কার করা বিচারব্যবস্থা চালু হলো এবং নতুন ধরনের কর্মীর প্রয়োজন দেখা দিল।ইভান ইলিচও সেই নতুন যুগের উপযুক্ত একজন কর্মকর্তা হয়ে উঠলেন। তাঁকে তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেটের পদে অভিষিক্ত করা হলো। তিনি পদটি গ্রহণ করলেন, যদিও এর জন্য তাঁকে অন্য একটি প্রদেশে যেতে হবে এবং এতদিনে গড়ে ওঠা পরিচিতি ও সম্পর্কগুলো ছেড়ে নতুন করে সবকিছু গড়ে তুলতে হবে।

তাঁর বিদায় উপলক্ষে বন্ধুবান্ধব একত্রিত হলেন। সবাই মিলে একটি দলগত ছবি তোলা হলো এবং তাঁকে একটি রুপোর সিগারেটের বাক্স উপহার দেওয়া হলো। তারপর তিনি তাঁর নতুন কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা হলেন।

তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ইভান ইলিচ আগের মতোই ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত, শিষ্ট ও comme il fautঅর্থাৎ, সর্বতোভাবে রুচিসম্মত ও যথাযথ একজন মানুষ। তিনি সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন এবং সরকারি দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত জীবনকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে জানতেন—যেমনটি তিনি বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকাকালীনও করতেন।

তবে তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তাঁর কাজ আগের তুলনায় অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক মনে হলো। আগের পদে শার্মারের তৈরি সাধারণ পোশাকের ইউনিফর্ম পরে চলাফেরা করতে তাঁর ভালো লাগত। গভর্নরের সঙ্গে দেখা করার জন্য ভয়ে-ভয়ে অপেক্ষা করে থাকা আবেদনকারী ও সরকারি কর্মচারীদের ভিড়ের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়াও তাঁর কাছে আনন্দের ছিল। তারা তাঁকে ঈর্ষার চোখে দেখত, কারণ তিনি একেবারে স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে সোজা তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত কক্ষে ঢুকে তাঁর সঙ্গে চা ও সিগারেট খেতে পারতেন।

কিন্তু তখন খুব বেশি লোক সরাসরি তাঁর ক্ষমতার অধীন ছিল না—শুধু পুলিশ কর্মকর্তারা এবং বিশেষ দায়িত্বে কোথাও গেলে সেখানকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজন। আর ইভান ইলিচ তাদের সঙ্গে ভদ্রভাবে, প্রায় বন্ধুর মতো আচরণ করতে পছন্দ করতেন। যেন তিনি তাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন—যে মানুষটি চাইলে তাদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে পারেন, তিনিই কী সহজ-সরল ও বন্ধুত্বপূর্ণভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবহার করছেন! তবে এমন লোকের সংখ্যা তখন ছিল খুবই কম।

কিন্তু এখন, তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ইভান ইলিচ অনুভব করলেন যে, কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই প্রত্যেকেই—এমনকি সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আত্মতুষ্ট মানুষটিও—তাঁর ক্ষমতার অধীন। তাঁকে কেবল একটি নির্দিষ্ট শিরোনামযুক্ত কাগজে কয়েকটি কথা লিখতে হবে, আর অমনি সেই গুরুত্বপূর্ণ ও আত্মম্ভরী ব্যক্তিকে তাঁর সামনে আসামি বা সাক্ষীর ভূমিকায় হাজির হতে হবে। আর ইভান ইলিচ যদি তাকে বসার অনুমতি না দেন, তাহলে তাকে দাঁড়িয়েই তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

ইভান ইলিচ কখনোই নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করতেন না। বরং তিনি চেষ্টা করতেন তাঁর ক্ষমতার প্রকাশকে যতটা সম্ভব কোমল ও সংযত রাখতে। কিন্তু নিজের হাতে এই ক্ষমতা রয়েছে—এবং চাইলে তার কঠোরতা কিছুটা কমিয়ে ব্যবহার করা যায়—এই চেতনা ও সম্ভাবনা তাঁর চাকরির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ও আনন্দের বিষয় হয়ে উঠেছিল।

কাজের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে জিজ্ঞাসাবাদের সময়, তিনি খুব দ্রুত এমন একটি পদ্ধতি রপ্ত করে ফেললেন যার মাধ্যমে মামলার আইনি দিকের সঙ্গে সম্পর্কহীন সব বিষয়কে বাদ দেওয়া যায়। এমনকি সবচেয়ে জটিল মামলাকেও তিনি এমন একটি কাঠামোয় নিয়ে আসতে পারতেন, যাতে কাগজে-কলমে কেবল তার বাহ্যিক ও আইনগত দিকটুকুই প্রকাশ পায়; ব্যক্তিগত মতামত বা আবেগের কোনো স্থান সেখানে থাকত না। আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে তিনি কঠোরভাবে নির্ধারিত নিয়মকানুন ও আনুষ্ঠানিকতার প্রতিটি ধাপ মেনে চলতেন

কাজটি ছিল নতুন, আর নতুন বিধিবিধান প্রয়োগকারী প্রথম দিকের কর্মকর্তাদের মধ্যে ইভান ইলিচ ছিলেন অন্যতম।

নতুন শহরে তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেটের পদে যোগ দেওয়ার পর ইভান ইলিচ নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হলেন, নতুন সম্পর্ক গড়ে উঠল এবং সমাজে নিজের অবস্থানও নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হলোতাঁর কথাবার্তা ও আচরণেও কিছুটা পরিবর্তন এল। প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষের প্রতি তিনি বেশ মর্যাদাপূর্ণ দূরত্ব বজায় রাখার ভঙ্গি গ্রহণ করলেন। অন্যদিকে, শহরে বসবাসকারী আইনজীবী ও ধনী জমিদারদের মধ্যে থেকে তিনি বেছে নিলেন শহরের সবচেয়ে অভিজাত ও প্রভাবশালী মহলটিকে। তাঁদের সঙ্গে মেলামেশার সময় তাঁর কথাবার্তায় সরকারের প্রতি সামান্য অসন্তোষ, পরিমিত উদারপন্থী মনোভাব এবং নিজেকে একজন প্রগতিশীল ও সচেতন নাগরিক হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা গেল। তবে পোশাক-পরিচ্ছদের আভিজাত্যে কোনো পরিবর্তন আনলেন না; শুধু থুতনি কামানো বন্ধ করে দাড়ি স্বাভাবিকভাবে বাড়তে দিলেন।

নতুন শহরে ইভান ইলিচ বেশ আনন্দেই দিন কাটাতে লাগলেন। সেখানকার সমাজ, যা গভর্নরের নীতির বিরোধিতার দিকে কিছুটা ঝুঁকে ছিল, তাঁকে সাদরে গ্রহণ করল। তাঁর বেতনও আগের চেয়ে বেশি ছিল। এরই মধ্যে তিনি ভিন্ট নামের তাসের খেলাটি খেলতে শুরু করলেন। খেলাটি তাঁর জীবনে আনন্দের মাত্রা বেশ খানিকটা বাড়িয়ে দিল। তাস খেলায় তাঁর বেশ স্বাভাবিক দক্ষতা ছিল; তিনি হাসিখুশি ও বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়ে খেলতেন, আবার খুব দ্রুত ও বিচক্ষণতার সঙ্গে হিসাব কষতে পারতেন। ফলে সাধারণত তিনিই জিততেন।

সেখানে দুই বছর থাকার পর তিনি তাঁর ভাবী স্ত্রী প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনা মিখেল-এর সঙ্গে পরিচিত হলেন। তিনি ছিলেন ইভান ইলিচের পরিচিত সমাজের সবচেয়ে আকর্ষণীয়, বুদ্ধিমতী ও চমকপ্রদ তরুণীদের একজন। তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজের ফাঁকে নানা ধরনের বিনোদন ও অবসর কাটানোর উপায়ের মধ্যে ইভান ইলিচ তাঁর সঙ্গে হালকা, রসিকতাপূর্ণ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুললেন।

বিশেষ দায়িত্বে নিযুক্ত সরকারি কর্মচারী থাকার সময় ইভান ইলিচ নাচতেন। কিন্তু তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার পর নাচাটা তাঁর জন্য খুব একটা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। এখন তিনি যখন নাচতেন, তখন এমন একটা ভঙ্গি থাকত যেন তিনি বোঝাতে চান—যদিও তিনি নতুন সংস্কারপ্রসূত ব্যবস্থার অধীনে চাকরি করছেন এবং সরকারি পদমর্যাদায় পঞ্চম শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছেন, তবু নাচের ব্যাপারে তিনি অধিকাংশ মানুষের চেয়ে ভালোই পারেন।

তাই কোনো কোনো সন্ধ্যার শেষে তিনি প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনার সঙ্গে নাচতেনআর মূলত এই নাচগুলোর সময়ই তিনি তাঁর মন জয় করে নেন। প্রাসকোভিয়া তাঁর প্রেমে পড়লেন।

প্রথমদিকে ইভান ইলিচের বিয়ে করার কোনো নির্দিষ্ট ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু মেয়েটি যখন তাঁর প্রেমে পড়ল, তখন তিনি নিজেকেই বললেন, সত্যিই তো, আমি বিয়ে করব না কেন?”

প্রাসকোভিয়া একটি ভালো পরিবারের মেয়ে ছিলেন, দেখতে মন্দ ছিলেন না এবং সামান্য কিছু সম্পত্তিও ছিল। ইভান ইলিচ চাইলে আরও জাঁকজমকপূর্ণ বা উচ্চবংশীয় বিয়ের আশা করতে পারতেন, কিন্তু এটিও যথেষ্ট ভালো সম্বন্ধ। তাঁর নিজের বেতন ছিল, আর তিনি আশা করতেন, স্ত্রীও সমপরিমাণ অর্থসম্পদের অধিকারী হবেন। তাঁর ভালো সামাজিক যোগাযোগ ছিল; তিনি ছিলেন মিষ্টি স্বভাবের, সুন্দরী এবং আচরণে সম্পূর্ণ মার্জিত ও শালীন এক তরুণী।

এ কথা বলা যেমন ঠিক হবে না যে ইভান ইলিচ প্রাসকোভিয়ার প্রেমে পড়েছিলেন এবং তাঁদের জীবনদর্শনের মিল থাকায় তাঁকে বিয়ে করেছিলেন, তেমনি এটাও বলা ঠিক হবে না যে তাঁর সামাজিক মহল এই বিয়েটিকে অনুমোদন করেছিল বলেই তিনি বিয়ে করেছিলেন। আসলে দুটো বিষয়ই তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। এই বিয়ে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আনন্দ দিয়েছিল, আবার একই সঙ্গে তাঁর সমাজের সবচেয়ে উচ্চপদস্থ ও প্রভাবশালী লোকেরাও এই বিয়েকে উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছিলেন

অতএব, ইভান ইলিচ বিয়ে করলেন।

বিয়ের প্রস্তুতি এবং বিবাহিত জীবনের প্রথম দিকটা—দাম্পত্যের স্নেহ-ভালোবাসা, নতুন আসবাবপত্র, নতুন বাসনপত্র, নতুন বিছানার চাদর ও অন্যান্য নতুন গৃহস্থালির সামগ্রী—সব মিলিয়ে তাঁর কাছে অত্যন্ত আনন্দের ছিল। তখন পর্যন্ত তাঁর মনে হতে শুরু করেছিল যে বিয়ে তাঁর এতদিনের সহজ, স্বচ্ছন্দ, আনন্দময় এবং সর্বদা শালীন জীবনযাত্রাকে মোটেই নষ্ট করবে না; বরং তা আরও সুন্দর করে তুলবে। যে জীবনকে সমাজও পছন্দ করত এবং তিনি নিজেও স্বাভাবিক বলে মনে করতেন, বিয়ের ফলে সেই জীবনযাত্রায় কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না—বরং তার উন্নতিই হবে।

কিন্তু স্ত্রীর গর্ভধারণের প্রথম কয়েক মাস থেকেই কিছুদিনের মধ্যেই এমন এক নতুন, অপ্রীতিকর, বিষণ্ণ ও অশোভন পরিস্থিতি হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়াল, যার থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ সে দেখতে পেল না। কোনো কারণ ছাড়াই—ইভান ইলিচ নিজের মনে যাকে বলত de gaieté de coeur (অকারণেই, নিছক খেয়ালে)—তার স্ত্রী তাদের সুখী ও শালীন জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটাতে শুরু করল। সে অকারণে ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠল, স্বামীর সমস্ত মনোযোগ শুধু নিজের প্রতি চাইল, সবকিছুতেই দোষ ধরতে লাগল এবং অমার্জিত ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করে দৃশ্য সৃষ্টি করতে লাগল।

প্রথমদিকে ইভান ইলিচ আশা করেছিল, এতদিন যে সহজ-স্বচ্ছন্দ ও মার্জিত জীবনযাপনের পদ্ধতি তাকে সাহায্য করেছে, সেটি অবলম্বন করেই সে এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এড়িয়ে যেতে পারবে। তাই স্ত্রীর বিরক্তিকর মেজাজকে সে উপেক্ষা করার চেষ্টা করল, নিজের স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দ ও আনন্দময় জীবনযাপন চালিয়ে যেতে লাগল, বাড়িতে বন্ধুদের তাস খেলতে ডাকত, আবার কখনো ক্লাবে যেত কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সন্ধ্যা কাটাত।

কিন্তু একদিন তার স্ত্রী এমন তীব্রভাবে তাকে ভর্ৎসনা করতে শুরু করল, এমন অশালীন ভাষায় কথা বলল এবং প্রতিবারই সে স্ত্রীর দাবি পূরণ না করলে এত দৃঢ়তার সঙ্গে তাকে গালমন্দ করতে লাগল—যেন সে নতি স্বীকার না করা পর্যন্ত, অর্থাৎ স্ত্রীর মতো বাড়িতে বসে বিরক্ত না হওয়া পর্যন্ত, কোনোভাবেই থামবে না— ফলে ইভান ইলিচ ভয় পেয়ে গেল।

তখন সে বুঝতে পারল, বিবাহিত জীবন—অন্তত প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনার সঙ্গে— সবসময় যে জীবনের আনন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্য বয়ে আনে, তা নয়; বরং অনেক সময় তা মানুষের আরাম ও শালীনতা দুটিকেই ব্যাহত করে। অতএব, এই ধরনের হস্তক্ষেপ থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য তাকে একটি প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আর সেই উপায় খুঁজতেই ইভান ইলিচ ব্যস্ত হয়ে উঠল।

তার সরকারি চাকরিই ছিল এমন একটি বিষয়, যার কাছে প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনা কিছুটা নতি স্বীকার করত। তাই নিজের সরকারি কাজ এবং সেই কাজের সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বগুলোকেই অবলম্বন করে সে স্ত্রীর সঙ্গে একরকম সংগ্রাম শুরু করল—নিজের স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য।

সন্তানের জন্ম, তাকে খাওয়ানোর চেষ্টা এবং তা নিয়ে নানা ব্যর্থতা, মা ও শিশুর বাস্তব কিংবা কল্পিত অসুস্থতা—এসব পরিস্থিতিতে ইভান ইলিচের সহানুভূতি ও মনোযোগ দাবি করা হতো, অথচ এসব বিষয়ে সে কিছুই বুঝত না। ফলে পারিবারিক জীবনের বাইরে নিজের জন্য একটি পৃথক জীবন গড়ে তোলার প্রয়োজন তার কাছে আরও তীব্র হয়ে উঠল।

স্ত্রী যত বেশি খিটখিটে ও দাবিদার হয়ে উঠতে লাগল, ইভান ইলিচও তত বেশি করে তার জীবনের কেন্দ্র সরকারি কাজের দিকে সরিয়ে নিতে লাগল। আর এর ফলে নিজের কাজের প্রতি তার আগ্রহও বাড়তে লাগল এবং আগের চেয়ে সে আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠল।

বিয়ের এক বছরের মধ্যেই ইভান ইলিচ বুঝে গিয়েছিল যে, বিবাহ হয়তো জীবনে কিছু অতিরিক্ত স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিতে পারে, কিন্তু আসলে এটি অত্যন্ত জটিল ও কঠিন একটি ব্যাপার। নিজের কর্তব্য পালন করতে—অর্থাৎ সমাজের অনুমোদিত শালীন জীবনযাপন করতে—সরকারি চাকরির মতোই বিবাহিত জীবন সম্পর্কেও একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা দরকার।

ইভান ইলিচ তাই বিবাহিত জীবন সম্পর্কে নিজের জন্য একটি নির্দিষ্ট নীতি তৈরি করে নিল। বিবাহের কাছ থেকে সে কেবল সেই সুবিধাগুলিই চাইত, যা বিবাহ তাকে দিতে পারে—বাড়িতে খাবার, একজন গৃহকর্ত্রী এবং শয্যাসঙ্গী—এবং সর্বোপরি, সমাজের চোখে গ্রহণযোগ্য বাহ্যিক শালীনতা। এর বাইরে সে চাইত হালকা-ফুরফুরে আনন্দ ও মার্জিত জীবনযাপন। সেগুলো যখন পেত, তখন সে খুবই সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ থাকত। কিন্তু যখনই স্ত্রীর বিরোধিতা, অসন্তোষ বা অভিযোগের মুখোমুখি হতো, তখনই সে নিজের চারপাশে সরকারি দায়িত্বের এক পৃথক জগৎ গড়ে নিয়ে তার মধ্যে আশ্রয় নিত—আর সেখানেই সে নিজের তৃপ্তি খুঁজে পেত।

ইভান ইলিচকে একজন সুনামধন্য ও দক্ষ সরকারি কর্মচারী হিসেবে গণ্য করা হতো। তিন বছর পর তিনি সহকারী সরকারি কৌঁসুলি পদে উন্নীত হলেন। নতুন দায়িত্ব, সেই দায়িত্বের গুরুত্ব, নিজের ইচ্ছামতো যে-কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে তাকে কারাগারে পাঠানোর ক্ষমতা, তাঁর বক্তব্যের যে প্রচার ও গুরুত্ব পাওয়া শুরু হলো, এবং এসব কাজে তাঁর সাফল্য—সব মিলিয়ে তাঁর পেশার প্রতি আকর্ষণ আরও বেড়ে গেল।

এর মধ্যে তাঁদের আরও কয়েকটি সন্তান হলো। তাঁর স্ত্রী ক্রমশ আরও খিটখিটে ও বদমেজাজি হয়ে উঠতে লাগলেন। কিন্তু ইভান ইলিচ তাঁর পারিবারিক জীবনের প্রতি যে মনোভাব গ্রহণ করেছিলেন, তার ফলে স্ত্রীর অভিযোগ-অনুযোগে তিনি প্রায় নির্বিকার থাকতেন।

সেই শহরে সাত বছর চাকরি করার পর তাঁকে অন্য একটি প্রদেশে সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে বদলি করা হলো। তাঁরা নতুন জায়গায় চলে গেলেন। কিন্তু সেখানে তাঁদের অর্থাভাব দেখা দিল, আর তাঁর স্ত্রীও নতুন জায়গাটি একেবারেই পছন্দ করলেন না। বেতন আগের চেয়ে বেশি হলেও জীবনযাত্রার খরচ ছিল আরও বেশি। তার ওপর তাঁদের দুই সন্তান মারা গেল। ফলে পারিবারিক জীবন তাঁর কাছে আরও অসহনীয় হয়ে উঠল।

নতুন বাড়িতে তাঁরা যে-সব অসুবিধার সম্মুখীন হলেন, সেগুলোর প্রতিটির জন্যই প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনা তাঁর স্বামীকে দায়ী করতেন। স্বামী-স্ত্রীর অধিকাংশ কথাবার্তাই—বিশেষ করে সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে আলোচনা—শেষ পর্যন্ত তাঁদের পুরোনো বিবাদগুলোর কথা মনে করিয়ে দিত। আর সেই পুরোনো বিবাদগুলো যেকোনো মুহূর্তে আবার তীব্র হয়ে উঠত।

তাঁদের মধ্যে মাঝে মাঝে যে সামান্য কিছু ভালোবাসার মুহূর্ত ফিরে আসত, সেগুলোই কেবল অবশিষ্ট ছিল; কিন্তু সেগুলোও বেশিক্ষণ স্থায়ী হতো না। সেগুলো ছিল যেন উত্তাল সমুদ্রের মধ্যে ছোট ছোট দ্বীপ—কিছুক্ষণের জন্য তাঁরা সেখানে আশ্রয় নিতেন, তারপর আবার পাড়ি দিতেন সেই গোপন শত্রুতার সমুদ্রের ওপর দিয়ে, যার প্রকাশ ঘটত পরস্পরের প্রতি তাঁদের দূরত্ব ও শীতল ব্যবহারে।

এই দূরত্ব যদি ইভান ইলিচ মনে করতেন যে তা থাকা উচিত নয়, তাহলে হয়তো তা তাঁকে কষ্ট দিত। কিন্তু এখন তিনি এই অবস্থাকেই স্বাভাবিক বলে মনে করতেন; এমনকি পারিবারিক জীবনে তিনি এটিকেই নিজের লক্ষ্য করে তুলেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, পারিবারিক জীবনের যাবতীয় অস্বস্তি ও ঝামেলা থেকে নিজেকে ক্রমশ আরও মুক্ত রাখা এবং সেগুলোকে এমনভাবে সামলে নেওয়া, যাতে বাইরে থেকে সবকিছু নিরীহ, স্বাভাবিক ও শালীন বলে মনে হয়।

তিনি এই কাজটি করলেন পরিবারের সঙ্গে ক্রমশ কম সময় কাটিয়ে। আর যখন বাড়িতে থাকতেই হতো, তখন বাইরের লোকজনকে সঙ্গে রেখে নিজের অবস্থানকে যতটা সম্ভব নিরাপদ রাখার চেষ্টা করতেন।

তবে সবচেয়ে বড় কথা ছিল তাঁর সরকারি চাকরিতাঁর জীবনের সমস্ত আগ্রহ এখন সরকারি কাজকর্মকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে লাগল, আর সেই জগতের প্রতি আগ্রহই তাঁকে সম্পূর্ণভাবে আচ্ছন্ন করে রাখল।

তিনি যে-কাউকে চাইলে সর্বনাশ করে দিতে পারেন—এই ক্ষমতার অনুভূতি; আদালতে প্রবেশের সময় তাঁর পদমর্যাদার গুরুত্ব ও বাহ্যিক গাম্ভীর্য; অধস্তন কর্মচারীদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ; ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন উভয়ের কাছেই তাঁর সাফল্য; আর সর্বোপরি, মামলাগুলো তিনি কী অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন—এই সমস্ত কিছুই তাঁকে আনন্দ দিত এবং তাঁর জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলত। এর সঙ্গে যোগ হতো সহকর্মীদের সঙ্গে গল্পগুজব, নৈশভোজ এবং তাসের খেলা।

এইভাবেই, মোটের ওপর, ইভান ইলিচের জীবন চলতে থাকল, যেভাবে তিনি মনে করতেন জীবন চলা উচিত—আনন্দে, স্বাচ্ছন্দ্যে এবং শালীনতার সঙ্গে।

 এইভাবেই আরও সাত বছর কেটে গেল। ততদিনে তাঁর বড় মেয়ের বয়স ষোলো বছর হয়ে গেছে। তাঁদের আর-একটি সন্তান মারা গিয়েছিল; ফলে একমাত্র ছেলেটিই বেঁচে ছিল। সে তখন স্কুলে পড়ত এবং তাকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই মতবিরোধ হতো। ইভান ইলিচ চেয়েছিলেন ছেলেকে আইন বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে, কিন্তু তাঁকে বিরক্ত করার জন্য প্রসকোভিয়া ফেদোরোভনা ছেলেটিকে হাই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। মেয়েটি বাড়িতেই পড়াশোনা করেছিল এবং ছেলেটিও বেশ ভালোভাবেই গড়ে উঠেছিল; পড়াশোনাতেও সে মন্দ ছিল না।”

                তৃতীয় অধ্যায়

বিয়ের পর ইভান ইলিচ আরও সতেরো বছর জীবন কাটিয়েছিলেন। ততদিনে তিনি বেশ কয়েক বছর পাবলিক প্রসিকিউটরের পদে কর্মরত এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। আরও ভালো কোনো পদ পাওয়ার আশায় তিনি এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বদলির প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এমন সময় একটি অপ্রত্যাশিত ও অপ্রিয় ঘটনা তাঁর জীবনের শান্তিপূর্ণ গতিকে সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত করল।

তিনি আশা করেছিলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় শহরের প্রেসাইডিং জজের পদটি তাঁকেই দেওয়া হবে। কিন্তু কীভাবে যেন হ্যাপে তাঁর চেয়ে এগিয়ে গিয়ে সেই পদটি পেয়ে গেল। এতে ইভান ইলিচ অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে উঠলেন। তিনি হ্যাপেকে ভর্ৎসনা করলেন এবং তার সঙ্গে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়লেন। এমনকি নিজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তাঁর বিবাদ বাধল। ফলে তাঁর প্রতি তাঁদের মনোভাবও শীতল হয়ে গেল। এরপর যখনই অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের সুযোগ এল, তাঁকে আবারও উপেক্ষা করা হলো।

সেটিই ছিল ১৮৮০ ইভান ইলিচের জীবনের সবচেয়ে কঠিন বছর। তখন একদিকে স্পষ্ট হয়ে গেল যে তাঁদের সংসার চালানোর জন্য তাঁর বেতন যথেষ্ট নয়; অন্যদিকে এটাও বোঝা গেল যে কর্তৃপক্ষ তাঁকে ভুলেই গেছে। শুধু তা-ই নয়, তাঁর কাছে যে ঘটনাটি ছিল সবচেয়ে বড় এবং নির্মম অবিচার, অন্যদের কাছে সেটিই ছিল একেবারে স্বাভাবিক একটি ঘটনা। এমনকি তাঁর বাবাও মনে করলেন না যে তাঁকে সাহায্য করা তাঁর কর্তব্য।

ইভান ইলিচের মনে হলো, সবাই যেন তাঁকে পরিত্যাগ করেছে। সবাই তাঁর বর্তমান অবস্থাকে—এই বেতনে সংসার চালানোর অবস্থাকে—একেবারে স্বাভাবিক, এমনকি বেশ সৌভাগ্যের ব্যাপার বলেই মনে করছে। অথচ একমাত্র তিনিই জানতেন, তাঁর প্রতি যে অবিচার করা হয়েছে তার যন্ত্রণা, স্ত্রীর অবিরাম খিটখিটে স্বভাব ও অভিযোগ এবং নিজের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি খরচ করে যে ঋণ তিনি করেছিলেন—সব মিলিয়ে তাঁর অবস্থা মোটেই স্বাভাবিক ছিল না।

অর্থ সাশ্রয় করার জন্য সেই গ্রীষ্মে তিনি ছুটি নিলেন এবং স্ত্রীকে নিয়ে স্ত্রীর ভাইয়ের বাড়িতে গ্রামে গিয়ে থাকলেন। সেখানে কাজকর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি একঘেয়েমি অনুভব করলেন। কিন্তু শুধু একঘেয়েমিই নয়—তাঁর ওপর এমন এক অসহ্য বিষণ্নতা চেপে বসল যে তিনি স্থির করলেন, এভাবে আর জীবন চালানো সম্ভব নয়; তাঁকে এবার দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপই নিতে হবে।

এক রাত ঘুম না এসে বারান্দায় পায়চারি করতে করতে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, পিটার্সবার্গে গিয়ে নিজের ব্যাপারে জোরালোভাবে চেষ্টা করবেন। যারা তাঁর যোগ্যতার মূল্য দেয়নি, তাদের উচিত শিক্ষা দেবেন এবং অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে বদলি হয়ে যাবেন।

পরদিন স্ত্রী ও স্ত্রীর ভাইয়ের নানা আপত্তি সত্ত্বেও তিনি পিটার্সবার্গের উদ্দেশে রওনা হলেন। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল—বছরে পাঁচ হাজার রুবেল বেতনের একটি পদ লাভ করা।

এবার তিনি আর কোনো নির্দিষ্ট দপ্তর, কাজের ধরন বা মতাদর্শের প্রতি আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর একমাত্র চাওয়া ছিল, বছরে পাঁচ হাজার রুবেল বেতনের অন্য একটি পদ। সেই পদ প্রশাসনে হতে পারে, কোনো ব্যাংকে হতে পারে, রেলওয়েতে হতে পারে, সম্রাজ্ঞী মারিয়ার কোনো প্রতিষ্ঠানেও হতে পারে, এমনকি শুল্ক বিভাগেও হতে পারে—কিন্তু দুটি শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হবে: বেতন বছরে পাঁচ হাজার রুবেল হতে হবে এবং যে মন্ত্রণালয়ে এতদিন তাঁর যোগ্যতার যথাযথ মূল্য দেওয়া হয়নি, সেটির বাইরে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে পদটি হতে হবে।

ইভান ইলিচের এই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত এক অভাবনীয় ও অপ্রত্যাশিত সাফল্যে পরিণত হল। কুর্স্কে তাঁর এক পরিচিত ব্যক্তি, এফ. আই. ইলিন, প্রথম শ্রেণির কামরায় উঠে ইভান ইলিচের পাশেই বসলেন। তারপর তিনি তাঁকে জানালেন, কুর্স্কের গভর্নর এইমাত্র একটি টেলিগ্রাম পেয়েছেন। তাতে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভায় শিগগিরই পরিবর্তন ঘটতে চলেছে—পিওতর ইভানোভিচের স্থলাভিষিক্ত হবেন ইভান সেমিওনোভিচ।

রাশিয়ার জন্য এই পরিবর্তনের গুরুত্ব তো ছিলই, কিন্তু ইভান ইলিচের কাছেও এর বিশেষ তাৎপর্য ছিল। কারণ নতুন একজনকে সামনে নিয়ে আসার ফলে পিওতর পেত্রোভিচ এবং তার সঙ্গে ইভান ইলিচের বন্ধু জাখার ইভানোভিচও প্রভাবশালী হয়ে উঠবেন। এতে ইভান ইলিচের যথেষ্ট সুবিধা হবে, কারণ জাখার ইভানোভিচ ছিলেন তাঁর বন্ধু ও সহকর্মী।

মস্কো পৌঁছানোর পর এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত হলো। আর পিটার্সবার্গে পৌঁছে ইভান ইলিচ জাখার ইভানোভিচের সঙ্গে দেখা করলেন এবং তাঁর আগের বিচার মন্ত্রণালয়েই একটি পদ পাওয়ার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি পেলেন। এক সপ্তাহ পরে তিনি স্ত্রীকে টেলিগ্রাম করে লিখলেন: “জাখার মিলারের জায়গায় এসেছে। রিপোর্ট পেশ করলেই আমি নিয়োগপত্র পাব।”

কর্মকর্তাদের এই পরিবর্তনের ফলে ইভান ইলিচ অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁর আগের মন্ত্রণালয়েই এমন একটি পদ লাভ করলেন, যা তাঁকে তাঁর প্রাক্তন সহকর্মীদের চেয়ে দুই ধাপ উচ্চ পদমর্যাদায় উন্নীত করল। সেই সঙ্গে তিনি পেলেন পাঁচ হাজার রুবেল বেতন এবং বদলির সঙ্গে সম্পর্কিত খরচের জন্য আরও সাড়ে তিন হাজার রুবেল।

ফলে তাঁর প্রাক্তন শত্রুদের প্রতি এবং গোটা দপ্তরের প্রতি জমে থাকা সমস্ত ক্ষোভ মুহূর্তের মধ্যেই দূর হয়ে গেল। ইভান ইলিচ আবার সম্পূর্ণ সুখী হয়ে উঠলেন।

দীর্ঘদিনের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো ইভান ইলিচ দেশে ফিরে এলেন অনেক বেশি প্রফুল্ল ও তৃপ্ত মনে। প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনাও কিছুটা স্বস্তি পেলেন এবং তাঁদের দুজনের মধ্যে যেন সাময়িক শান্তিচুক্তি হয়ে গেল। ইভান ইলিচ বললেন, পিটার্সবার্গে সবাই কীভাবে তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেছে, যারা এতদিন তাঁর শত্রু ছিল তারা কীভাবে লজ্জিত হয়ে এখন তাঁর মন জয় করার জন্য তোষামোদ করছে, তাঁর নতুন পদ পাওয়ায় তারা কতটা ঈর্ষান্বিত, আর পিটার্সবার্গের সবাই তাঁকে কতখানি পছন্দ করে। প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনা তাঁর কথা শুনলেন এবং মনে হলো, সবই তিনি বিশ্বাস করছেন। তিনি কোনো কথার বিরোধিতা করলেন না; বরং তাঁরা যে শহরে যেতে চলেছেন, সেখানে তাঁদের জীবন কীভাবে কাটবে, সেই পরিকল্পনাই করতে লাগলেন।

ইভান ইলিচ আনন্দের সঙ্গে লক্ষ করলেন যে, এসব পরিকল্পনা আসলে তাঁর নিজের পরিকল্পনার সঙ্গেই মিলে যাচ্ছে। অর্থাৎ তিনি ও তাঁর স্ত্রী একই বিষয়ে একমত এবং সামান্য একটি হোঁচট খাওয়ার পর তাঁর জীবন আবার তার স্বাভাবিক ছন্দ—আনন্দ, স্বচ্ছন্দতা ও শোভনতার পথে ফিরে আসছে।

ইভান ইলিচ অল্প কয়েক দিনের জন্যই বাড়ি ফিরলেন, কারণ সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে তাঁকে নতুন দায়িত্বে যোগ দিতে হবেতাছাড়া নতুন জায়গায় গিয়ে সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য তাঁর সময় দরকার ছিল। প্রদেশে থাকা তাঁর সমস্ত জিনিসপত্র সরিয়ে আনতে হবে, আরও অনেক নতুন জিনিস কিনতে হবে এবং অর্ডার দিতে হবে—অর্থাৎ তিনি যেসব ব্যবস্থা করার কথা ভেবে রেখেছিলেন, সেগুলো সম্পূর্ণ করতে হবে। মজার ব্যাপার হলো, প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনাও প্রায় একই ধরনের পরিকল্পনা করেছিলেন।

সবকিছু যখন এত সুন্দরভাবে ঘটল, তাঁদের দুজনের লক্ষ্যও যখন এক হয়ে গেল, আর তার ওপর তাঁরা একে অপরের সঙ্গে খুব কম সময় কাটাতে লাগলেন, তখন তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্ক প্রথম কয়েক বছরের পর আগের চেয়েও ভালো হয়ে উঠল, আগে কখনো এমন ভালো ছিল না

ইভান ইলিচ প্রথমে ভেবেছিলেন, স্ত্রী-সন্তানদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রীর ভাই এবং ভাইয়ের স্ত্রী হঠাৎ করে তাঁর ও তাঁর পরিবারের প্রতি বিশেষভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁদের অনুরোধেই শেষ পর্যন্ত ইভান ইলিচ একাই চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

তিনি একাই রওনা হলেন। তাঁর মনে যে আনন্দ ও প্রফুল্লতা তৈরি হয়েছিল—সাফল্যের কারণে এবং স্ত্রীর সঙ্গে সাময়িক শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের কারণে—তার একটুও কমতি হলো না। বরং এই দুটি বিষয় একে অপরকে আরও বাড়িয়ে তুলছিল।

নতুন শহরে গিয়ে তিনি এমন একটি চমৎকার বাড়ি পেলেন, যা তাঁর এবং তাঁর স্ত্রীর কল্পনার সঙ্গে একেবারে মিলে যায়। পুরোনো ধাঁচের প্রশস্ত ও উঁচু ছাদের বসার ঘর, একটি আরামদায়ক ও মর্যাদাপূর্ণ অফিসঘর, স্ত্রী ও মেয়ের জন্য আলাদা ঘর, ছেলের জন্য একটি পড়ার ঘর—সবকিছু যেন বিশেষভাবে তাঁদের পরিবারের জন্যই তৈরি করা হয়েছে।

ইভান ইলিচ নিজেই বাড়িটি সাজানোর কাজ তদারক করতে লাগলেন। তিনি দেওয়ালের ওয়ালপেপার বেছে নিলেন, আসবাবপত্রের ঘাটতি পূরণ করলেন—বিশেষ করে পুরোনো দিনের আসবাব, যেগুলোকে তিনি অত্যন্ত রুচিশীল ও অভিজাত বলে মনে করতেন। এমনকি ঘরের আসবাব ও পর্দা-গালিচা ইত্যাদি সাজানোর কাজও তিনি নিজে নজরদারি করে করলেন।

কাজ ক্রমেই এগিয়ে চলল এবং তাঁর কল্পনা করা আদর্শের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। এমনকি, কাজ যখন অর্ধেকও শেষ হয়নি, তখনই তা তাঁর প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেল। তিনি কল্পনা করতে পারছিলেন, সবকিছু শেষ হলে বাড়িটির চেহারা কতটা পরিশীলিত, রুচিসম্মত ও মার্জিত হবে—কোথাও কোনো সস্তা বা অরুচিকর ভাব থাকবে না।

রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময়ও তিনি কল্পনা করতেন, শেষ পর্যন্ত বসার ঘরটি দেখতে কেমন হবে। আধখানা সাজানো ড্রয়িংরুমের দিকে তাকিয়েই তিনি যেন ভবিষ্যতের সম্পূর্ণ ঘরটি দেখতে পেতেন—সেখানে থাকবে অগ্নিকুণ্ড, তার সামনে পর্দা, ছোটখাটো শৌখিন জিনিস রাখার স্ট্যান্ড, এদিক-ওদিক ছড়িয়ে রাখা ছোট ছোট চেয়ার, দেওয়ালে সাজানো থালা-বাটি, আর নানা রকমের ব্রোঞ্জের শৌখিন মূর্তি—সবকিছু যথাস্থানে বসানো হলে ঘরটি ঠিক যেমন সুন্দর ও অভিজাত দেখাবে, তিনি মনে মনে তেমনই দেখতে পেতেন।তিনি মনে মনে বেশ খুশি হয়েছিলেন এই ভেবে যে, এ ধরনের জিনিসের প্রতি তাঁর নিজের মতোই রুচি থাকা স্ত্রী ও মেয়ে বাড়িটা দেখে মুগ্ধ হবে। তাঁরা যে এতটা চমৎকার কিছু দেখতে পাবেন, তা নিশ্চয়ই আশা করেননি। বিশেষ করে পুরোনো আমলের এমন কিছু জিনিস তিনি খুব সস্তায় খুঁজে কিনতে পেরেছিলেন, যেগুলো গোটা বাড়িটাকেই এক ধরনের অভিজাত, সম্ভ্রান্ত আবহ দিয়েছিল। কিন্তু চিঠিতে তিনি ইচ্ছা করেই সবকিছুকে কম করে লিখতেন, যাতে তাঁদের সামনে বাড়িটি দেখিয়ে চমকে দিতে পারেন।

এইসব কাজে তিনি এতটাই ডুবে গিয়েছিলেন যে, নতুন দায়িত্বের কাজ—যদিও নিজের সরকারি কাজ তিনি পছন্দ করতেন—তাঁর প্রত্যাশার তুলনায় তাঁকে অনেক কম আকৃষ্ট করতে লাগল। কখনও কখনও আদালতে বিচারকার্য চলার সময়ও তাঁর মন অন্যদিকে চলে যেত; তিনি ভাবতেন, জানালার পর্দায় কার্নিশগুলো সোজা হবে, না কি বাঁকানো হবে

বাড়ির সাজসজ্জা নিয়ে তিনি এতটাই উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন যে, প্রায়ই নিজেই নানা কাজ করতেন—আসবাবপত্রের জায়গা বদলাতেন, পর্দা নতুন করে টাঙাতেন। একদিন একজন গৃহসজ্জাকারীকে কীভাবে পর্দার কাপড় ঝুলিয়ে দিতে হবে তা বোঝাতে গিয়ে, লোকটি কিছুতেই বুঝতে না পারায়, তিনি নিজেই মইয়ের ওপর উঠে দেখাতে গেলেন। হঠাৎ ভুল জায়গায় পা পড়ে তিনি পিছলে গেলেন। তবে তিনি ছিলেন শক্তসমর্থ ও চটপটে মানুষ; তাই কোনওমতে নিজেকে সামলে নিলেন। শুধু জানালার ফ্রেমের হাতলের সঙ্গে তাঁর পাশের অংশে জোরে ধাক্কা লাগল। জায়গাটা কিছুক্ষণ বেশ ব্যথা করেছিল, কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই ব্যথা চলে গেল। বরং তখন তিনি নিজেকে খুবই ফুরফুরে ও সুস্থ বোধ করছিলেন। তিনি লিখলেন, মনে হচ্ছে, যেন আমার বয়স পনেরো বছর কমে গেছে।”

তিনি ভেবেছিলেন সেপ্টেম্বরের মধ্যেই সবকিছু প্রস্তুত হয়ে যাবে। কিন্তু কাজ গড়াতে গড়াতে অক্টোবরের মাঝামাঝি হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত ফলাফল তাঁর নিজের চোখে তো বটেই, অন্য যারা দেখেছিল তাদের কাছেও বেশ মনোরম মনে হয়েছিল।

বাস্তবে অবশ্য এটি ছিল এমন এক ধরনের বাড়ির সাজসজ্জা, যা সাধারণত মধ্যবিত্ত বা স্বচ্ছল কিন্তু সীমিত আয়ের লোকেদের বাড়িতে দেখা যায়—যাঁরা নিজেদের ধনী বলে দেখাতে চান, অথচ শেষ পর্যন্ত নিজেদের মতোই অন্য লোকেদের বাড়ির সঙ্গে সাদৃশ্য তৈরি করেন। সেখানে ছিল দামাস্ক কাপড়ের আসবাব, গাঢ় রঙের কাঠ, নানা ধরনের গাছপালা, কার্পেট, আর কিছু ম্লান ও কিছু চকচকে ব্রোঞ্জের সামগ্রী—অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির লোকেরা নিজেদের শ্রেণি অন্যদের মতো দেখানোর জন্য বাড়িতে যে ধরনের জিনিসপত্র রাখে, ঠিক সেরকম

ইভান ইলিচের বাড়িটিও অন্যদের বাড়ির সঙ্গে এতটাই মিলে গিয়েছিল যে, আলাদা করে দেখলে সেটি কারও নজরেই পড়ত না। কিন্তু তাঁর নিজের কাছে সবকিছুই ছিল অসাধারণ, একেবারে ব্যতিক্রমী।

পরিবারকে নিয়ে স্টেশনে পৌঁছে, সদ্য সাজানো নতুন বাড়িতে তাঁদের নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলেন। বাড়িটি তখন আলোয় ঝলমল করছিল। সাদা নেকটাই পরা এক ভৃত্য দরজা খুলে তাঁদের হলঘরে ঢুকিয়ে দিল; হলঘরটি নানা গাছপালা দিয়ে সুন্দরভাবে সাজানো। সেখান থেকে তাঁরা যখন বসার ঘর ও পড়ার ঘরে গেলেন এবং বিস্ময় ও আনন্দে নানা কথা বলতে লাগলেন, তখন ইভান ইলিচের আনন্দের আর সীমা রইল না।

তিনি তাঁদের বাড়ির প্রতিটি জায়গা ঘুরিয়ে দেখালেন, তাঁদের প্রশংসার প্রতিটি কথা আগ্রহভরে শুনলেন এবং আনন্দে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

সেদিন সন্ধ্যায় চা খাওয়ার সময় প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনা অন্যান্য কথার মধ্যে তাঁর পড়ে যাওয়ার ঘটনাটিও জানতে চাইলেন। তিনি হেসে উঠলেন এবং কীভাবে হঠাৎ পিছলে পড়ে গিয়েছিলেন, আর তাতে কীভাবে গৃহসজ্জাকারী লোকটি ভয় পেয়ে গিয়েছিল—তা অভিনয় করে তাঁদের দেখালেন।ভালোই হয়েছে যে আমি একটু ক্রীড়াবিদ-স্বভাবের মানুষ। অন্য কেউ হলে হয়তো মরে যেত; কিন্তু আমি শুধু এইখানে একটু চোট পেয়েছিজায়গাটা ছুঁলে ব্যথা লাগে, তবে ইতিমধ্যেই কমে আসছে—সামান্য কালশিটে পড়েছে মাত্র।”

এইভাবেই তারা তাদের নতুন বাড়িতে বসবাস শুরু করল। অবশ্য, বরাবরের মতোই, পুরোপুরি গুছিয়ে বসার পর দেখা গেল—বাড়িটিতে তাদের আসলে আরও একটি ঘর দরকার ছিল। আয়ও বেড়েছিল, কিন্তু বরাবরের মতোই সেই আয়ও প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য কম—প্রায় পাঁচশো রুবেল কম। তবু সব মিলিয়ে বেশ ভালোই চলছিল।

শুরুর দিকে সবকিছু বিশেষ ভালোই চলেছিল। তখনও বাড়ির সমস্ত ব্যবস্থা পুরোপুরি শেষ হয়নি; কিছু না কিছু কাজ বাকি ছিল—কোনো জিনিস কিনতে হবে, কোন জিনিস অর্ডার দিতে হবে, কোন আসবাব অন্য জায়গায় সরাতে হবে, আবার কোথাও কিছু ঠিকঠাক করে নিতে হবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মাঝে মাঝে মতবিরোধ হলেও, দুজনেই নতুন বাড়ি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল এবং এত কাজে ব্যস্ত ছিল যে সেসব বিষয় কোনো গুরুতর ঝগড়ায় গড়ায়নি।

কিন্তু যখন আর কোনো কিছু গুছিয়ে নেওয়ার বা ঠিকঠাক করার বাকি রইল না, তখন জীবনটা কিছুটা একঘেয়ে হয়ে উঠল; মনে হতে লাগল যেন কী একটা নেই। তবে এরই মধ্যে তারা নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিল, নতুন কিছু অভ্যাস তৈরি হচ্ছিল, আর ধীরে ধীরে তাদের জীবনও আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠছিল।

ইভান ইলিচ সকালে আদালতে যেতেন এবং দুপুরে বাড়ি ফিরে এসে খেতে বসতেন। প্রথমদিকে সাধারণত তাঁর মেজাজ বেশ ভালোই থাকত। তবে মাঝে মাঝে শুধু বাড়ির কোনো কিছু নিয়েই তিনি বিরক্ত হয়ে উঠতেন। টেবিলের কাপড়ে কোথাও সামান্য দাগ, আসবাবের গদিতে কোনো চিহ্ন, কিংবা জানালার পর্দার দড়ি ছিঁড়ে যাওয়া—এমন সামান্য বিষয়ও তাঁকে বিরক্ত করত। কারণ বাড়িটা সাজাতে তিনি এত পরিশ্রম করেছিলেন যে, এর কোনো কিছুতে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেও তা তাঁকে খুবই কষ্ট দিত।

তবে মোটের ওপর তাঁর জীবন ঠিক সেইভাবেই চলছিল, যেভাবে তিনি মনে করতেন মানুষের জীবন চলা উচিত—সহজে, আনন্দে এবং শালীনভাবে।

তিনি সকাল ন'টায় ঘুম থেকে উঠতেন, কফি খেতেন, খবরের কাগজ পড়তেন, তারপর সাধারণ পোশাকের ওপর সরকারি পোশাক পরে আদালতে যেতেন। সেখানে তাঁর কাজের নিয়মকানুনের সঙ্গে তিনি ইতিমধ্যেই এমনভাবে মানিয়ে নিয়েছিলেন যে, কোনো অসুবিধা ছাড়াই সেই নিয়মের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারতেন। আবেদনকারীদের সঙ্গে দেখা করা, দপ্তরে বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ নেওয়া, দপ্তরের কাজকর্ম, প্রকাশ্য ও প্রশাসনিক অধিবেশন—সবই তাঁর দৈনন্দিন কাজের অঙ্গ ছিল।

এই সমস্ত কাজের মূল বিষয় ছিল—নতুন ও জীবন্ত কোনো কিছুকেই যেন সেখানে প্রবেশ করতে না দেওয়া; কারণ নতুন বা প্রাণবন্ত কোনো বিষয়ই সরকারি কাজের নিয়মিত গতিকে ব্যাহত করে। মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, কেবল সরকারি সম্পর্কই থাকবে, এবং সেই সম্পর্কও কেবল সরকারি কাজের প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ থাকবে।

ধরা যাক, কোনো একজন লোক তাঁর কাছে এসে কোনো তথ্য জানতে চাইল। ইভান ইলিচের কাজের আওতায় যদি বিষয়টি না পড়ত, তাহলে তিনি তার সঙ্গে কোনো রকম সম্পর্কই রাখতেন না। কিন্তু লোকটির যদি তাঁর সঙ্গে সরকারি পদমর্যাদার কারণে কোনো কাজ থাকত—এমন কোনো বিষয়, যা সরকারি কাগজে-কলমে যথাযথভাবে প্রকাশ করা যায়—তাহলে ইভান ইলিচ সেই সম্পর্কের সীমার মধ্যে থেকে তার জন্য যা যা করা সম্ভব, সত্যিই সবকিছুই করতেন। আর তা করতে গিয়েও তিনি এমন একটা ভাব বজায় রাখতেন, যেন তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ মানবিক সম্পর্ক রয়েছে।অর্থাৎ, জীবনের প্রচলিত সৌজন্য ও সামাজিক রীতিনীতিগুলো তিনি মেনে চলতেন। কিন্তু দাপ্তরিক সম্পর্কের পরিসর শেষ হলেই অন্য সব সম্পর্কেরও যেন অবসান ঘটত। ইভান ইলিচের মধ্যে নিজের প্রকৃত ব্যক্তিগত জীবনকে দাপ্তরিক জীবনের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখার এই ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। দীর্ঘদিনের অভ্যাস এবং স্বাভাবিক দক্ষতার ফলে তিনি এই ব্যাপারটিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যে, কখনো কখনো একজন দক্ষ শিল্পীর মতো তিনি ইচ্ছা করেই ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক সম্পর্ককে সামান্য মিশতে দিতেন। কারণ তিনি জানতেন, যখনই ইচ্ছা হবে, আবার সেই কঠোর দাপ্তরিক ভঙ্গিতে ফিরে যেতে পারবেন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কটিও মুহূর্তে ছিন্ন করতে পারবেন। আর এসব তিনি করতেন অত্যন্ত সহজে, স্বচ্ছন্দে, মার্জিতভাবে—প্রায় শিল্পীর নৈপুণ্যে।

আদালতের অধিবেশনগুলোর মধ্যবর্তী বিরতিতে তিনি ধূমপান করতেন, চা পান করতেন এবং অল্পস্বল্প রাজনীতি নিয়ে, কিছু সাধারণ বিষয় নিয়ে, কিছু তাসের খেলা নিয়ে—তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা করতেন সরকারি পদে নিয়োগ ও বদলি নিয়ে।

কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে, কিন্তু একজন দক্ষ শিল্পীর মতো তৃপ্তি নিয়ে—যেন অর্কেস্ট্রায় নিজের অংশটি নিখুঁতভাবে বাজিয়ে আসা প্রথম সারির কোনো বেহালাবাদকের মতো—তিনি বাড়ি ফিরতেন। সেখানে দেখতেন, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে বাইরে কারও বাড়িতে বেড়াতে গেছে, অথবা বাড়িতে কোনো অতিথি এসেছে; তাঁর ছেলে স্কুলে গিয়েছে, গৃহশিক্ষকের কাছে পড়া শেষ করেছে এবং হাই স্কুলে যা যা শেখানো হয়, সেগুলো নিশ্চয়ই ঠিকমতো শিখছে। সবকিছুই যথারীতি চলছিল।

রাতের খাবারের পর, যদি বাড়িতে কোনো অতিথি না থাকত, ইভান ইলিচ কখনো কখনো সেই সময়ে বহুল আলোচিত কোনো বই পড়তেন। তারপর সন্ধ্যায় কাজে বসতেন—অর্থাৎ সরকারি নথিপত্র পড়তেন, সাক্ষীদের জবানবন্দি মিলিয়ে দেখতেন এবং সেগুলোর সঙ্গে প্রযোজ্য আইনের ধারাগুলো খুঁজে নোট করতেন। এই কাজ না খুব বিরক্তিকর, না খুব আনন্দদায়ক ছিলযখন ব্রিজ খেলার সুযোগ থাকত, তখন কাজটি তাঁর কাছে বিরক্তিকর লাগত; কিন্তু ব্রিজ খেলার ব্যবস্থা না থাকলে অন্তত কিছু না করার চেয়ে, কিংবা স্ত্রীর সঙ্গে বসে থাকার চেয়ে এই কাজই তাঁর কাছে ভালো ছিল।

ইভান ইলিচের সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল ছোটখাটো নৈশভোজের আয়োজন করা, যেখানে তিনি সমাজের সম্মানিত ও সম্ভ্রান্ত নারী-পুরুষদের আমন্ত্রণ জানাতেন। তাঁর বসার ঘর যেমন অন্য সবার বসার ঘরের মতোই ছিল, তেমনি তাঁর এই আনন্দময় ছোটখাটো আসরগুলোও অন্যদের এমন সব আসরের মতোই ছিল।

একবার তারা বাড়িতে নাচের আসরেরও আয়োজন করেছিল। ইভান ইলিচ এতে বেশ আনন্দ পেয়েছিলেন এবং সবকিছুই ভালোভাবেই মিটে গিয়েছিল। শুধু এর জেরেই স্ত্রীর সঙ্গে কেক ও মিষ্টি নিয়ে একবার তুমুল ঝগড়া বেধে যায়। প্রাসকোভিয়া ফিওদোরোভনা নিজের মতো করে সবকিছুর ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইভান ইলিচ জেদ ধরে দামি মিষ্টির দোকান থেকেই সবকিছু কিনতে বলেছিলেন এবং প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি কেক অর্ডার করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত কিছু কেক অব্যবহৃত থেকে যায় এবং মিষ্টির দোকানের বিল দাঁড়ায় পঁয়তাল্লিশ রুবেল—এই নিয়েই ভয়ানক ও তিক্ত ঝগড়া শুরু হয়। প্রাসকোভিয়া ফিওদোরোভনা তাঁকে ‘বোকা’ ও ‘নির্বোধ’ বলে গাল দিয়েছিলেন। আর ইভান ইলিচ মাথা চেপে ধরে রাগের মাথায় বিবাহবিচ্ছেদের কথাও ইঙ্গিত করেছিলেন। তবে নাচের আসরটি নিজে বেশ উপভোগ্ই করেছিলেনসমাজের নামী-দামি লোকেরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ইভান ইলিচ প্রিন্সেস ত্রুফোনোভার সঙ্গেও নেচেছিলেন। তিনি ছিলেন ‘আমার বোঝা বহন করো’ নামের বিখ্যাত সমিতির প্রতিষ্ঠাতার বোন।

ইভান ইলিচের চাকরিসংক্রান্ত আনন্দ ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষার আনন্দ; সামাজিক মেলামেশার আনন্দ ছিল আত্মগরিমা ও লোকদেখানোর আনন্দ। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল ব্রিজ খেলা জীবনে যতই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটুক না কেন, ইভান ইলিচ স্বীকার করতেন—সবকিছুর ঊর্ধ্বে আলোর রশ্মির মতো যে আনন্দটি তাঁকে উজ্জ্বল করে তুলত, তা হলো ভালো খেলোয়াড়দের সঙ্গে ব্রিজ খেলতে বসা। অবশ্য এমন সঙ্গী চাই, যারা অযথা হৈচৈ করে না। আর চারজনে মিলে ব্রিজ খেলাই তাঁর সবচেয়ে পছন্দের ছিল। পাঁচজন হলে একজনকে বসে থাকতে হয়—তখন খেলায় একটু বিরক্তি আসত, যদিও মুখে কেউ তা স্বীকার করত না।

কার্ড ভালো পড়লে তিনি মনোযোগ দিয়ে, বুদ্ধি খাটিয়ে, গম্ভীরভাবে খেলতেন। তারপর খেলা শেষে রাতের খাবার খেতেন এবং এক গ্লাস মদ পান করতেন। বিশেষ করে ব্রিজ খেলায় সামান্য জিততে পারলে—বড় অঙ্কের টাকা জেতা আবার তাঁর ভালো লাগত না—ইভান ইলিচের মন একেবারে উৎফুল্ল হয়ে উঠত এবং তিনি অত্যন্ত প্রফুল্ল মনে শুতে যেতেন।

এইভাবেই তাঁদের জীবন চলছিল। তাঁরা সমাজের সেরা লোকজনের সঙ্গে মেলামেশা করে নিজেদের একটি পরিচিত মহল তৈরি করেছিলেন। তাঁদের বাড়িতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যেমন আসতেন, তেমনি তরুণ-তরুণীরাও আসত। পরিচিতজনদের ব্যাপারে স্বামী, স্ত্রী ও মেয়ের মতামত ছিল সম্পূর্ণ এক। তাঁরা নীরবে, সর্বসম্মতভাবে সেইসব অমার্জিত, নিম্নরুচির বন্ধু ও আত্মীয়দের দূরে সরিয়ে রাখতেন, যারা অনেক ভালোবাসা ও আন্তরিকতার ভান করে দেওয়ালে ঝোলানো জাপানি সাজসজ্জায় শোভিত তাঁদের বৈঠকখানায় এসে হাজির হতো।

অল্পদিনের মধ্যেই সেইসব নিম্নরুচির লোকজন আর তাঁদের বাড়িতে আসার চেষ্টা করত না। ফলে গোলভিন পরিবারের সামাজিক মহলে শুধু সেরা লোকজনই অবশিষ্ট রইল।

তরুণেরা লিজার প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছিল। বিশেষ করে পেত্রিশ্চেভ নামে এক যুবক—যিনি ছিলেন পরীক্ষামূলক বিচারক এবং দিমিত্রি ইভানোভিচ পেত্রিশ্চেভের একমাত্র ছেলে ও উত্তরাধিকারী—লিজার প্রতি এত বেশি মনোযোগ দিতে শুরু করেছিলেন যে ইভান ইলিচ ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে প্রাসকোভিয়া ফিওদোরোভনার সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। এমনকি তাঁদের দুজনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর জন্য একটি পার্টির আয়োজন করা যায় কি না, অথবা বাড়িতে কোনো ছোটখাটো নাটক মঞ্চস্থ করা যায় কি না, সে কথাও তিনি ভেবেছিলেন।

এইভাবেই তাঁদের জীবন চলতে লাগল। কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সবকিছু ভালোভাবেই চলছিল, আর জীবনও যেন মসৃণ ও আনন্দময় গতিতে বয়ে যাচ্ছিল।

                                                   চতুর্থ অধ্যায়

তাঁরা সকলেই সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন। ইভান ইলিচ মাঝে মাঝে মুখে অদ্ভুত এক স্বাদ অনুভব করতেন এবং মুখের বাঁ পাশের দিকে সামান্য অস্বস্তি বোধ করতেন। এটাকে ঠিক অসুস্থতা বলা যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই অস্বস্তি বাড়তে লাগল। ব্যথা ঠিক নয়, তবে বাঁ পাশে যেন একটা চাপ অনুভূত হতে লাগল, আর তার সঙ্গে দেখা দিল খিটখিটে মেজাজ। ক্রমে তাঁর মেজাজ আরও খারাপ হতে লাগল এবং গোলভিন পরিবারের যে স্বচ্ছন্দ, আনন্দময় ও নিয়মমাফিক জীবন এতদিন গড়ে উঠেছিল, তাতে বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করল।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া ক্রমেই বেড়ে যেতে লাগলঅল্পদিনের মধ্যেই তাঁদের সংসারের স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দতা ও সৌহার্দ্য উধাও হয়ে গেল; এমনকি ভদ্রতার আবরণটুকু কোনোমতে বজায় রাখা যাচ্ছিল। আবার প্রায়ই ঝগড়াঝাঁটি ও অশান্তির দৃশ্য ঘটতে লাগল। শান্ত মুহূর্তের অবকাশও খুব কমে গেল, যেন স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সঙ্গে কথা বললেই কোনো বিস্ফোরণ ঘটবে

এখন প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনার পক্ষে স্বামীর মেজাজকে অসহ্য বলে অভিযোগ করার যথেষ্ট কারণ ছিল। তাঁর স্বভাবসিদ্ধ অতিরঞ্জনের ভঙ্গিতে তিনি বলতে লাগলেন, ইভান ইলিচের মেজাজ নাকি বরাবরই ভয়ংকর রকমের খারাপ ছিল এবং গত বিশ বছর ধরে সেই মেজাজ সহ্য করে আসার জন্য তাঁর নিজের অসীম ধৈর্যের প্রয়োজন হয়েছে।

তবে এটা সত্যি যে, এখনকার ঝগড়াগুলো সাধারণত ইভান ইলিচই শুরু করতেন। খাওয়ার ঠিক আগে তাঁর মেজাজ সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়ে উঠত; প্রায়ই এমন হতো যে, দুপুরের খাবারে স্যুপ খেতে শুরু করামাত্রই তাঁর রাগ চড়ে যেত। কখনো তিনি লক্ষ করতেন, কোনো প্লেট বা বাসনের কিনারা ভাঙা; কখনো খাবার তাঁর পছন্দমতো হয়নি; কখনো তাঁর ছেলে টেবিলের ওপর কনুই রেখেছে; আবার কখনো মেয়ের চুল তাঁর পছন্দমতো সাজানো হয়নি। এসবের প্রতিটির জন্যই তিনি প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভাকে দায়ী করতেন।

প্রথমদিকে প্রাসকোভিয়াও পাল্টা জবাব দিতেন এবং তাঁকে কটু কথা শোনাতেন। কিন্তু এক-দুবার রাতের খাবারের শুরুতেই ইভান ইলিচ এমন ভয়ংকর রাগে ফেটে পড়তেন যে, তিনি বুঝতে পারতেন—খাওয়ার ফলে তাঁর শরীরে কোনো শারীরিক গোলমাল তৈরি হচ্ছে, আর সেই কারণেই তাঁর মেজাজ এমন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তাই এরপর তিনি নিজেকে সংযত করতেন, কোনো উত্তর দিতেন না; বরং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খাওয়া শেষ করার চেষ্টা করতেন। নিজের এই আত্মসংযমকে তিনি অত্যন্ত প্রশংসনীয় বলে মনে করতেন।

প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভার মনে ধীরে ধীরে এই ধারণা দৃঢ় হলো যে, তাঁর স্বামীর স্বভাব ভয়ংকর এবং সেই স্বামীই তাঁর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছেন। ফলে তিনি নিজের জন্য করুণা অনুভব করতে শুরু করলেন। আর যতই তিনি নিজেকে অসহায় মনে করে দুঃখ করতে লাগলেন, ততই তাঁর স্বামীর প্রতি ঘৃণা বাড়তে লাগল।

এমনকি তিনি মনে মনে চাইতে শুরু করলেন, তাঁর স্বামী যেন মারা যান। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি চাইতেন না যে ইভান ইলিচ মারা যান, কারণ তাহলে তাঁর বেতনটাও বন্ধ হয়ে যাবে। এই চিন্তাই তাঁকে স্বামীর ওপর আরও বিরক্ত করে তুলত। তিনি নিজেকে অত্যন্ত দুর্ভাগা মনে করতেন—কারণ তাঁর মনে হতো, এমনকি স্বামীর মৃত্যুও তাঁকে এই দুর্দশা থেকে মুক্তি দিতে পারবে না। তিনি অবশ্য নিজের এই ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করতেন না; কিন্তু তাঁর মনের গভীরে জমে থাকা সেই ক্ষোভ ইভান ইলিচের বিরক্তিকে আরও বাড়িয়ে দিত।

একবার এমনই এক ঝগড়ার পর, যেখানে ইভান ইলিচ তাঁর স্ত্রীর প্রতি বিশেষভাবে অন্যায় আচরণ করেছিলেন, তিনি ব্যাখ্যা করে বললেন যে, তাঁর মেজাজ সত্যিই খিটখিটে হয়ে গেছে, কিন্তু এর কারণ হলো তিনি ভালো বোধ করছেন না।

তখন প্রাসকোভিয়া বললেন, তিনি যদি সত্যিই অসুস্থ হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর চিকিৎসা করানো উচিত। তিনি জোর করে তাঁকে একজন নামকরা চিকিৎসকের কাছে যেতে বললেন।

ইভান ইলিচ শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের কাছে গেলেন। সেখানে ঠিক সেই ঘটনাই ঘটল, যা তিনি আগেই অনুমান করেছিলেন এবং যা সাধারণত এ ধরনের ক্ষেত্রেই ঘটে।

প্রথমে ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা। তারপর এল ডাক্তারের সেই গম্ভীর ও গুরুত্বপূর্ণ ভাব, যার সঙ্গে ইভান ইলিচ খুবই পরিচিত ছিলেন। আদালতে নিজে বিচারকার্য পরিচালনা করার সময় তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে ঠিক একই ধরনের ভাব দেখাতেন। ডাক্তার তাঁর শরীর পরীক্ষা করলেন, তাঁর কথা শুনলেন, নানা প্রশ্ন করলেন—যেসব প্রশ্নের উত্তর তিনি কী দেবেন, তা যেন ডাক্তার আগে থেকেই জানতেন। এমন অনেক প্রশ্নও করা হলো, যেগুলোর আসলে কোনো প্রয়োজনই ছিল না।

ডাক্তারের মুখভঙ্গি ও আচরণে এমন একটা ভাব ফুটে উঠছিল যেন তিনি বলতে চাইছেন—‘আপনি যদি নিজেকে আমাদের হাতে তুলে দেন, তাহলে সবকিছু আমরা ঠিক করে দেব। কীভাবে সব করতে হয়, তা আমরা নিঃসন্দেহে জানিসবার ক্ষেত্রেই একই নিয়মে সবকিছু করা হয়।’

পুরো ব্যাপারটাই ইভান ইলিচের কাছে আদালতের কাজকর্মের মতো মনে হলো। ডাক্তারের চোখে ও আচরণে তাঁর প্রতি ঠিক সেই ভাবই ছিল, যে ভাব তিনি নিজে কোনো আসামির প্রতি দেখাতেন।

ডাক্তার বললেন, অমুক লক্ষণ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে রোগীর শরীরে অমুক সমস্যা রয়েছে; কিন্তু অমুক পরীক্ষায় যদি তা নিশ্চিত না হয়, তাহলে তাঁকে অমুক বিষয়টি ধরে নিতে হবে। আবার সেটিও যদি ধরা হয়, তাহলে... ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু ইভান ইলিচের কাছে তখন একটিই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ ছিল—তাঁর অসুখটা কি গুরুতর, নাকি গুরুতর নয়? অথচ ডাক্তার সেই প্রশ্নটিকেই এড়িয়ে গেলেন। তাঁর দৃষ্টিতে এটি আদৌ আলোচনার বিষয় ছিল না। তাঁর কাছে আসল প্রশ্ন ছিল— রোগটি কি স্থানচ্যুত কিডনি, দীর্ঘস্থায়ী ক্যাটারহ(দীর্ঘস্থায়ী ক্যাটার” (Chronic catarrh) বলতে সাধারণত শরীরের কোনো শ্লৈষ্মিক ঝিল্লিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রদাহ ও অতিরিক্ত শ্লেষ্মা (mucus) তৈরি হওয়ার অবস্থা বোঝায়।), নাকি অ্যাপেন্ডিসাইটিস?

শেষ পর্যন্ত ডাক্তার অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, ইভান ইলিচের মনে যেমন মনে হলো, অ্যাপেন্ডিসাইটিসের পক্ষেই মত দিলেন; তবে সঙ্গে এটাও বললেন যে, প্রস্রাব পরীক্ষা করে যদি নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি আবার বিবেচনা করা হবে।

ডাক্তারের এই সমস্ত কথাবার্তা ইভান ইলিচের কাছে অতি পরিচিত মনে হলো। কারণ বিচারাধীন আসামিদের নিয়ে কাজ করার সময় তিনি নিজেও অসংখ্যবার ঠিক এইভাবেই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কথা বলেছেন। ডাক্তারও যেন একই দক্ষতায় তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন। ডাক্তার চশমার ওপর দিয়ে আসামির দিকে বিজয়ীর মতো, এমনকি কিছুটা প্রফুল্ল দৃষ্টিতে তাকালেন।

ডাক্তারের কথার সারমর্ম থেকে ইভান ইলিচ বুঝলেন যে পরিস্থিতি ভালো নয়। কিন্তু তাঁর আরও মনে হলো, ডাক্তারের কাছে—সম্ভবত অন্য সবার কাছেও—এ ব্যাপারটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। অথচ তাঁর নিজের জন্য বিষয়টি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই উপলব্ধি তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করল। নিজের প্রতি তাঁর প্রবল মমতা জন্ম নিল এবং এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ডাক্তারের এই উদাসীনতার জন্য তাঁর মনে তীব্র ক্ষোভ ও তিক্ততা তৈরি হলো।

তবে তিনি এসবের কিছুই প্রকাশ করলেন না। উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপর ডাক্তারের ফিস রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—আমরা রোগীরা বোধহয় প্রায়ই এমন প্রশ্ন করি, যা করা উচিত নয়। কিন্তু বলুন তো, মোটের ওপর এই রোগটা কি বিপজ্জনক, নাকি নয়?”

ডাক্তার চশমার ওপর দিয়ে এক চোখে তাঁর দিকে কঠোরভাবে তাকালেন। সেই দৃষ্টির যেন অর্থ—আসামি, আপনাকে যে প্রশ্ন করা হয়েছে, শুধু তার উত্তর দিন। তা না হলে আমাকে আপনাকে আদালত থেকে বের করে দিতে হবে।

ডাক্তার বললেন—আমি ইতিমধ্যেই আপনাকে যা যা প্রয়োজনীয় এবং যথাযথ মনে করেছি, তা বলেছি। পরীক্ষায় হয়তো আরও কিছু জানা যেতে পারে।” এই বলে ডাক্তার মাথা নাড়লেন।

ইভান ইলিচ ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলেন। মনটা ভীষণ খারাপ। বাইরে এসে স্লেজগাড়িতে বসলেন এবং বাড়ির দিকে রওনা হলেন।

সারা পথ তিনি ডাক্তারের কথাগুলো মনে মনে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ভাবতে লাগলেন। জটিল, দুর্বোধ্য বৈজ্ঞানিক কথাগুলোকে তিনি সহজ ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা করলেন। তাঁর মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—আমার অবস্থা কি খারাপ? খুব খারাপ? নাকি এখনও তেমন কিছু হয়নি?

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর মনে হলো, ডাক্তার যা বলেছেন তার অর্থ একটাই—অবস্থা খুবই খারাপ।

বাইরের সবকিছুই তাঁর কাছে হঠাৎ বিষণ্ণ ও নিরানন্দ বলে মনে হতে লাগল। গাড়োয়ানদের, বাড়িঘর, পথচারী, দোকানপাট—সবকিছুই যেন মলিন, বিষণ্ণ। তাঁর শরীরের সেই একটানা মৃদু অথচ গভীর যন্ত্রণা—যে ব্যথা এক মুহূর্তের জন্যও তাঁকে ছাড়ে না—ডাক্তারের অস্পষ্ট ও সন্দেহজনক মন্তব্যের পর যেন হঠাৎ তিনি আরও গুরুতর অর্থ পেয়ে গেলেনইভান ইলিচ এখন নতুন এক ভয় ও উদ্বেগ নিয়ে সেই ব্যথার দিকে লক্ষ্য করতে লাগলেন।

বাড়ি ফিরে তিনি স্ত্রীকে ডাক্তারের কাছে যাওয়া থেকে পুরো ঘটনাটি বলতে শুরু করলেন। তাঁর স্ত্রী মন দিয়ে শুনছিলেন। কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই টুপি পরা অবস্থায়, বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে তাঁদের মেয়ে ঘরে ঢুকল। মেয়েটি অনিচ্ছাভরে বসে বাবার এই দীর্ঘ ও একঘেয়ে গল্প শুনতে লাগলকিন্তু সে বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারল না। তার মাও শেষ পর্যন্ত ইভান ইলিচের কথা পুরোপুরি শুনলেন না

তিনি শুধু বললেন— বেশ, আমি খুব খুশি হলাম। এখন নিয়ম করে ওষুধ খেতে ভুলো না। প্রেসক্রিপশনটা আমাকে দাও, আমি গেরাসিমকে ওষুধের দোকানে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

এই বলে তিনি বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে অন্য ঘরে চলে গেলেন।

তিনি যতক্ষণ ঘরে ছিলেন, ইভান ইলিচ যেন ঠিকমতো নিঃশ্বাস নেওয়ারও সময় পাননি। কিন্তু তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই ইভান ইলিচ গভীরভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

আচ্ছা,” ইভান ইলিচ মনে মনে ভাবলেন, “হয়তো ব্যাপারটা এতটা খারাপ নয়।”

তিনি ওষুধ খেতে শুরু করলেন এবং ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলতে লাগলেন। প্রস্রাব পরীক্ষা করার পর ডাক্তার তাঁর নির্দেশনাগুলিও কিছুটা পরিবর্তন করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল, প্রস্রাব পরীক্ষার ফল থেকে যে ধারণা পাওয়া গিয়েছিল, তাঁর শরীরে দেখা দেওয়া উপসর্গগুলোর সঙ্গে তার মিল নেই। বাস্তবে যা ঘটছিল, তা ডাক্তারের বলা কথার সঙ্গে একেবারেই মেলেনি। ইভান ইলিচের মনে হলো, ডাক্তার হয়তো কোনো কথা ভুলে গেছেন, অথবা কোনো ভুল করেছেন, কিংবা ইচ্ছা করেই তাঁর কাছ থেকে কিছু গোপন করেছেন। অবশ্য এর জন্য ডাক্তারকে দোষ দেওয়া যায় না। তবু ইভান ইলিচ তাঁর সব নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে লাগলেন এবং প্রথমদিকে তাতে কিছুটা স্বস্তিও পেলেন।

ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর থেকে ইভান ইলিচের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়াল—স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত ডাক্তারের সমস্ত নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করা, নিয়ম করে ওষুধ খাওয়া এবং নিজের ব্যথা ও শারীরিক নিঃসরণগুলোর প্রতি সতর্ক নজর রাখা। ধীরে ধীরে মানুষের অসুখ-বিসুখ ও সুস্থতা সম্পর্কেই তাঁর সবচেয়ে বেশি আগ্রহ জন্মাল। তাঁর সামনে কারও অসুস্থতা, মৃত্যু কিংবা সুস্থ হয়ে ওঠার কথা উঠলেই—বিশেষ করে সেই অসুখটি যদি তাঁর নিজের রোগের মতো হয়—তিনি গভীর উদ্বেগ নিয়ে তা শুনতেন। তিনি নিজের উদ্বেগ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন, নানা প্রশ্ন করতেন এবং যা শুনতেন, তার সঙ্গে নিজের অসুখের মিল খুঁজে দেখতেন।

তাঁর ব্যথা কিন্তু একটুও কমছিল না। তবু ইভান ইলিচ নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন যে তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন। যতক্ষণ কোনো কিছু তাঁকে বিচলিত না করত, ততক্ষণ তিনি এই বিশ্বাস ধরে রাখতে পারতেন। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে সামান্য মনোমালিন্য হলেই, অফিসের কাজে কোনো ব্যর্থতা দেখা দিলেই, কিংবা ব্রিজ খেলায় খারাপ তাস পেলেই তিনি হঠাৎ তীব্রভাবে নিজের অসুস্থতা অনুভব করতেন।

আগে এ ধরনের দুর্ভাগ্য বা বিরক্তিকর ঘটনাকে তিনি সহজভাবেই মেনে নিতেন। ভাবতেন, শিগগিরই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, সমস্যাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনবেন এবং আনতে সফল হবেন—অথবা ব্রিজে একটি দুর্দান্ত ‘গ্র্যান্ড স্ল্যাম’ করবেন। কিন্তু এখন সামান্য কোনো বিপত্তিই তাঁকে ভীষণভাবে বিচলিত করে তুলত এবং তাঁকে হতাশার অতল গহ্বরে ঠেলে দিত।

তখন তিনি নিজেকে বলতেন, “এই তো, যখন মনে হচ্ছিল আমি একটু একটু করে ভালো হয়ে উঠছি, ওষুধও যখন কাজ করতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই এই অভিশপ্ত বিপত্তি! আবার এই বিরক্তিকর ঝামেলা…”

এরপর সেই বিপত্তির ওপর, কিংবা যারা তাঁকে বিরক্ত করছে এবং তাঁর মৃত্যুকে যেন আরও কাছে টেনে আনছে—তাদের ওপর তিনি প্রচণ্ড রেগে যেতেন। তিনি বুঝতে পারতেন, এই রাগই তাঁর অসুস্থতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, অথচ নিজেকে সংযত করতে পারতেন না।

স্বাভাবিকভাবে মনে হওয়ার কথা ছিল যে, পরিস্থিতি ও মানুষের ওপর এই অতিরিক্ত বিরক্তি তাঁর অসুস্থতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে; তাই তাঁর উচিত এসব অপ্রীতিকর বিষয় উপেক্ষা করা। কিন্তু তিনি ঠিক তার উল্টো সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন। তিনি ভাবলেন, তাঁর এখন শান্তি দরকার। তাই কোন কোন বিষয় সেই শান্তি নষ্ট করতে পারে, সেগুলোর ওপর তিনি সারাক্ষণ নজর রাখতে লাগলেন এবং সামান্যতম ব্যাঘাত ঘটলেও অত্যন্ত খিটখিটে হয়ে উঠতেন।

এর ওপর তিনি চিকিৎসাবিষয়ক বই পড়তে শুরু করলেন এবং একের পর এক ডাক্তারের পরামর্শ নিতে লাগলেন। এতে তাঁর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেল। তাঁর রোগটি এত ধীরে ধীরে বাড়ছিল যে, এক দিনের সঙ্গে আরেক দিনের তুলনা করলে তিনি নিজেকেই সহজে বোঝাতে পারতেন যে তেমন কোনো অবনতি হয়নি—কারণ প্রতিদিনের পার্থক্য ছিল অত্যন্ত সামান্যকিন্তু যখনই তিনি কোনো ডাক্তারের কাছে যেতেন, তখন তাঁর মনে হতো তিনি ক্রমশ আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন—এমনকি খুব দ্রুতই অবনতির দিকে যাচ্ছেন।তা সত্ত্বেও তিনি বারবার ডাক্তারের কাছে যেতেই থাকলেন।

সেই মাসেই তিনি আর-একজন নামী চিকিৎসকের কাছে গেলেন। তিনিও প্রথম চিকিৎসকের মতোই প্রায় একই কথা বললেন, তবে প্রশ্নগুলো একটু অন্যভাবে তুললেন। এই চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ইভান ইলিচের সন্দেহ ও ভয় বরং আরও বেড়ে গেল। তাঁর এক বন্ধুর পরিচিত একজন অত্যন্ত ভালো চিকিৎসকও আবার তাঁর অসুখটি পরীক্ষা করে অন্যরকম রোগনির্ণয় করলেন। তিনি অবশ্য সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনার কথা বললেন, কিন্তু তাঁর নানা প্রশ্ন ও অনুমান ইভান ইলিচকে আরও বিভ্রান্ত করে তুলল এবং তাঁর মনে সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিল।

একজন হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক আবার সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে রোগটি নির্ণয় করলেন এবং এমন কিছু ওষুধ দিলেন, যা ইভান ইলিচ এক সপ্তাহ গোপনে খেলেন। কিন্তু এক সপ্তাহ পরেও যখন তাঁর কোনো উন্নতি হলো না, এবং আগের চিকিৎসকের চিকিৎসার ওপর যেমন আস্থা হারিয়েছিলেন, তেমনি এই চিকিৎসকের ওপরও বিশ্বাস হারিয়ে ফেললেন, তখন তিনি আরও হতাশ হয়ে পড়লেন।

একদিন এক পরিচিত মহিলা তাঁকে এক অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন দেবমূর্তির দ্বারা কোনো এক রোগী সুস্থ হয়ে ওঠার গল্প বললেন। ইভান ইলিচ লক্ষ্য করলেন, তিনি কথাটি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনছেন এবং ঘটনাটি সত্যিই ঘটেছিল বলে বিশ্বাস করতেও শুরু করেছেন। এই ব্যাপারটি তাঁকে ভয় পাইয়ে দিল।

আমার মন কি সত্যিই এতটাই দুর্বল হয়ে গেছে?”—তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করলেন। “ছিঃ, এসব বাজে কথা! সবই অর্থহীন। আমাকে এই স্নায়বিক ভয়কে প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। একজন চিকিৎসককে যখন বেছে নিয়েছি, তখন তাঁর দেওয়া চিকিৎসা কঠোরভাবে মেনে চলতেই হবে। আমি সেটাই করব। এবার সব ঠিক হয়ে গেল। আমি আর এ নিয়ে ভাবব না। বরং গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত নিয়ম মেনে চিকিৎসা চালিয়ে যাব, তারপর দেখা যাবে কী হয়। আজ থেকে আর কোনো দ্বিধা নয়!”

এ কথা বলা সহজ ছিল, কিন্তু তা মেনে চলা অসম্ভব হয়ে উঠল।

তাঁর পাশের ব্যথাটি ক্রমেই তাঁকে চেপে ধরছিল এবং মনে হচ্ছিল, ব্যথা আরও বাড়ছে ও ক্রমশ একটানা হয়ে উঠছে। মুখের ভেতরের অদ্ভুত স্বাদটিও দিন দিন আরও বিচিত্র লাগছিল। তাঁর মনে হতে লাগল, নিঃশ্বাসেও যেন দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তাঁর খিদে ও শক্তি—দুটিই কমে যাচ্ছে।

নিজেকে আর কোনোভাবেই প্রবঞ্চনা করার উপায় ছিল না। তাঁর শরীরের ভেতরে এমন কিছু ভয়ংকর, নতুন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটছিল, যা তাঁর জীবনে এর আগে কখনো ঘটেনি—এবং সে সম্পর্কে একমাত্র তিনিই সচেতন ছিলেন। আশপাশের লোকেরা বিষয়টি বুঝতে পারছিল না, অথবা বুঝতে চাইছিল না। তারা এমনভাবে চলাফেরা করছিল যেন পৃথিবীর সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক আছে।

আর এই ব্যাপারটিই ইভান ইলিচকে অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি যন্ত্রণা দিত।

তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, তাঁর পরিবারের লোকেরা—বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে, যারা সারাক্ষণ এক বাড়ি থেকে আর-এক বাড়িতে যাতায়াত ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে ব্যস্ত—তাঁর অসুস্থতার প্রকৃত অবস্থা কিছুই বুঝতে পারছে না। বরং তিনি এত বিষণ্ণ ও খুঁতখুঁতে হয়ে পড়েছেন বলে তারা বিরক্ত হচ্ছে, যেন এই অসুস্থতার জন্য তিনিই দায়ী।

তারা বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করলেও ইভান ইলিচ বুঝতে পারছিলেন যে, তিনি যেন তাদের চলার পথে একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আর তাঁর স্ত্রী তাঁর অসুস্থতা সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করে নিয়েছেন এবং তিনি যা-ই বলুন বা করুন না কেন, সেই ধারণা থেকে একটুও নড়ছেন না।

তাঁর স্ত্রীর মনোভাব ছিল এমন: জানো তো,” স্ত্রী তাঁর বন্ধুদের বলতেন, “ইভান ইলিচ আর পাঁচজনের মতো হতে পারে না, চিকিৎসক যে নিয়ম করে দিয়েছেন সেটাও ঠিকমতো মানতে পারে না। একদিন দেখবে, সময়মতো ওষুধের ফোঁটা খাচ্ছে, কঠোরভাবে পথ্য মেনে চলছে, ঠিক সময়ে শুয়ে পড়ছে; কিন্তু পরের দিন আমি যদি নজর না রাখি, তাহলে হঠাৎ ওষুধ খাওয়ার কথাই ভুলে যাবে, নিষেধ করা সত্ত্বেও স্টার্জন মাছ খাবে, আর রাত একটা পর্যন্ত তাস খেলতে বসে থাকবে।”

 ওহ, আরে, সেটা কবে?” ইভান ইলিচ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করতেন।শুধু একবার পেতর ইভানোভিচের বাড়িতে।”

আর গতকাল শেবেকের বাড়িতে?”

তা হলেও, আমি যদি রাত জেগে না থাকতাম, এই ব্যথার জন্যই তো ঘুম আসত না।”

যাই হোক না কেন, এভাবে চললে তুমি কোনোদিনই সুস্থ হবে না। বরং আমাদের সবাইকে কষ্টই দিয়ে যাবে।”

ইভান ইলিচের অসুস্থতা সম্পর্কে প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনার মনোভাব ছিল এমনই—সে অন্যদের কাছে যেমন বলত, ইভান ইলিচের কাছেও তেমনই বলত যে, তার অসুস্থতার জন্য সে নিজেই দায়ী এবং এটিও তার করা অন্যান্য বিরক্তিকর কাজেরই আরেকটি নমুনা। ইভান ইলিচ বুঝতে পারতেন, প্রাসকোভিয়া আসলে অনিচ্ছাকৃতভাবেই এই মনোভাব প্রকাশ করে ফেলত। কিন্তু সেটা জানলেও তাঁর কষ্ট একটুও কমত না।

আদালতেও ইভান ইলিচ লক্ষ্য করলেন—অথবা তাঁর মনে হলো যে তিনি লক্ষ্য করছেন—তাঁর প্রতি লোকজনের আচরণ যেন কেমন অদ্ভুত হয়ে গেছে। কখনও কখনও তাঁর মনে হতো, লোকেরা তাঁকে কৌতূহলী চোখে দেখছে—যেন এমন একজন মানুষকে দেখছে, যার পদটি হয়তো খুব শিগগিরই খালি হয়ে যাবে।

আবার কখনও তাঁর বন্ধুরা হঠাৎ বন্ধুত্বপূর্ণ ঠাট্টার সুরে তাঁর মনমরা ভাব নিয়ে হাসি-তামাশা করতে শুরু করত। যেন তাঁর অন্তরের মধ্যে যে ভয়ংকর, মর্মান্তিক এবং অভাবনীয় ঘটনা ঘটে চলেছে—যা অবিরাম তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে এবং অপ্রতিরোধ্যভাবে তাঁকে জীবন থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে—সেটি বুঝি হাসি-ঠাট্টার জন্য বেশ মজার একটি বিষয়!

বিশেষ করে শ্‌ভার্ট্‌জ তাঁকে ভীষণ বিরক্ত করতেন। তাঁর রসিকতা, প্রাণচাঞ্চল্য এবং সহজ-স্বচ্ছন্দ ভঙ্গি ইভান ইলিচকে মনে করিয়ে দিত, দশ বছর আগে তিনিও ঠিক এমনই ছিলেন।

একদিন কয়েকজন বন্ধু তাস খেলার জন্য তাঁর বাড়িতে এল। সবাই মিলে একটি সেট তৈরি করে তাস খেলতে বসল। নতুন তাসগুলোকে একটু নরম করার জন্য বাঁকিয়ে নিয়ে তারা তাস বিলি করল। ইভান ইলিচ নিজের হাতে থাকা তাসগুলো সাজাতে গিয়ে দেখলেন, তাঁর হাতে সাতটি হরতন এসেছে।

তাঁর সঙ্গী বললেন, “ নো ট্রাম্প” এবং দুটি হরতন দিয়ে তাঁকে সমর্থন করলেন।

এর চেয়ে আর কী-ই বা চাওয়ার থাকতে পারে? খেলাটি তো জমজমাট হওয়ারই কথা। সবাই বেশ আনন্দ করবে। এমনকি তাঁরা গ্র্যান্ড স্ল্যামও করতে পারবে।

কিন্তু হঠাৎ ইভান ইলিচ আবার সেই কুরে কুরে খাওয়া ব্যথাটা অনুভব করলেন। মুখের সেই অদ্ভুত স্বাদও ফিরে এল। আর তখন তাঁর মনে হলো—এমন পরিস্থিতিতে গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতার জন্য আনন্দিত হওয়াটা কত হাস্যকর!

তিনি তাঁর সঙ্গী মিখাইল মিখাইলোভিচের দিকে তাকালেন। মিখাইল মিখাইলোভিচ তাঁর শক্ত হাত দিয়ে টেবিলে টোকা দিলেন। তারপর কৌশল করে জিতে নেওয়া তাসগুলো তাড়াতাড়ি তুলে নেওয়ার বদলে, অত্যন্ত ভদ্র ও সহানুভূতিশীল ভঙ্গিতে তাসগুলো ইভান ইলিচের দিকে ঠেলে দিলেন—যাতে ইভান ইলিচকে হাত বাড়িয়ে সেগুলো তুলতে না হয় এবং সহজেই তাসগুলো গুছিয়ে নেওয়ার আনন্দটুকু পেতে পারেন।

সে কি মনে করছে, আমি হাত বাড়াতেও এত দুর্বল হয়ে গেছি?”—ইভান ইলিচ ভাবলেন।

এই চিন্তায় তিনি এতটাই বিচলিত হয়ে পড়লেন যে, তিনি কী করছেন তা ভুলেই গেলেন। ফলে নিজের সঙ্গীর তাসের ওপর ভুল করে আরও বড় তাস ফেলে দিলেন। এর ফলে গ্র্যান্ড স্ল্যামটি তিনটি চালের জন্য হাতছাড়া হয়ে গেল।

কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার ছিল—তিনি দেখতে পেলেন, মিখাইল মিখাইলোভিচ এই ভুলে কতটা বিরক্ত ও হতাশ হয়েছেন। অথচ ইভান ইলিচ তাতে একটুও পরোয়া করলেন না।

আর তাঁর কাছে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল এই উপলব্ধিটাই—কেন তাঁর আর কোনো কিছু পরোয়া হচ্ছে না।

তারা সবাই বুঝতে পারছিল যে তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। তাই বলল,“আপনি যদি ক্লান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে আমরা থামতে পারি। একটু বিশ্রাম নিন।”

শুয়ে পড়বেন? না, তিনি মোটেই ক্লান্ত ছিলেন না। তাই রাবার(ব্রিজ খেলায় rubber হলো পরপর কয়েকটি game-এর সমষ্টি, সাধারণত যে পক্ষ আগে দুই game জেতে, সেই rubber জেতে।) খেলাটাও শেষ করলেন। কিন্তু সবাই তখন বিষণ্ণ ও নীরব। ইভান ইলিচ অনুভব করলেন, এই বিষণ্ণতার ছায়া যেন তিনিই তাদের ওপর ছড়িয়ে দিয়েছেন, অথচ কিছুতেই তা দূর করতে পারছেন না।

তারা রাতের খাবার খেল এবং একসময় চলে গেল। ইভান ইলিচ একা রয়ে গেলেন এই উপলব্ধি নিয়ে যে, তাঁর জীবন যেন বিষে ভরে গেছে এবং সেই বিষ অন্যদের জীবনকেও বিষিয়ে তুলছে। আর এই বিষ কমে যাওয়ার বদলে ক্রমেই তাঁর সমগ্র সত্তার ভেতর আরও গভীরে প্রবেশ করছে।

এই অনুভূতি, তার সঙ্গে শারীরিক যন্ত্রণা এবং মৃত্যুভয়—সবকিছু নিয়েই তাঁকে বিছানায় যেতে হতো। তারপর প্রায়ই রাতের অধিকাংশ সময় যন্ত্রণায় জেগে কাটাতে হতো। পরদিন সকালে আবার তাঁকে উঠতে হতো, পোশাক পরতে হতো, আদালতে যেতে হতো, কথা বলতে ও লিখতে হতো। আর যদি বাইরে না-ও যেতেন, তাহলেও বাড়িতে কাটাতে হতো সেই চব্বিশটি ঘণ্টা—যার প্রতিটি মুহূর্তই ছিল একেকটি যন্ত্রণা।

এভাবেই তাঁকে একেবারে একা, যেন এক গভীর খাদ-এর কিনারায় দাঁড়িয়ে, জীবন কাটাতে হচ্ছিল—এমন কেউ ছিল না, যে তাঁর কষ্ট সত্যিই বুঝত কিংবা তাঁকে একটু সহানুভূতি জানাত।

                          পঞ্চম অধ্যায়

এক মাস কেটে গেল, তারপর আরও একটি মাস। নববর্ষের ঠিক আগে ইভান ইলিচের শ্যালক শহরে এলেন এবং তাঁদের বাড়িতেই উঠলেন। তখন ইভান ইলিচ আদালতে ছিলেন, আর প্রসকোভিয়া ফেদোরোভনা গিয়েছিলেন কেনাকাটা করতে।

ইভান ইলিচ বাড়ি ফিরে নিজের পড়ার ঘরে ঢুকে দেখলেন, তাঁর শ্যালক সেখানে বসে আছেন। তিনি ছিলেন সুস্থ-সবল, টকটকে চেহারার একজন মানুষ এবং তিনি নিজেই তাঁর সুটকেস খুলে জিনিসপত্র বের করছিলেন। ইভান ইলিচের পায়ের শব্দ শুনে তিনি মাথা তুললেন এবং কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেই দৃষ্টিই ইভান ইলিচকে সবকিছু বুঝিয়ে দিল। শ্যালক বিস্ময়ে কিছু বলে উঠতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলেন। আর সেই আচরণই যেন সবকিছু নিশ্চিত করে দিল।

আমার চেহারায় পরিবর্তন হয়েছে, তাই না?” ইভান ইলিচ বললেন।

হ্যাঁ, কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।” শ্যালক উত্তরে বললেন।

এরপর ইভান ইলিচ যতই চেষ্টা করলেন, শ্যালককে তাঁর চেহারা নিয়ে আর কিছু বলাতে পারলেন না। তিনি প্রসঙ্গটি বারবার সেদিকে ফেরানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু শ্যালক আর কিছুই বললেন না।

এমন সময় প্রসকোভিয়া ফেদোরোভনা বাড়ি ফিরলেন। তাঁর ভাই তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। ইভান ইলিচ দরজায় তালা দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে লাগলেন—প্রথমে সোজাসুজি, তারপর পাশ ফিরে। এরপর তিনি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তোলা নিজের একটি পুরোনো ছবি হাতে নিলেন এবং আয়নায় দেখা বর্তমান চেহারার সঙ্গে ছবিটির তুলনা করতে লাগলেন। নিজের মধ্যে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তা ছিল বিরাট।

তারপর তিনি কনুই পর্যন্ত হাতের জামার হাতা গুটিয়ে বাহুর দিকে তাকালেন। আবার হাতা নামিয়ে দিলেন। একটি ছোট সোফার মতো আসনে বসে পড়লেন এবং তাঁর মুখ যেন রাতের অন্ধকারের চেয়েও কালো হয়ে গেল।

না, না, এভাবে চলবে না!” তিনি নিজেকেই বললেন।

হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের কাছে গেলেন। কিছু আইনি কাগজপত্র হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। কিন্তু মনোযোগ দিতে পারলেন না। পড়া চালিয়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠল।

তিনি দরজার তালা খুলে বসার ঘরে গেলেন। ড্রয়িংরুমের দরজা বন্ধ ছিল। তিনি পায়ের শব্দ না করে ধীরে ধীরে দরজাটির কাছে গিয়ে কান পাতলেন।

না, তুমি বাড়িয়ে বলছ!” প্রসকোভিয়া ফেদোরোভনা বলছিলেন।

বাড়িয়ে বলছি! তুমি কি নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছ না? আরে, লোকটা তো যেন মরে গেছে! ওর চোখের দিকে তাকাও—একটুও প্রাণ নেই। কিন্তু ওর আসলে কী হয়েছে?”

কেউই জানে না। নিকোলায়েভিচ কিছু একটা বলেছিলেন, কিন্তু কী বলেছিলেন তা আমি জানি না। আর লেশ্চেতিৎস্কি তো একেবারে উল্টো কথাই বলেছেন…”

ইভান ইলিচ সেখান থেকে চলে এসে নিজের ঘরে গেলেন। শুয়ে পড়ে ভাবতে লাগলেন—“কিডনি, কিডনি নাকি তার জায়গা থেকে সরে গেছে!”

তাঁর কিডনি কীভাবে নিজের জায়গা থেকে আলগা হয়ে এদিক-ওদিক দুলছে, সে সম্পর্কে ডাক্তাররা যা যা বলেছিলেন, তিনি সব মনে করার চেষ্টা করলেন। কল্পনার জোরে তিনি যেন সেই কিডনিটিকে ধরে ফেলতে, তার নড়াচড়া থামিয়ে দিতে এবং সেটিকে ঠিক জায়গায় ধরে রাখতে চাইলেন। তাঁর মনে হলো, এর জন্য এত সামান্যই তো দরকার!

না, আবার পিওতর ইভানোভিচের কাছে যাব।”

তিনি ঘণ্টা বাজিয়ে গাড়ি আনতে বললেন এবং যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন।

কোথায় যাচ্ছ, জিন?” স্ত্রী বিশেষ দুঃখভরা, অস্বাভাবিক কোমল দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করলেন।

স্ত্রীর সেই অস্বাভাবিক মমতাময় দৃষ্টি তাঁকে বিরক্ত করে তুলল। তিনি বিষণ্ণ মুখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “পিওতর ইভানোভিচের কাছে যেতে হবে

তিনি পিওতর ইভানোভিচের কাছে এলেন। তারপর দুজনে মিলে তাঁর সেই বন্ধু, ডাক্তারটির কাছে গেলেন। ডাক্তার বাড়িতেই ছিলেন। ইভান ইলিচ তাঁর সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললেন।

ডাক্তারের মতে তাঁর শরীরের ভেতরে কী ঘটছে, তার শারীরবৃত্তীয় ও অঙ্গসংস্থানগত বিশদ ব্যাখ্যা শুনে তিনি সবই বুঝতে পারলেন। অ্যাপেন্ডিক্সে, অর্থাৎ অন্ত্রের একটি ছোট অংশে, কোথাও যেন সামান্য একটা সমস্যা হয়েছে। কিন্তু সব ঠিক হয়ে যেতে পারে। শুধু একটি অঙ্গের কার্যক্ষমতা একটু বাড়াতে হবে, আর অন্য একটি অঙ্গের কার্যকলাপ কিছুটা কমাতে হবে। তাহলেই শরীরের শোষণ-প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হবে এবং সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

তিনি বেশ দেরিতে বাড়ি ফিরলেন। রাতের খাবার খেলেন এবং বেশ হাসিখুশিভাবেই কথাবার্তা বললেন। কিন্তু নিজের ঘরে ফিরে এসে কাজ শুরু করতে তাঁর অনেকক্ষণ লাগল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি পড়ার ঘরে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করলেন। তবু তাঁর মনে সব সময়ই একটা অনুভূতি রয়ে গেল—তিনি যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ, অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটি বিষয়কে আপাতত একপাশে সরিয়ে রেখেছেন; কাজ শেষ হলে আবার সেই বিষয়টি নিয়ে ভাববেন।

কাজ শেষ করার পর তাঁর মনে পড়ল, সেই ব্যক্তিগত বিষয়টি আসলে তাঁর অ্যাপেন্ডিক্সের কথা

কিন্তু তিনি নিজেকে সেই চিন্তার মধ্যে ডুবিয়ে দিলেন না। চা খাওয়ার জন্য বৈঠকখানায় চলে এলেন।

সেখানে কয়েকজন অতিথি এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে সেই তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেটও ছিলেন, যিনি তাঁর মেয়ের জন্য বেশ উপযুক্ত পাত্র বলে মনে করা হচ্ছিল। সবাই গল্প করছিল, পিয়ানো বাজাচ্ছিল এবং গান গাইছিল।

প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনা যেমন পরে বলেছিলেন, সেদিন সন্ধ্যায় ইভান ইলিচকে স্বাভাবিকের চেয়েও বেশ প্রফুল্ল মনে হচ্ছিলকিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও তিনি ভুলতে পারলেন না যে অ্যাপেন্ডিক্সের সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে ভাবাটা তিনি পিছিয়ে রেখেছেন।

রাত এগারোটার সময় তিনি সবাইকে শুভরাত্রি জানিয়ে শোবার ঘরে চলে এলেন।

অসুস্থ হওয়ার পর থেকে তিনি নিজের পড়ার ঘরের পাশের একটি ছোট ঘরে একাই ঘুমাতেন। পোশাক খুলে জোলার(এমিল জোলা) একটি উপন্যাস হাতে নিলেন। কিন্তু বই পড়ার পরিবর্তে তিনি আবার চিন্তায় ডুবে গেলেন। তাঁর কল্পনায় এবার অ্যাপেন্ডিক্সের সেই কাঙ্ক্ষিত উন্নতিটা যেন সত্যিই ঘটতে লাগল।

শরীরের ভেতরের শোষণ ও বর্জন-প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হয়ে গেল, অঙ্গটির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাও ফিরে এল

হ্যাঁ, এটাই তো!” তিনি মনে মনে বললেন। “প্রকৃতিকে শুধু একটু সাহায্য করলেই হবে, ব্যস।”

তিনি তাঁর ওষুধের কথা মনে করলেন। উঠে ওষুধ খেলেন এবং চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লেন। অপেক্ষা করতে লাগলেন—ওষুধটি যেন তার উপকারী কাজ শুরু করে, ব্যথাটা যেন কমিয়ে দেয়।

আমাকে শুধু নিয়ম করে ওষুধ খেতে হবে এবং যেসব জিনিস শরীরের ক্ষতি করে, সেগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। আমি তো ইতিমধ্যেই ভালো বোধ করছি—অনেক ভালো।”

তিনি নিজের পাশটায় (ব্যাথার জায়গায়) হাত দিয়ে টিপে দেখলেনচাপ দিলে আর ব্যথা লাগছে না।

এই তো! সত্যিই তো ব্যথা লাগছে না। অনেকটাই ভালো হয়ে গেছে।”

তিনি বাতি নিভিয়ে পাশ ফিরে শুলেন…অ্যাপেন্ডিক্সটা ভালো হয়ে উঠছে। শরীরে শোষণ-প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হচ্ছে।”

হঠাৎ তিনি সেই পুরোনো, পরিচিত, ভোঁতা অথচ গভীর ও জেদি ব্যথাটা অনুভব করলেন। মুখে আবার সেই একই পরিচিত, জঘন্য স্বাদ ফিরে এল।

তাঁর বুকটা হঠাৎ ধসে গেল, মাথা যেন ঝিমঝিম করে উঠল।

হে ঈশ্বর! হে ঈশ্বর!” তিনি বিড়বিড় করে বললেন। “আবার! আবার শুরু হলো! আর এটা কোনোদিনই থামবে না।”

হঠাৎ বিষয়টা তাঁর কাছে সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে দেখা দিল।

অ্যাপেন্ডিক্স! কিডনি!” তিনি নিজেকে বললেন। “ব্যাপারটা আসলে অ্যাপেন্ডিক্স বা কিডনির নয়। ব্যাপারটা জীবন আর… মৃত্যুর।”

হ্যাঁ, জীবন ছিল—আর এখন তা চলে যাচ্ছে, চলে যাচ্ছে, আর আমি তাকে থামাতে পারছি না। হ্যাঁ। নিজেকে আর কেন ধোঁকা দেব? আমি ছাড়া কি আর কারও কাছে এটা স্পষ্ট নয় যে আমি মারা যাচ্ছি? আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ, কয়েক দিন… এমনকি এই মুহূর্তেই তা ঘটে যেতে পারে।”

একসময় আলো ছিল, এখন অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। আমি এখানে ছিলাম, আর এখন সেখানে চলে যাচ্ছি! কিন্তু কোথায়?”

একটা শীতল স্রোত যেন তাঁর শরীর বেয়ে নেমে গেল। তাঁর শ্বাস বন্ধ হয়ে এল। তিনি শুধু নিজের হৃদস্পন্দনের ধুকপুক শব্দ অনুভব করতে লাগলেন।

আমি যখন আর থাকব না, তখন কী থাকবে? কিছুই থাকবে না। তাহলে আমি যখন আর থাকব না, তখন আমি কোথায় থাকব? এটাই কি মৃত্যু?”

না, আমি চাই না!”

তিনি লাফ দিয়ে উঠে বসে মোমবাতি জ্বালাতে চেষ্টা করলেন। কাঁপতে থাকা হাতে মোমবাতিটা খুঁজতে গিয়ে সেটি ও মোমদান দুটোই মেঝেতে ফেলে দিলেন। তারপর আবার বালিশের ওপর ঢলে পড়লেন।

কী লাভ? এতে তো কিছুই বদলাবে না,” অন্ধকারের দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে সে মনে মনে বলল। “মৃত্যু। হ্যাঁ, মৃত্যু। অথচ ওদের কেউই তা জানে না, জানতে চায়ও না; আমার জন্য ওদের কোনো মায়া-মমতাও নেই। এখন ওরা খেলছে।” (দরজার ওপাশ থেকে দূরে কোনো গান ও তার বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গত ভেসে আসছিল।) “ওদের কাছে সবই স্বাভাবিক, কিন্তু ওরাও তো একদিন মরবে! নির্বোধের দল! আমি আগে মরব, ওরা পরে—কিন্তু শেষ পরিণতি তো একই। আর এখন ওরা কত আনন্দ করছে… জানোয়ারগুলো!”

রাগে তাঁর গলা যেন আটকে এল, আর সে অসহ্য, যন্ত্রণাদায়ক দুঃখে ভেঙে পড়ল। “এটা কি সম্ভব যে, পৃথিবীর সব মানুষকেই এই ভয়ংকর যন্ত্রণা ভোগ করার জন্য অভিশপ্ত হতে হবে?”

তিনি উঠে বসলেন“কোথাও নিশ্চয়ই একটা ভুল হচ্ছে। আমাকে শান্ত হতে হবে—সবকিছু একেবারে শুরু থেকে আবার ভেবে দেখতে হবে।”

তিনি আবার ভাবতে শুরু করল। “হ্যাঁ, আমার অসুস্থতার শুরুটা—আমি পাশে আঘাত পেয়েছিলাম, কিন্তু সেদিন এবং তার পরের দিনও আমি বেশ ভালোই ছিলাম। সামান্য ব্যথা হয়েছিল, তারপর একটু বেশি। ডাক্তার দেখালাম। এরপর এল হতাশা আর উৎকণ্ঠা, আরও ডাক্তার দেখালাম, আর ধীরে ধীরে আমি সেই অতল গহ্বরের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার শক্তি কমতে লাগল, আমি ক্রমেই সেই গহ্বরের আরও কাছে যেতে লাগলাম, আর এখন আমি একেবারে শুকিয়ে গেছি, চোখে আর কোনো আলো নেই। আমি ভাবছি অ্যাপেন্ডিক্সের কথা—কিন্তু এ তো মৃত্যু! আমি ভাবছি কীভাবে অ্যাপেন্ডিক্সটা ঠিক করা যায়, অথচ এরই মধ্যে মৃত্যু আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে! সত্যিই কি এটাই মৃত্যু?”

আবার আতঙ্ক তাঁকে গ্রাস করল, তিনি হাঁপাতে লাগলেনবিছানার পাশে থাকা ছোট টেবিলটির ওপর কনুই দিয়ে ভর দিয়ে তিনি দেশলাই খুঁজতে নিচু হলেনটেবিলটি তাঁর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং তাতে তাঁর ব্যথা লাগছিল। এতে তিনি ভীষণ রেগে গেলেনআরও জোরে টেবিলটির ওপর চাপ দিলেন, ফলে সেটি উল্টে পড়ল। হাঁপাতে হাঁপাতে, সম্পূর্ণ হতাশ হয়ে তিনি চিৎ হয়ে পড়ে গেলেন—এই আশঙ্কায় যে, এই বুঝি সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু এসে তাঁকে গ্রাস করবে।

এরই মধ্যে অতিথিরা একে একে চলে যাচ্ছিলেন। প্রসকোভিয়া ফিয়োদোরোভনা তাঁদের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে ঘরে ফিরে এলেন।

কী হয়েছে?”

কিছু না। অসাবধানতায় ওটা উল্টে ফেলেছি।”

তিনি বাইরে বেরিয়ে গেলেন এবং একটি মোমবাতি নিয়ে ফিরে এলেন। ইভান ইলিচ তখন এমনভাবে হাঁপাচ্ছিলেন, যেন একটানা অনেকটা দৌড়ে এসেছেন। তিনি চিৎ হয়ে শুয়ে থেকে স্থির দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

কী হয়েছে, জিন?”

না… কিছু… হয়নি। ওটা উল্টে ফেলেছি।”

(“এ কথা বলে কী লাভ? ও তো কিছুই বুঝবে না,” তিনি মনে মনে ভাবলেন।)

সত্যিই, প্রসকোভিয়া কিছুই বুঝতে পারলেন না। তিনি পড়ে যাওয়া জিনিসটি তুলে ঠিক জায়গায় রাখলেন, ইভান ইলিচের মোমবাতিটি জ্বেলে দিলেন এবং তাড়াতাড়ি আরেকজন অতিথিকে বিদায় জানাতে চলে গেলেন।

ফিরে এসে দেখলেন, ইভান ইলিচ তখনও চিৎ হয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছেন।

কী হয়েছে? তোমার কি আরও খারাপ লাগছে?”

হ্যাঁ।” তিনি মাথা নাড়লেন এবং বসে পড়লেন।

জিন, জানো কী মনে হয়? আমার মনে হয় লেশ্চেতিৎসকিকে এখানে ডেকে এনে তোমাকে দেখানো উচিত

এর অর্থ ছিল—খরচের কথা না ভেবে সেই বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে ডেকে আনা।

ইভান ইলিচ বিদ্বেষভরা এক মৃদু হাসি হেসে বললেন, “না।”

প্রসকোভিয়া আরও কিছুক্ষণ তাঁর কাছে বসে রইলেন। তারপর উঠে এসে তাঁর কপালে চুমু খেলেন। কিন্তু তিনি যখন চুমু খাচ্ছিলেন, তখন ইভান ইলিচ তাঁকে অন্তরের গভীর থেকে ঘৃণা করছিলেন এবং অনেক কষ্টে তাঁকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখছিলেন।

শুভরাত্রি। ঈশ্বর করুন, তুমি যেন ঘুমোতে পারো।”

হ্যাঁ।”

                          ষষ্ঠ অধ্যায়

ইভান ইলিচ বুঝতে পারছিলেন যে তিনি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, আর সেই উপলব্ধি তাঁকে অবিরাম গভীর হতাশায় ডুবিয়ে রাখছিল। মনের গভীরে তিনি জানতেন যে তিনি মারা যাচ্ছেন। কিন্তু শুধু যে তিনি এই চিন্তার সঙ্গে অভ্যস্ত ছিলেন না, তা নয়—তিনি আসলে বিষয়টি বুঝতেই পারছিলেন না, এবং কোনোভাবেই তা উপলব্ধি করতে পারছিলেন না।

কিসেভেটারের যুক্তিবিদ্যার বই থেকে শেখা সেই তর্কটি তাঁর সবসময়ই সঠিক বলে মনে হতো: কাইয়ুস একজন মানুষ। সব মানুষই মরণশীল। অতএব, কাইয়ুসও মরণশীল।”

কাইয়ুসের ক্ষেত্রে এই যুক্তি যে সঠিক, সে বিষয়ে তাঁর কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে? কোনোভাবেই নয়। কাইয়ুস—একজন বিমূর্ত মানুষ—মরণশীল, এটা সম্পূর্ণ সত্য। কিন্তু তিনি তো কাইয়ুস নন, কোনো বিমূর্ত মানুষও নন; তিনি ছিলেন একেবারে স্বতন্ত্র, অন্য সবার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একজন মানুষ।

তিনি আবার যেন সেই ছোট্ট ভানিয়া—মা-বাবাকে নিয়ে, মিত্যা আর ভলোদিয়াকে নিয়ে, খেলনাগুলো, গাড়োয়ান আর ধাত্রীকে নিয়ে; পরে কাটেঙ্কাকে নিয়ে—আর শৈশব, বাল্যকাল ও যৌবনের সমস্ত আনন্দ, দুঃখ ও সুখ-উল্লাস নিয়ে তার সেই পুরোনো জীবনে ফিরে গিয়েছিল।কাইয়ুস কী জানত সেই ডোরাকাটা চামড়ার বলটির গন্ধ সম্পর্কে, যে বলটি ভানিয়া এত ভালোবাসত? কাইয়ুস কি কখনো মায়ের হাতে এভাবে চুমু খেয়েছিল? মায়ের পোশাকের রেশমি কাপড় কি কাইয়ুসের কানে ঠিক এভাবেই মৃদু শব্দ তুলেছিল? স্কুলে পেস্ট্রি(মিষ্টি রুটি/কেকজাতীয় খাবার)খারাপ হওয়ায় কাইয়ুস কি কখনো এভাবে হৈচৈ করেছিল? কাইয়ুস কি কখনো এভাবে প্রেমে পড়েছিল? কাইয়ুস কি তাঁর মতো কোনো অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে পেরেছিল?

হ্যাঁ, কাইয়ুস সত্যিই মরণশীল ছিল, আর তার মৃত্যু হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আমি? আমি তো ছোট্ট ভানিয়া—আমি ইভান ইলিচ—আমার সমস্ত চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি আর আবেগ নিয়ে আমিআমার ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। আমার তো মরার কথা নয়। এমনটা হতে পারে না। এ তো ভয়ংকর!”

এই ছিল তাঁর মনের অনুভূতি।

কাইয়ুসের মতো যদি আমারও মরতে হতো, তাহলে নিশ্চয়ই আমি আগে থেকেই তা বুঝতে পারতাম। আমার অন্তরের কোনো এক গোপন কণ্ঠ আমাকে সেকথা জানিয়ে দিত। কিন্তু আমার মধ্যে তো তেমন কিছুই ছিল না। বরং আমি এবং আমার পরিচিত সবাই এতদিন ধরে মনে করে এসেছি যে আমাদের ব্যাপারটা কাইয়ুসের ব্যাপার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আর এখন—এই তো! এটাই ঘটছে!”

তিনি নিজেকেই বললেন, “এটা হতে পারে নাঅসম্ভব! কিন্তু এ তো সত্যিই ঘটছে। তাহলে এমন কেন? এটা কীভাবে বোঝা যায়?”

তিনি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তাই এই ভুল, অস্বাভাবিক, অসুস্থ চিন্তাটাকে মন থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন এবং তার জায়গায় অন্য স্বাভাবিক, সুস্থ ও যুক্তিসঙ্গত চিন্তা আনতে চাইলেন।

কিন্তু সেই চিন্তাটি—শুধু চিন্তাটিই নয়, তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা নির্মম বাস্তবতাটিও—বারবার তাঁর সামনে এসে উপস্থিত হতে লাগল।

আর সেই চিন্তাটিকে সরিয়ে রাখার জন্য তিনি একের পর এক নানা চিন্তা মনে আনতে লাগলেন, এই আশায় যে সেগুলোর মধ্যে কোনো একটিতে তিনি একটু ভরসা খুঁজে পাবেন। তিনি চেষ্টা করলেন তাঁর পুরোনো চিন্তার ধারায় ফিরে যেতে—যে চিন্তার ধারা একসময় মৃত্যুর ভাবনাকে তাঁর কাছ থেকে আড়াল করে রাখত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আগে যে সমস্ত বিষয় তাঁর মৃত্যুচেতনাকে আড়াল করত, ঢেকে রাখত এবং ভুলিয়ে দিত, এখন আর সেগুলোর কোনোটিই তা পারছিল না।

এখন ইভান ইলিচ তাঁর অধিকাংশ সময় ব্যয় করতেন সেই পুরোনো চিন্তার ধারাটি আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টায়। তিনি নিজেকে বলতেন, “আমি আবার আমার কাজকর্ম শুরু করব—শেষ পর্যন্ত এতদিন তো আমি এই কাজের মধ্যেই জীবন কাটিয়েছি।” সমস্ত সন্দেহ দূরে সরিয়ে তিনি আদালতে যেতেন, সহকর্মীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন এবং আগের মতোই নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে থাকতেন। চিন্তাশীল দৃষ্টিতে তিনি আদালতকক্ষের লোকজনের দিকে তাকাতেন এবং তাঁর ক্ষীণ, হাড়জিরজিরে দুই বাহু ওক কাঠের চেয়ারের হাতলে রেখে দিতেন। স্বাভাবিক নিয়মে কোনো সহকর্মীর দিকে একটু ঝুঁকে তাঁর কাগজপত্র নিজের দিকে টেনে নিয়ে নিচুস্বরে তার সঙ্গে দু-একটি কথা বলতেন; তারপর হঠাৎ চোখ তুলে সোজা হয়ে বসে কয়েকটি কথা বলতেন এবং বিচারকার্য শুরু করতেন।

কিন্তু হঠাৎ, বিচারকার্য যে পর্যায়েই থাকুক না কেন, তাঁর পাশের সেই ব্যথা আবার নিজের কুরে কুরে খাওয়ার কাজ শুরু করত। ইভান ইলিচ তখন ব্যথাটির দিকে মন চলে যাওয়া ঠেকাতে চেষ্টা করতেন, সেটিকে মন থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইতেন; কিন্তু কোনোভাবেই সফল হতেন না। সেটি এসে তাঁর সামনে দাঁড়াত এবং তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকত। তখন তিনি যেন পাথর হয়ে যেতেন; তাঁর চোখের আলো নিভে যেত। আবার তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করতেন—এটাই কি একমাত্র সত্য?

তাঁর সহকর্মী ও অধস্তন কর্মচারীরা বিস্ময় ও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করত যে, একসময়ের মেধাবী ও সূক্ষ্মবুদ্ধির বিচারক ইভান ইলিচ ক্রমশ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন এবং ভুল করতে শুরু করেছেন। তিনি নিজেকে ঝাঁকিয়ে যেন আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতেন, কোনোভাবে বিচারকার্য শেষ করতেন এবং বাড়ি ফিরে আসতেন। তাঁর মনে তখন এক গভীর বিষণ্ণ উপলব্ধি জেগে উঠত—আগের মতো তাঁর বিচারকের কাজ আর তাঁকে সেই জিনিসটি থেকে আড়াল করে রাখতে পারছে না, যেটিকে তিনি আড়াল করতে চান; আর সেই কাজ তাঁকে সেই জিনিসটি থেকে মুক্তিও দিতে পারছে না।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার ছিল, সেই জিনিসটি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করত কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নয়; বরং শুধু এই জন্য যে তিনি তার দিকে তাকান—সরাসরি তার মুখোমুখি হন; তাকিয়ে থাকেন, অথচ কিছুই করার নেই; শুধু অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে তাকে সহ্য করে যান তিনি

ইভান ইলিচ এই অবস্থাটা থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য সান্ত্বনা খুঁজতে লাগলেন—নতুন নতুন আড়াল, নতুন নতুন পর্দা; আর সত্যিই তেমন কিছু আড়াল তিনি খুঁজেও পেলেন। কিছু সময়ের জন্য সেগুলো তাঁকে রক্ষা করল বলেও মনে হলো। কিন্তু পরক্ষণেই সেগুলো যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল—বরং এমন স্বচ্ছ হয়ে উঠল, যেন সেই জিনিসটি তাদের ভেদ করে বেরিয়ে আসছে, আর কিছুতেই তাকে আড়াল করা যাচ্ছে না।

এই শেষ কয়েক দিনে তিনি প্রায়ই সেই বৈঠকখানায় যেতেন, যেটি তিনি নিজের পছন্দমতো সাজিয়েছিলেন—সেই ঘরেই তো তিনি পড়ে গিয়েছিলেন এবং যার জন্য—এখন তাঁর কাছে ব্যাপারটি কী ভয়াবহ ও তিক্তভাবে হাস্যকর মনে হতো!—তিনি নিজের জীবনটাকেই প্রায় উৎসর্গ করেছিলেন। কারণ এখন তিনি জানতেন, সেই পড়ে যাওয়ার ঘটনাই তাঁর অসুস্থতার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল।

ঘরে ঢুকে তিনি দেখতেন, পালিশ করা টেবিলটার কোথাও যেন আঁচড় লেগেছে। কেন এমন হয়েছে, তা খুঁজতে গিয়ে দেখতেন, অ্যালবামের ব্রোঞ্জের অলংকারের একটি অংশ বেঁকে গেছে। তিনি সযত্নে সাজিয়ে রাখা সেই দামি অ্যালবামটি হাতে তুলে নিতেন এবং তাঁর মেয়ে ও তার বন্ধুদের ওপর বিরক্ত হতেন—তাদের অগোছালো স্বভাবের জন্য। অ্যালবামটি এখানে-সেখানে ছিঁড়ে গেছে, কয়েকটি ছবিও উল্টো করে ঢোকানো হয়েছে। তিনি যত্ন করে সেগুলো ঠিকঠাক করে দিতেন এবং ব্রোঞ্জের বাঁকানো অংশটিও আগের জায়গায় ফিরিয়ে দিতেন।

তারপর তাঁর মনে হতো, ঘরের সব জিনিস অন্য এক কোণে, গাছপালার কাছে সরিয়ে রাখলে কেমন হয়। তিনি চাকরকে ডাকতেন। কিন্তু তাঁর মেয়ে কিংবা স্ত্রী এসে তাঁকে সাহায্য করতে চাইত। তাঁরা একমত হতে পারতেন না; তাঁর স্ত্রী তাঁর কথার বিরোধিতা করতেন, আর তিনিও তর্ক করতে করতে রেগে যেতেন। কিন্তু তাতে ক্ষতি ছিল না। কারণ তখন তিনি সেই জিনিসটির কথা ভাবছিলেন না। সেটি যেন অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু তারপর, যখন তিনি নিজেই কোনো একটা জিনিস সরাতে যেতেন, তাঁর স্ত্রী বলতেন,
—“চাকরদের দিয়ে করান। আপনি আবার নিজেকে আঘাত করবেন।”

আর সেই মুহূর্তেই সেই জিনিসটি যেন হঠাৎ পর্দা ভেদ করে ঝলকে উঠত, আর তিনি তাকে দেখতে পেতেন। সেই দেখা ছিল মাত্র এক ঝলকের জন্য। তিনি আশা করতেন, সেটি আবার অদৃশ্য হয়ে যাবে। কিন্তু নিজের অজান্তেই তাঁর মন চলে যেত শরীরের সেই পাশটার দিকে।

ওটা আগের মতোই সেখানে বসে আছে, একইভাবে আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে!”

এরপর আর তিনি সেই জিনিসটির কথা ভুলতে পারতেন না। ফুলের আড়াল থেকে সেটি যেন স্পষ্টভাবে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে—তিনি তা দেখতে পেতেন।

এসবের জন্যই বা কী?” তিনি ভাবতেন। “সত্যিই তো! একটা পর্দার জন্য আমি আমার জীবনটাই নষ্ট করে ফেললাম—যেন কোনো দুর্গ দখল করতে গিয়ে জীবন দিয়েছি! এ কি সত্যি হতে পারে? কী ভয়ংকর, কী নির্বোধের মতো ব্যাপার! এমনটা হতে পারে না! হতে পারে না—কিন্তু হয়েছেই তো।”

তিনি নিজের পড়ার ঘরে চলে যেতেন, শুয়ে পড়তেন, আর আবার সেই জিনিসটির সঙ্গে একা হয়ে যেতেন—মুখোমুখি, একেবারে মুখোমুখি।

আর সেটির বিরুদ্ধে করার মতো কিছুই তাঁর ছিল না—শুধু তার দিকে তাকিয়ে থাকা আর শিউরে ওঠা ছাড়া।

                          সপ্তম অধ্যায়

কীভাবে এমনটা ঘটল, তা বলা কঠিন। কারণ ব্যাপারটি ধীরে ধীরে, কারও নজরে না পড়েই ঘটেছিল। কিন্তু ইভান ইলিচের অসুস্থতার তৃতীয় মাসে তাঁর স্ত্রী, মেয়ে, ছেলে, পরিচিতজন, ডাক্তার, চাকর-বাকর—সবাই, আর সবার চেয়ে বেশি স্বয়ং ইভান ইলিচ—বুঝতে পেরেছিলেন যে অন্যদের কাছে তাঁর অস্তিত্বের একমাত্র তাৎপর্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এই প্রশ্ন: তিনি আর কতদিনে নিজের জায়গাটা ছেড়ে দেবেন, কবে তাঁর উপস্থিতির কারণে জীবিত মানুষগুলোর যে অস্বস্তি হচ্ছে, তার অবসান ঘটবে, আর কবে তিনি নিজেও তাঁর যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবেন।

তিনি ক্রমশ কম ঘুমোতে লাগলেন। তাঁকে আফিম খাওয়ানো হতো এবং চামড়ার নিচে মরফিনের ইনজেকশন দেওয়া হতো, কিন্তু তাতেও তাঁর কষ্টের উপশম হলো না। প্রথম দিকে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় যে নিস্তেজ বিষণ্ণতা তাঁকে গ্রাস করত, তাতে সামান্য স্বস্তি মিলত। কিন্তু পরে সেই অনুভূতিটাই এত যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠল যে, তা তাঁর শারীরিক ব্যথার সমান, এমনকি কখনও কখনও তার চেয়েও অসহনীয় মনে হতে লাগল।

ডাক্তারদের নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর জন্য বিশেষ ধরনের খাবার তৈরি করা হতো। কিন্তু সেসব খাবারও দিন দিন তাঁর কাছে বিস্বাদ ও ঘৃণ্য হয়ে উঠতে লাগল। মলমূত্র ত্যাগের জন্যও তাঁর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। প্রতিবারই সেটি তাঁর কাছে এক ভয়ংকর যন্ত্রণা হয়ে উঠত—নোংরামি, অস্বস্তিকর ও অপমানজনক পরিস্থিতি, দুর্গন্ধ, আর সেই সঙ্গে এই বোধ যে, এ কাজের জন্য অন্য একজন মানুষকেও জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই সবচেয়ে অপ্রীতিকর কাজটির মধ্যেই ইভান ইলিচ কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পেতেন। দারোয়ানের তরুণ সহকারী গেরাসিম সবসময় এসে সেই জিনিসপত্র সরিয়ে নিয়ে যেত। গেরাসিম ছিল একেবারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সতেজ চেহারার এক তরুণ কৃষক। শহরের খাবার খেয়ে সে বেশ স্বাস্থ্যবান ও মোটাসোটা হয়ে উঠেছিল। তার স্বভাব ছিল প্রফুল্ল ও প্রাণবন্ত।

শুরুতে রুশ কৃষকের পরিষ্কার পোশাক পরা গেরাসিমকে সেই ঘৃণ্য কাজটি করতে দেখে ইভান ইলিচ অস্বস্তি বোধ করতেন। একদিন কমোড থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময় তিনি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে, নিজের পায়জামা পর্যন্ত টেনে তুলতে পারলেন না। তিনি একটি নরম আরামকেদারায় ঢলে পড়লেন এবং আতঙ্কের সঙ্গে নিজের অনাবৃত, দুর্বল হয়ে যাওয়া উরুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। অসুস্থতার কারণে তাঁর পায়ের পেশিগুলো এত শুকিয়ে গিয়েছিল যে সেগুলোর রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

এমন সময় গেরাসিম দৃঢ় অথচ হালকা পদক্ষেপে ঘরে ঢুকল। তার ভারী বুট থেকে তারকোল ও টাটকা শীতের বাতাসের মনোরম গন্ধ বেরোচ্ছিল। তার গায়ে ছিল পরিষ্কার মোটা কাপড়ের অ্যাপ্রন; ছাপা কাপড়ের জামার হাতা কনুইয়ের ওপর গুটিয়ে রাখা, ফলে তার শক্ত, তরুণ, খালি বাহু দুটি দেখা যাচ্ছিল। অসুস্থ প্রভুর অনুভূতির কথা ভেবে সে তাঁর দিকে না তাকিয়ে সরাসরি কমোডের দিকে এগিয়ে গেল। আর নিজের মুখে ফুটে ওঠা প্রাণের আনন্দটুকুও সংযত রাখার চেষ্টা করতে করতে সে কমোডটির কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

গেরাসিম!” দুর্বল কণ্ঠে ইভান ইলিচ ডাকলেন।

গেরাসিম চমকে উঠল। মনে হলো, সে বোধহয় কোনো ভুল করে ফেলেছে। দ্রুত সে তার টাটকা, সরল, সদয় তরুণ মুখটি ঘুরিয়ে ইভান ইলিচের দিকে তাকাল। মুখে তখনও কেবল দাড়ি ওঠার প্রথম কোমল আভাস।

জি, স্যার?”

তোমার জন্য নিশ্চয়ই ব্যাপারটা খুবই অস্বস্তিকর। আমাকে ক্ষমা করো। আমি তো একেবারেই অসহায়।”

আরে না, স্যার,” গেরাসিমের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, মুখে ঝকঝকে সাদা দাঁত দেখা গেল। “এতে আবার কী এমন কষ্ট! আপনি তো অসুস্থ, স্যার।”

তারপর তার দক্ষ, সবল হাত অভ্যস্ত কাজটি করে গেল। কাজ শেষ করে সে হালকা পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

পাঁচ মিনিট পর একইভাবে নিঃশব্দে ফিরে এল। ইভান ইলিচ তখনও সেই একই ভঙ্গিতে আরামকেদারায় বসে ছিলেন।

গেরাসিম,” পরিষ্কার করে ধোয়া পাত্রটি যথাস্থানে রেখে গেরাসিম যখন সরে আসছিল, তখন তিনি বললেন, “একটু এখানে এসো, আমাকে সাহায্য করো।”

গেরাসিম তাঁর কাছে এগিয়ে এল।

আমাকে তুলে দাও। উঠতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। দিমিত্রিকেও আমি চলে যেতে বলেছি।”

গেরাসিম তাঁর কাছে এসে শক্ত অথচ কোমল হাতে খুব সহজ দক্ষতায় প্রভুকে জড়িয়ে ধরল। যে হালকা ভঙ্গিতে সে হাঁটছিল, ঠিক সেই স্বাভাবিকতায় এক হাত দিয়ে ইভান ইলিচকে তুলে ধরে সামলে রাখল, আর অন্য হাতে তাঁর পায়জামা টেনে ঠিক করে দিল। তারপর তাঁকে আবার বসিয়ে দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু ইভান ইলিচ বললেন, তাঁকে সোফা পর্যন্ত নিয়ে যেতে।

গেরাসিম কোনো রকম চেষ্টা বা চাপের লক্ষণ না দেখিয়েই, প্রায় কোলে তুলে নেওয়ার মতো করে তাঁকে সোফার কাছে নিয়ে এল এবং সেখানে শুইয়ে দিল।

ধন্যবাদ। তুমি কী সহজ আর সুন্দরভাবেই না সবকিছু করো!”

গেরাসিম আবার মৃদু হাসল এবং ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু ইভান ইলিচের মনে হলো, তার উপস্থিতিই যেন তাঁকে এক অদ্ভুত স্বস্তি দিচ্ছে। তাই তিনি তাকে যেতে দিতে চাইলেন না।

আর একটা কথা—ওই চেয়ারটা একটু এগিয়ে দাওনা, ওটা নয়, অন্যটা—আমার পায়ের নিচে দাও। পা একটু উঁচু করে রাখলে আমার আরাম লাগে।”

গেরাসিম চেয়ারটি এনে নরমভাবে ঠিক জায়গায় রাখল এবং ইভান ইলিচের পা তুলে তার ওপর রাখল। গেরাসিম যখন তাঁর পা ধরে রেখেছিল, তখন ইভান ইলিচের মনে হলো, তাঁর শরীরটা যেন একটু ভালো লাগছে।

পা একটু উঁচু করে রাখলে ভালো লাগে,” তিনি বললেন। “ওগুলোর নিচে ওই কুশনটা দাও।”

গেরাসিম তাই করল। আবার সে তাঁর পা তুলে কুশনের ওপর রাখল। আর গেরাসিম যখন পা দুটো ধরে রেখেছিল, তখন ইভান ইলিচের মনে হলো, তিনি যেন আরও স্বস্তি পাচ্ছেন। কিন্তু গেরাসিম পা নামিয়ে রাখতেই তাঁর মনে হলো, কষ্টটা আবার যেন বেড়ে গেল।

গেরাসিম,” তিনি ডাকলেন।

জি, স্যার?”

তুমি কি এখন খুব ব্যস্ত?”

একেবারেই না, স্যার,” গেরাসিম বলল। ভদ্রলোকদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়, শহরের লোক জনের কাছ থেকে সে তা শিখে নিয়েছিল।

তোমার আর কী কাজ বাকি আছে?”

আমার আর কী কাজ? সবই তো হয়ে গেছে। শুধু কালকের জন্য কাঠগুলো চেরা বাকি আছে।”

তাহলে আমার পা দুটো একটু আরও উঁচু করে ধরে রাখতে পারবে?”

অবশ্যই পারব। কেন পারব না?”

গেরাসিম তাঁর প্রভুর পা দুটো আরও উঁচু করে ধরল। আর ইভান ইলিচের মনে হলো, এই অবস্থায় তাঁর আর একটুও ব্যথা হচ্ছে না।

আর কাঠগুলোর কী হবে?”

ওসব নিয়ে ভাববেন না, স্যার। এখনও তো অনেক সময় আছে।”

ইভান ইলিচ গেরাসিমকে বসতে বললেন এবং তাঁর পা দুটো ধরে রাখতে বললেন। তারপর তাঁর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। আশ্চর্যের বিষয়, গেরাসিম যখন তাঁর পা দুটো তুলে ধরে রাখত, তখন ইভান ইলিচের মনে হতো যেন তিনি কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। এরপর থেকে মাঝে মাঝেই ইভান ইলিচ গেরাসিমকে ডেকে নিতেন এবং তাঁর কাঁধের ওপর নিজের পা তুলে রাখতে বলতেন। আর তখন গেরাসিমের সঙ্গে কথা বলতেও তাঁর ভালো লাগত।

গেরাসিম সবকিছুই করত সহজভাবে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে, কোনো বিরক্তি ছাড়াই এবং এমন এক সরল, সদয় মনোভাব নিয়ে, যা ইভান ইলিচকে গভীরভাবে স্পর্শ করত। অন্য মানুষের স্বাস্থ্য, শক্তি ও প্রাণবন্ততা ইভান ইলিচের কাছে অসহ্য লাগত; কিন্তু গেরাসিমের শক্তি ও প্রাণশক্তি তাঁকে হীন বা অপমানিত বোধ করাত না—বরং শান্তি দিত, সান্ত্বনা দিত।

ইভান ইলিচকে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছিল এই প্রতারণা, এই মিথ্যাচার—যে মিথ্যাকে কোনো এক অদ্ভুত কারণে সবাই মেনে নিয়েছিল। সবাই এমন ভান করছিল যেন তিনি মরছেন না, কেবল অসুস্থ; তাঁকে শুধু শান্ত থাকতে হবে, চিকিৎসা নিতে হবে, আর তারপর সবকিছু ভালো হয়ে যাবে। অথচ ইভান ইলিচ জানতেন, তাঁরা যা-ই কিছু করুন না কেন, এর কোনো ফল হবে না—শুধু আরও অসহনীয় যন্ত্রণা এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু অপেক্ষা করছে।

এই প্রতারণাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত—তাঁর চারপাশের মানুষগুলো এমন একটি সত্য স্বীকার করতে চাইছিল না, যে সত্য তারা যেমন জানত, তিনিও তেমনি জানতেন। বরং তারা তাঁর ভয়াবহ অবস্থার ব্যাপারে তাঁর কাছেই মিথ্যা বলতে চাইত এবং তাঁকেও সেই মিথ্যার অংশীদার হতে বাধ্য করত।

মৃত্যুর ঠিক পূর্বমুহূর্তে তাঁকে ঘিরে যে মিথ্যার অভিনয় চলছিল—যে অভিনয়ের ফলে তাঁর মৃত্যুর মতো ভয়াবহ ও গম্ভীর ঘটনাটিকেও তাদের অতিথি-আপ্যায়ন, পর্দা নিয়ে ব্যস্ততা, রাতের খাবারে স্টার্জন মাছ পরিবেশন—এসব তুচ্ছ দৈনন্দিন ব্যাপারের সমতুল্য করে ফেলা হচ্ছিল—সেই মিথ্যাই ইভান ইলিচের কাছে এক ভয়াবহ যন্ত্রণা হয়ে উঠেছিল।

অদ্ভুত ব্যাপার, অনেকবারই যখন তারা তাঁর সামনে এসব ভান-অভিনয় করছিল, তখন তাঁর মনে হচ্ছিল, এই বুঝি চিৎকার করে বলে ওঠেন—

মিথ্যে বলা বন্ধ করো! তোমরা জানো, আমিও জানি যে আমি মারা যাচ্ছি। অন্তত এই সত্যটা নিয়ে মিথ্যে বলা বন্ধ করো!” কিন্তু তিনি কখনো এই কথা বলার সাহস সঞ্চয় করতে পারেননি।

তিনি স্পষ্টই বুঝতে পারছিলেন, তাঁর মৃত্যুর সেই ভয়াবহ, মর্মান্তিক ঘটনাটিকে আশপাশের মানুষগুলো এমন একটি সাধারণ, সামান্য, বিরক্তিকর—এমনকি কিছুটা অশোভন ঘটনায় পরিণত করেছে, যেন কেউ ড্রয়িংরুমে ঢুকে সেখানে কোনো দুর্গন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে। আর এই কাজটি তারা করছিল সেই তথাকথিত শিষ্টাচারের আড়ালে, যে শিষ্টাচারের সেবা তিনি সারা জীবন ধরে করে এসেছেন।

ইভান ইলিচ বুঝতে পারলেন, কেউই তাঁর প্রতি সত্যিকারের সহানুভূতি অনুভব করছে না। কারণ কেউই তাঁর অবস্থাটা সত্যিকার অর্থে বুঝতে বা উপলব্ধি করতে চাইছে না। একমাত্র গেরাসিমই তাঁর অবস্থাটা বুঝেছিল এবং তাঁর জন্য দুঃখ অনুভব করেছিল।

তাই ইভান ইলিচ একমাত্র গেরাসিমের সঙ্গেই স্বস্তি অনুভব করতেন।

গেরাসিম যখন তাঁর পা ধরে রাখত—কখনো কখনো সারা রাত ধরে—তখন ইভান ইলিচ গভীর সান্ত্বনা পেতেন। গেরাসিম তাঁকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজে ঘুমোতে যেতে অস্বীকার করত এবং বলত— আপনি এসব নিয়ে চিন্তা করবেন না, ইভান ইলিচ। পরে আমি যথেষ্ট ঘুমিয়ে নিতে পারব।”

কখনো কখনো সে আরও আপনজনের মতো হয়ে বলত— আপনি যদি অসুস্থ না হতেন, তাহলে কথা আলাদা ছিল। কিন্তু এখন আপনি অসুস্থ—তাই আপনাকে একটু সাহায্য করতে আমার আপত্তি হবে কেন?”

সে যা উপলব্ধি করতে পেরেছে সেটাকে আড়াল করার কোনো প্রয়োজন বোধ করে না। সে শুধু তার রোগে কাতর, দুর্বল ও কৃশকায় প্রভুর জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ অনুভব করত।

একবার ইভান ইলিচ তাকে চলে যেতে বললে গেরাসিম সরাসরি বলে ফেলেছিল— আমরা সবাই একদিন না একদিন মরব। তাহলে আপনাকে একটু সাহায্য করতে আমার আপত্তি থাকবে কেন?”

এই কথার মধ্য দিয়ে সে যেন খুব সহজ একটি সত্য প্রকাশ করেছিল—মৃত্যুপথযাত্রী একজন মানুষের জন্য কাজ করাকে সে কোনো বোঝা মনে করে না। কারণ সে জানত, তার নিজের মৃত্যুর সময়ও হয়তো কেউ না কেউ তার জন্য ঠিক একইভাবে একটু কষ্ট স্বীকার করবে।

এই মিথ্যাচারের কথাটা বাদ দিলেও, কিংবা বলা যায়, সেই মিথ্যাচারের কারণেই, ইভান ইলিচকে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দিত আর-একটি বিষয়—কেউই তাকে সেভাবে করুণা করত না, যেভাবে সে করুণা পেতে চাইত।

দীর্ঘক্ষণ অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করার পর কখনো কখনো তার সবচেয়ে বেশি ইচ্ছে করত—যদিও সে নিজেই এ কথা স্বীকার করতে লজ্জা পেত—কেউ যেন তাকে ঠিক সেইভাবে স্নেহ করে, যেভাবে অসুস্থ একটি শিশুকে করা হয়। সে চাইত, কেউ তাকে আদর করুক, সান্ত্বনা দিক, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিক। সে জানত, সে একজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মচারী, তার দাড়িতে পাক ধরেছে; তাই সে যা চাইছে, তা বাস্তবে পাওয়া অসম্ভব। তবু তার মন সেই স্নেহ-সান্ত্বনার জন্য আকুল হয়ে থাকত।

গেরাসিমের আচরণে সে যেন সেই কাঙ্ক্ষিত স্নেহেরই কিছুটা আভাস পেত, আর তাই গেরাসিমের সেই ব্যবহার তাকে সান্ত্বনা দিত।

ইভান ইলিচের ইচ্ছে করত কাঁদতে, আদর পেতে, কেউ যেন তার জন্য কাঁদে। কিন্তু ঠিক সেই সময় তার সহকর্মী শেবেক এসে হাজির হতো। তখন কাঁদা বা আদর পাওয়ার বদলে অভ্যাসবশত ইভান ইলিচ নিজের মুখে গাম্ভীর্য, কঠোরতা ও গভীর ভাব ফুটিয়ে তুলত। আদালতের ক্যাসেশন বিভাগের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে সে নিজের মতামত প্রকাশ করত এবং সেই মতের ওপর একগুঁয়েভাবে অটল থাকত।

তাঁর চারপাশে এবং তাঁর নিজের ভেতরে যে এই মিথ্যা ও ভান জমে উঠেছিল, তাঁর শেষ জীবনের দিনগুলোকে বিষিয়ে তুলার অন্য কোনো কিছুরই যেন এতটা ক্ষমতা ছিল না।

                 অষ্টম অধ্যায়

সকাল হয়েছিল। ইভান ইলিচ বুঝতে পেরেছিলেন যে সকাল হয়েছে, কারণ গেরাসিম চলে গেছে, আর পিটার নামে ভৃত্যটি এসে মোমবাতিগুলো নিভিয়ে দিয়েছে, একটি পর্দা সরিয়ে দিয়েছে এবং নিঃশব্দে ঘর গোছাতে শুরু করেছে। সকাল হোক বা সন্ধ্যা, শুক্রবার হোক বা রবিবার—তাতে কিছুই এসে যায় না; সবই যেন একই রকম: একটানা কুরে কুরে খাওয়া, অসহনীয়, যন্ত্রণাদায়ক ব্যথা—এক মুহূর্তের জন্যও যার বিরাম নেই; জীবনের শক্তি নির্মমভাবে ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে আসছে, অথচ এখনও পুরোপুরি নিভে যায়নি—এই বোধ; আর সেই চিরভীতিকর, ঘৃণিত মৃত্যুর ক্রমাগত এগিয়ে আসা। মৃত্যুই ছিল একমাত্র বাস্তবতা, আর বাকি সবকিছুই ছিল মিথ্যা ও ভ্রান্তি। এমন অবস্থায় দিন, সপ্তাহ, ঘণ্টা—এসবেরই বা কী অর্থ?

—“স্যার, একটু চা খাবেন?”

ও নিয়মকানুন ঠিক রাখতে চায়, চায় যেন বড়লোকেরা সকালে চা পান করেন,’ ইভান ইলিচ মনে মনে ভাবলেন। মুখে শুধু বললেন—“না।”

—“স্যার, আপনি কি সোফায় গিয়ে শোবেন?”

ও ঘরটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে চায়, আর আমি ওর কাজে বাধা হয়ে আছি। আমিই যেন নোংরা আর অগোছালো জিনিস,’ তিনি ভাবলেন। তারপর শুধু বললেন,
—“না, আমাকে একা থাকতে দাও।”

লোকটি নিজের কাজে ব্যস্ত রইল। ইভান ইলিচ হাত বাড়িয়ে দিলেন। পিটার সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এল।

—“কী হয়েছে, স্যার?”

—“আমার ঘড়িটা।”

কাছেই রাখা ঘড়িটা তুলে নিয়ে পিটার তাঁর মনিবের হাতে দিল।

—“সাড়ে আটটা। সবাই কি উঠে পড়েছে?”

—“না, স্যার। শুধু ভ্লাদিমির ইভানোভিচ উঠেছে; সে স্কুলে চলে গেছে। প্রাসকোভিয়া ফিওদোরোভনা বলেছেন, আপনি যদি তাঁকে ডাকতে বলেন, তাহলে যেন তাঁকে জাগিয়ে দিই। তাঁকে কি ডাকব?”

—“না, দরকার নেই।”

হয়তো একটু চা খাওয়াই ভালো হবে,’ তিনি মনে মনে ভাবলেন। তারপর মুখে বললেন,
—“হ্যাঁ, আমাকে একটু চা এনে দাও।”

পিটার দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু ইভান ইলিচ একা হয়ে যাওয়ার ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন।

ওকে কী করে এখানে রাখা যায়? ও হ্যাঁ, আমার ওষুধের কথা বলব।’

—“পিটার, আমার ওষুধটা আমাকে দাও।”

কেন নয়? হয়তো এখনও কিছুটা উপকার হতে পারে।’

তিনি এক চামচ ওষুধ নিয়ে গিলে ফেললেন। কিন্তু সেই পরিচিত, বমি-বমি ভাব জাগানো, হতাশায় ভরা স্বাদটি অনুভব করা মাত্রই তিনি স্থির করলেন— না, এতে কোনো কাজ হবে না। সবই অর্থহীন কাণ্ড, সবই প্রতারণা।’

না, আমি আর এতে বিশ্বাস করতে পারি না। কিন্তু এই ব্যথা—কেন এই ব্যথা? যদি অন্তত এক মুহূর্তের জন্যও ব্যথাটা থেমে যেত!’

তিনি কাতর স্বরে গোঙালেন।

পিটার তাঁর দিকে ফিরে তাকাল।

—“কিছু হয়নি। তুমি যাও, আমার জন্য একটু চা নিয়ে এসো।”

পিটার বেরিয়ে গেল। একা হয়ে ইভান ইলিচ গোঙাতে লাগলেন—শুধু যন্ত্রণায় নয়, যদিও সেই যন্ত্রণা ছিল ভয়াবহ; তার চেয়েও বেশি ছিল তাঁর মনের অসহ্য যন্ত্রণা। সব সময় একই অবস্থা, চিরকাল যেন একই রকম—এই অন্তহীন দিন আর রাত। যদি শুধু একটু তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেত! কিন্তু তাড়াতাড়ি কী শেষ হবে? মৃত্যু? অন্ধকার?… না, না! মৃত্যু ছাড়া আর যেকোনো কিছুই ভালো!

পিটার যখন ট্রেতে করে চা নিয়ে ফিরে এল, ইভান ইলিচ কিছুক্ষণ তার দিকে এমন বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন যে, সে কে এবং কেন এসেছে, তা যেন তিনি বুঝতেই পারছিলেন না। তাঁর সেই দৃষ্টিতে পিটার অস্বস্তিতে পড়ে গেলআর পিটারের এই অস্বস্তিই ইভান ইলিচকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল।

ওহ্, চা! আচ্ছা, রেখে দাও। শুধু আমাকে একটু ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার জামা পরতে সাহায্য করো।”

ইভান ইলিচ ধুতে শুরু করলেন। মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য থেমে থেমে তিনি প্রথমে হাত ধুলেন, তারপর মুখ ধুলেন, দাঁত পরিষ্কার করলেন, চুল আঁচড়ালেন এবং আয়নায় নিজের দিকে তাকালেন। আয়নায় নিজের চেহারা দেখে তিনি ভয় পেয়ে গেলেন—বিশেষ করে তাঁর বিবর্ণ কপালের ওপর নিস্তেজভাবে লেপ্টে থাকা চুলগুলো দেখে। জামা বদলানোর সময় তিনি বুঝতে পারছিলেন, নিজের শরীরের দিকে তাকালে আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়বেন। তাই সেদিকে না তাকানোর চেষ্টা করলেন।

অবশেষে তিনি তৈরি হলেন। গায়ে গাউন চাপালেন, একটি চাদর জড়িয়ে নিলেন এবং চা খাওয়ার জন্য আরামকেদারায় বসলেন। কিছুক্ষণের জন্য তাঁর শরীরে একটু স্বস্তি ফিরে এল। কিন্তু চায়ে চুমুক দেওয়া মাত্রই আবার সেই একই অদ্ভুত স্বাদ অনুভব করলেন, আর যন্ত্রণাটাও ফিরে এল। অনেক কষ্টে চা শেষ করে তিনি পা দুটো সামনের দিকে ছড়িয়ে শুয়ে পড়লেন এবং পিটারকে চলে যেতে বললেন।

সব সময় একই ব্যাপার।

এই তো একটু আগে আশার ক্ষীণ আলো জ্বলে ওঠেছিল, আর পরক্ষণেই হতাশার উত্তাল সমুদ্র এসে তাকে গ্রাস করেছিলআর সঙ্গে থাকে সেই যন্ত্রণা—সব সময় যন্ত্রণা, সব সময় হতাশা, আর সব সময় একই অবস্থা।

একা থাকলে তাঁর ভীষণ কষ্টের সঙ্গে কাউকে ডেকে কাছে পাওয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগত। কিন্তু তিনি আগেই জানতেন, কেউ কাছে থাকলে তাঁর অবস্থা আরও অসহ্য হয়ে উঠবে।

আরেক ডোজ মরফিন নেব—অন্তত কিছুক্ষণের জন্য অচেতন হয়ে থাকব। ডাক্তারকে বলব, তাঁকে অন্য কোনো উপায় ভাবতেই হবে। এভাবে চলতে পারে না, চলতেই পারে না।”

এইভাবে আরও এক ঘণ্টা কেটে গেল, তারপর আরও একটি ঘণ্টা।

কিন্তু এবার দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল।

হয়তো ডাক্তার? হ্যাঁ, ডাক্তারই।

ডাক্তার ভেতরে ঢুকলেন—সতেজ, প্রাণবন্ত, মোটাসোটা এবং হাসিখুশি। তাঁর মুখে এমন এক অভিব্যক্তি, যেন তিনি বলতে চাইছেন, “আরে, আপনি তো কোনো একটা ব্যাপার নিয়ে অযথাই ভয় পেয়ে আছেন! দাঁড়ান, সবকিছু আমি এখনই ঠিক করে দিচ্ছি!”

ডাক্তার নিজেও জানেন, এই পরিস্থিতিতে তাঁর মুখের এমন ভাব একেবারেই বেমানান। কিন্তু একবার এই অভিব্যক্তি তিনি মুখে এঁটে নিয়েছেন, এখন আর সেটি সরাতে পারেন না—যেমন কোনো ব্যক্তি সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে একের পর এক রোগী দেখতে যাওয়ার জন্য ফ্রক-কোট পরে নিলে, সারাদিন সেটি আর খুলতে পারে না।

উফ্! কী ভীষণ ঠান্ডা! কী তীব্র শীত পড়েছে! একটু গা গরম করে নিই,”—ডাক্তার এমনভাবে বললেন, যেন শুধু একটু গা গরম হওয়ার অপেক্ষা, তারপরই সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে।

আচ্ছা, বলুন তো, এখন কেমন আছেন?”

ইভান ইলিচের মনে হলো, ডাক্তার আসলে বলতে চাইছে—“আচ্ছা, আমাদের অবস্থা এখন কেমন?” কিন্তু তিনিও বুঝতে পারছেন যে এভাবে বলা ঠিক হবে না। তাই তিনি বললেন, “রাতটা কেমন গেল?”

ইভান ইলিচ তাঁর দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন চোখের ভাষায় বলছেন—“মিথ্যে কথা বলতে তোমার কি একটুও লজ্জা হয় না?”

কিন্তু ডাক্তার সেই প্রশ্ন বুঝতে চাইলেন না। ইভান ইলিচ বললেন, “আগের মতোই ভয়াবহ। ব্যথা এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে ছাড়ে না, একটুও কমে না। যদি কিছু একটা...”

হ্যাঁ, আপনারা রোগীরা সবাই এমনই করেন...” ডাক্তার বললেন“এই যে, এখন মনে হচ্ছে আমার গা বেশ গরম হয়ে গেছে। এমনকি প্রাসকোভিয়া ফিয়োদোরোভনাও, যিনি এত খুঁতখুঁতে, আমার তাপমাত্রা নিয়ে কোনো আপত্তি করতে পারতেন না। আচ্ছা, এবার আপনাকে সুপ্রভাত জানানো যেতে পারে।”

এই বলে ডাক্তার রোগীর হাতে চাপ দিয়ে ধরলেন

তারপর আগের হাসি-ঠাট্টার ভাবটা ছেড়ে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে রোগীকে পরীক্ষা করতে শুরু করলেননাড়ি দেখলেন, তাপমাত্রা মাপলেন; তারপর রোগীর শরীর টিপে-টুপে দেখতে এবং স্টেথোস্কোপ দিয়ে বুক পরীক্ষা করতে লাগলেন

ইভান ইলিচ খুব ভালো করেই জানতেন যে এসব নিছক অর্থহীন কাজ, একেবারে ভণ্ডামি। তবু ডাক্তার যখন সোফার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তাঁর শরীরের ওপর ঝুঁকে পড়লেন, কখনও কানটা একটু ওপরে, কখনও একটু নিচে নিয়ে গেলেন, আর মুখে গভীর তাৎপর্যের ভাব ফুটিয়ে নানা রকম কসরত করতে লাগলেন, তখন ইভান ইলিচ সবকিছুই চুপচাপ সহ্য করলেন। ঠিক যেমন তিনি একসময় আইনজীবীদের কথাবার্তাও সহ্য করতেন—যদিও তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে তারা মিথ্যে কথা বলছে এবং কেন মিথ্যে কথা বলছে।

ডাক্তার তখনও সোফার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তাঁর শরীর পরীক্ষা করছিলেনএমন সময় দরজার কাছে প্রাসকোভিয়া ফিয়োদোরোভনার রেশমি পোশাকের খসখস শব্দ শোনা গেল। সেই সঙ্গে শোনা গেল, ডাক্তার এসে পৌঁছানোর খবর তাকে না দেওয়ার জন্য সে পিওতরকে বকাঝকা করছে।

সে ঘরে ঢুকে স্বামীকে চুমু খেল। তারপর সঙ্গে সঙ্গেই প্রমাণ করতে শুরু করল যে সে অনেকক্ষণ আগেই ঘুম থেকে উঠেছিল এবং কেবল একটা ভুল বোঝাবুঝির কারণেই ডাক্তার আসার সময় সেখানে উপস্থিত থাকতে পারেনি।

ইভান ইলিচ তার দিকে তাকিয়ে তাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভালো করে নিরীক্ষণ করলেন। তার সাদা, গোলগাল, পরিচ্ছন্ন হাত ও গলার সঙ্গে নিজের অবস্থা তুলনা করলেন; তার ঝকঝকে চুল, প্রাণচঞ্চল চোখের দীপ্তি—সবকিছুই তাঁর চোখে পড়ল।

তিনি তাকে সমস্ত প্রাণ দিয়ে ঘৃণা করলেন। আর সেই ঘৃণার তীব্র অনুভূতির স্পর্শে ইভান ইলিচের যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দিল।

ডাক্তার দু’হাত জোরে জোরে ঘষতে লাগলেন—আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে।

তাঁর প্রতি এবং তাঁর অসুস্থতার প্রতি প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনার মনোভাব এখনও একই রকম ছিল। ডাক্তার যেমন তাঁর রোগীর প্রতি একটি বিশেষ ধরনের মনোভাব তৈরি করে ফেলেছিলেন, যা তিনি আর বদলাতে পারছিলেন না, তেমনি তিনিও ইভান ইলিচের প্রতি একটি নির্দিষ্ট ধারণা পোষণ করতেন— ইভান এমন কিছু করছেন না, যা তাঁর করা উচিত, এবং এর জন্য তিনি নিজেই দায়ী। তাই তিনি তাঁকে ভালোবেসে বকাঝকা করতেন। এখন আর সেই মনোভাব বদলানো তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

দেখতেই পাচ্ছেন, ও আমার কথা শোনে না, সময়মতো ওষুধও খায় না। আর সবচেয়ে বড় কথা, এমন একটা ভঙ্গিতে শুয়ে থাকে, যা নিশ্চয়ই ওর পক্ষে খারাপ—পা দুটো উঁচু করে।”

তিনি কীভাবে ইভান গেরাসিমকে দিয়ে তাঁর পা দুটো তুলে ধরে রাখতে বলেন, সেটাও ডাক্তারকে বললেন। ডাক্তার অবজ্ঞামিশ্রিত সৌজন্যের সঙ্গে মৃদু হাসলেন। তাঁর সেই হাসির অর্থ যেন এই—“আর কী-ই বা করা যাবে? এই অসুস্থ মানুষগুলোর এমন কত বোকা বোকা খেয়াল থাকে! এসব আমাদের ক্ষমা করতেই হবে।”

পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হলে ডাক্তার ঘড়ির দিকে তাকালেন। তখন প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনা ইভান ইলিচকে বললেন, “অবশ্যই, আপনি যেমন চান তেমনই হবে। তবে আজ আমি একজন বিখ্যাত বিশেষজ্ঞকে ডেকে পাঠিয়েছি। তিনি আপনাকে পরীক্ষা করবেন এবং মিখাইল দানিলোভিচের সঙ্গে পরামর্শ করবেন।” তারপর খানিকটা ব্যঙ্গের সুরে বললেন, “দয়া করে এতে আপত্তি করবেন না। আমি এটা নিজের জন্যই করছি।”

কথাটির মধ্যে এমন একটা ইঙ্গিত ছিল যে, তিনি সবকিছুই নাকি নিজের জন্য করছেন, অথচ আসলে তিনি সবই তাঁর স্বামীর ভালোর জন্য করছেন—এবং এই কথাটি শুধু এই কারণে বলছেন, যাতে ইভান তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কোনো অধিকার না পান।

ইভান নীরব রইলেন এবং কপাল কুঁচকে রইলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি যেন চারদিক থেকে মিথ্যার এক জালে ঘিরে পড়েছেন—এমন এক জাল, যার জট ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন।

তিনি বুঝতে পারছিলেন, প্রাসকোভিয়া তাঁর জন্য যা কিছু করছেন, সবই আসলে নিজের স্বার্থে করছেন। অথচ তিনি যখন বলেন যে তিনি নিজের জন্যই এসব করছেন, তখন এমনভাবে বলেন যেন কথাটি এতটাই অবিশ্বাস্য যে ইভানকে অবশ্যই এর উল্টোটা বুঝতে হবে।

সাড়ে এগারোটার সময় সেই বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ এসে পৌঁছালেন। আবার শুরু হল শরীর পরীক্ষা করার সেই শব্দ, নানা গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা—কখনও ইভান ইলিচের সামনে, কখনও পাশের ঘরে—কিডনি আর অ্যাপেন্ডিক্স নিয়ে আলোচনা, নানা প্রশ্ন ও তার উত্তর। সবকিছুতেই এমন এক গভীর গুরুত্বের ভাব, যেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।

কিন্তু ইভান ইলিচের সামনে তখন যে একমাত্র সত্যিকারের প্রশ্নটি ছিল—জীবন না মৃত্যুতার পরিবর্তে আবারও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াল তাঁর কিডনি আর অ্যাপেন্ডিক্স। যেন ওই অঙ্গ দুটিই এমন কিছু ভুল করছিল, যা তাদের করা উচিত ছিল না; আর এখন মিখাইল দানিলোভিচ ও সেই বিশেষজ্ঞ মিলে তাদের ধরে বেঁধে ঠিক করে দেবেন, তাদের ভুল-ত্রুটি শুধরে দেবেন এবং আবার যথাযথভাবে কাজ করতে বাধ্য করবেন।

প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকটি ইভান ইলিচের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় মুখে গম্ভীর ভাব রেখেছিলেন, যদিও তাঁর চেহারায় সম্পূর্ণ নিরাশার ছাপ ছিল না। ভয় ও আশায় চকচক করা চোখে ইভান ইলিচ যখন ভীরু স্বরে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি সুস্থ হয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন, তখন ডাক্তার বললেন—এ বিষয়ে তিনি নিশ্চয়তা দিতে পারেন না, তবে সম্ভাবনা যে একেবারে নেই, তা নয়।

ডাক্তারকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে দেখতে দেখতে ইভান ইলিচের চোখে যে আশার আকুল দৃষ্টি ফুটে উঠেছিল, তা এতই করুণ ছিল যে প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনা সেটি দেখে ডাক্তারকে তাঁর পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কেঁদে ফেললেন।

কিন্তু ডাক্তারের উৎসাহের কথায় যে আশার আলো ইভান ইলিচের মনে জ্বলে উঠেছিল, তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। একই ঘর, একই ছবি, একই পর্দা, একই দেওয়ালের কাগজ(ওয়ালপেপার), একই ওষুধের শিশিগুলো—সবই তো আগের মতোই ছিল। আর ছিল সেই একই যন্ত্রণাক্লিষ্ট শরীর। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইভান ইলিচ গোঙাতে শুরু করলেন। তাঁকে চামড়ার নিচে একটি ইনজেকশন দেওয়া হলো, এবং তিনি অচেতনতার মধ্যে ডুবে গেলেন

যখন তাঁর জ্ঞান ফিরল, তখন গোধূলি নেমে এসেছে। তাঁকে রাতের খাবার এনে দেওয়া হলো। অনেক কষ্টে তিনি সামান্য বিফ-টি(গরুর মাংসের ঝোল) গিলে খেলেন। তারপর আবার সবকিছু আগের মতোই চলতে লাগল, আর ধীরে ধীরে রাত ঘনিয়ে এল।

সন্ধ্যা সাতটার সময় প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনা সন্ধ্যার পোশাক পরে ঘরে ঢুকলেন। তাঁর প্রশস্ত বুক কর্সেট(শরীরের কোমর ও বুক আঁটসাঁট করে রাখার বিশেষ অন্তর্বাস) এর চাপে আরও উঁচু হয়ে উঠেছিল, আর মুখে পাউডারের হালকা দাগ ছিল।সকালে তিনি ইভান ইলিচকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে সেদিন রাতে তারা থিয়েটারে যাবে। সারাহ অভিনয় করতে বার্নহার্ট শহরে এসেছেন এবং তাঁদের জন্য একটি বক্স নেওয়া ছিল—সেটি নেওয়ার জন্য ইভান ইলিচই জোর করেছিলেন।

এখন তিনি সে কথা ভুলেই গিয়েছিলেন। স্ত্রীর সাজসজ্জা দেখে তাঁর বিরক্তি লাগল। কিন্তু নিজের বিরক্তি তিনি প্রকাশ করলেন না। কারণ তাঁর মনে পড়ল, তিনিই তো জোর করে বলেছিলেন যে তাঁদের একটি বক্স নেওয়া উচিত এবং থিয়েটারে যাওয়া উচিত—শিশুদের জন্য এটি শিক্ষামূলক ও নান্দনিক আনন্দের একটি সুযোগ হবে।

প্রাসকোভিয়া ফেদোরোভনা ঘরে ঢুকলেন আত্মতৃপ্তির ভাব নিয়ে, তবে তাঁর মুখে সামান্য অপরাধবোধের ছাপও ছিল। তিনি বসে জিজ্ঞেস করলেন, ইভান ইলিচ কেমন আছেন। কিন্তু ইভান ইলিচ বুঝতে পারলেন, তিনি সত্যিই তাঁর অবস্থা জানতে চান বলে প্রশ্নটি করছেন না; কেবল প্রশ্ন করার জন্যই করছেন। কারণ তিনিও জানেন, জানার মতো নতুন কিছু নেই।

এরপর তিনি আসল কথায় এলেন—তিনি কোনোভাবেই যেতে চাইতেন না, কিন্তু যেহেতু বক্সটি আগেই নেওয়া হয়ে গেছে এবং হেলেন ও তাঁদের মেয়ে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে পেত্রিশ্চেভও যাচ্ছে—(যে পরীক্ষার ম্যাজিস্ট্রেট এবং তাঁদের মেয়ের বাগদত্ত)—তাই তাদের একা যেতে দেওয়া তো সম্ভব নয়। অবশ্য তিনি বরং ইভান ইলিচের কাছেই কিছুক্ষণ বসে থাকতে বেশি পছন্দ করতেন। তবে তিনি যেন অবশ্যই ডাক্তারের নির্দেশ মেনে চলেন, তিনি বাইরে থাকা অবস্থায়ও যেন নিজের যত্ন নেন। আচ্ছা, আর ফিয়োদর পেত্রোভিচ”—(যিনি তাঁর মেয়ের বাগদত্ত)—“ভেতরে আসতে চান। তাঁকে কি আসতে বলব? আর লিজাকেও?”

বেশ, আসুক।”

তাদের মেয়ে লিজা সন্ধ্যার অনুষ্ঠানের উপযোগী সম্পূর্ণ সাজপোশাকে ঘরে ঢুকল। তার তরুণ, সতেজ শরীরের অনেকটাই অনাবৃত ছিল—যেন নিজের সেই যৌবন ও সৌন্দর্যই সে প্রদর্শন করছে, অথচ ইভান ইলিচের নিজের শরীরই এখন তাঁর কাছে অসহ্য যন্ত্রণার কারণ। সে ছিল বলিষ্ঠ, সুস্থ, স্পষ্টতই প্রেমে মগ্ন; আর অসুস্থতা, যন্ত্রণা ও মৃত্যুর প্রতি তার বিরক্তি—কারণ এগুলো তার সুখের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে

ফিয়োদর পেত্রোভিচও সন্ধ্যার পোশাকে এসে ঘরে ঢুকল। ক্যাপুলের মতো করে তার চুল কোঁকড়ানো, লম্বা ও পেশিবহুল গলায় শক্ত, আঁটসাঁট কলার, বুকের সামনে বিশাল সাদা শার্টের অংশ, আর শক্ত উরুর সঙ্গে লেগে থাকা সরু কালো পায়জামা। এক হাতে সে শক্ত করে সাদা দস্তানা পরেছিল, আর অন্য হাতে ধরে রেখেছিল অপেরার টুপি।

তার পেছন পেছন স্কুলের ছেলেটিও নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে পড়ল। নতুন ইউনিফর্ম পরা, বেচারা ছোট্ট ছেলেটির হাতেও দস্তানা। তার চোখের নিচে গভীর কালো ছাপ—যার অর্থ ইভান ইলিচ খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারলেন। ছেলেটিকে ইভান ইলিচের সবসময়ই করুণ মনে হতো; কিন্তু এখন ছেলেটির ভীত, মমতাভরা দৃষ্টি দেখতে তাঁর আরও বেশি কষ্ট হচ্ছিল। তাঁর মনে হলো, গেরাসিম ছাড়া একমাত্র ভাসিয়াই যেন তাঁকে সত্যিই বুঝতে এবং তাঁর জন্য সহানুভূতি অনুভব করতে পারে

সবাই বসে আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করল, তিনি কেমন আছেন

তারপর নেমে এল নীরবতা।

লিজা মাকে অপেরার দূরবীনটির কথা জিজ্ঞেস করল। কে সেটি নিয়েছিল এবং কোথায় রেখেছিল—এই নিয়ে মা-মেয়ের মধ্যে খানিক তর্ক শুরু হলো। ব্যাপারটা কিছুটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠল।

ফিয়োদর পেত্রোভিচ ইভান ইলিচকে জিজ্ঞেস করল, তিনি কখনও সারাহ বার্নহার্টকে দেখেছেন কি না।

ইভান ইলিচ প্রথমে প্রশ্নটি ঠিকমতো বুঝতে পারলেন না। তারপর বললেন-না। তুমি কি আগে তাঁকে দেখেছ?”

হ্যাঁ, আদ্রিয়েন লেকুভর-এ।”

প্রাসকোভিয়া ফিয়োদোরোভনা বললেন, কোন কোন ভূমিকায় সারাহ বার্নহার্ট বিশেষভাবে ভালো অভিনয় করেছিলেন। তাঁর মেয়ে অবশ্য এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করল। তারপর তাঁর অভিনয়ের সৌন্দর্য ও বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা শুরু হলো—এমন এক ধরনের আলোচনা, যা মানুষ বারবার করে এবং প্রতিবারই প্রায় একই রকম হয়।

আলোচনার মাঝখানে ফিয়োদর পেত্রোভিচ একবার ইভান ইলিচের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ চুপ করে গেল।

অন্যরাও ইভান ইলিচের দিকে তাকাল এবং তারাও নীরব হয়ে গেল।

ইভান ইলিচ জ্বলজ্বলে চোখে সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁকে দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে তিনি তাদের ওপর ভীষণ বিরক্ত।

এই পরিস্থিতি সামলে নেওয়া দরকার ছিল, কিন্তু কীভাবে তা করা যায়, কেউ বুঝতে পারছিল না। নীরবতা ভাঙতেই হতো। কিন্তু কিছুক্ষণ কেউই সাহস করে কথা বলতে পারল না। সকলেরই ভয় হচ্ছিল—এতক্ষণ ধরে যে ভান ও মিথ্যা সৌজন্যের আড়ালে সত্যকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, সেটি যদি হঠাৎ সবার চোখের সামনে ভেঙে পড়ে, তবে আসল সত্যটি আর গোপন থাকবে না।

সবার আগে লিজাই সাহস সঞ্চয় করে সেই নীরবতা ভাঙল। কিন্তু সবাই যে কথাটি মনে মনে অনুভব করছিল, সেটিকে আড়াল করার চেষ্টা করতে গিয়েই সে বরং সেই সত্যটাকেই আরও স্পষ্ট করে ফেলল।

আচ্ছা, যদি যেতেই হয়, তাহলে এবার রওনা হওয়ার সময় হয়েছে,”—ঘড়ির দিকে তাকিয়ে লিজা বলল। ঘড়িটা ছিল তার বাবার দেওয়া উপহার। তারপর ফেদর পেত্রোভিচের দিকে তাকিয়ে এমন এক মৃদু অথচ অর্থপূর্ণ হাসি হাসল, যার তাৎপর্য কেবল তাদের দুজনেরই জানা ছিল।

সে উঠে দাঁড়াল; তার পোশাকটি মৃদু শব্দে খসখস করে উঠল। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে শুভরাত্রি জানিয়ে চলে গেল

তারা চলে যাওয়ার পর ইভান ইলিচের মনে হলো, যেন তিনি কিছুটা স্বস্তি পেলেন। তাদের সঙ্গে সঙ্গে সেই কৃত্রিমতাটুকুও যেন ঘর থেকে চলে গেছে। কিন্তু যন্ত্রণা রয়ে গেল—সেই একই যন্ত্রণা, সেই একই ভয়, যা সবকিছুকে একঘেয়ে ও একই রকম করে তুলেছিল; কিছুই যেন বেশি কঠিন নয়, আবার কিছুই সহজও নয়। বরং সবকিছুই আরও খারাপ হয়ে উঠছিল।

আবার মিনিটের পর মিনিট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেতে লাগল। সবকিছু একই রকম রয়ে গেল; যন্ত্রণার কোনো বিরাম নেই। আর এই সমস্ত কিছুর যে অনিবার্য পরিণতি আসন্ন, সেই ভাবনাটিই ক্রমশ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে লাগল।

হ্যাঁ, গেরাসিমকে এখানে পাঠাও,”—পেত্র যে প্রশ্ন করেছিল, তার উত্তরে তিনি বললেন।

                   নবম অধ্যায়

তার স্ত্রী গভীর রাতে ফিরে এলেন। পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকলেন তিনি; কিন্তু ইভান ইলিচ তাঁর আসার শব্দ শুনতে পেলেন। চোখ খুলেই আবার তাড়াতাড়ি বন্ধ করে ফেললেন। স্ত্রী চেয়েছিলেন গেরাসিমকে চলে যেতে বলে নিজেই তাঁর পাশে বসে থাকবেনকিন্তু ইভান ইলিচ চোখ খুলে বললেন, না, তুমি চলে যাও।

খুব কষ্ট হচ্ছে?

সব সময় যেমন হয়, তেমনই।

একটু আফিম খাও।

ইভান ইলিচ রাজি হলেন এবং আফিম খেলেন। স্ত্রী চলে গেলেন।

রাত প্রায় তিনটে পর্যন্ত তিনি এক অসাড়, যন্ত্রণাময় ঘোরের মধ্যে পড়ে রইলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল, তাঁকে এবং তাঁর যন্ত্রণাকে যেন একটি সরু, গভীর, কালো বস্তার মধ্যে ঠেলে ঢোকানো হচ্ছে। ক্রমাগত আরও গভীরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, অথচ কিছুতেই বস্তার তলায় পৌঁছানো যাচ্ছে না। ব্যাপারটা এমনিতেই ভয়ংকর, তার ওপর এর সঙ্গে মিশে ছিল অসহ্য যন্ত্রণা। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, অথচ একই সঙ্গে চাইছিলেন বস্তার ভেতর দিয়ে একেবারে নিচে পড়ে যেতে। তিনি বাধা দিচ্ছিলেন, আবার যেন নিজেই সেই ঠেলে দেওয়ার কাজে সায়ও দিচ্ছিলেন।

হঠাৎ মনে হলো, তিনি যেন বস্তাটি ভেদ করে নিচে পড়ে গেলেন—আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চেতনা ফিরে এল।

গেরাসিম পায়ের কাছে বিছানায় বসে শান্তভাবে, ধৈর্যের সঙ্গে ঝিমোচ্ছিল। ইভান ইলিচের মোজা-পরা, রোগে শুকিয়ে যাওয়া পা দুটো তখনও গেরাসিমের কাঁধের ওপর রাখা ছিলসেই একই ঢাকা-দেওয়া মোমবাতিটি জ্বলছিল, আর সেই একই অবিরাম যন্ত্রণা তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।

গেরাসিম, চলে যাও—তিনি ফিসফিস করে বললেন।

কোনো অসুবিধা নেই, হুজুর। আমি আর একটু থাকি।

না। তুমি যাও।

ইভান ইলিচ গেরাসিমের কাঁধ থেকে পা নামিয়ে নিলেন। এক পাশে ফিরে হাতের ওপর ভর দিয়ে শুয়ে পড়লেন। নিজের জন্য তাঁর গভীর মায়া হলো। গেরাসিম পাশের ঘরে চলে যাওয়া পর্যন্ত তিনি শুধু অপেক্ষা করলেন। তারপর আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না—শিশুর মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।

নিজের অসহায়তার জন্য তিনি কাঁদলেন, তাঁর ভয়ংকর নিঃসঙ্গতার জন্য কাঁদলেন, মানুষের নিষ্ঠুরতার জন্য কাঁদলেন, ঈশ্বরের নিষ্ঠুরতার জন্য কাঁদলেন—আর কাঁদলেন ঈশ্বরের অনুপস্থিতির জন্য।

তুমি কেন আমার সঙ্গে এসব করলে? কেন আমাকে এখানে এনে ফেললে? কেন, কেন তুমি আমাকে এত ভয়ংকরভাবে যন্ত্রণা দিচ্ছ?”

তিনি কোনো উত্তরের আশা করেননি। তবু তিনি কাঁদতে লাগলেন—কারণ কোনো উত্তর ছিল না, কোনো উত্তর পাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না

ব্যথা আবার তীব্র হয়ে উঠল। কিন্তু তিনি নড়লেন না, কাউকে ডাকলেনও না। মনে মনে বললেন-চালিয়ে যাও! আঘাত করো! কিন্তু কেন? আমি তোমার কী করেছি? কেন আমাকে এই শাস্তি দিচ্ছ?”

তারপর ধীরে ধীরে তিনি শান্ত হয়ে এলেন। শুধু কান্নাই থামালেন না, এমনকি নিঃশ্বাস পর্যন্ত আটকে রেখে গভীর মনোযোগের সঙ্গে শুনতে লাগলেন। মনে হলো, তিনি যেন বাইরে থেকে আসা কোনো শ্রাব্য কণ্ঠস্বর শুনছেন না; বরং শুনছেন নিজের আত্মার কণ্ঠস্বর—নিজের অন্তরের গভীর থেকে উঠে আসা চিন্তার অবিরাম স্রোত।

তুমি কী চাও?”—এই কথাটিই ছিল প্রথম স্পষ্ট ভাবনা, যা তিনি ভাষায় প্রকাশ করতে পারলেন। তিনি শুনলেন, “তুমি কী চাও? তুমি কী চাও?” নিজেকেই প্রশ্ন করলেন তিনি। “আমি কী চাই? বাঁচতে চাই, কষ্ট পেতে চাই না,” তিনি উত্তর দিলেন। তারপর আবার এত গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলেন যে, এমনকি তাঁর অসহ্য যন্ত্রণাও তাঁকে আর বিচলিত করতে পারল না।

বাঁচতে চাও? কীভাবে?”—তাঁর অন্তরের কণ্ঠস্বর প্রশ্ন করল।

কেন, যেমন আগে বাঁচতাম—সুখে, স্বাচ্ছন্দ্যে।”

যেমন আগে বেঁচেছিলে—সুখে, স্বাচ্ছন্দ্যে?”—অন্তরের কণ্ঠস্বর আবার সেই কথাই বলল।

তখন কল্পনায় তিনি তাঁর সুখের জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় মুহূর্তগুলো একে একে স্মরণ করতে শুরু করলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর জীবনের সেই শ্রেষ্ঠ মুহূর্তগুলোর একটিও এখন আর তেমন আনন্দময় বলে মনে হলো না, শুধু শৈশবের প্রথম দিকের স্মৃতিগুলো ছাড়া। শৈশবেই যেন এমন কিছু সত্যিকারের আনন্দ ছিল, যা ফিরে পাওয়া গেলে তার ওপর ভর করে আবার বেঁচে থাকা সম্ভব। কিন্তু যে শিশুটি সেই আনন্দ অনুভব করেছিল, সে তো আর নেই; মনে হলো, সে যেন অন্য কারও স্মৃতি।

যে সময় থেকে ইভান ইলিচের বর্তামান জীবন গড়ে উঠতে শুরু করেছিল, সেই সময়ে পৌঁছাতেই তাঁর অতীতের সব আনন্দ যেন চোখের সামনে গলে যেতে লাগল এবং তুচ্ছ, এমনকি অনেক সময় কদর্য ও বিরক্তিকর কিছুতে পরিণত হলো। শৈশব থেকে যত দূরে তিনি এগিয়েছিলেন এবং বর্তমানের যত কাছে এসেছিলেন, তাঁর জীবনের আনন্দগুলো ততই মূল্যহীন ও সন্দেহজনক বলে মনে হতে লাগল

এর শুরু আইন বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে। সেখানে তখনও কিছু সত্যিকারের ভালো জিনিস ছিল—প্রাণখোলা আনন্দ, বন্ধুত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাকিন্তু উচ্চতর শ্রেণিতে উঠতে উঠতে সেই ভালো মুহূর্তগুলো কমে এসেছিল। এরপর কর্মজীবনের প্রথম দিকে, যখন তিনি গভর্নরের দপ্তরে চাকরি করতেন, তখন আবার কিছু আনন্দময় মুহূর্ত এসেছিল—এক নারীর প্রতি তাঁর ভালোবাসার স্মৃতিগুলো জেগে উঠল

তারপর সবকিছু ক্রমশ জটিল ও অস্পষ্ট হয়ে গেল; ভালো কিছুর পরিমাণ আরও কমে গেল। পরে আরও কমল। যত তিনি জীবনের পথে এগিয়ে গেলেন, ততই ভালো জিনিসের পরিমাণ কমতে থাকল।

তাঁর বিয়ে—যা অনেকটা নিছক এক দুর্ঘটনার মতো ঘটেছিল; তারপর সেই বিয়ে নিয়ে মোহভঙ্গ; স্ত্রীর মুখের দুর্গন্ধ, তার ইন্দ্রিয়পরায়ণতা ও ভণ্ডামি; তারপর সেই প্রাণঘাতী সরকারি চাকরির জীবন, অর্থ নিয়ে দুশ্চিন্তা—এক বছর, দুই বছর, দশ বছর, বিশ বছর—সব সময় একই ব্যাপার। আর যত সময় গড়িয়েছে, সেই জীবন ততই অসহনীয় ও মৃত্যুর মতো নিস্তেজ হয়ে উঠেছে।

মনে হচ্ছে, আমি যেন ভেবেছিলাম ওপরে উঠছি, অথচ আসলে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছিলাম। সত্যিই তো তাই। সমাজের চোখে আমি যত ওপরে উঠেছি, ঠিক ততটাই আমার জীবন আমার কাছ থেকে সরে গেছে। আর এখন সব শেষ। বাকি আছে শুধু মৃত্যু।”

তাহলে এর অর্থ কী? কেন এমন হলো? জীবন যে এত অর্থহীন আর ভয়াবহ হতে পারে, তা তো হতে পারে না। কিন্তু যদি সত্যিই জীবন এত ভয়াবহ ও অর্থহীন হয়ে থাকে, তাহলে আমাকে কেন যন্ত্রণা পেতে পেতে মরতে হবে? নিশ্চয়ই কোথাও একটা ভুল হয়েছে!”

হঠাৎ তাঁর মনে হলো, “হয়তো আমি যেভাবে বাঁচা উচিত ছিল, সেভাবে বাঁচিনি।”

কিন্তু তা কী করে সম্ভব? আমি তো সবকিছু ঠিকঠাকই করেছি!”—সঙ্গে সঙ্গেই তিনি নিজেকে উত্তর দিলেন। আর জীবনের সমস্ত রহস্যের একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান বলে মনে হওয়া এই চিন্তাটিকে তিনি তৎক্ষণাৎ মন থেকে সরিয়ে দিলেন—এমন এক অসম্ভব ধারণা বলে।

তাহলে এখন তুমি কী চাও? বাঁচতে চাও? কীভাবে বাঁচবে? সেইভাবে, যেভাবে তুমি আদালতে থাকাকালীন বাঁচতে—যখন পিয়ন ঘোষণা করত, ‘বিচারক আসছেন!’ বিচারক আসছেন, বিচারক!”

তিনি কথাগুলো নিজের মনেই বারবার উচ্চারণ করতে লাগলেন।

এই তো তিনি—বিচারক। কিন্তু আমি তো অপরাধী নই!”—তিনি রাগে চিৎকার করে উঠলেন।

কিন্তু এসব কিসের জন্য?”

তিনি আর কাঁদলেন না। মুখটি দেয়ালের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে একই প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে থাকলেন—কেন? কী উদ্দেশ্যে? কেন এই সমস্ত ভয়াবহতা?

কিন্তু যতই তিনি ভাবলেন, কোনো উত্তরই তিনি পেলেন না।

আর যখনই তাঁর মনে হতো—যেমন প্রায়ই হতো—যে এসব কিছু ঘটছে কারণ তিনি তাঁর জীবন যেভাবে যাপন করা উচিত ছিল, সেভাবে যাপন করেননি, তখনই তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজের সমগ্র জীবনের তথাকথিত সঠিকতা মনে করতেন এবং সেই অদ্ভুত ধারণাটিকে মন থেকে সরিয়ে দিতেন।

                      দশম অধ্যায়

আরও দু-সপ্তাহ কেটে গেল। এখন ইভান ইলিচ আর সোফা থেকে উঠতেন না। বিছানায় শুতেন না; প্রায় সব সময়ই সোফার ওপর দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকতেন। একই রকম অবিরাম যন্ত্রণা তাঁকে কষ্ট দিত, আর নিঃসঙ্গ অবস্থায় তিনি বারবার সেই একই দুর্বোধ্য, যার কোনো সমাধান নেই এমন প্রশ্নটি নিয়ে ভাবতেন— এটা কী? এমন কি হতে পারে যে এটাই মৃত্যু?”

মনের ভেতর থেকে উত্তর আসত—হ্যাঁ, এটাই মৃত্যু।”

কিন্তু এই কষ্ট কেন?”

ভেতরের কণ্ঠস্বর উত্তর দিত—কোনো কারণ নেই—এমনিই হচ্ছে।”

এর বাইরে বা এর অতিরিক্ত আর কিছুই ছিল না।

অসুস্থ হওয়ার শুরু থেকেই—অর্থাৎ প্রথমবার ডাক্তার দেখাতে যাওয়ার পর থেকেই—ইভান ইলিচের জীবন যেন দুটো পরস্পরবিরোধী অনুভূতির মধ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। কখনও তিনি হতাশায় ডুবে যেতেন এবং সেই অজানা, ভয়ংকর মৃত্যুর আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন; আবার কখনও আশাবাদী হয়ে নিজের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কীভাবে কাজ করছে, তা গভীর আগ্রহে লক্ষ্য করতেন।

কখনও তাঁর সমস্ত মনোযোগ গিয়ে কেন্দ্রীভূত হতো শুধু একটি কিডনি কিংবা অন্ত্রের ওপর—যেটি সাময়িকভাবে তার স্বাভাবিক কাজ করতে পারছে না বলে তিনি মনে করতেন। আবার কখনও তাঁর সামনে একমাত্র সত্য হয়ে দাঁড়াত সেই দুর্বোধ্য ও ভয়ংকর মৃত্যু, যাকে কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়।

অসুস্থতার শুরু থেকেই এই দুই মানসিক অবস্থা পালা করে তাঁর মধ্যে দেখা দিয়েছিলকিন্তু অসুখ যত বাড়তে লাগল, কিডনির ব্যাপারটি তাঁর কাছে ততই অনিশ্চিত ও অবাস্তব বলে মনে হতে লাগল, আর আসন্ন মৃত্যুর অনুভূতিটি হয়ে উঠল ক্রমেই আরও বাস্তব।

তিন মাস আগে তিনি কেমন ছিলেন আর এখন কোথায় এসে দাঁড়িয়েছেন—এ কথা মনে করলেই তাঁর মনে হতো, তিনি কী নিয়মিতভাবে ক্রমশ অবনতির দিকে এগিয়ে চলেছেন। আর তখন তাঁর সামান্যতম আশাটুকুও ভেঙে চুরমার হয়ে যেত।

ইদানীং, সোফার পেছনের দিকের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকা অবস্থায় যে নিঃসঙ্গতা তাঁকে ঘিরে ধরত, সেই নিঃসঙ্গতা ছিল ভয়াবহ। অথচ তিনি ছিলেন জনবহুল একটি শহরের মধ্যে, চারপাশে ছিল অসংখ্য পরিচিত মানুষ ও আত্মীয়স্বজন। তবু তাঁর নিঃসঙ্গতা এতটাই সম্পূর্ণ ছিল যে সমুদ্রের তলদেশে কিংবা মাটির গভীরেও তিনি এর চেয়ে বেশি নিঃসঙ্গ হতে পারতেন না।

এই ভয়ংকর নিঃসঙ্গতার মধ্যে ইভান ইলিচ কেবল অতীতের স্মৃতি নিয়েই বেঁচে থাকতেন

অতীত জীবনের একের পর এক ছবি তাঁর মনের সামনে ভেসে উঠত। সেই স্মৃতিগুলো সাধারণত সাম্প্রতিক সময় থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে আরও দূরের অতীতে চলে যেত—শেষ পর্যন্ত তাঁর শৈশবের কাছে গিয়ে থামত।

সেদিন তাঁকে যে শুকনো বরই রান্না করে খেতে দেওয়া হয়েছিল, সেটার কথা ভাবতে গেলেই তাঁর মন ফিরে যেত শৈশবের সেই কাঁচা, কুঁচকে যাওয়া ফরাসি বরইগুলোর কাছে। মনে পড়ত সেগুলোর বিশেষ স্বাদ, আর আঁটি চুষতে চুষতে মুখে জমে ওঠা লালার কথা। সেই স্বাদের স্মৃতির সঙ্গে একে একে ফিরে আসত শৈশবের আরও কত স্মৃতি—তাঁর ধাইমা, তাঁর ভাই, তাঁদের খেলনাগুলো।

না, এসব ভাবা চলবে না… খুব কষ্ট হয়,” নিজেকেই বলতেন ইভান ইলিচ।

তারপর নিজেকে আবার বর্তমানের মধ্যে ফিরিয়ে আনতেন—সোফার পেছনের বোতামটির দিকে এবং তার মরোক্কো চামড়ার ভাঁজগুলোর দিকে মনোযোগ দিতেন।

মরোক্কো চামড়া খুব দামি, কিন্তু ভালো টেকে না—এ নিয়ে একবার ঝগড়াও হয়েছিল। আর বাবার যে সময়ের সেই পোর্টফোলিওটা আমরা ছিঁড়ে ফেলেছিলাম এবং শাস্তি পেয়েছিলাম, আর মা আমাদের টার্ট(টার্ট (Tart) হলো এক ধরনের মিষ্টি বা নোনতা পেস্ট্রি-জাতীয় খাবার)এনে দিয়েছিলেন—সেই সময়ের ঝগড়াটাও ছিল অন্য রকম, আর চামড়াটাও ছিল অন্য রকম…”

আবার তাঁর চিন্তা ফিরে যেত শৈশবের দিনগুলোর কাছে। আবার সেই স্মৃতি তাঁকে কষ্ট দিত। আর তিনি প্রাণপণে সেসব চিন্তা মন থেকে সরিয়ে অন্য কোনো বিষয়ের দিকে নিজের মনকে ফেরানোর চেষ্টা করতেন।

এরপর আবার সেই স্মৃতির ধারার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনে আর-একটি দৃশ্যপট ভেসে উঠল—কীভাবে তাঁর অসুস্থতা ধীরে ধীরে বেড়েছে এবং ক্রমশ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। সেখানেও তিনি যতই অতীতের দিকে ফিরে তাকালেন, ততই দেখতে পেলেন—জীবন ছিল আরও পরিপূর্ণ। জীবনে ভালো জিনিসের পরিমাণও ছিল বেশি, আর জীবনও ছিল যেন আরও বেশি প্রাণময়। দুটি বিষয় তাঁর মনে একাকার হয়ে গেল।

তিনি ভাবলেন, যেভাবে আমার যন্ত্রণা ক্রমাগত বেড়েছে, ঠিক সেভাবেই আমার জীবনও ক্রমশ আরও খারাপ হয়ে চলেছে।

জীবনের একেবারে শুরুতে, অনেক পেছনে, একটি উজ্জ্বল আলোকবিন্দু রয়েছে; তারপর সবকিছু ক্রমশ অন্ধকার থেকে আরও অন্ধকার হয়ে গেছে এবং দ্রুততর গতিতে শেষের দিকে ছুটে চলেছে—মৃত্যু যত এগিয়ে এসেছে, সেই গতি যেন তার দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক,” ইভান ইলিচ ভাবলেন।

তখন তাঁর মনে পড়ল, উপর থেকে নিচে পড়তে থাকা একটি পাথরের কথা—যে পাথর ক্রমেই দ্রুততর গতিতে নিচে নেমে আসে। তাঁর জীবনও যেন তেমনই—একটির পর একটি যন্ত্রণা ক্রমশ বেড়ে চলেছে এবং তাঁকে দ্রুত থেকে দ্রুততর গতিতে জীবনের শেষ প্রান্তের দিকে, সেই চরম ভয়াবহ যন্ত্রণার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

আমি ছুটে চলেছি…”

এই ভাবনায় তিনি শিউরে উঠলেন। শরীরটা একটু নাড়াচাড়া করলেন এবং নিজেকে সেই পতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বুঝতে পারলেন—প্রতিরোধ করা আর সম্ভব নয়। ক্লান্ত চোখ দুটো সামনে যা দেখছে, তা দেখা থেকে বিরত হতে পারছে না। তিনি সোফার পিঠের দিকে তাকিয়ে রইলেন এবং অপেক্ষা করতে লাগলেন—সেই ভয়ংকর পতন, প্রচণ্ড আঘাত এবং ধ্বংসের মুহূর্তটির জন্য।

প্রতিরোধ করা অসম্ভব!” তিনি নিজেকে বললেন

যদি অন্তত বুঝতে পারতাম, এসবের অর্থ কী! কিন্তু সেটাও অসম্ভব। যদি বলা যেত যে আমি যেভাবে জীবনযাপন করা উচিত ছিল, সেভাবে জীবনযাপন করিনি, তাহলে হয়তো এর একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যেত। কিন্তু সেটাও তো বলা যায় না।”

এরপর তাঁর মনে পড়ল তাঁর সমগ্র জীবন—কীভাবে তিনি সর্বদা আইন মেনে চলেছেন, নিয়মকানুন মেনেছেন, কর্তব্যপরায়ণ থেকেছেন এবং সমাজের চোখে যথাযথ ও শালীন জীবনযাপন করেছেন।

অন্তত এটুকু তো কোনোভাবেই স্বীকার করা যায় না,” তিনি ভাবলেন।

তাঁর ঠোঁটে এক ধরনের বিদ্রূপাত্মক হাসি ফুটে উঠল—যেন কেউ তাঁর সেই হাসি দেখতে পাচ্ছে এবং সেই হাসির আড়ালে তিনি সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন

কোনো ব্যাখ্যাই নেই! শুধু যন্ত্রণা, মৃত্যু…। কিন্তু কেন?”

                  একাদশ অধ্যায়

আরও দু’সপ্তাহ এভাবেই কেটে গেল। এই দুই সপ্তাহের মধ্যেই এমন একটি ঘটনা ঘটল, যার জন্য ইভান ইলিচ এবং তাঁর স্ত্রী দু’জনেই অপেক্ষা করছিলেন—পেত্রিশচেভ আনুষ্ঠানিকভাবে লিজাকে বিবাহের প্রস্তাব দিল।

ঘটনাটি ঘটেছিল সন্ধ্যায়। পরদিন প্রাসকোভিয়া ফিয়োদোরোভনা তাঁর স্বামীর ঘরে এলেন। কীভাবে তাঁকে এই খবরটি জানানো যায়, সেই কথাই ভাবছিলেন। কিন্তু আগের রাতেই ইভান ইলিচের অবস্থার আবারও অবনতি ঘটেছিল।

তিনি দেখলেন, ইভান ইলিচ তখনও সোফায় শুয়ে আছেন, কিন্তু আগের চেয়ে অন্যভাবে। চিৎ হয়ে শুয়ে তিনি গোঙাচ্ছিলেন এবং একদৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। প্রাসকোভিয়া তাঁর ওষুধের কথা মনে করিয়ে দিতে শুরু করলেন। কিন্তু তিনি এমন এক দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকালেন যে, তিনি আর কথাটা শেষ করতে পারলেন না। সেই দৃষ্টিতে, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রীর প্রতি, এমন তীব্র বিদ্বেষ ফুটে উঠেছিল যে প্রাসকোভিয়া স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

ইভান ইলিচ বললেন—“খ্রিস্টের দোহাই, আমাকে শান্তিতে মরতে দাও!”

তিনি চলে যেতে উদ্যত হলেন। ঠিক সেই সময় তাঁদের মেয়ে এসে বাবাকে সকালের শুভেচ্ছা জানাতে তাঁর কাছে এগিয়ে গেল। ইভান ইলিচ তার দিকেও স্ত্রীর মতোই তাকালেন। তাঁর শরীরের অবস্থা কেমন, মেয়ে জানতে চাইলে তিনি শুষ্ক স্বরে বললেন—“শিগগিরই তো তোমাদের সবাইকে আমার হাত থেকে মুক্তি দেব।”

দু’জনেই চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ তাঁর কাছে বসে থাকার পর তারা চলে গেল।

লিজা মাকে বলল—“এটা কি আমাদের দোষ? এমন ভাব করছেন যেন আমরাই এর জন্য দায়ী! বাবার জন্য আমার খুব কষ্ট হয়, কিন্তু তার জন্য আমাদেরও কেন এত কষ্ট পেতে হবে?”

ডাক্তার প্রতিদিনের মতো নির্দিষ্ট সময়ে এলেন। ইভান ইলিচ তাঁর দিকে একবারও চোখ না সরিয়ে, রাগে ভরা দৃষ্টিতে কেবল “হ্যাঁ” এবং “না” বলে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে লাগলেন। শেষে বললেন—“আপনি তো জানেন, আমার জন্য আপনি কিছুই করতে পারবেন না। তাই আমাকে একা থাকতে দিন।”

ডাক্তার বললেন—“আপনার কষ্ট কিছুটা কমিয়ে দিতে পারি।”

ইভান ইলিচ বললেন—“সেটাও আপনি পারবেন না। আমাকে একা থাকতে দিন।”

ডাক্তার তখন পাশের বসার ঘরে গিয়ে প্রাসকোভিয়া ফিয়োদোরোভনাকে বললেন যে রোগীর অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। এখন একমাত্র উপায় হলো তাঁর স্বামীর যন্ত্রণা কমানোর জন্য আফিম দেওয়া। যন্ত্রণাটা নিশ্চয়ই অসহ্য।

ডাক্তার যা বলেছিলেন, তা সত্যি। ইভান ইলিচের শারীরিক যন্ত্রণা ছিল ভয়াবহ। কিন্তু শারীরিক কষ্টের চেয়েও ভয়ংকর ছিল তাঁর মানসিক যন্ত্রণা—সেটিই ছিল তাঁর প্রধান নির্যাতন।

এই মানসিক যন্ত্রণার কারণ ছিল এই যে, সেদিন রাতে তিনি জেরাসিমের ঘুমঘুম, সরল-সহৃদয় মুখটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তাঁর মনে একটি প্রশ্ন জেগে উঠেছিলযদি আমার পুরো জীবনটাই ভুল হয়ে থাকে?”

তাঁর মনে হলো, এতদিন যে কথাটিকে তিনি সম্পূর্ণ অসম্ভব বলে মনে করে এসেছেন—অর্থাৎ তিনি তাঁর জীবনকে যেভাবে যাপন করা উচিত ছিল, সেভাবে যাপন করেননি—সেটিই হয়তো শেষ পর্যন্ত সত্যি।

তিনি ভাবতে লাগলেন, সমাজের সবচেয়ে উঁচু স্তরের লোকেরা যাকে ভালো ও সঠিক বলে মনে করত, তার বিরুদ্ধে তাঁর মধ্যে যে সামান্যতম প্রতিবাদের চেষ্টা কখনও কখনও জেগে উঠেছিল, যে ক্ষীণ অথচ অদৃশ্য তাড়নাগুলো তিনি সঙ্গে সঙ্গেই দমন করে ফেলেছিলেন—হয়তো সেগুলোই ছিল সত্যিকারের জীবন। আর বাকি সবকিছুই ছিল মিথ্যা।

তাঁর পেশাগত কর্তব্য, তাঁর সমগ্র জীবনযাপনের ব্যবস্থা, তাঁর পারিবারিক জীবন, সমাজে তাঁর অবস্থান এবং সরকারি চাকরির সঙ্গে জড়িত সমস্ত স্বার্থ—সবকিছুই হয়তো মিথ্যা ছিল।

তিনি নিজের কাছে সেই জীবনটাকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু হঠাৎই তিনি বুঝতে পারলেন, যে বিষয়গুলোকে তিনি এতক্ষণ নিজের পক্ষে যুক্তি হিসেবে দাঁড় করাচ্ছিলেন, সেগুলোর ভিত কতটা দুর্বল ছিল

নিজেকে রক্ষা করার মতো আসলে কিছুই ছিল না।

কিন্তু যদি তা-ই হয়,” তিনি মনে মনে বলল, “আর আমি যদি এই জীবন থেকে এমন এক উপলব্ধি নিয়ে বিদায় নিই যে, আমাকে যা কিছু দেওয়া হয়েছিল, তার সবই আমি হারিয়েছি এবং এখন আর কিছুই সংশোধন করার উপায় নেই—তাহলে কী হবে?”

তিনি চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল এবং সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিতে নিজের জীবনটাকে ফিরে দেখতে শুরু করল। সকালে প্রথমে যখন তিনি তার ভৃত্যকে দেখল, তারপর স্ত্রীকে, তারপর মেয়েকে এবং শেষে ডাক্তারকে—তাদের প্রতিটি কথা, প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি তাকে সেই ভয়াবহ সত্যটিরই প্রমাণ দিল, যা রাতের বেলা তার কাছে প্রকাশিত হয়েছিল। তাদের মধ্যে তিনি যেন নিজেকেই দেখতে পেলেন—যে সবকিছুর জন্য তিনি এতদিন বেঁচে ছিলেন, সেই সমগ্র জীবনকে। আর এখন স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, সেসবের কিছুই সত্যিকারের ছিল না; বরং সেগুলো ছিল এক ভয়ংকর ও বিরাট প্রতারণা, যা তাঁর কাছ থেকে জীবন ও মৃত্যুর প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে রেখেছিল।

এই উপলব্ধি তাঁর শারীরিক যন্ত্রণাকে যেন দশগুণ বাড়িয়ে দিল। তিনি গোঙাতে লাগলেন, এপাশ-ওপাশ করতে লাগলেন এবং যে পোশাক তাকে গলা টিপে ধরছে ও শ্বাসরোধ করছে বলে মনে হচ্ছিল, সেটি টানতে লাগলেনএই কারণেই তিনি তাঁদের ওপর আরও ঘৃণা অনুভব করতে লাগলেন

তাঁকে প্রচুর পরিমাণে আফিম খাওয়ানো হলো। কিছুক্ষণের জন্য তিনি অচেতন হয়ে পড়লেনকিন্তু দুপুরের দিকে আবার তাঁর যন্ত্রণা শুরু হলো। তিনি সবাইকে ঘর থেকে বের করে দিলেন এবং ছটফট করতে লাগলেন

তার স্ত্রী তার কাছে এসে বলল—“জ্যাঁ, আমার প্রিয়, আমার কথা রাখো। এতে কোনো ক্ষতি হবে না, বরং অনেক সময় এতে উপকার হয়। সুস্থ মানুষও তো এটা গ্রহণ করে।”

তিনি চোখ বড় বড় করে স্ত্রীর দিকে তাকালেন

—“কী? কমিউনিয়ন(কমিউনিয়ন (Communion) বলতে খ্রিস্টধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচারকে বোঝায়।) নেব? কেন? এর তো কোনো দরকার নেই! তবে…।”

তাঁর স্ত্রী কাঁদতে শুরু করল।

—“হ্যাঁ, প্রিয়, নাও। আমি আমাদের পুরোহিতকে ডেকে আনছি। তিনি খুবই ভালো মানুষ।”

—“আচ্ছা। বেশ, তাই হোক,” তিনি অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করে বললেন

পুরোহিত এসে তার স্বীকারোক্তি শুনলেন। তখন ইভান ইলিচের মন কিছুটা নরম হয়ে গেল। তাঁর সমস্ত সংশয় যেন কিছুক্ষণের জন্য দূর হয়ে গেলো এবং সেই সঙ্গে যন্ত্রণাও কিছুটা কমে গেল। এক মুহূর্তের জন্য তাঁর মনে আশার আলো জ্বলে উঠল। তিনি আবার তার অ্যাপেন্ডিক্সের কথা এবং সেটি ঠিক করার সম্ভাবনার কথা ভাবতে শুরু করলেন

চোখে জল নিয়ে তিনি ধর্মীয় আচারটি গ্রহণ করলেনএরপর তাঁকে আবার শুইয়ে দেওয়া হলে কিছুক্ষণের জন্য তিনি স্বস্তি অনুভব করলেন, আর তাঁর মনে আবার বেঁচে থাকার আশা জেগে উঠল।

যে অস্ত্রোপচারের কথা তাঁকে বলা হয়েছিল, তিনি আবার সেটির কথা ভাবতে লাগলেন

বাঁচতে চাই! আমি বাঁচতে চাই!” তিনি মনে মনে বললেন

কমিউনিয়ন গ্রহণের পর তাঁর স্ত্রী তাকে অভিনন্দন জানাতে ঘরে এল। প্রচলিত কিছু সৌজন্যমূলক কথা বলার পর সে জিজ্ঞেস করল—“তুমি এখন একটু ভালো বোধ করছ, তাই না?”

তার দিকে না তাকিয়েই ইভান ইলিচ বলল—“হ্যাঁ।”

কিন্তু তাঁর স্ত্রীর পোশাক, তার দেহভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর—সবকিছুই যেন একই সত্য প্রকাশ করছিল:

এটা ভুল। এভাবে হওয়ার কথা নয়। তুমি যে জীবনের জন্য এতদিন বেঁচেছ এবং এখনও বেঁচে আছ, তার সবটাই মিথ্যা ও প্রতারণা—যে মিথ্যা তোমার কাছ থেকে জীবন ও মৃত্যুর সত্যকে আড়াল করে রেখেছে।”

এই চিন্তাটিকে তিনি মেনে নেওয়া মাত্রই তাঁর ঘৃণা এবং অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা আবার তীব্র হয়ে উঠল। সেই যন্ত্রণার সঙ্গে ফিরে এল অনিবার্য, আসন্ন মৃত্যুর স্পষ্ট অনুভূতিও। তার সঙ্গে এবার যোগ হলো এক নতুন ধরনের তীব্র, বিদ্ধ করে যাওয়া ব্যথা এবং শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসার অনুভূতি।

হ্যাঁ” শব্দটি উচ্চারণ করার সময় তাঁর মুখের অভিব্যক্তি ছিল ভয়ংকর।

কথাটি বলেই তিনি সরাসরি স্ত্রীর চোখের দিকে তাকালেনতারপর তাঁর দুর্বল শরীরের পক্ষে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় মুখ ফিরিয়ে উপুড় হয়ে গেলেন এবং চিৎকার করে বললেন—“বেরিয়ে যাও! বেরিয়ে যাও, আমাকে একা থাকতে দাও!”

                         দ্বাদশ অধ্যায়

সেই মুহূর্ত থেকেই তাঁর চিৎকার শুরু হয়েছিল, যা টানা তিন দিন ধরে চলেছিল। চিৎকারটি এতই ভয়াবহ ছিল যে, দুটি বন্ধ দরজার ওপার থেকেও তা শুনলে যে-কোনো মানুষের মনে আতঙ্ক জেগে উঠত। স্ত্রীকে উত্তর দেওয়ার মুহূর্তেই তিনি বুঝতে পারলেন—তিনি শেষ হয়ে গেছেন; আর ফিরে আসার কোনো পথ নেই। শেষ এসে গেছে—একেবারে শেষ। অথচ তাঁর সমস্ত সংশয়ের কোনো সমাধান হয়নি; সেগুলো সংশয় হয়েই রয়ে গেছে।

ওহ! ওহ! ওহ!”—তিনি নানা সুরে চিৎকার করতে লাগলেন। প্রথমে তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন-আমি চাই না!” তারপর সেই ‘ও’ ধ্বনিটিই টেনে টেনে চিৎকার করতে থাকলেন।

টানা তিন দিন ধরে—যে সময়ের কোনো অস্তিত্বই যেন তাঁর কাছে ছিল না—তিনি সেই কালো থলেটি(কালো থলেটি ইভান ইলিচের মৃত্যু ও মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণার প্রতীক)র মধ্যে ছটফট করতে লাগলেন, যেটির মধ্যে এক অদৃশ্য, অপ্রতিরোধ্য শক্তি তাঁকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছিল। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো মানুষ যেমন জল্লাদের হাতে ছটফট করতে থাকে, অথচ জানে যে নিজেকে বাঁচানোর কোনো উপায় তার নেই, তিনিও তেমনই প্রাণপণে সংগ্রাম করতে লাগলেন। প্রতি মুহূর্তে তিনি অনুভব করছিলেন, তাঁর সমস্ত প্রতিরোধ সত্ত্বেও তিনি ক্রমেই আরও কাছে চলে যাচ্ছেন সেই ভয়ংকর কিছুর দিকে।

তিনি বুঝতে পারছিলেন, তাঁর যন্ত্রণার কারণ শুধু এই নয় যে তাঁকে সেই কালো গহ্বরের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে; বরং আরও বেশি কষ্ট দিচ্ছে এই সত্য যে, তিনি পুরোপুরি তার মধ্যে ঢুকতে পারছেন না। আর তাঁকে সেই গহ্বরের মধ্যে ঢুকতে বাধা দিচ্ছিল তাঁর এই বিশ্বাস যে তাঁর জীবন ভালোভাবেই কেটেছে। নিজের জীবনকে ভালো বলে যে যুক্তি দিয়ে তিনি এতদিন নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, সেই যুক্তিই এখন তাঁকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, সামনে এগোতে দিচ্ছে না। আর এটাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছিল।

হঠাৎ কোনো এক শক্তি তাঁর বুক ও পাশের দিকে এমন জোরে আঘাত করল যে, তাঁর শ্বাস নেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠল। তারপর তিনি সেই গহ্বরের মধ্য দিয়ে নিচে পড়ে গেলেন। আর সেখানে, একেবারে তলদেশে, ছিল আলো।

তাঁর সঙ্গে যা ঘটেছিল, তা অনেকটা সেই অনুভূতির মতো, যা কখনো কখনো রেলগাড়িতে বসে হয়—মনে হয় যেন গাড়ি পিছনের দিকে যাচ্ছে, অথচ আসলে সেটি সামনের দিকেই এগিয়ে চলেছে; তারপর হঠাৎ এক মুহূর্তে আমরা বুঝতে পারি গাড়িটি আসলে কোন দিকে যাচ্ছে।

হ্যাঁ, এতদিন যা করেছি, তা ঠিক ছিল না,” তিনি মনে মনে বললেন। “কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। এখনও সব ঠিক করা সম্ভব। কিন্তু ঠিক কাজটা কী?”—এই প্রশ্নটি নিজেকেই করলেন তিনি। আর হঠাৎই তিনি শান্ত হয়ে গেলেন।

ঘটনাটি ঘটেছিল তাঁর জীবনের শেষ তৃতীয় দিনের শেষে—মৃত্যুর মাত্র দুই ঘণ্টা আগে।

ঠিক সেই সময় তাঁর স্কুলপড়ুয়া ছেলে নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে ধীরে ধীরে তাঁর শয্যার কাছে এসে দাঁড়াল। মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটি তখনও মরিয়া হয়ে চিৎকার করছিলেন এবং হাত-পা ছুড়ছিলেন। হঠাৎ তাঁর হাতটি ছেলের মাথার ওপর গিয়ে পড়ল। ছেলেটি সেই হাতটি ধরে নিজের ঠোঁটে চেপে ধরল এবং কাঁদতে শুরু করল।

সেই মুহূর্তেই ইভান ইলিচ যেন অতল গহ্বর পেরিয়ে আলোর দেখা পেলেন। তাঁর কাছে হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে উঠল—তাঁর জীবন যেমন হওয়া উচিত ছিল, তেমন হয়নি ঠিকই, কিন্তু এখনও তা সংশোধন করা সম্ভব। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করলেন, সঠিক কাজটা কী?” তারপর স্থির হয়ে মন দিয়ে শুনতে লাগলেন।

এমন সময় তিনি অনুভব করলেন, কেউ তাঁর হাতে চুমু খাচ্ছে। চোখ খুলে ছেলের দিকে তাকালেন। ছেলেটির জন্য তাঁর মনে গভীর মমতা জেগে উঠল। তাঁর স্ত্রীও কাছে এগিয়ে এলেন। ইভান ইলিচ তাঁর দিকে তাকালেন। স্ত্রী হাঁ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন; নাক ও গালে তখনও শুকায়নি এমন অশ্রুর দাগ, মুখে গভীর হতাশা ও অসহায়তার ছাপ।

তাঁর প্রতিও ইভান ইলিচের মায়া হলো। হ্যাঁ, আমি ওদের দুঃখ দিচ্ছি,” তিনি মনে মনে ভাবলেন। ওরা আমার জন্য কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু আমি মারা গেলে ওদের কষ্ট কমে যাবে।

তিনি কথাটা মুখে বলতে চাইলেন, কিন্তু বলার মতো শক্তি তাঁর ছিল না।

তা ছাড়া, বলেই বা কী হবে? আমাকে কাজ করতে হবে,” তিনি ভাবলেন।

স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে তিনি ছেলের দিকে ইশারা করে বললেন-ওকে নিয়ে যাও... ওর জন্য কষ্ট হচ্ছে... তোমার জন্যও কষ্ট হচ্ছে...”

তিনি আরও বলতে চেয়েছিলেন, আমাকে ক্ষমা করো। কিন্তু তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ক্ষমা...” শব্দটিও ঠিকমতো উচ্চারিত হলো না। তিনি হাত নাড়লেন। তিনি জানতেন, যাঁর কাছে তাঁর মনের কথার অর্থ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি ঠিকই তা বুঝবেন।

হঠাৎ তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল—যে ভার এতক্ষণ তাঁকে চেপে ধরেছিল, যে যন্ত্রণা ও আতঙ্ক তাঁকে কিছুতেই ছাড়ছিল না, তা যেন একসঙ্গে চারদিক থেকে খসে পড়তে শুরু করেছে—এক দিক থেকে নয়, দশ দিক থেকে নয়, যেন সব দিক থেকেই।

তিনি তাদের জন্য দুঃখ অনুভব করলেন। তাদের আর কষ্ট না দেওয়ার জন্য তাঁকে কিছু একটা করতেই হবে—তাঁদের মুক্ত করতে হবে, আর নিজেকেও এই অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করতে হবে।

কী সহজ! কী সুন্দর!” তিনি মনে মনে বললেন

তারপর হঠাৎ তাঁর মনে হলো, আর এই ব্যথা? ব্যথাটার কী হলো? কোথায় গেলে তুমি, ব্যথা?”

তিনি ব্যথার দিকে মন দিলেন। হ্যাঁ, এই তো আছে। তা থাকুক। এতে কী এসে যায়?”

আর মৃত্যু? মৃত্যু কোথায়?”

তিনি মৃত্যুকে নিয়ে তাঁর সেই চিরপরিচিত ভয়টাকে খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু তা আর খুঁজে পেলেন না।

কোথায় গেল? কোন মৃত্যু?”

ভয় পাওয়ার আর কোনো কারণ ছিল না, কারণ সেখানে আর মৃত্যু বলে কিছু ছিল না। মৃত্যুর জায়গায় ছিল আলো।

হঠাৎ তিনি উচ্চস্বরে বলে উঠলেন-এই তো ব্যাপার! কী আনন্দ!”

তাঁর কাছে এই সমস্ত ঘটনা ঘটল এক মুহূর্তের মধ্যেই। আর সেই এক মুহূর্তের উপলব্ধির অর্থও তাঁর কাছে আর কখনও বদলাল না।

কিন্তু যারা তাঁর পাশে উপস্থিত ছিল, তাদের কাছে তাঁর মৃত্যুযন্ত্রণা আরও প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলতে থাকল।

তাঁর গলায় কিছু একটা ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছিল। কঙ্কালসার শরীরটি মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছিল। তারপর তাঁর হাঁপ ধরা ও গলার ঘড়ঘড় শব্দ ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে এল।

শেষ হয়ে গেছে!” তাঁর কাছেই কেউ একজন বলল।

ইভান ইলিচ কথাটি শুনলেন এবং মনে মনে তা পুনরাবৃত্তি করলেন— মৃত্যু শেষ হয়ে গেছে,” তিনি নিজেকে বললেন। মৃত্যু আর নেই!”

তিনি একবার শ্বাস টানলেন, দীর্ঘশ্বাসের মাঝখানেই থেমে গেলেন, শরীরটা সোজা হয়ে প্রসারিত হলো—এবং তিনি মারা গেলেন।

                                                                                            সমাপ্ত

      

 

Comments

Popular posts from this blog

জীবনের গল্প

শহীদ কারবালা (যাত্ৰাপালা)

আসামের পর্যটন স্থান (Tourist places in Assam)